করোনা অতিমারীর প্রেক্ষিতে জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন : একটি পর্যালোচনা

কোভিড ১৯ এসে জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নটিকে আবার সমাজ তথা রাজনীতির মূলস্রোতে নিয়ে এসেছে। বিগত দু’-তিন দশকে বিশ্বায়নের একুশে আইনের মধ্যে দিয়ে আমরা জনস্বাস্থ্য ধারণাটির এক ধরনের অপমূল্যায়ন দেখেছিলাম। বিশ্বায়ন শুধু স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেসরকারীকরণ— কর্পোরেটকরণ করেনি। স্বাস্থ্যের ধারণাটির সাথে সার্বিক সমাজ প্রগতির যে সম্পর্ক রয়েছে, বিশ্বায়ন তাকে উপড়ে ফেলতে চেয়েছে। বিশ্বায়নের হাত ধরে স্বাস্থ্যের অর্থ এসে ঠেকেছে চিকিৎসা আর ব্যক্তিমানুষের রোগমুক্তি।

জনস্বাস্থ্য নিয়ে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিতে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলশ্রুতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৭৮ সালে বিশ্বজুড়ে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’-এর ধারণা তৈরি করেছিল। ১৯৪৮ সালে স্বাস্থ্যের সংজ্ঞা নিয়ে WHO বলেছিল “Heath is a state of complete physical, mental and social well being and not merely absence of any disease or infirmity”। স্বাস্থ্যের এই সংজ্ঞা ও ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’-এর ধারণার আতসকাঁচে ফেলে আজকের কোভিড অতিমারীর পর্যায়কে আমাদের পর্যালোচনা করা উচিৎ।

জনস্বাস্থ্যের মূল ভিত্তিভূমি হল প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় গলদ থাকলে তা অতিমারীর সময়ে হঠাৎ করে মুমূর্ষু রোগীর সংখ্যা এত বাড়িয়ে দেয় যে তা উচ্চতর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর অপ্রত্যাশিত চাপ ফেলে তাকে গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। কোভিড অতিমারীর ক্ষেত্রে আমরা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এই সংকট খুব ভালোভাবে অনুভব করেছি। আমাদের দেশে সরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাতে বরাদ্দ হল জিডিপির ১.২৬ শতাংশ। উন্নত দেশ তো বটেই এমনকি পাশের শ্রীলংকা-বাংলাদেশের থেকেও এই প্রশ্নে আমাদের অবস্থা শোচনীয়। ২০১৯ সালে ল্যান্সেট পত্রিকার একটি সমীক্ষাতে দেখা যাচ্ছে যে স্বাস্থ্য পরিষেবার সুযোগ ও মানের নিরিখে (HAQ index) আমাদের দেশের অবস্থান বিশ্বের মধ্যে ১৪৫তম, বাংলাদেশ (১৩৩) ও শ্রীলংকার (৭১) পিছনে (সূত্র : https://wwhelancet.com/journals/lancet/article/PIIS0140-6736(18)30994-2/fulltextw.t) ।

কোভিড অতিমারীর মোকাবিলায় আমাদের দেশের সরকার বাহাদুরের স্লোগান ছিল সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন। অতিমারীর উচ্চ পর্যায়ে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া নিয়ন্ত্রণের জন্য শারীরিক দূরত্ব প্রয়োজন কিন্তু সামাজিক দূরত্ব কখনওই একটি অতিমারীকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম নয়। বরং অতিমারীকে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে সরকারের তরফ থেকে সামাজিক স্তরে আরও অনেক বেশি উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সেই ভূমিকাটিই পালন করে থাকে। প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রশ্নে কোভিডের সময়ে আমরা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছি। শহর বা গ্রামে রোগ সম্পর্কে লোকেদের সচেতন করা, রোগ নির্ণয়ের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে টেস্টিং-এর ব্যবস্থা করা, করোনা রোগী ও পরিবারের উপর সামাজিক বয়কটের বোঝা না চাপিয়ে দিয়ে রোগী ও তার পরিবারের পাশে থাকার জন্য উপযুক্ত পরিকাঠামো নির্মাণ করা, রোগ ধরা পড়লে তার বিপদসংকুল লক্ষণ নির্ণয়ের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্যকর্মীদের দিয়ে পরীক্ষা করানোর ব্যবস্থা করা— এই সমস্ত প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর প্রশ্নে আমাদের দেশ তথা রাজ্য সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। বাস্তবতঃ সরকার সামাজিক দূরত্বের স্লোগান তুলে আর অপরিকল্পিত লকডাউন করে আমাদের দেশের আপামর শ্রমজীবী মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। যে দেশে অধিকাংশ মানুষের উপযুক্ত বাসস্থান নেই, যে দেশে অধিকাংশ মানুষ দৈনিক মজুরির উপর নির্ভরশীল সেখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার স্লোগান অথবা অপরিকল্পিত লকডাউন আসলে অতিমারীর দুর্দশাকে আরও বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে। শ্রমজীবী মানুষদের জন্য উপযুক্ত সামাজিক এবং আর্থিক বন্দোবস্ত ছাড়া লকডাউন করে সরকার অতিমারীর সামাজিক দায় নিজের কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলে শ্রমজীবী মানুষের ঘাড়ে তুলে দিয়েছে। অন্যদিকে এই পর্যায়ে মুনাফার পাহাড় গড়েছে আদানি আম্বানির মতো একচেটিয়া পুঁজিপতিরা। কিন্তু অতিমারীর সময়ে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো বৃদ্ধির জন্য উচ্চকোটির এই অংশের উপর কর বা সেস বসানোর পথে হাঁটেনি আমাদের সরকার।

প্রাথমিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সরকারী ঔদাসীন্যের আরও একটি প্রকাশ হচ্ছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি সরকারের অবহেলা। কোনও দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রধান সৈনিক কিন্তু ডাক্তাররা হন না। বরং অ-ডাক্তার বিভিন্ন স্বাস্থ্য কর্মীদের ভূমিকাই এখানে মুখ্য। পুরসভার স্বাস্থ্যকর্মী থেকে শুরু করে গ্রামীণ স্তরে আশা-কর্মী, কারওর কোনও স্থায়ী কাজ নেই, নেই বিভিন্ন প্ৰয়োজনীয় যন্ত্রাদি ব্যবহারের উপযুক্ত ট্রেনিং বা দক্ষতা। মাসিক ৬,০০০-৮,০০০ টাকায় চুক্তিভিত্তিকভাবে নিয়োজিত এই কর্মীদের অধিকাংশই মহিলা। ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্বাস্থ্যক্ষেত্রে কর্মীদের অপ্রতুলতাও আর একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। যেখানে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ১০,০০০ জনসংখ্যা প্রতি ডাক্তার, নার্স সহ নূন্যতম ৪৪.৫ জনস্বাস্থ্যকর্মীর লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছে, সেখানে ভারতে শহর-গ্রাম সব মিলিয়ে সেই সংখ্যা হল ২০.৬ (এর মধ্যে আয়ুশ কর্মীরাও রয়েছেন)। এই অপ্রতুলতার ফলে করোনা অতিমারীতে প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নিযুক্ত স্বাস্থ্যকর্মী বিশেষতঃ মহিলা স্বাস্থ্যকর্মীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, বিশেষ ভাতা বা বীমার ব্যবস্থা ছাড়াই মাত্রাতিরিক্ত কাজ করতে হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সেই কাজের পরিমাণ ও  গুণমান অতিমারীর সংকটের চাহিদাকে মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে। এই সমস্ত অস্থায়ী স্বাস্থ্যকর্মীদের অধিকারের লড়াই বাস্তবতঃ জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।

‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ যে সরকারের দায়িত্ব, এই মূল সুর ১৯৭৮-এর কাজাখস্তানের আলমাতি-তে অনুষ্ঠিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধিবেশনে গৃহীত হয়েছিল। ভারতবর্ষ সেই সনদের সাক্ষরকারী হলেও ১৯৮০ সালের পর থেকে স্বাস্থ্য নিয়ে ক্রমাগত উল্টো পথে হেঁটেছে সরকার। জিডিপির শতকরা হিসেবে সরকারী স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বরাদ্দ কমেছে। আর যেটুকুও বা হয়েছে তাতেও অবহেলিত থেকেছে প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। শহরকেন্দ্রিক মেডিক্যাল কলেজ খোলা এবং বিভিন্ন উৎকর্ষ কেন্দ্র গড়ার কাজেই আপেক্ষিক ব্যয়বরাদ্দ বেশি হয়েছে। ফলতঃ গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুরবস্থা সহ বিভিন্ন আঞ্চলিক অসাম্য এ দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় উচ্চমাত্রায় প্রকট। ২০১২ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের তত্ত্বাবধানে ডঃ শ্রীনাথ রেড্ডির নেতৃত্বে গঠিত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’-এর সপক্ষে সওয়াল করে বেসরকারীকরণ এবং বীমা নির্ভর চিকিৎসা ব্যবস্থার বিরোধিতা করে। সরকারী ব্যয়বরাদ্দ বৃদ্ধি করে কীভাবে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’-এর পথে হাঁটা যেতে পারে তার রূপরেখাও তৈরি করেছিল সেই কমিটি। কিন্তু সেসব প্রস্তাব বিশ্বায়নের রূপকার ইউপিএ সরকারের বাস্তব নীতিতে লাগু হয়নি। এই ধারাবাহিকতার পরিণতিতে ২০১৪ সাল থেকেই দেশের বর্তমান ফ্যাসিবাদী শাসকরা স্বাস্থ্য নিয়ে আরও দ্রুততায় উল্টো পথে হাঁটা শুরু করে। করোনা অতিমারীর মৃত্যু মিছিল আসলে সেই পথেরই গন্তব্যস্থল।

অতিমারীর গোটা পর্যায়কাল জুড়েই জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি বিজেপি সরকারের ঔদাসীন্য ছিল সীমাহীন। ২০২০ সালের শুরু ফেব্রুয়ারী মাসে ICMR (Indian Council of Medical Research) সতর্কতা জারি করা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক উড়ান বাতিল করার পথে হাঁটেনি কেন্দ্রীয় সরকার। কারণ সরকারের কাছে দেশের জনজীবনের চেয়ে পুঁজি অনেক বেশি মহার্ঘ্য। প্রথম ঢেউয়ের পরে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর উন্নতি সাধনে কোনও বাস্তব উদ্যোগ নেয়নি সরকার। ২০১৯-এর কোর হেলথ বাজেট ছিল ৭৮,৮৮৬ কোটি টাকা; করোনা পর্যায়ে সেটা কমে এসে দাঁড়িয়েছে ৭১,২৬৯ কোটিতে। গত এক বছরের পর্যায়কালে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বহুবিধ সতর্কতা সত্ত্বেও  অক্সিজেন প্ল্যান্ট থেকে শুরু করে শ্বাসকষ্টের চিকিৎসার সরঞ্জাম, করোনাজনিত শারীরিক সমস্যার চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ওষুধ কোন কিছুই তৈরি করার বিশেষ কোনও উদ্যোগ নেয়নি সরকার। এই সমস্ত কিছু উৎপাদন তথা বন্টনের দায়িত্ব ছাড়া ছিল বেসরকারী বাজার ব্যবস্থার হাতে। ফলতঃ অক্সিজেন থেকে ভেন্টিলেটর, ওষুধ থেকে অন্যান্য সরঞ্জাম সমস্ত কিছুই দ্বিতীয় ঢেউয়ের পর্যায়ে অপ্রতুল হয়ে পড়ে। অপর্যাপ্ত পরিকাঠামোর চিকিৎসা ব্যবস্থা সার্বিকভাবে ভেঙে পড়ে দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কায়। শুধু সরঞ্জাম নয়, স্বাস্থ্যকর্মীদেরও সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারেনি সরকার। ভুল নীতির ফলে বহু স্বাস্থ্যকর্মীকে যেমন অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে; তেমনই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি এই গোটা পর্যায়ে অব্যবহৃত থেকেছেন ডাক্তার সহ বহু স্বাস্থ্যকর্মী। শুধু চিকিৎসা নিয়ে নয়, টীকাকরণের মতো একটি সর্বজনীন বিষয়কেও প্রাথমিকভাবে খোলা বাজারে ছেড়ে দিয়েছিল কেন্দ্র সরকার। শেষমেশ বিভিন্ন স্তরের সামাজিক রাজনৈতিক চাপের মুখে সবার জন্য বিনামূল্যে টীকার নীতি ঘোষণা করেছে সরকার। কিন্তু সেই টীকার পর্যাপ্ত যোগান এখনও দিবাস্বপ্ন হয়ে রয়েছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সংকটের পর এখন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর নাম করে প্রায় ৫০,০০০ কোটি টাকার বেসরকারী বিনিয়োগ পরিকল্পনা করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। আর এই বিনিয়োগে ব্যাংক লোনের গ্যারান্টার হবে সরকার নিজে। অর্থাৎ সরকারী উদ্যোগে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো বানানোর পথে না হেঁটে করোনার অজুহাতে জনগণের করের টাকা ঘুরপথে স্বাস্থ্যক্ষেত্রের পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দেওয়ার পথে নেমেছে সরকার। বহু প্রশ্নে আপাতভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির বিরোধিতা করলেও করোনাকালে অপর্যাপ্ত টেস্টিং, অপর্যাপ্ত সরকারী হাসপাতাল শয্যা, লাগামছাড়া বেসরকারী খরচ নিয়ন্ত্রণে অনীহা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যের দুরবস্থা— সব মিলিয়ে রাজ্য সরকারের ভূমিকাও যথেষ্ট সমস্যাজনক থেকেছে।

সাধারণ জনমানসে গঙ্গার ভাসমান লাশ, দিল্লির শ্মশানে লাগাতার জ্বলতে থাকা চিতার আগুন করোনা অতিমারীর ভয়াবহতার দ্যোতক হয়ে উঠেছে। তবে শুধু মৃত্যুসংখ্যা বা করোনা পরবর্তী দীর্ঘকালীন অসুস্থতা দিয়ে করোনা অতিমারীর প্রভাবকে মাপা যায় না। জনস্বাস্থ্যকে মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার নিরিখে মাপতে গেলেই আমরা দেখতে পাবো করোনা অতিমারী জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সংকটের চেয়েও অনেক বড়সড় দীর্ঘকালীন সংকট  নিয়ে এসেছে। জনস্বাস্থ্যের এই অতিমারীজনিত দীর্ঘকালীন সংকটটির একটি লিঙ্গবৈষম্যজনিত প্রেক্ষিতও রয়েছে যা আমাদের সাধারণ আলোচনার পরিসরে খুব একটা চর্চিত নয়। করোনা অতিমারী ও তাকে মোকাবিলা করার ভুল রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিসরকে অনেকাংশে সঙ্কুচিত করেছে। অতিমারীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ফলস্বরূপ সমাজের সমস্ত স্তরেই পরিবার কাঠামোটির পরিসর নতুন করে বিস্তৃত হয়েছে। এর ফলে আমাদের পরিবার কাঠামোর মধ্যে থাকা পিতৃতান্ত্রিক মতাদর্শের হাত ধরে নারীদের সামাজিক মানসিক শারীরিক সমস্যা বেড়েছে বহুগুণ। করোনা অতিমারী মেয়েদের সামাজিক, শারীরিক, মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে ঠিক কতটা গভীর ধরণের প্রভাব ফেলেছে তা নিয়ে আমাদের দেশে এখনও ভালো কোনও তথ্যভিত্তিক চর্চা হয়নি। তবুও কতগুলো সমস্যাকে সহজেই চিহ্নিত করা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকার ফলে শিশুদের বিকাশের সম্পূর্ণ দায়িত্ব এসে পড়েছে পরিবারের উপর, বকলমে মায়েদের উপর। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি বিশেষতঃ শ্রমজীবী মায়েরা এই প্রশ্নে বিশেষভাবে সমস্যার মধ্যে পড়েছেন। এমনিতেই কাজের অনিশ্চয়তা এবং রোজগারের অপ্রতুলতাজনিত সাংসারিক সংকটের মানসিক বোঝা শ্রমজীবী মেয়েদের উপর জোরালোভাবে পড়েছে। তার উপর সারাদিন বাচ্চার ঘরে থাকা, সব মিলিয়ে করোনা অতিমারী তাদের সামাজিক ও মানসিক বোঝা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। করোনা সংকটজনিত আর্থিক দুরবস্থা মেয়েদের শারীরিক সমস্যাকেও বাড়িয়ে দিয়েছে। তথ্য বলে সামাজিক কারণেই ক্রনিক অসুখ জনিত (যেমন সুগার, প্রেসার, বিভিন্ন স্ত্রীরোগ, অস্থি-পেশীর সমস্যা ইত্যাদি) রোগের চিকিৎসা সুযোগের পরিমাণ মেয়েদের মধ্যে শতকরাভাবে কম। করোনা অতিমারী জনিত আর্থসামাজিক সংকট সেই সমস্যাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। গার্হস্থ্য হিংসার পরিমাণ করোনা পর্যায়ে বিশেষ করে লকডাউনের সময়ে বহুগুণে বেড়েছে। জাতীয় মহিলা কমিশনের রিপোর্ট অনুসারে অতিমারী পর্যায়ে গার্হস্থ্য হিংসার অভিযোগ বেড়েছে প্রায় ৫০-৬০% (সূত্র : https://link.springer.com/article/10.1007/s11417-020-09340-1)। আমাদের দেশে বাস্তব অবস্থায় অভিযোগ জানানোর সুযোগ পান খুব অল্পই অংশের মেয়েরা। তাতেও এই ধরনের বৃদ্ধি বোঝায় যে প্রকৃত চিত্রটি ঠিক কতটা ভয়াবহ। শুধু গার্হস্থ্য হিংসা নয়, করোনা অতিমারীর পর্যায়ে নানাবিধ কারণে আমাদের দেশের মহিলাদের মানসিক সমস্যা বেড়েছে বহুগুণে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতার অভাবে, সরকারী পরিকাঠামোর অভাবের ফলে এই মানসিক রোগীদের অধিকাংশই চিকিৎসার থেকে বঞ্চিত হয়ে রয়েছেন। সব মিলিয়ে করোনা শুধু শারীরিক দিক থেকে নয়, বরং মানসিক ও সামাজিক দিক থেকেও দেশের নারীসমাজের স্বাস্থ্যের প্রশ্নকে গভীর সংকটের মুখে ফেলেছে। কিন্তু বিষয়টি যথেষ্ট গভীরতায় সামাজিক রাজনৈতিক পরিসরের চর্চার বিষয় হয়ে ওঠেনি।

করোনা অতিমারী এসে আরও একবার জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বকে আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে। জনস্বাস্থ্য বিষয়টির সামাজিক রাজনৈতিক গুরুত্বের ধারণা এদেশের প্রগতিশীল মহলেও বিরল। ফলতঃ দু’-একটি ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের প্রশ্নটি এ দেশের শ্রেণী আন্দোলন, নারী আন্দোলন বা সাধারণ প্রগতিশীল আন্দোলনের বিষয় হয়ে ওঠেনি জোরালোভাবে। সবার জন্য স্বাস্থ্যের লড়াই বাস্তবতঃ বৃহত্তর সমাজবদলের লড়াইয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। করোনা অতিমারী থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের শ্রেণী আন্দোলন, নারী আন্দোলনের সাথে জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের প্রশ্নটির সংশ্লেষের উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *