ছুটি-রুটি

পর্ব এক – কী করে ছুটি ও রুটির দেখা হল 

বেজায় গরম। দুপুরবেলা বসে বসে ফ্যানের হাওয়া খাওয়া আর কুলপিকাকুর থেকে বড় বড় কুলপি কেনা ছাড়া বিশেষ ভালো কিচ্ছু হচ্ছে না দিনে। তার উপর গরমের ছুটি। বন্ধুদের সঙ্গেও সেই কত্তদিন দেখা হয়নি। দুপুরবেলা বসে বসে টিনটিন পড়তে পড়তে এইসবই ভাবছিল ছুটি। বাবা মাও ওদিকে ভোঁসভোঁস করে ঘরে শুয়ে ঘুম দিচ্ছে। বাবার নাক ডাকছে ঘ্রোঁৎ ফুউউউউ, আর তালে তালে মায়ের নাকও সাড়া দিচ্ছে সুড়ুৎ সুঁউউউউ।

ভারী রাগ ধরে গেল ছুটির। দুপুরে ঘুমোলে নাকি ছুটি রাত্তিরে ঘুমায় না, ক্যাঁচরম্যাচর করে। তাই বাবা মা বলেছে একদম ড্যাবড্যাব করে জেগে থাকতে। আর এদিকে নিজেরা কিন্তু দিব্যি খাটে শুয়ে নাক ডাকছে। রাগ হবে না, বলো? রাগলেই ছুটির নাকটা লাল হয়ে যায়, আর অমনি ঘুমও পেয়ে যায়। কিন্তু না, এখন কিছুতেই ঘুমাবে না সে, এই বড়দের মতো সারাদিন ঘুমিয়ে নষ্ট করে সে কিছুতেই দিন কাটাবে না।

ঘুম কাটাতে ছুটি তরতর পায়ে সোজা উঠে গেল ছাদে। আর ছাদের দরজাটা খুলতেই…ওরেবাবা, পুরো গরম হলকা আসছে যেন! না না কিছুতেই ছাদে পা রাখা যাবে না। দরজাটা ঠেস দিয়ে বন্ধ করে খানিক ভাবতে বসল ছুটি। কোথায় যাওয়া যায়? খানিক ভেবে উপায় বের হল – হয়েছে! গোলাপবাগানেই যাবে সে! 

কী জিগাচ্ছ? গোলাপবাগানটা কী? ওমা, দেখো তো আমারই কী ভুল। ছুটিদের পাড়ায় ওদের ফ্ল্যাটবাড়িটা থেকে দুটো গলি এগোলেই একটা বিশাল বাগান আছে। ছুটিদের ছাদ থেকে তার ওপারের শেষটা পর্যন্ত দেখা যায় না। সেই জায়গাটার নামই গোলাপবাগান। গোলাপবাগান অবশ্য নামেই, তাতে একটাও গোলাপগাছ নেই। বিশাল বাগান, পাঁচিল জায়গায় জায়গায় ভেঙে পড়ছে, কেউ জানে না তার মালিক কে। ভিতরে ঠাসা ঠাসা গাছ আর আগাছা। পাড়ার কেউও বড় একটা ওদিকটা মাড়ায় না। কাসিমের মা তো এও বলে যে সন্ধেবেলা ওই বাগানে নাকি সে এই এত্ত একহাত বড় জিভ বের করা হলদে রঙের জিন, বুড়ো আঙুলের মতো খুদে খুদে কাঠপরী, পিঠ চুলকানো বেহ্মদত্তি, সবই দেখেছে। 

ছুটির কাঠপরী দেখার খুব শখ। সুযোগ পেলে মাঝেমধ্যেই সে ইতিউতি গোলাপ বাগানে উঁকি দিয়ে দেখে, কাঠপরী দেখা গেল কিনা। ছুটির পাশের বাড়ির সূর্যাস্তদাদা অবশ্য বলে, ওসব কাঠপরী টরী নাকি হয় না, তা অবশ্য ছুটির বিশ্বাস হয় না। সূর্যাস্তদাদা অনেক গুলপট্টি মারে। পৃথিবীতে এত কিছু হতে পারে, আর সামান্য কাঠপরী হতে পারে না?

পায়ে চটি গলিয়ে ছুটি আস্তে আস্তে দরজাটা ভেজিয়ে একছুটে নীচে নেমে গেল। দরজার ফাঁক দিয়ে তখনও মা আর বাবার সুর করে নাক ডাকা ভেসে ভেসে আসছে। 

ছুটিদের পাড়াটায় অনেক গাছ। বট, জাম, নারকেল, সুপারি, নিম, আঁশফল আরও কত কী। গাছের ছায়ায় এই ভরা গরমেও রাস্তাটা তেমন তেতে ওঠেনি। চারদিক শুনশান, খানিক দূরে বড়রাস্তা দিয়ে মাঝেমধ্যে খালি একটা আধটা গাড়ি যাবার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। 

তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে দু মিনিটের মধ্যেই ছুটি গোলাপবাগানের একেবারে ধারে এসে পড়ল। আগে অনেকবার এত অবধি এসেছে ছুটি, উঁকিঝুঁকিও মেরেছে, কিন্তু ভিতরে অবধি ঢোকা হয়নি। চাইলে অবশ্য ঢোকাই যায়। উঁচু পাঁচিল অনেকজায়গায় ভেঙে কোথাও ছুটির কোমর, কোথাও বা নাক অবধি নেমে এসেছে।

এদিকওদিক একবার দেখে নিল চট করে ছুটি, গড়াই কাকীমার নজরে পড়ে গেলে এখনই চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করবে। কিন্তু কোথায় কী, চারদিক ভোঁ ভাঁ, কেউ কোত্থাও নেই। খালি ওপাড়ার ভুলো গরমের হাত থেকে বাঁচতে দূরের পাকুড় গাছটার তলায় শুয়ে ভোঁসভোঁস করে ঘুমোচ্ছে।

দুহাতে চাপ দিয়ে পাঁচিলে চড়ে পড়ল ছুটি। তারপরে এক লাফ দিয়ে সোজা ভিতরে।

ভিতরটায় ঢুকতেই কেমন যেন গা শিরশির করা শুরু করল ছুটির। কেমন যেন ছায়া ছায়া চারদিকটা, একটা গা ছমছমে ভাব। বাইরের কোন আওয়াজই যেন এসে পৌঁছচ্ছে না, দূরে বড়রাস্তার গাড়ির আওয়াজও আর শোনা যাচ্ছে না। শুধু পাতার মধ্যে দিয়ে হাওয়া চলবার সরসর শব্দ, মাঝেমধ্যে দু চারটে পাখির ডাক, ডালে ডাল লাগবার আওয়াজ। 

দু দশ পা চলার পরেই ছুটির মনে হল কেউ যেন তার পিছনে পিছনে চলছে। ইতি উতি তাকিয়ে অবশ্য কাউকেই দেখতে পেল না ছুটি। কিন্তু তাও, কেউ যেন একটা রয়েছে। সোজা তাকালে কিছুই বোঝা যায় না, কিন্তু চোখের কোণা দিয়ে মনে হয় কোথা থেকে যেন এই একটা ছায়া সরে গেল। ছুটি আমাদের অবশ্যি ভারী বীরপুরুষ, ভূতপ্রেতদত্তিদানোতে তার ভয় নেই মোটেও। কিন্তু তাও নিজের অজান্তেই একটা ছোট্ট ঢোক গিলে নিল ছুটি। পিছনে তাকিয়ে দেখল ঢোকার পাঁচিলটাও আর মোটে দেখা যাচ্ছে না। 

কিন্তু কই, না বেহ্মদত্তি, না জীন, না কাঠপরী কারুরই যে টিকিটিরও দেখা নেই! আচ্ছা আরেকটু এগিয়েই দেখা যাক নাহয়? জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পায়ে চলা ছোট্ট পথ। পুরো দেড়হাত মাপের মানুষ হলে মোটেও গলতে পারবে না সেখান দিয়ে। কিন্তু আমাদের ছোট্ট ছুটি এই ডালের ফাঁক দিয়ে গলে, ওই মাকড়সার জাল ডিঙিয়ে দিব্যি সামনে এগোতে লাগল। 

বেশ মিনিট পাঁচ চলার পর যখন জঙ্গল আর শেষ হবে না মনে হচ্ছে, ছুটিও ভাবছে পায়ে পায়ে ফেরত যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ কিনা, তখনই জঙ্গল পাতলা হয়ে গেল। শেষ মাকড়সার জালটা ডিঙিয়ে ছুটি অবাক হয়ে দেখল, সামনে বনজঙ্গল অনেক পাতলা হয়ে গেছে, ডালপালা মেলা গাছগুলো থাকলেও আগাছা প্রায় নেই। আর সামনে জমি ঢালু হয়ে নেমে গিয়েছে একটা দিঘি অবধি!

হ্যাঁ সত্যি, বেশ সুন্দর গোলমতো একটা দিঘি! দিব্যি টলটলে জল তাতে, পাড়ের কাছটা নালিঘাস, কচুরিপানা, আর মাঝখানটায় একটা দুটো শাপলা ফুল ফুটেছে। উল্টো পারে আবার ঘন বন শুরু হয়েছে। ছুটি তো ভারী অবাক হয়ে গেল। এরকম দিব্যি একটা দিঘি তাদের বাড়ি থেকে ঢিলছোঁড়া দূরত্বে আছে আর সে কিনা জানেও না! এরকম সুন্দর একটা দিঘি থাকতে রোজ শনিবার করে বাবা তাকে সাইকেলে চাপিয়ে ওই দূরে পচা সুইমিং পুলে সাঁতার শেখাতে নিয়ে যায়?

জলের একদম কাছে পৌঁছে গেল ছুটি। ছুটি এখনও পুরো ভালো করে সাঁতার শেখেনি, জলকে তার এখনও একটু ভয় ভয় করে। খানিক দূর থেকে একটা পা থেকে চটির পাটিটা খুলে ফেলে আস্তে আস্তে ডুবিয়ে দিল। জলের উপরটা বেশ গরম, কিন্তু একদম উপরটাই, ভিতরটা বেশ কুলকুলে ঠাণ্ডা জল। দু’পা থেকেই চটি খুলে ফেলে গোড়ালি অবধি ভিজিয়ে খানিক জল ছিটিয়ে আবার জল থেকে উঠে পড়ল ছুটি। পা দুটো ভিজে গিয়ে গরমের দিনে বেশ আরাম হচ্ছে। একটা পাকুড় গাছের তলায় বসে আবার চটি পড়ছে, তখনই ছুটি দেখতে পেল তাকে।

কাকে দেখল ভাবছ? দেখল, পাকুড় গাছটার একদম তলার ডালটায় বসে একটা বেশ মোটাসোটা কাঠিবিড়ালি তার দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রয়েছে। মাঝেমধ্যে মোটাসোটা লেজখানা ঝাঁকাচ্ছে, মাঝেমধ্যে একটা কাঠবাদামের টুকরোয় কুটুস কুটুস করে কামড় দিচ্ছে, কিন্তু বলতে গেলে তার দিকে সত্যিকারেরই ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রয়েছে।

খানিক অপেক্ষা করেও যখন কাঠবেড়ালিটা চোখ ফেরাচ্ছেই না, তখন রেগে গিয়ে এক ধমকই দিইয়ে ফেলল ছুটি। “অ্যাই! অ্যাই! হচ্ছেটা কী? এরকম ড্যাবড্যাব করে তাকাচ্ছ কেন?”

সে কাঠবেড়ালি ভারী অবাক হয়ে ছুটির দিকে তাকিয়ে রইল, তারপরে বলল, “তুমি দেখতে পাচ্ছ আমাকে? “ 

ছুটি একবার নিজের কানদুটো থাবড়ে নিল। কাঠবেড়ালিটা সত্যি সত্যি উত্তর দিল তার কথার? নাকি সে ভুল শুনল? আবার কারুর কথার উত্তর না দিলে অভদ্রতাও হয়, তাই সে তড়িঘড়ি উত্তর দিল, “হ্যাঁ তো, দেখলাম তো, না দেখার কী আছে?”

কাঠবিড়ালিটা তাতে আরও চিন্তিত হয়ে পড়ল। “কিন্তু এরকম তো হবার কথা নয়।” বলে তিরতির করে ঘাড় নাড়তে লাগল। 

ছুটি কোমরে হাত দিয়ে বলল, “বা রে, রোজ কত্ত কাঠবেড়ালি দেখছি, রোজ আমাদের টবের গাছ ঠুকরে দিয়ে যাচ্ছে, ফুলের কুঁড়ি খেয়ে দিয়ে যাচ্ছে, আর বললে হবে আমি তোমাকে কীকরে দেখলাম?”

কাঠবেড়ালি তাতে আরও চিন্তিত হয়ে পড়ল মনে হল। “কিন্তু মানে এরকম তো হবার কথা না। মানে আমি তো সাধারণ কাঠবেড়ালি নই…”

-“কাঠবেড়ালি নও তো কে তুমি?”

-“আমি? আমি আর্জেন্তুরা উরসুলা দে লা ক্যাম্বিয়ান।”

ছুটি দু একবার চেষ্টা করল ওই ইয়াব্বড় গোদা নামখানা বলতে। দু একবার তুতলিয়ে শেষে হাল ছেড়ে বলল, “অত্তবড় নাম তো আমি বলতেই পারব না!” 

কাঠবেড়ালি খানিক ভেবে বলল, “আচ্ছা, তোমার নাম কী?” 

-“আমার নাম ছুটি। ছুটি ঘোষ।”

-“বেশ তাহলে তুমি আমাকে বরং রুটি বলে ডেকো।”

“ছুটি আর রুটি?” নামের মিল পেয়ে ছুটি মনে মনে বেশ খুশি হয়ে উঠল।

রুটিও বেশ ঘাড় বেঁকিয়ে তাকে দেখছিল। তারপর খানিক ভেবে টেবে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কাঠবাদাম খাবে?” একটু ঝাল নুন দিয়ে কাঠবাদাম ছুটির খুব পছন্দ। সে একটু লজ্জা লজ্জা মুখ করে কিন্তু বেশ জোরে ঘাড় কাত করে বলল, “হ্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যা!” কিন্তু বলেই তার মনে হল, রুটি তাকে বাদাম দিচ্ছে, তারও তো রুটিকে কিছু দেওয়া উচিত? 

আরে ঠিক। খবার পরে দুপুরবেলা মা তাকে এত্তবড় একটা ডাঁশা পেয়ারা দিয়েছিল। সেইখানা তো এখনও পকেটেই রয়ে গেছে। পকেট হাতড়ে ছুটি এক পকেট থেকে বের করল ডাঁশা পেয়ারাখানা, আর অন্য পকেট থেকে কাগজে মোড়া ঝাল ঝাল নুন। রুটিও আশেপাশের গাছ থেকে পেরে আনল কাঠবাদাম, জাম, আঁশফল, জামরুল আরও কত কী!

আর তারপরে সেই ঝিলের ধারে বসে পা দোলাতে দোলাতে দুজনের যে কি চড়ুইভাতিটাই না হল! এত্ত পেটপুরে খেয়ে ছুটি নির্ঘাত রাত্তিরে আর কিছুই খেতে পারবে না।

ওদিকে বিকেলও হব হব করছে। গাছের ছায়া আস্তে আস্তে গুটিসুটি মারতে মারতে ক্রমশ লম্বা হচ্ছে। এইবার না ফিরলে মা নির্ঘাত ঘুম ভেঙে উঠে পড়বে। সেই দেখে খানিক ভেবে টেবে ছুটি বলল, “আচ্ছা আমি এবারে আসি? নইলে আবার মা বাবা চিন্তা করবে!” 

রুটিরও হয়তো মন খারাপ করছিল এট্টু এট্টু, কিন্তু সেও কিছু বুঝতে দিল না। মোটা লেজখানা এদিক ওদিক করতে করতে বলল, “হ্যাঁ কাল আবার এসো পারলে?” 

তার গলায় একটু দুঃখের সুর শোনা গেল কি? যাইহোক, কাল আসবে তো ছুটি আবার ফিরে বাগানে! সে ঘাড় নেড়ে বলল, “হ্যাঁঅ্যাঅ্যা, কাল আসব আবার।”

রুটি গাছগাছালির ভিড় পেরিয়ে ছুটিকে বাগানের পাঁচিল অব্ধি এগিয়ে দিল। ছুটিও এদিক ওদিক গড়াই কাকীমার জন্য দেখে তারপরে টুক করে পাঁচিলটা টপকে নিল। গাছের বড় বড় শেকড় আর নীচু ডাল পাঁচিলের ধারে এমন জট পাকিয়ে রয়েছে যে এইদিক থেকে পাঁচিল পেরোনো ভারী সহজ। 

পাঁচিল টপকে টুপ করে লাফ দিয়ে নেমে পড়ল ছুটি। পিছন ফিরে জোরে জোরে অনেকক্ষণ রুটিকে টাটা করল, তারপরে সোজা ছুট! মা এবার ঘুম থেকে উঠেই না পড়ে! আর গড়াই কাকীমারও বিকেল বিকেল পাড়া টহল দিয়ে বেরোনো অভ্যেস। তেনার চোখে পড়লে আর দেখতে হচ্ছে না! 

এক্কেবারে একদমে ফ্ল্যাটবাড়ি অবধি পৌঁছে তবে শান্তি পেল ছুটি। তরতর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে এক ছুটে আবার সোজা ভেজানো দরজা ঠেলে ফ্ল্যাটে ঢুকে হুশহুশ করে হাঁপাতে লাগল।

মাঝে কতক্ষণ আর গেছে, বড়জোর ঘণ্টা দুই? বাবার নাক তখনও ডেকে চলেছে ঘ্র্যাঁৎ ফুউউউউ, আর মায়ের নাকও সাড়া দিয়ে চলেছে, সোঁৎ সুঁউউউউ।

…চলবে

অলংকরণ – স্নেহা বিশ্বাস

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *