শ্রেণি সংগ্রাম ও পিতৃতন্ত্র: মাওবাদী আন্দোলনে মেয়েরা

রাজনৈতিক কর্মী সোমা সেনের লেখা  Class Struggle and Patriarchy: Women in the Maoist Movement প্রবন্ধের অনুবাদ

 

ভীমা কোরেগাঁও মামলার অন্যতম অভিযুক্ত সোমা সেনের বর্তমান ঠিকানা মহারাষ্ট্রের বাইকুলা জেল। ২০১৮ সালের ৬ জুন, বিভিন্ন শহরে হানা দিয়ে একাধিক সুপরিচিত রাজনৈতিক ও মানবাধিকার কর্মীকে গ্রেফতার করে পুনে পুলিস। ইউএপিএ-সহ একাধিক মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত হয়ে জেলে যান সোমা সেনসহ মোট পাঁচজন মানবাধিকার কর্মী। পরবর্তীতে এই একই মামলায় জেলে গেছেন দেশের মোট ১৫ জন প্রথম সারির রাজনৈতিক কর্মী। শ্রমিক ধর্মঘট থেকে নারী আন্দোলন, সারা জীবনই ব্যবস্থাবদলের পক্ষে লড়াইয়ে থেকেছেন সোমা সেন, দাঁড়িয়েছেন নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের পাশে। ভারতের মাওবাদী আন্দোলন ও আন্দোলনে মেয়েদের ভূমিকা তাঁর অন্যতম আগ্রহের জায়গা। কাজ করেছেন একাধিক মানবাধিকার ও নারী সংগঠনের সঙ্গে। ২০১৭ সালে নকশালবাড়ির ৫০ বছরে ইপিডব্লিউ পত্রিকায় এই নিবন্ধটি তিনি লেখেন।    

২০০৮ সালে নিশিতা (খুব সম্ভবত ছদ্মনাম) ‘কৃষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়কে খোলা চিঠি’ শীর্ষক একটি লেখা লেখেন (অপ্রকাশিত)।1 উল্লেখ্য, এই লেখায় নিশিতা (খুব সম্ভবত  ছদ্মনাম) কৃষ্ণাদির সাথে সহমত পোষণ করে, নকশালপন্থী আন্দোলনে পিতৃতন্ত্র থাকা সত্ত্বেও তিনি কেন এই আন্দোলনে রয়েছেন সেই আলোচনা করেছিলেন। মেয়েরা কিভাবে লড়াই করে বর্তমানে এই আন্দোলনের অর্ধেক আকাশ জুড়ে ছেয়ে আছে সে কথাও বলেছিলেন। কৃষ্ণাদি অবশ্য নিজেও এই জার্নালে প্রকাশিত তাঁর নকশালবাড়ি ও নারী অধিকার প্রসঙ্গিত লেখার শেষ অংশে বলেছিলেন, “কিন্তু আজ আমার মনে হয় যদি আমরা মেয়েরা সেদিন লড়াইটা চালিয়ে যেতাম, তাহলে হয়তো পুরুষদের সঙ্গে নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সমান অধিকার অর্জন করতে পারতাম। নকশালবাড়ি আন্দোলনের ইতিহাসটাই অন্য হতে পারত।”     

নিশিতা তার চিঠিতে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন, যে তিনি তাঁর সমসাময়িক মহিলা আন্দোলনকারীদের মধ্যে কৃষ্ণাদি বা সেই প্রজন্মের অগ্নিকন্যারা – যারা প্রথম নকশালবাড়িকে দাবানলে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তাঁদের মতো কাউকে পাননি। তিনি তাঁর লেখায় আরও বলছেন, যদি তাঁরা একসাথে লড়তে পারতেন, “তাহলে পার্টির ভেতরে অনেক লড়াই আর আলাদা করে লড়তে হতো না, সহজেই তা হাসিল করা যেত।’’ বসন্তের বজ্রনির্ঘোষের পঞ্চাশ বছর পর, কৃষ্ণাদির লেখা ও নিশিতার চিঠির নয় বছর পর, মেয়েরা নকশালপন্থী বা মাওবাদী আন্দোলনে আজ কোথায় অবস্থান করছে?      

১৯৬৯ সালে গঠিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী লেনিনবাদী) পরবর্তীকালে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়। এই দলগুলোর মধ্যে অনেকেই এখনো সক্রিয় এবং তাদের নিজস্ব নারী সংগঠন রয়েছে যারা বৃহত্তর অর্থে এমএল বা নকশালপন্থী ধারার অন্তর্ভুক্ত। সিপিআইএমএল (জনযুদ্ধ) ও মাওবাদী কম্যুনিস্ট সেন্টার (এমসিসি) ২০০৪ সালে ঐক্য স্থাপন করে নতুন পার্টির জন্ম দেয় যা সিপিআই (মাওবাদী) নামে পরিচিতি লাভ করে। সেই সময় থেকে নতুন পার্টি ও তার সাথে ঘনিষ্ঠ গণ-সংগঠন সমূহের কর্মকাণ্ডগুলিকে সাধারণত মাওবাদী আন্দোলন হিসেবে ধরা হয়। আমি এই লেখায় উপযুক্ত তথ্য ও নথিপত্রের সাহায্য নিয়ে মাওবাদী আন্দোলনে মহিলাদের অবস্থান ও পিতৃতন্ত্রের প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করব। রণনীতিগত কারণে ও ভয়ঙ্কর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ফলে এই আন্দোলন এখন মূলত ঘন জঙ্গল পরিবেষ্টিত আদিবাসী এলাকায় সীমাবদ্ধ। তার সাথে সমতল এলাকায় এবং শহরাঞ্চলে আন্দোলনের কিছুকিছু প্রভাব রয়েছে। মহিলারা আন্দোলনের এই সমস্ত পরিসরে ছাত্র সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন এবং নারী  সংগঠনের অধীনে নানা কাজের সাথে যুক্ত।            

নারী সংগঠন

অমিত ভট্টাচার্য লিখেছেন, নকশালবাড়ির জন্মলগ্নেই মেয়েদের অগ্রণী ভূমিকা ছিল। ২৪ মে ১৯৬৭ সালে সোনম ওয়াংদি নামক এক পুলিশকর্মীকে – আদিবাসী এক রমণী তীর বিদ্ধ করেছিলেন। পরের দিন যে ১১ জন কৃষককে খুন করা হয়, তাদের মধ্যে ৮ জনই মহিলা, দুজনের কোলে সদ্যজাত শিশু ছিল। অমিতবাবু সত্তরের দশকের পার্টি সাহিত্য পর্যালোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, যদিও পার্টি ইস্তেহার ঘোষণা করছে জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র “মহিলাদের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করবে’’, কিন্তু পার্টি সেই সময় আলাদা করে নারী সংগঠন তৈরি করার প্রয়োজন বোধ করেনি। মধ্য বিহার ও তেলেঙ্গানায় ছড়িয়ে পড়া কৃষক সংগ্রামে মহিলারা সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করার লক্ষ্যে শ্রীকাকুলামে মহিলারা ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসের মোকাবিলা করেছিলেন, এবং রাষ্ট্রের বুলেট আলিঙ্গন করেছিলেন।                  

১৯৮০-র দশকে সত্তাগত অধিকারের দাবিতে বিভিন্ন আন্দোলন গড়ে ওঠার ফলে এমএল সংগঠনগুলোর একাংশের মধ্যে জাতিবর্ণ ব্যবস্থা, নারী অধিকারের প্রশ্ন, জাতিসত্তার প্রশ্ন এবং এর সাথে সংগঠনগত রাজনৈতিক অবস্থানের প্রশ্নে  ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। এমনই একটি এমএল গোষ্ঠীর সমর্থক কিছু মহিলা (যে গোষ্ঠী তখন চন্দ্রপুল্লা রেড্ডী গ্রুপ নামে পরিচিত ছিল এবং পরবর্তীকালে জনশক্তি পার্টিতে রূপান্তরিত হয়) এমএল ধারার প্রথম নারী সংগঠন তৈরি করেছিলেন – যা প্রোগ্রেসিভ অর্গানাইজেশন অব উইমেন (পিওডব্ল্যু) বা প্রগতিশীল নারী সংগঠন হিসেবে প্রকাশ পায়। বিহারে ৮০-র দশকে পার্টি ইউনিটি নামক আরেকটি এমএল গোষ্ঠী, যারা মূলত কৃষকদের মধ্যে কাজ করত, মজদুর কিষান সংগ্রাম সমিতি ও নারী মুক্তি সংগ্রাম সমিতি তৈরি করেছিল। এমসিসি নারী মুক্তি সঙ্ঘ নামক মহিলাদের সংগঠন শুরু করে, যা এখনও ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী মহিলাদের মধ্যে সক্রিয়। সিপিআইএমএল (জনযুদ্ধ)-এর ঘনিষ্ঠ বহু নারী সংগঠন ১৯৮৫ থেকে ৯৫ পর্যন্ত শহরাঞ্চলের বিভিন্ন কেন্দ্রে তৈরি হয়েছিল।    

বিপ্লবী আদর্শকে সামনে রেখে তেলুগু ভাষায় ‘মহিলা মারগাম’ নামে মেয়েদের একটি পত্রিকা প্রকাশ হওয়া শুরু করে ১৯৮৯ থেকে। এটি গত তিন দশক ধরে চলছে। ১৯৯৫-তে,  জনযুদ্ধের উদ্যোগে গ্রামাঞ্চলের সশস্ত্র কৃষক সংগ্রামের এলাকাগুলোতে তৈরি হয় বিপ্লবী মহিলা সঙ্ঘম (ভিএমএস)। আদিবাসী এলাকায় এই সংগঠন আদিবাসী বিপ্লবী মহিলা সঙ্ঘম নামে কাজ করত। অন্ধ্র প্রদেশে ‘প্রোগ্রেসিভ অর্গানাইজেশন অব উইমেন’ বিড়ি শ্রমিকদের সংগঠিত করার কাজ করেছিল করিমনগর, নিজামাবাদ ও অন্যান্য জেলায়। ভিএমএস জমির লড়াইয়ের সাথে সাথে, এসব অঞ্চলে প্রচলিত সামন্ততান্ত্রিক ও যৌন শোষণের বিরুদ্ধেও সংগ্রাম গড়ে তোলে। রায়েতু কুলি সঙ্ঘম (কৃষি মজুর সঙ্ঘ)-এর সাথে ভিএমএস জমিদারদের অবৈধ মালিকানায় থাকা জমি দখলের লড়াই করে এবং সেই জমিতে লাল পতাকা পুঁতে নিজেরা দখল নেয়। অনুরাধা গান্ধী এই প্রসঙ্গে লিখেছেন, “এটা আরসিএস এবং ভিএমএস-এর যৌথ সিদ্ধান্ত – যখন জমি দখল ও বণ্টন হবে তখন মহিলাদেরও স্বাধীন ভাবে জমির পাট্টা দেওয়া হবে, উপরন্তু, যে সমস্ত জায়গায় বিপ্লবী আন্দোলনের জমির পাট্টা দেওয়ার ক্ষমতা আছে, সেই সব জায়গায় এটা করা হচ্ছে ।”                 

সিপিআইএমএল (জনযুদ্ধ) ১৯৮০-তে প্রথম তার স্কোয়াড পাঠায় মধ্য ভারতের জঙ্গলে (যে অঞ্চলকে দণ্ডকারণ্য বলা হয়), এবং সেখানে কৃষক সংগঠন তৈরি করা শুরু করে। যেহেতু আদিবাসী মহিলারা কৃষিকাজ ও তেন্দু পাতা সংগ্রহের কাজের সাথে যুক্ত তাই তারা মজুরি বৃদ্ধি ও জমি দখলের লড়াইয়ের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত হয়ে পড়েন। ১৯৮৬ সালে, ‘আদিবাসী মহিলা সংগঠনম’ (এএমএস) তৈরি হয় এবং পরবর্তীকালে ১৯৯১-এ গড়চিরোলিতে এই সংগঠন ডিভিশনাল স্তরের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, এবং এর নামকরণ হয় ‘ক্রান্তিকারি আদিবাসী মহিলা সংগঠন’ (কেএএমএস)।            

কেএএমএস দলিল

এই সংগঠনের ইতিহাস তেলুগু ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে, তবে এর ইংরেজি অনুবাদ আপাতত অপ্রকাশিত অবস্থায় আছে। এই ইতিহাস পড়লে জানা যায় কেএএমএস বিশাল এক সংগঠন। এই সংগঠন যেমন শ্রেণি প্রশ্নকে সামনে রাখে, তেমনই পিতৃতন্ত্র কিভাবে সমাজ ব্যবস্থার সাথে ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িত সে বিষয়েওতারা যথেষ্ট সচেতন। যদিও তারা স্বীকার করছে যে সবসময়ে এর বিরুদ্ধে যথাযথ ভাবে লড়াই করা যাচ্ছে না। এই দলিল দাবি করছে যে ৫০,০০০ একর বন জমি আদিবাসীরা দখল করে চাষ করা শুরু করেন, ‘‘পুরুষদের থেকে অনেক বেশি জোরদার রূপে’’ মহিলারা সেখানে অগ্রণী  ভূমিকা পালন করেন।  এই লেখায় বিবরণ রয়েছে কিভাবে উচ্চবর্ণের জমিদাররা অন্ধ্র প্রদেশের পশ্চিম গোদাবরী জেলা, উত্তর প্রদেশ, বিহার থেকে বস্তারে এসে জমি দখলের লোভে আদিবাসী মহিলাদের বিয়ে করে ও তাদের উপর ব্যাপক যৌন নিপীড়ন চালাতে থাকে। কেএএমএস ও নকশালপন্থী স্কোয়াড এই রীতির বিরোধিতা করে। ‘বহিরাগতদের’ যৌন নিপীড়ন ছাড়াও গোন্ড সমাজে উপস্থিত ‘অভ্যন্তরীণ পিতৃতন্ত্র’ নিয়েও কেএএমএস-এর নথিতে লেখা হয়েছে,যার মধ্যে রয়েছে বলপূর্বক বিবাহ, বহুবিবাহ, কন্যাসুলকম বা বধূ পণ ইত্যাদি বিষয়। অর্থনৈতিক স্তরে মেয়েরাসম্পত্তিগত উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত। তারা বীজ পুঁততে পারেন না বা গোলাঘরে ঢুকতে পারেন না। তাঁদের ধান ভানতে দেওয়া হয় না। ঋতুস্রাবসম্পর্কিত কুসংস্কারের কারণে রজঃস্বলা মেয়েদের ঘরের বাইরে বা ঋতুর জন্য নির্দিষ্ট কুঁড়েতে গিয়ে বসতে হয় যেখানে তাদের খাবার এনে দেওয়া হয়। 

গড়চিরোলিতে বিয়ের পর মেয়েদের ব্লাউস পরা পরিত্যাগ করতে বাধ্য করা হত। কেএএমএস takkelladu lon hodiya (মেয়েদের গোলাঘরে ঢুকতে দাও) অভিযান শুরু করে। এছাড়া সংগঠনের তরফে korma lon (পিরিয়ড হওয়া মেয়েদের জন্য কুঁড়ে) পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু সেটা আদিবাসী সমাজ মেনে নেয় নি। কেএএমএস সদস্যরা মনে করেন যে এইধরনের উদ্যোগ নেওয়ার পূর্বে জনগণ কে বোঝানোর কাজটাও জরুরি।গোন্ডদের মধ্যে বহু ধরনের বিবাহ রীতি রয়েছে, কিন্তু কেএএমএস এর মধ্যে শুধু এক ধরনের রীতিকেই প্রশ্রয় দেয় যা lon hodiya (ঘরে ঢোকা) নামে প্রচলিত। এই রীতি অনুযায়ী একটি মেয়ে যদি কোনো ছেলেকে পছন্দ করে, তখন সেই ছেলেটির ঘরে প্রবেশ করে তার পরিবারের সাথে মেয়েটির বসবাস শুরু করার কথা। তারপর তাদের বাবা-মায়েরা একে অপরের সাথে কথা বলে বিয়ে ঠিক করেন। এক গ্রামে ৮ই মার্চের প্রকাশ্য জনসভায়, কেএএমএস সংগঠকরা বিয়ে করতে ইচ্ছুক যুগলদের হাত ধরে সামনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানায় ও তাদের জনসমক্ষে পরস্পরের প্রতি প্রেম নিবেদন করতে উৎসাহ দেয়। কেএএমএস বলপূর্বক বিয়ে দেওয়া, গার্হস্থ্য হিংসা, ডাইনি হত্যা, বিবাহ বিচ্ছেদ প্রভৃতি ঘটনায় হস্তক্ষেপ করে, এবং গণআদালতের মাধ্যমে সরাসরি আলোচনা করে যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতি চালু করে। এভাবেই ‘পার্সন্যাল-কে পলিটিক্যাল’ করে তোলে, এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কাঠামো কীভাবে ব্যক্তিমানুষের জীবনেও উপস্থিত তার স্বরূপ উন্মোচন করে ।      

গোন্ড সমাজের অন্যতম প্রতিষ্ঠান হচ্ছে গটুল। গটুল হলযুবক-যুবতীদের জন্য তাদের ঐতিহ্যবাহী-জ্ঞান শিক্ষার কেন্দ্র, আর সারাদিনের কঠোর পরিশ্রমের পর বিশ্রাম, আলাপচারিতা, গান, নাচ ও আনন্দ করার জায়গা। এটা আবার ছিল ছেলে-মেয়েদের একে-অপরকে পছন্দ করে সঙ্গীবেছে নেওয়ার ক্ষেত্র। বিবাহ-পূর্ব যৌন সম্পর্ককে নিন্দা করা হতো না এবং যৌন সম্পর্ক স্থাপন হলে বিয়ে করতেই হবে এমন বাধ্যবাধকতাও ছিল না, বরং ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে আবার তাদের সঙ্গী বেছে নেওয়ার অধিকার ছিল। কিন্তু কেএএমএস ডকুমেন্ট মনে করছে বর্তমান সময়ে গটুলে ছেলেরা আধিপত্য কায়েম করেছে, তারাই সিদ্ধান্ত নেয় কে কার সঙ্গী হবে, কোনো মেয়ে গর্ভবতী হলে তার দায়িত্ব নেয় না, মেয়েদের দিয়ে কাঠ সংগ্রহ করা সহবিভিন্ন কায়িক শ্রম করায়। কেএএমএস গটুলকে এমন এক পরিসরেপরিণত করতে চায় যেখানে শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয় ও আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মূল উদ্দেশ্য নারীপুরুষের সম্পর্কে সাম্য প্রতিষ্ঠা। গটুলে যাওয়া অনেক মেয়েরা গটুল বন্ধের দাবি তুলেছেন, তারা জানিয়েছেন সেখানে তাঁদের নাচতে জোর করা হয় এবং অনিচ্ছা সত্ত্বেও যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হতে বাধ্য করা হয়।     

কেএএমএস নেতৃত্ব যথেষ্ট প্রত্যয়ের সাথে মনে করে, মেয়েদের সম্পত্তিরঅধিকার না থাকা, কৃষি প্রথায় নারীদের অংশগ্রহণ না থাকা ইত্যাদি আদিবাসী সমাজের অভ্যন্তরে যে সমস্ত পিতৃতান্ত্রিক রীতি রয়েছে তার বিরুদ্ধে লড়তে হবে। তাদের দাবি অনুযায়ী, যে এলাকাগুলোতে জনতানা সরকার (জনগণের সরকার) শাসন করছে, এবং মহিলাদের উচ্চদায়িত্বসম্পন্ন পদে নিয়োগ করা হয়েছে, কেএএমএস গোন্ড মহিলাদের সেখানে নিজেদের সমাজের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে গিয়ে চাষের বীজ রোপণ করতে উৎসাহ দিয়েছিল। দলিল এও বলছে যে সৌভাগ্যজনক ভাবে সে বছর আবহাওয়া খুব ভাল ছিল এবং চমৎকার ফলন হয়েছিল!           

কেএএমএস বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, যেরকম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণ, কাশ্মীরে সেনাবাহিনীর অত্যাচার ইত্যাদি। ৬ই ডিসেম্বরকে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী দিবস হিসেবে পালন করা হয়। থাংজম মনোরমার ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাকে ঘিরে মশাল মিছিল ও অন্যান্য কর্মসূচিও নেওয়া হয়। ১৯৯৬ সাল থেকে সাংগঠনিকভাবে দুটো পত্রিকা প্রকাশ করা হয়, তেলুেগু ভাষায় Poru Mahila (পোড়ু মহিলা) ও হিন্দিতে Sangharshrat Mahila (সংঘর্ষরত মহিলা)। সাংগঠনিক মত রাখা হয়েছে যে, কয়া ভাষায় (গোন্ডদের ভাষা) ধারাবাহিক লেখালেখি করা দরকার। এই প্রেক্ষাপটে বোঝা যায় কেন সালওয়া জুডুম মহিলা নেত্রীদেরই বিশেষ ভাবে নিশানা করে। আদিবাসী সমাজের সামন্ততান্ত্রিক শক্তিগুলো যেহেতু এই পরিবর্তন চায় না, তাই তারা রাষ্ট্রের সঙ্গে একজোট হয়ে ছত্তিসগড়ের জনগণের ওপর বিভৎস নিপীড়ন চালায়।        

অবশ্যম্ভাবী ভাবেই, যে আন্দোলনকে ভারত রাষ্ট্র “সন্ত্রাসবাদী” বলে গণ্য করে সেই আন্দোলনের ওপর নির্বিচার রাষ্ট্রীয় অত্যাচার নামায়। মাওবাদীদের অধিকাংশ লেখাপত্রে শহীদ মেয়েদের জীবনের কথা রয়েছে যারা বিপ্লবের লক্ষ্যে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। Women Martyrs of the Indian Revolution (ভারতবর্ষের বিপ্লবী আন্দোলনের নারী শহীদ) বুকলেটের ভুমিকায় পঞ্ছাডি নির্মলা, স্নেহলতা, পদ্মা, রঞ্জিতা, অরুনাদের আত্মবলিদানের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করা হয়েছে।            

কনফারেন্স রিপোর্ট  

বহু প্রশ্ন ওঠে ভারতবর্ষের সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে মহিলাদের যোগদান ও তাদের নেতৃত্ব নিয়ে। এগুলো কি মূলত পুরুষদের পার্টিযেখানে সশস্ত্র সংগ্রামে শুধুমাত্র পুরুষদের স্বার্থ চরিতার্থের লক্ষ্যে নারী শক্তিকে ‘ব্যবহার’ করা হয়? ? এই প্রশ্ন যদি আমরা নকশালপন্থী আন্দোলনের নিরিখে ভাবি তাহলে মিডিয়া ও উপযুক্ত লেখাপত্রের মারফৎ যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় যে, প্রায় সর্বত্রই মহিলারা তাঁদের রাজনৈতিক চেতনার উন্নতিকরণের প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যান, এবং তারা কমবেশি জানেন কী করছেন ও কেন  তাঁরা এই সংগ্রামের অংশীদার।      

শহরাঞ্চলের দুজন রাজনৈতিক কর্মী লতা ও সুজাতা ১৯৯১ সালের কেএএমএস কনফারেন্সে যোগ দেন ও তার ভিত্তিতে একটি ছোট রিপোর্ট তৈরি করেছিলেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা বলছে ১০০০ জনের গ্রামীণ ইউনিট গুলোর প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন ৪০ জন  ডেলিগেট। আদিবাসী মহিলারা সেখানে – গাছ কেটে বেঞ্চ তৈরি করা, মাটি সমান করা ইত্যাদি সব রকমের স্বেচ্ছাসেবী কাজে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ব্যাপক নাচগানও হয়েছিল যা কখনো কখনো সারারাত ধরেও চলেছে। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন নারী সংগঠন তৈরির নেপথ্যে নকশালপন্থী স্কোয়াডের সেখানে একটা বড় ভূমিকা ছিল। কনফারেন্সে মহিলারা যখনই কথা বলেছেন, তখন তারা সাধারণত শুরু করেছেন, “স্কোয়াড আমাদের গ্রামে এলো, তারপর…’’ এই দিয়ে।             

প্রথমত, স্কোয়াডের পুরুষ সদস্যরা ধরেই নিয়েছিলেন যে আদিবাসী মহিলারা তাদের জন্য রান্না করবে আর প্রয়োজনে গ্রামের পুরুষদের সাথে তেন্দু পাতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করবে। কিন্তু কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের মধ্যে মহিলারাও স্কোয়াডে ছিলেন এবং স্বতন্ত্র নারী সংগঠন তৈরির উদ্দেশ্যে তারা গোন্ড মহিলাদের সঙ্গে আলাদা করে দেখা করা শুরু করেন। প্রথমে যদিও আদিবাসী পুরুষরা আলাদা নারী সংগঠন তৈরি হওয়ার বিষয়ে উদাসীন ছিলেন, কনফারেন্স রিপোর্ট উল্লেখ করছে যে “তাঁরা ধীরে ধীরে পুরুষদের মধ্যে থাকা পিতৃতন্ত্রকে নির্মূল করতে সফল হয়েছে।’’ আদিবাসী মহিলারাই প্রথম শুরুর দিকের স্কোয়াডগুলোর রক্ষণশীল পিতৃতন্ত্রকে ধাক্কা দেন, এবং  স্কোয়াডে যোগদানের জন্য লড়াই করেন। তাঁরা যেন দেখাতে চেয়েছিলেন যে, তাঁরা যেমন তীর ধনুক চালাতে পারেন, তেমনিই বন্দুক তুলতেও তাঁরা সক্ষম।       

পার্টি দলিল

মাওবাদী আন্দোলনের মহিলা প্রশ্ন নিয়ে চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করে “Our Approach to the Women’s Question’’ (নারী প্রশ্নের সাপেক্ষে আমাদের অভিমুখ)। এখানে অমিত ভট্টাচার্য পার্টির নারীপ্রশ্ন ও পিতৃতন্ত্র বিষয়ক মনোভাব আলোচনার জন্য জনযুদ্ধ বা মাওবাদীদের নহিপত্র এবং দলিলগুলো ব্যবহার করেছেন, যার মধ্যে উল্লেখ্য “The approach of our party in building a revolutionary women’s movement’’ (বিপ্লবী নারী আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের পার্টির ভূমিকা)। ২০০১ সালের দলিল,“Fight against Patriarchal Thinking within the Party and Promote Proleterian Culture’’ (পার্টির অভ্যন্তরীণ পিতৃতন্ত্রের বিরোধিতা কর, এবং প্রলেতারীয় সংস্কৃতি তুলে ধর), স্পষ্ট দেখাচ্ছে মাওবাদী পার্টি স্বীকার করেছে তাদের পার্টির ভিতরে পিতৃতন্ত্রের উপস্থিতি রয়েছে। ২০০৭ সালে অনুষ্ঠিত নবম কংগ্রেসের রিপোর্ট অনুযায়ী, পার্টি মানছে পিতৃতান্ত্রিক ব্যাধি তাদের অন্যতম প্রতিবন্ধক, এবং পার্টি সেটা সমাধান করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আরেকটি প্রশ্ন মাঝে মাঝে উঠে আসে যে, আদৌ কি মেয়েরা মাওবাদী পার্টির নেতৃত্বস্থানীয় পদে উন্নীত হতে পারে? আমরা দুজনের ব্যাপারে পড়েছি, প্রয়াত অনুরাধা গান্ধী ও সদ্য কারাগার মুক্ত শিলা দিদি, যিনি একজন আদিবাসী মহিলা। এঁরা দুজনেই কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন, অন্য দিকে রাজ্য কমিটি ও ডিভিশনাল কমিটিগুলোতে অনেক মহিলা সদস্যও রয়েছেন। পিপলস লিবারেশন গেরিলা আর্মি (পিএলজিএ) সদস্যদের মধ্যে তিরিশ শতাংশ মহিলা, এছাড়াও স্কোয়াড ও প্লেটুন স্তরে শুধু মাত্র মেয়েদের নিয়ে তৈরি ও মেয়েদের দ্বারা পরিচালিত সামরিক সংগঠন রয়েছে। কিছু সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত রাজনৈতিক বন্দি যারা পার্টিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন, গ্রেফতারের আগে সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, তাঁদের অভিজ্ঞতায় কিছু এলাকায় পুরুষদের নিয়ে তৈরি স্কোয়াড ও কমিটি পরিচালনা করতে তাঁদের অসুবিধে হয়েছে। নিশিতার মতো কেউ কেউ আবার মনে করেন যে তাঁরা কাজ করেছেন “অসাধারণ পুরুষ কমরেডদের সঙ্গে; নারীপ্রশ্নের নিরিখে যাঁদের পৃথিবীর বুকে শ্রেষ্ঠ পুরুষ হিসেবে ভাবা যেতে পারে।’’              

শ্রীলা রায় তাঁর বইয়ে (২০১২) উল্লেখ করেছেন, মহিলাদের স্মৃতিতে নকশালপন্থী আন্দোলনের একধরণের স্তুতি পাওয়া যায়, যেখানে আত্মবলিদানকেই সর্বোচ্চ গুণ বলে মনে করা হয়। এই মর্মে আমার এক মহিলা রাজনৈতিক কমীর সাথে হওয়া কথোপকথন মনে পড়ছে, যিনি এক অসাধারণ জননেত্রী ছিলেন। তিনি ঘরের কাজ, বা নারীসুলভ বলে যা কিছু ধরা হয় সেই সমস্ত কাজকে খুব অপছন্দ করতেন। তিনি খুব কম বয়সে আন্দোলনে যোগ দেন কারণ এখানে লিঙ্গ অনুযায়ী কাজের বন্টনের বাধ্যবাধকতা ছিল না। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে তাঁকে আণ্ডারগ্রাউন্ডে যেতে হয় এবং পুলিশের চোখ এড়াতে সেখানে তাঁকে ‘সাধারণ মহিলার’ বেশে থাকতে বাধ্য হতে হয়, এবং পিছিয়ে পড়া সমাজের লিঙ্গভিত্তিক কাজ বন্টনের রীতিই মেনে চলতে হয়।           

অমিতবাবু আবার ১৯৯৯ সালের একটি সার্কুলার উল্লেখ করছেন, যা বলছে “আমরা আমাদের পার্টি থেকে যৌনতা, বিবাহ, পরিবার সম্পর্কে শ্রেণি আদর্শ বহির্ভূত ধারণাগুলো বর্জন করি।’’এই বয়ানকে তিনি ইউনিক এবং ‘খুব গুরুত্বপূর্ণ’ বলে মনে করেনকারণ, এই বিষয়গুলো নিয়ে সাধারণত দল বা গ্রুপগুলো চুপ থাকতো অথবা প্রচলিত ধারার আনুগত্য করতো। এই সার্কুলার পুরুষ কমরেড বা নেতাদের মধ্যে যদি কোনও ভুল প্রবণতা দেখা যায় তাহলে সেই আধিপত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্যে মহিলাদের উৎসাহিত করছে। আবার, কড়া ভাষায় সেই পুরুষদের সমালোচনা করছে এই সার্কুলার যারা মহিলাদের ছোট করার স্বভাবদোষে দুষ্ট। উল্লেখযোগ্য ভাবে এই সার্কুলারে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ ও পুনর্বিবাহ নিয়ে আলোচনা ও কিছু রূপরেখাও তৈরি করা হয়। মূলত গেরিলা যোদ্ধা যাদের জীবন শৃঙ্খলা ও অনুশীলন দ্বারা চালিত, তাঁদের উদ্দ্যেশে এই রূপরেখা তৈরি করা হয়। এই সার্কুলার বিবাহপূর্ব যৌন সম্পর্ক ও পরকীয়া সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা জারি করে, নিজ পছন্দে বিয়ে করাকে সমর্থন করে, এবং বলে যে বৈবাহিক সিদ্ধান্ত অভিজ্ঞ ও এগিয়ে থাকা সদস্যদের সজ্ঞানে হওয়া কাম্য। পাশাপাশি পুরুষদের মধ্যে মহিলা সঙ্গীর প্রতি ঈর্ষা তৈরি হওয়ার প্রবণতার বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা জারি করে এই সার্কুলার। এছাড়াও এই সার্কুলারে বলা হয়, লিভ-ইন ও ক্যাজুয়াল সম্পর্ক বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে যা বিপ্লবীদের শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনের জন্য ক্ষতিকারক। গত বছর জেএনইউ-এর কিছু ছাত্রছাত্রী, যারা মাওবাদী রাজনীতির সমর্থক গ্রুপের সদস্য ছিল, তাদের গ্রুপ ভেঙে বেরিয়ে যায় এবং এই ধরনের সামন্ততান্ত্রিক, পিতৃতান্ত্রিক ধ্যানধারণা পোষণ করার জন্য আরডিএফ-কে (যারা মাওবাদী আদর্শে বিশ্বাসী) সমালোচনা করে। 

অতএব, উপরে আলোচিত সার্কুলার ও তার প্রস্তাবিত নিয়মাবলী তরুণ বিপ্লবীদের একাংশের সমালোচনার মুখে পড়ে। একইভাবে মাওবাদী দল ও তার নারী সংগঠন গ্রামাঞ্চলে মদ্যপান করার বিরুদ্ধে প্রচার চালায় ও সংগঠকদেরও মদ্যপান করতে নিষেধ করে।  শহরাঞ্চলে এই নীতিও বিতর্কের মুখে পড়ে, যেখানে নারী ও পুরুষের মধ্যে মদ্যপান, ধূমপান বা একসাথে থাকা বেশি প্রচলিত। যদিও এই প্রশ্ন ওঠে না, যে জীবনশৈলী শহরাঞ্চলে প্রচলিত তা গ্রামীণ সমাজের নৈতিকতা বা মরালিটির ক্ষেত্রে চালু করা সম্ভব কিনা। একইভাবে, যে নিয়ম আদিবাসী এলাকায় মানা হয় তাও মূলস্রোতের গ্রামীণ সমাজে প্রযোজ্য নয়। সদ্য কারাগার থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত রাজনৈতিক বন্দী ও সংগঠনের মহিলা সদস্যা বি অনুরাধা উপরের মতামত সম্পর্কে বলেন যে, “মার্ক্সবাদী আদর্শ কোনও নীতির সর্বজনীনতা প্রতিষ্ঠারআগে গুরুত্ব দেয় প্রত্যক্ষ বাস্তবক্ষেত্রের বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের উপর, এবং এই দুইয়ের মধ্যে এক দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক বর্তমান।’’2              

শহরাঞ্চলের নারী আন্দোলন    

নকশালপন্থী আন্দোলন ও মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের আদর্শ যা এই আন্দোলনকে দিশা দেখিয়েছে, দেশে ও বিদেশে মানুষের জীবনে তার সুদূরপ্রাসারী প্রভাব স্পষ্ট। তাই ভারতে বিভিন্ন শহরের মহিলারা যাঁরা এই আদর্শের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন, তারা সংগঠক হিসেবে পরবর্তীকালে কাজ করেছেন। তাঁরা শ্রমিক শ্রেণী, ছাত্রছাত্রী, চাকুরীজীবী ইউনিয়ন, গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সংগঠন ও নারী সংগঠন ইত্যাদির মধ্য দিয়ে কাজ করেছেন। এদের মধ্যে অধিকাংশ নারী সংগঠনই মাওবাদী পার্টির সাথে সরাসরি ভাবে যুক্ত নয়, কিন্তু তাদের মধ্যে থাকা কিছু সদস্য মাওবাদী আদর্শে বিশ্বাস করেন। এই ধরনের নারী সংগঠন বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে সংগ্রাম করেছে যেমন – ধর্ষণ এবং যৌন হেনস্থা, গার্হস্থ্য হিংসা, অ্যাসিড আক্রমণ, হবু শিশুর যৌন নির্বাচন করে গর্ভপাত, হিন্দুত্বের পটভূমিকায় নারীদের অবস্থান, বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতায় মহিলাদের পণ্যায়ণ, বিশ্বায়নের অধীনে মহিলা শ্রমিকদের অবস্থা, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) ইত্যাদি। আদিবাসীদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, ছত্তিসগড়ে সালওয়া জুডুম বা ঝাড়খণ্ডে সেন্ড্রা বাহিনীর অত্যাচার, মহিলা রাজবন্দী ও মহিলাদের ভুয়ো সংঘর্ষে হত্যা করা প্রভৃতি বিষয়েওসরব থেকেছে এই সংগঠনগুলি।          

বর্তমান উন্নয়ন মডেলের দরুণ উৎখাত এবং বিস্থাপনের বাস্তবতা যা ছত্তিসগড়, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গের সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম-লালগড় ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে উঠে আসে, সেই সমস্ত অধিকার আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধেও কাজ করে এই সংগঠনগুলি। সমস্ত নারী সংগঠনগুলির মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্যের আদর্শ  থেকে এই গ্রুপগুলি স্বতন্ত্র মহিলা আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে যৌথ ভাবে কাজ করে। ১৯৯১ সালে তারা তিরুপতি কনফারেন্স আয়োজন করে। কনফারেন্স-এ অংশগ্রহণকারী মহিলারা লোকশিল্প ভিত্তিক পথনাটক, গান ও নাচ পরিবেশন করেন এবং মহিলাদের লেখা, প্রদর্শিত গান ও নাচ সিডি ও ক্যাসেটে রেকর্ড করা হয়। মহিলাদের পত্রিকা বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত হয় ও সেগুলো অফিস, কলেজে ইত্যাদি জায়গায় বিক্রি করা হয়। এভাবে ছোট শহরের সাধারণ মহিলাদের কাছে নারী মুক্তির ডাক পৌঁছয় ও তাঁরা নিজেদের মতামত রাখার সুযোগ পান। লিঙ্গ নির্বিশেষে বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত লেখক, কবি ও সংগঠকরা নারী মুক্তির প্রশ্নে বহু সেমিনার ও বিতর্কও আয়োজিত করেছেন।

১৯৯২ সালে পাটনার ‘অল ইন্ডিয়া লিগ অব রেভলিউশনারি কালচার’ (সর্বভারতীয় বিপ্লবী সংস্কৃতি লীগ) এরকমই একটি সেমিনারের আয়োজন করে, যে আলোচনায় নারীবাদ প্রশ্নে তীব্র বিতর্ক হয়। বিপ্লবী রাজনীতির প্রেক্ষিতে হওয়া এই আলোচনা অংশগ্রহণকারীদের সমৃদ্ধ করেছিল। মধ্যবিত্ত পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা বনাম নারীবাদের দ্বারা সমৃদ্ধ বিপ্লবী চিন্তা –  সেমিনারে এই দুইয়ের মধ্যে জোর বিতর্ক হয়, এবং আমি নিজে সেই আলোচনার সাক্ষী।          

দুর্ভাগ্যজনকভাবে ৯০-এর দশকে যে নারী মুক্তি আন্দোলনের ধারা গতি পেয়েছিল, গত দশকে তার অনেকাংশে ক্ষয়ক্ষতি হয়। হয়তো নকশালপন্থী, মার্ক্সবাদী, দলিত ও সামগ্রিক ভাবে গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের ওপর নামা আক্রমণই এর কারণ। শহরাঞ্চলের কিছু মহিলা আন্দোলনকারী, তাঁরা বিশেষত পুরনো প্রজন্মের পুরুষ কর্মীদের পিতৃতান্ত্রিক আচরণের কারণে ক্লান্তি অনুভব করেছেন। মহিলাদের বলা হয়েছে নারীবাদ শ্রমিকশ্রেণীকে বিভক্ত করে ফলে তা এড়িয়ে চলা উচিৎ। নারীবাদ পিতৃতন্ত্র বিরোধী কেন্দ্রবিন্দু থেকে মার্ক্সবাদ, উদারবাদ, গান্ধীবাদ, অথবা আম্বেদকার চিন্তার মতো দার্শনিক ভাবনার পরিসরকে লিঙ্গ রাজনীতির প্রশ্নে আরও ধারালো করে তোলে। কিন্তু কিছু সক্রিয় কর্মীদের কাছে নারীবাদ ও মার্ক্সবাদ পরস্পরবিরোধী। 

ভারতীয় মাওবাদী আন্দোলন ক্যুয়ার ইস্যু, সমকামী সম্পর্ক, রূপান্তরকামী মানুষের সমস্যা নিয়ে এখনো অজ্ঞ। ইন্টারনেটে পাওয়া তথ্য ঘাঁটলে একজন সহজেই দেখতে পাবে কমিউনিস্ট পার্টি অব ফিলিপিন্স, তাদের স্কোয়াড সদস্য যেসব সমকামী তাঁদের বিয়ের ব্যবস্থা করেছে। কিভাবে এই পার্টি প্রান্তিক যৌনতার প্রশ্নের সাথে সৃজনশীল ভাবে বিশ্লেষণ করেছে, এই বিষয়ে গবেষণা হয়েছে। কিন্তু ভারতের মাওবাদী আন্দোলনে এই নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য নেই।                   

উপসংহার

নকশালবাড়ির সময় থেকে মহিলারা এই আন্দোলনের বিকাশের জন্য বহু গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, ও ভারতীয় মহিলাদের আবদ্ধ করে রাখা অনেক বেড়া ভেঙেছেন। দলের একজন অভ্যন্তরীণ সদস্যা নিশিতা বলছেন,  “একজন মহিলা কমরেড হিসেবে, আমি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে পারি মহিলারা পার্টি ও বাহিনীর মধ্যে দ্রুত ও যথার্থ ভাবে এগিয়েছেন, পার্টি ও জনগণের নেতৃত্বস্থানীয় পদে নিজেদের ন্যায্য স্থান অর্জন করেছেন… মহিলা কমরেডরা পুরুষ কমরেডদের ওপর নির্ভরশীল না, ও তাঁরা নিজেরা তাঁদের সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাঁরা রাখেন। এটা তাঁদের বিপ্লব, এটা তাঁদের দল, যেটা তাঁরা তাঁদের শ্রমের মূল্যে তৈরি করেছেন। এবং তাঁরা এই আন্দোলনকে সর্বাবস্থায় রক্ষা করবেন ও জয়ের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। ‘’       

আমার অধ্যয়ন, পর্যবেক্ষণ ও অসংখ্য মহিলা কর্মীদের সাথে হওয়া আলাপ থেকে আমি বুঝেছি যে, নকশালপন্থী আন্দোলনে বিশাল পরিবর্তন ঘটেছে। মহিলাদের অংশগ্রহণ রাজনৈতিক চিন্তা ও কর্মকাণ্ড দুদিকেই সার্বিক উন্নতি এনেছে। প্রথমত, মাওবাদী আন্দোলন প্রচলিত ধারার এনজিও বা দলিত আন্দোলনের নারীপ্রশ্নের থেকে আলাদাভাবে এই প্রশ্নকে দেখে। এই আন্দোলনশ্রেণি ও পিতৃতন্ত্রের পারস্পরিক সম্পর্ককে সব সময়ে গুরুত্ব দেয়। শ্রেণিসংগ্রাম বহির্ভূতভাবে শাসক শ্রেণিকে উচ্ছেদ না করা অবধি পিতৃতন্ত্রকে মোকাবিলা করা অসম্ভব, কারণ শ্রেণিবিভক্ত সমাজ পিতৃতন্ত্রের বিভিন্ন রুপকে এই শ্রেণিবৈষম্যের মধ্যেই ধারণ করে। সিপিআই, সিপিএম সহ বেশিরভাগ সংসদীয় কমিউনিস্ট দলে নারী সংগঠন, অন্যান্য গণসংগঠনের মতই রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থে মহিলাদের সংখ্যাবৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত হয়।

অন্যদিকে, আমার দীর্ঘদিন ধরে নেওয়া সাক্ষাৎকার, সেটা নেপালের হিলাসা ইয়ামির (মাওবাদি-সেন্টার) সাথে হোক বা ফিলিপিন্সের মহিলা কর্মীদের সাথে, অথবা ভারতবর্ষে অনুরাধা গান্ধীর সাথে – আমায় স্থিরবিশ্বাসী করেছে যে এই দলগুলো মহিলাদের সংগ্রামের অর্ধেক অংশীদার ভাবে। অন্য শব্দবন্ধে বলতে গেলে বলা যায়, নারীরা এই আন্দোলনে পার্টি, ছাত্র সংগঠন, শ্রমিক কৃষক সংগঠন ও জনতানা সরকার যা বিকল্প ক্ষমতার উৎস, তার অর্ধেক অংশ জুড়ে বিরাজ করছেন এবং সব ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।                 

আন্দোলনে জাতিপ্রথার প্রশ্নের নিরিখেও ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দিয়েছে।জাতি-বর্ণ ব্যবস্থা ও লিঙ্গপ্রশ্ন বুনিয়াদী ভিত্তি এবং উপরিকাঠামো এই দুইয়ের অংশ। মহিলারা বিপ্লব পরবর্তী সময়ে চটজলদি সাম্য অর্জন করতে পারবে এমন নয়, বরং বস্তুনিষ্ঠভাবে সাংস্কৃতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক স্তরে সমস্ত বৈষম্য মূলক অনুশীলনের বিরুদ্ধে তাঁদের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। এই জন্যে মধ্য ভারত ও ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী মহিলাদের দেখে উচ্ছ্বসিত হই, যারা নিজেদের সমাজের পিতৃতান্ত্রিক রীতিনীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছেন। সম্পূর্ণ ব্যবস্থাকে গোড়া থেকে নাড়িয়ে দেয় এমন সংগঠনে যোগদান করা নিজ অধিকারেই পিতৃতন্ত্র-বিরোধী অনুশীলনে সামিল হওয়া। কারণ তাঁরা জানেন এই আন্দোলনের সাথে যোগ স্থাপনের সঙ্গে বহু বিপদ ও আত্মবলিদান যুক্ত। নিশিতার কথায়, “পিতৃতন্ত্র বিরোধী লড়াই, তার মূল অর্থে, আসলে শ্রেণি সংগ্রাম।’’ ষাঁড়ের দুই শিং ধরে জব্দ করার প্রচেষ্টায় মাওবাদী আন্দোলনের মেয়েরা নিয়োজিত।

তথ্যসূত্র

  1. Bandyopadhyay, Krishna (2008): “Naxalbari Politics: A Feminist Narrative,” Economic & Political Weekly, 5 April.
  2. Bhattacharyya, Amit (2016): Storming the Gates of Heaven: The Maoist Movement in India: A Critical Study 1972–2014, Kolkata: Setu Prakashani.
  3. CAVOW (2006): “Salwa Judum and Violence on Women in Dantewada, Chhatisgadh, Nagpur,” Committee against Violence on Women, December.
  4. Ghandy, Anuradha (2011): Scripting the Change: Selected Writings of Anuradha Ghandy, Anand Teltumbde and Shoma Sen (eds), New Delhi: Daanish Books.
  5. Kurpu, Sabari (2005): Women Martyrs of Dandakaranya, Published by Swapan Dasgupta Radical Publications, Kolkata.
  6. — (2010): Dandakaranya Mahila Udyam Charitra (1980–2009) published in Telugu, Hyderabad: Virasam Pracharanalu, March (English translation unpublished).
  7. Latha and Sujatha (1991): “Emerging Women’s Movement in Dandakarnya: Conference Report,” published in Telugu journal Arunotara, March 1992, translated into English and published as an activist pamphlet.
  8. Nishita (unpublished): “An Open Letter to Krishna Bandopadhyay.”
  9. Roy, Srila (2012): Remembering Revolution: Gender, Violence and Subjectivity in India’s Naxalbari Movement, New Delhi: Oxford University Press.
শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *