ভারতীয় নাগরিকত্বের পিতৃতান্ত্রিক ক্রমবিবর্তন এবং আসাম এনআরসি

নাগরিকত্বের ধারণাটি ঐতিহাসিকভাবে ‘অধিকার ও কর্তব্য’ সম্পর্কিত আলোচনার মধ্যে চর্চিত হয়। জাতি-রাষ্ট্রে নাগরিকত্ব জন্মের ভিত্তিতে নির্ধারিত বিশেষাধিকারের বিপরীতে সবার সমান অধিকার সুনিশ্চিত  করে। নাগরিকত্বের সবচেয়ে  প্রতিষ্ঠিত সংজ্ঞাটি দিয়েছেন টি. এইচ. মার্শাল। তার মতে, নাগরিকত্ব ব্যাক্তিকে সম্প্রদায়ের পূর্ণ সদস্যের মর্যাদায় অভিসিক্ত করে” (মার্শাল ১৯৫০, ১৪)। মার্শালের নাগরিকত্বের ধারণার মূল উপাদানগুলি হল একটি সম্প্রদায়ের সদস্যপদ, সেই সম্প্রদায়ের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সমতা এবং সেই সদস্যপদের সাথে যুক্ত অধিকার এবং কর্তব্য। 

ভারতীয় সংবিধানেও নাগরিকত্বের সংজ্ঞা এই প্রতিষ্ঠিত ধারণার মধ্যে নির্ধারিত হয়। পরে সেখানে কিছু লিঙ্গভিত্তিক বিধান যুক্ত করা হয়। কিন্তু, ১৯৮৭ সাল থেকে এটি ধীরে ধীরে রক্ষণশীলতার দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। জন্মভিত্তিক নাগরিকত্ব (jus soli) থেকে বংশোদ্ভূত নাগরিকত্বকে (jus sanguine) বেশি গুরুত্ব দেওয়া শুরু হয়। 

নাগরিকত্ব আইনে বিপরীতকামকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয় 

১৯৮৬ সালের ভারতীয় নাগরিকত্ব আইন-১৯৫৫ সংশোধনী বিলের মাধ্যমে প্রথমবার নাগরিকত্ব আলোচনায় বংশক্রমিক নাগরিকত্ব শর্ত হয়ে ওঠে। এই সংশোধিত নিয়মে বলা হয় যে ১ জুলাই ১৯৮৭-এর পরে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিদের নাগরিক হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য তাদের পিতামাতার মধ্যে একজনকে ভারতীয় নাগরিক বলে প্রমাণ করতে হবে।

২০০৩ সালে,আরেকটি সংশোধনী পাস করা হয় যাতে বলা হয়েছিল যে ১ জুলাই ১৯৮৭ থেকে ৩রা ডিসেম্বর ২০০৩-এর মধ্যে জন্মগ্রহণকারীদের ভারতীয় নাগরিক হওয়ার জন্য তাদের পিতামাতার একজনকে ভারতীয় হতে হবে এবং অন্যজন ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ নয় এমন হতে হবে।

এবং এর পরে যারা জন্মগ্রহণ করেন, তাদের জন্য তাদের বাবা-মা দুজনেই ভারতীয় নাগরিক বলে প্রমাণ করা বাধ্যতামূলক। তাছাড়া এই সংশোধনীর মাধ্যমেই কেন্দ্রীয় সরকারকে একটি জাতীয় নাগরিকপঞ্জি তৈরি এবং বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর পরে নাগরিকত্ব (নাগরিকপঞ্জী এবং জাতীয় পরিচয়পত্র ইস্যু) বিধিমালা, ২০০৩, এই আইনের অধীনে এনআরসি-র রূপরেখা  তৈরি করা হয়। 

নাগরিকপঞ্জিতে নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন জমা দেওয়ার জন্য ১৪টি নথির যে তালিকা দেওয়া হয়েছিলো সেটি নিম্নরূপ। 

১৯৭১ সনের ২৩ মার্চ তারিখের আগের  যে কোনো একটি 

১/ ভোটার তালিকা 

২/ ১৯৫১ সালের নাগরিক পঞ্জি 

৩/ রিফুজি প্রমাণপত্র

৪/ নাগরিকত্ব সার্টিফিকেট

৫/ জমি সংক্রান্ত নথি

৬/ শিক্ষাগত যোগত্যা সংক্রান্ত নথি

৭/ বেংক পাসবই

৮/ চাকুরির  নিয়োগ পত্র

৯/ বিমা সংক্রান্ত  নথি

১০/ মামলার মোকদ্দমা সংক্রান্ত নথি

১১/ পাসপোর্ট

১২/ জন্মের প্রমাণপত্র

১৩/ কোনো ধরনের সরকারি অনুজ্ঞা পত্র

১৪/ পোস্ট-অফিসের পাসবই ইত্যাদিতে নিজের কিম্বা কোনো পূর্বপুরুষের নাম থাকতে হবে।

এগুলোতে যে পূর্বজনের নাম রয়েছে তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে তালিকা খ তে বর্ণিত নথি, যেমন- ১/জমি সংক্রান্ত নথি,২/ শিক্ষাগত যোগত্যা সংক্রান্ত নথি, ৩/ ব্যাঙ্ক পাসবই, ৪/ বিমা সংক্রান্ত  নথি, ৫/ ভোটার তালিকা, ৬/ মামলার মোকদ্দমা সংক্রান্ত নথি, ৭/ পাসপোর্ট, ৮/ জন্মের প্রমাণপত্র ৯/ কোনো ধরনের সরকারি অনুজ্ঞা পত্র, ১০/ পোস্ট-অফিসের পাসবই, ১১/ রেশন কার্ড, ১২/ অন্য যেকোনো আইন ভাবে প্রামাণ্য নথি।  

কিন্তু একটু খতিয়ে দেখলেই দেখা যাবে মহিলাদের কাছে এই নথিগুলো থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।  অর্থাৎ পদ্ধতিগত এবং আদর্শগত দুভাবেই এই নিয়ম পিতৃতান্ত্রিকতার ধারক এবং বাহক।

নাগরিকত্ব আইন কিভাবে জাতি-রাষ্ট্রে পিতৃতান্ত্রিকতার বীজ বপন করে

বাধ্যতামূলক বিসমকামীতা

১৯৮৬ এবং ২০০৩ উভয় সংশোধনীতে একটি অন্তর্নিহিত ধারণা রয়েছে যে ভারতে জন্মগ্রহণকারী প্রতিটি শিশুর দুজন অভিভাবক থাকবে। এই অনুমানটিও পুরোপুরি বিপরীতকামিতার (heteronormative) উপর ভিত্তি করে নির্মিত। এখানে অনুমান করা হয় যে প্রতিজন নাগরিককে বাধ্যতামূলক বিসমকামী হতে হবে। জাতি রাষ্ট্র এই পিতৃতান্ত্রিক ধারণাটি  পিতৃ-পরিচয়ের বিশুদ্ধতা সুনিশ্চিত করার জন্য প্রয়োগ করে। 

লিঙ্গের  সামাজিক নির্মাণ

বংশানুক্রমিক নাগরিকত্বের ভিত্তিই হল ‘পরিবার’। এবং সেই পরিবারের কল্পনা স্বাভাবিক নিয়মেই  প্রতিবারই অত্যন্ত পুরুষতান্ত্রিক এবং বিপরীতকামী। এবং ‘সদস্যপদ’ ‘সমতা’ এবং ‘অধিকার ও কর্তব্য’-এর ধারণা, এই সব সাধারণত শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের অভিজ্ঞতা উপর ভিত্তি করে তৈরি। প্রান্তিক লিঙ্গের কিংবা প্রান্তিক শ্রেণির মানুষকে পরিচয়ের জন্য যে সমস্ত বৈষম্যের সম্মুখীন হতে হয় সেই ঐতিহাসিক বৈষম্যগুলোকে কোন স্বীকৃতি তথা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এনআরসি বিধি দ্বারা প্রণীত নীতি  সম্পূর্ণরূপে পরিচয়ের আধুনিক নির্মাণকে বাদ দেয় যা অনেক বেশি তরল ( fluide ) এবং ট্রান্স (trans) ।

ইন্টারসেকশনিলিটি (intersectionality) উপেক্ষা করা হয়েছে

নারী বা ট্রান্স পরিচয় ছাড়া জাতি, বর্ণ, ভাষা, শারীরিক সক্ষমতা বা অক্ষমতা ইত্যাদিও আমাদের আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে, এবং এর ভিত্তিতে আমাদের অভিজ্ঞতা পরিবর্তন হয়। প্রান্তিক জাতি ও শ্রেণীর মহিলাদের ব্রাম্মণ্যবাদী- পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার কাছে ঐতিহাসিক নিপীড়নের সম্মুখীন হওয়ার কারণে এনআরসি তালিকায় যুক্ত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত নথি নাও থাকতে পারে। পাশাপাশি, নারী এবং ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের বিভিন্ন লিঙ্গভিত্তিক অপরাধের সম্মুখীন হতে হয় যেমন ধর্ষণ (rape), ঘরোয়া হিংসা (domestic violence ),  পরিবারের দ্বারা পরিত্যাগ(abandonment by family) ইত্যাদি। এনআরসি-র নিয়ম প্রণয়নের সময়ে এইসব দিকগুলো বিবেচনা করা হয়নি। যৌনকর্মীদের সন্তান বা ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া শিশুদের দুজন বিসমকামী অভিভাবক থাকা খুবই দুরূহ।

পরিবারের পুরুষতান্ত্রিক ধারণা 

এনআরসি-তে নাম তোলার জন্য বাধ্যতামূলকভাবে পরিবার-বৃক্ষ বা Family tree ফর্ম জমা দাখিল করতে হয়, যাতে নিজের সম্পূর্ণ বংশতালিকা তৈরি করে দিতে হয়েছে। এটি পরিবারের পিতৃতান্ত্রিক কল্পনাকে আরেকটু মজবুত করে।  একজন একা মহিলা বা তাদের সন্তানদের কাছে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য উপযুক্ত নথি-পত্র  প্রমাণাদি নাও থাকতে পারে বা তাদের পূর্বের পরিবার এরকম কোন নথি তাদের হাতে তুলে দিতে নাও চাইতে পারেন। বংশভিত্তিক নাগরিকত্বের সংকীর্ণ ধারণা তাদের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করতে পারে  এবং রাষ্ট্রহীনতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।  

 নাগরিকত্ব আইনের নারীবাদী পাঠ— অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত

বর্তমানে নারীবাদী গবেষণায় নাগরিকত্ব আইনকে তিনটি মডেলে পাঠ করা হয়। প্রথম মডেলটিতে  নাগরিকদের দায়িত্ব কর্তব্য নির্ধারণে লিঙ্গকে গুরুত্ব দেওয় হয় না। এতে নাগরিকদের লিঙ্গকে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলা হয়।  এটিকে লিঙ্গ নিরপেক্ষ মডেল বলা যেতে পারে যা পদ্ধতিগত সমতার কথা বলে। এরপর নারীবাদীরা নাগরিকত্বের ধারণাকে পুনঃরায় লিঙ্গ সাপক্ষে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করে। এটিকে একটি লিঙ্গ-বৈচিত্রমূলক নাগরিকত্বের ধারণা বলা যেতে পারে। এই মডেল “সমতা”-র পরিবর্তে “পার্থক্য”-কে গুরুত্ব দেয়, এবং একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসাবে মহিলাদের অভিজ্ঞতার উপর জোর দেয়। এই মডেল অনুযায়ী মাতৃত্ব কিংবা মা হিসেবে মহিলাদের অভিজ্ঞতা তাদের রাজনৈতিক এবং সামাজিক সত্তার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। লিঙ্গ-বহুত্ববাদী নাগরিকত্ব, তৃতীয় মডেল, যা গ্রুপ ডিফারেন্সিয়েটেড নাগরিকত্বের  (group-differentiated citizenship) উপর প্রতিষ্ঠিত।  চান্তল মফ নামে এক ফরাসী রাজনৈতিক বিশ্লেষক সর্বপ্রথম এই  ধারণাটির প্রস্তাব দেন। এই ধারণা লিঙ্গ ছাড়াও অন্যান্য সামাজিক বৈষম্য যেমন শ্রেণি বৈষম্য, জাতিগত বৈষম্য ইত্যাদিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে নাগরিকত্বের ধারণা, তাদের অধিকার এবং কর্তব্য নির্ধারিত করে। এটি আপাততভাবে নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিপ্লবী নারীবাদী পাঠ। পাবলিক-প্রাইট ডিকোটমিগুলির (public-private dichotomy)   পুনর্গঠনের সাথে, এই ধারণাটি ভবিষ্যতে নাগরিকত্বের  নারীবাদী তত্ত্বের নির্মাণে সম্ভাব্য ভিত্তি হিসাবে কাজ করতে পারে।  

এটা কি একটু বেশী চাওয়া

আমরা একটি নব্য-উদারনৈতিক সমাজে বাস করছি যেখানে নাগরিকত্বের প্রকৃতি ও পরিধি দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। এখানে নাগরিকত্বের একটি বিপ্লবী নারীবাদী ব্যাখ্যা আশা করাটা খুব বেশি চাওয়া বলে মনে হতে পারে। তবে পার্ক-ট্রিট, শাহীনবাগ অনেক অসাধ্যকেই সম্ভবপর করে দিয়েছে।  তাই এটাও হয়তো কোন একদিন সম্ভবপর হয়ে  যেতে পারে। 

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published.