দেশ

দেশ কি পাল্টে যাচ্ছে? 

রুকুর বয়েস দশ। সে এতোসব জটিল প্রশ্নের উত্তর জানে না। তবু সে বুঝতে পারছে চারদিকে কিছু বাজে ঘটনা নিশ্চয় ঘটছে। এইতো সেদিন আব্বা কাজ থেকে ফিরে টিনের বাক্সটা খুলল। এই বাক্সের ভেতর কতো পুরনো কাগজপত্র থাকে। আব্বা ধুলো ঝেড়ে কাগজগুলো দেখছিল। দেখতে দেখতে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল একসময়। মা তখন রান্নাঘরে। রাতের খাবার বানাচ্ছিল। আব্বা মাকে ডেকে বলল, কাগজগুলোয় তো গন্ডগোল রয়েছে। 

মা রান্নাঘর থেকে ফিরে এসেছে। হাতে খুন্তি। মুখে ঘাম। জিজ্ঞেস করল, কেন?

আব্বা বলল, দলিলে আমার আব্বার নামের আগে শেখ রয়েছে। কিন্তু আমার ভোটার কার্ডে আব্বার নামের আগে শেখ নেই। এ তো মহা ঝামেলা।

মাও চিন্তিত হয়ে পড়ল। জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা রুকুর কাগজগুলো ঠিক আছে তো?

আব্বা মাথা নেড়ে কী যেন ভাবল। তারপর রুকুর আধার কার্ড আর বার্থ সার্টিফিকেট মেলাতে গিয়ে ভুল দেখতে পেল। রুকুর ভালো নাম – রুক্সানা খাতুন। আধার কার্ডে রয়েছে – Ruksana. কিন্তু বার্থ সার্টিফিকেটে লেখা – Rooksana.

মা বলল, তাহলে কী করবে?

আব্বা বলল, এখন আর কারোকে কিছু বলার দরকার নেই। আগে দেখতে হবে কোনটা পাল্টানো সহজ। আধার কার্ডে নামের বানান চেঞ্জ করা সহজ হলে ওটাতেই চেঞ্জ করে নেব।

নামের বানান পরিবর্তন করা এতো কঠিন কাজ কেন রুকু বুঝতে পারল না। তার কিন্তু বেশ মজাই লাগল ব্যাপারটা। দুটো কাগজে তার দু’রকম নাম। যেন একজন আরেকজনের সই। রুকু তো বাড়িতে একাই থাকে সারাদিন। খেলবার বন্ধুও তার বেশি নেই। আব্বা সেই সকালে কাজে চলে যায়। ফেরে রাতের বেলা। মা ঘরের কাজ নিয়েই ব্যস্ত। ফাঁকা হলেই তাকে পড়তে বসায়। রুকুর খেলার সঙ্গী কোথায়? 

রুকুর খেলার সঙ্গী নেই। সে তাই নিজের মনেই একধরনের খেলা বানিয়ে নিল। যে-রুকু আঁকতে ভালোবাসে, সেই রুকুর নামের বানানে দুটো O-আছে। কিন্তু যে-রুকু পড়া ফাঁকি দিয়ে খেলতে ভালোবাসে, সেই রুকুর নামের বানানে U. 

সবে যুক্তাক্ষর শিখছে রুকু। বৃষ্টি নামের তার বন্ধু হয়েছে ক্লাসে। বৃষ্টি খুব চঞ্চল। প্রতিদিন তার থেকে টিফিন ভাগ করে খায়। রুকুর টিফিনে মিষ্টি থাকবেই। আর সেই মিষ্টিতে বৃষ্টি ভাগ বসাবেই। সেদিন মায়ের কাছে ‘বৃষ্টি’ বানান লিখতে গিয়ে সে ধন্দে পড়ে গেল। ঠিক করতে পারল না ষ্ট-তে ই-কার বসাবে, না ঈ-কার বসাবে। এইটা সে প্রায় ভুল করে। বৃষ্টিকে ভাবতে গিয়ে সে বন্ধুকে দেখতে পেল। আবার ঝরঝর করে বৃষ্টি পড়ার শব্দও যেন পেল। একবার তার বাংলার শিক্ষক জানিয়েছিলেন, স্ত্রী লিংগের ক্ষেত্রে সাধারণত ঈ-কার বসে। সে ঝরঝর বৃষ্টিকে বাদ দিয়ে তাই বন্ধুটাকে লিখল। সে লিখল – বৃষ্টী। অমনি তার মা চোখ বড়ো করল। বলল, আবার ভুল করেছিস? 

মাকে ভয় করে রুকু। কী উত্তর দেবে তার যুক্তি খুঁজে পাচ্ছিল না। মিথ্যা করে বলল, কিন্তু মা বৃষ্টি তো এইরকম করেই নামের বানান লেখে।

– তাহলে সে ভুল লেখে। 

– নিজের নামের বানানে ভুল! ওকেও আমার মতো নামের বানান পাল্টাতে হবে?

– মা আর সেই কথার উত্তর দিল না। অন্য প্রশ্নের উত্তর লেখাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

নিজের মনেই হেসে ফেলল রুকু। একজন রুকু তাকে বাহবা দিল। অন্য রুকুটা বলল, মায়ের কাছে মিথ্যা বললি?

আব্বা কয়েক জনের কাছ থেকে পাকা খবর নিয়ে এসেছে। আধার কার্ডে নামের বানান পাল্টাতে গেলে কী করতে হবে তা নিয়ে মায়ের সঙ্গে আলোচনা করছে। রুকুর মন খারাপ হয়ে গেল। যেন একজন বন্ধুকে বাদ দিতে হবে তাকে। বন্ধুকে বাদ দিতে সে কিছুতেই রাজি নয়। তার রাগও হল আব্বা-মায়ের উপর।

রোবিবার আব্বার ছুটি। আব্বা সকালে বাজার থেকে গরুর গোশ কিনে এনেছে। মাকে বলেছে পুঁইশাক দিয়ে রান্না করতে। আব্বা পুঁইশাক দিয়ে গোশ রান্না খেতে খুব পছন্দ করে। আব্বার মন বেশ ফুরফুরে এখন। রুকু আব্বাকে বলল, আব্বা আমি নাম পাল্টাবো না।

– নাম কেন পাল্টাবি?

– তুমিই তো আমার আধার কার্ডের নাম পাল্টাতে চাইছ।

– ধুর বোকা। নাম কেন পাল্টাবি। তোর দুটো কাগজে দুই রকম নামের বানান। সেজন্য নামের বানান পাল্টে সব কাগজে যাতে একই বানান থাকে সেইটার ব্যবস্থা করছি। 

– দুই রকম নামের বানান থাকলে কী ক্ষতি?

– সে-অনেক ঝামেলা।

– কী ঝামেলা?

– ওসব তুই বুঝবি না। 

– বারে, আমার ঝামেলা আর আমিই বুঝব না!

আব্বা কী যেন ভাবল নিজের মনে। তারপর বলল, এখন আমাদের সব কাগজ ঠিক করে রাখতে হবে। 

– কেন?

– হঠাৎ যদি সরকার কাগজ দেখতে চায়?

– তুমি আমার দুটো কাগজই দেখাবে।

– আর সরকার যদি জানতে চায় দুরকম বানানের মধ্যে তুই আসলে কোনটা, তাহলে কী জবাব দেব?

– তুমি বলবে দুটোই আমি।

– এটা আবার হয় নাকি!

– হবে না কেন?

রুকুর কথা শুনে আব্বা হেসেই ফেলল। রুকু তবু বলতে থাকল, আমি নামের বানান পাল্টাব না। কিছুতেই পাল্টাব না।

ডিসেম্বরের শুরুতেই শীত পড়ে গেল। কমলা লেবুর জন্য শীতকাল পছন্দ করে রুকু। কিন্তু অন্য রুকু বলল, ঐ, দ্যাখ ঘুড়ি।

রুকু কোনোদিন ঘুড়ি ওড়ায়নি। সে লক্ষ করেছে কোনো মেয়েই ঘুড়ি ওড়ায় না। জামাল তার থেকে ক’বছরের বড়ো। রুকু জানালা দিয়ে দেখল, জামালদা মাঠে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। এখন আব্বা-মা ঘরে নেই। তারা কী এক দলিল ঠিক করতে উকিলের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছে। যাবার আগে মা সাবধান করে দিয়েছে, একদম বাইরে বেরবি না। আমরা এখুনি চলে আসব। 

একটু আগে ছবি আঁকছিল রুকু। এখন জানালায় তাকিয়ে তার মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছে। সেও জামালদার মতো ঘুড়ি ওড়াতে চায়। একজন রুকু তাকে বলল, চল। 

অন্যজন বলল, খবরদার! বাইরে বেরবে না। 

প্রথমজন বলল, একটু গিয়েই চলে আসব। মা জানতে পারবে না। 

দ্বিতীয় জন বলল, বাইরে বেরবে না। মায়ের কথা শোনো।

রুকু কী করবে বুঝতে পারছিল না। তখনি কে যেন তার হাত ধরল। সে দেখল তার মতোই আরেকজন রুকু তাকে ঘর থেকে বার করে আনছে।

মাঠে অনেকেই ঘুড়ি ওড়াচ্ছিল। সে জামালদার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। জামালদা বলল, কীরে?

– আমাকে ঘুড়ি ওড়ানো শেখাবে?

– তুই ঘুড়ি ওড়াবি?

রুকু হাসল। 

জামাল তাকে সুতোটা দিয়ে বলল, দেখি তুই কেমন ঘুড়ি ওড়াস। 

ফুরফুরে উত্তুরে হাওয়া দিচ্ছিল। তবে সেই হাওয়ার যে এতো টান রুকু কল্পনাও করতে পারেনি। ঘুড়ি যেন তাকে উড়িয়ে নিয়ে চলে যাবে। অনেক দূর অন্যদেশে সে যেন উড়ে যাবে এখনি। 

আরেকটু হলেই ঘুড়িটা নারকেল গাছের মাথায় আটকে যেত। জামালদা তার থেকে সুতোটা নিয়ে সামলে নিল। রুকু জিজ্ঞেস করল, আমি ঘুড়ি ওড়াতে পারব?

– কেন পারবি না?

– মেয়েরা ঘুড়ি ওড়ায়?

– ওড়ায় বোধহয়।

– কিন্তু এখানে তো কোনো মেয়ে ঘুড়ি ওড়ায় না।

– ওড়ায় হয়ত। আমি কি সব জানি নাকি?

রুকু বেশ সাহস পেয়ে গেল। আরেকবার সুতোটা নেবার জন্য তার হাত নিশপিশ করতে থাকল। কিন্তু অন্য রুকু তাকে মনে করিয়ে দিল, এখুনি মা ফিরে আসবে। বাড়ি চল। 

সেদিন ঠিক সময়ে বাড়ি পৌঁছে গিয়েছিল রুকু। আব্বা-মা যখন ফিরল, দেখল তাদের মেয়ে মন দিয়ে পড়াশোনা করছে। মা তবু সন্দেহপ্রবন। মেয়ে সত্যিই পড়ছে কিনা যাচাই করতে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, স্বপন বুড়ো কার ছদ্মনাম?

উত্তরটা জানা ছিল রুকুর। সেও চেঁচিয়ে উত্তর দিল, অখিল নিয়োগী।

মা আর কথা বাড়াল না।

দেশটা কি পাল্টে গিয়েছে?

রুকু এখনো জানে না তার দেশ কতোদূর পাল্টে গিয়েছে। তবে কিছু যে একটা হয়েছে তা বুঝতে পারছিল আব্বার মুখ দেখে। 

সেদিন পড়া হয়ে গেলেও আব্বা তাকে কার্টুন দেখতে দিল না। বেশ রাত হয়ে গিয়েছে। আব্বা তবু টিভির পর্দার দিকে তাকিয়ে। এইসময় রুকুর কার্টুন দেখার সময়। সারাদিনে এই একবারই সে কার্টুন দেখতে পারে। অন্যসময় কার্টুন দেখলে মা রাগ করে তাকে। তার সঙ্গে মায়ের একটা বোঝাপড়া হয়েছে – প্রতিদিন ঘুমতে যাবার আগে সে ১৫মিনিট কার্টুন দেখতে পায়। কিন্তু সেদিন আব্বা এমনভাবে টিভির দিকে চেয়ে রয়েছিল যে সে নিজের ইচ্ছাটা জানাতে পারল না।

টিভিতে পার্লামেন্টের তর্ক চলছে। পার্লামেন্টে আইন পাশ হয়। আইন পাশ হলে সেই আইন সবাইকে মেনে চলতে হয়। কিন্তু আমার যদি আইনটাকে পছন্দ না হয়?

রুকু জিজ্ঞেস করল আব্বাকে। আব্বা তার দিকে তাকাল না। একভাবে টিভির দিকেই চেয়ে রইল। রুকু বুঝতে পারছিল কিছু একটা প্রয়োজনীয় জিনিস ঘটতে চলেছে টিভিতে। তার এসব ভালো লাগছিল না। তবু আব্বার পাশে চুপ করে বসে রইল। সে খেয়াল করল মাও চলে এসেছে টিভি দেখতে।

অনেক তর্কের পর ভোট শুরু হল। কেউ আইনের পক্ষে মত জানাবে। কেউ আইনের বিপক্ষে। যে-মতের সংখ্যা বেশি হবে, সেই মতটাই গৃহীত হবে। রুকুর মনে হল এটা যেন ক্রিকেট খেলা। শেষ ওভারে দশ রান চাই। যারা বল করছে তারাও বেশ চালাক। সহজে রান তুলতে দিচ্ছে না। 

অবশেষে ভোটের ফলাফল জানা গেল। নতুন নাগরিকত্ব আইন পাশ হয়ে গিয়েছে। আব্বার মন খারাপ। টিভিটা বন্ধ করে দিল। রুকুর সঙ্গে কথাও বলল না। সেই রাতে ভাত খেল না মা। কিছুদিন আগে মায়ের এক খালা মারা গিয়েছিল। মৃত্যুসংবাদ পাবার পর মা এমনি মন খারাপ করে বসেছিল অনেক্ষণ।

নাগরিকত্ব আইনটা কী? আব্বাকে পরের দিন জিজ্ঞেস করল রুকু। আব্বা কাজে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছিল। বলল, খুব খারাপ।

– কেমন খারাপ?

– এই আইন অনুযায়ী আশপাশের দেশ থেকে যারা আশ্রয়ের জন্য আমাদের দেশে আসবে, তাদের ধর্মবিচার করে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। 

– ধর্ম বিচার করা মানে কী?

মা আব্বাকে খাবার দিচ্ছিল। বলল, আমরা তো জানি সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার আছে। ঠিক কী না?

রুকু জিজ্ঞেস করল, সমান অধিকার মানে কী?

মা বলল, তোদের স্কুলে টিফিনের ঘন্টা পড়লে তোরা কী করিস?

– কী আর করব। আমরা সবাই হই-হই করে টিফিন খাই।

 – কিন্তু এইবার যদি বলা হয় টিফিনের ঘন্টা পড়লে শুধু বৃষ্টিই টিফিন খেতে পারবে। রুক্সানা খাতুন টিফিন খেতে পারবে না। তখন তোর কেমন লাগবে?

– যাহ। এটা আবার স্কুলে হয় নাকি।

– কিন্তু যদি হয়?

– তাহলে আমার মন খারাপ হয়ে যাবে।

– সেতো বটেই। কিন্তু তুই কি এই নিয়মটা মানবি?

– একদম মানব না। আমিও বৃষ্টির সঙ্গে টিফিন খাব। 

– আর যদি সেটা করতে না দেয়?

 – তাহলে আমি হেডদিদিকে বলে দেব।

– কিন্তু নিয়মটা যদি হেডদিদিই বানায়?

 – তাহলেও আমি নিয়মটা মানব না। এইটা বাজে নিয়ম।

রুকুর কথা শুনে মায়ের চোখ ভিজে গেল। রুকুকে জড়িয়ে ধরল। আব্বা তার কপালে চুমু খেয়ে কাজে বেরিয়ে গেল।

দেশটা হয়তো পাল্টে গিয়েছে। বড়োদের কথা শুনে তার এমনি মনে হয়। তবে দেশ নিয়ে সে যে খুব ভাবছে তাও নয়। তার এখন একটাই চিন্তা – যেভাবেই হোক ঘুড়ি ওড়ানো তাকে শিখতেই হবে। সে রোজ জানালা দিয়ে জামালদাকে ঘুড়ি ওড়াতে দেখে। একজন রুকু তাকে বলে, চল। কিন্তু অন্যজন তাকে বিপদের কথা মনে করিয়ে দেয়। সে জানে, ঘরে মা থাকলে জামালদার সঙ্গে ঘুড়ি ওড়াতে যাওয়া বেশ ঝুঁকির কাজ। মা টের পেলে তার আর রক্ষে নেই!

কিন্তু সব খারাপের মধ্যে ভালোও কিছু থাকে। থাকবেই। সে ঘুড়ি ওড়ানোর একটা সুযোগ পেয়ে গেল।

রুকু শুনেছে তাদের আশেপাশের ঘর থেকে মানুষজন এই আইনের প্রতিবাদে বড়ো মাঠটায় জড়ো হয়েছে। আইনটাকে না ফেরানো অব্ধি তারা এইভাবে বসে থাকবে। 

এই মাঠে ইদের পর মেলা বসে। রুকু কতোবার আব্বা-মায়ের সঙ্গে সেই মেলায় গিয়েছে। গতবার সে মেলায় গিয়ে গুড়ের কটকটি খেয়েছিল। নাগোরদোলা চড়েছিল। আব্বা তাকে একটা পুতুল কিনে দিয়েছিল। শোয়ালে পুতুলটার চোখ বন্ধ হয়ে যায়। আবার দাঁড় করালে সে চোখ খোলে।

কিন্তু আজ সে মাঠটাকে চিনতেও পারল না। কতো মানুষ সেই মাঠে জড়ো হয়েছে। সে জামালদার মাকে দেখতে পেল। জামালদার মা আরো অনেকের সঙ্গে সেইখানে বসে রয়েছে। আমেনা বুবু কলেজে পড়ে। সে সবার সামনে বক্তৃতা দিচ্ছে। মাঝে মাঝে স্লোগান উঠছে। চারদিক দেখে তার মেলার কথাই মনে পড়ল। তবে এই মেলাটা অন্যরকম। এখানে নাগোরদোলা নেই। গুড়ের কটকটি নেই। কিন্তু কতো মানুষ মিলেমিশে কথা বলছে পরস্পরের সঙ্গে। হাফিজা খালার ছেলেটা রুকুর থেকে অনেক ছোটো। সবে হাঁটতে শিখেছে। হাফিজা খালা বাচ্চাটাকে কোলে নিয়েই সবার সঙ্গে প্রতিবাদ করছে।

বাড়ি ফিরে মা বলল, এখন আর ঘরে বসে থাকবার সময় নয়। কাল থেকে আমিও ওখানে থাকব। সকালেই চলে যাব।

আব্বা বলল, আর রুকু?

মাকে উত্তর দেবার সময় দিল না রুকু। সে যেন এই সুযোগের জন্য তৈরি ছিল। বলে ফেলল, আমি তো বড়ো হয়ে গিয়েছি। একাই থাকতে পারব।

– একা থাকতে পারবি? ভয় করবে না?

– উঁহু। ভয় করবে কেন?

অন্যদিনের থেকে আগেই ঘুম ভেঙে গিয়েছিল রুকুর। সে উঠে দেখল মা সকলের জন্য ইতোমধ্যেই চা বানিয়ে ফেলেছে। আব্বাও রেডি। তার জন্য চা আর রুটি টেবিলে রেখে আব্বা মাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

কোনোমতে চা খেয়েই রুকু জানালার কাছে চলে গেল। এতো সকালে কে আর ঘুড়ি ওড়ায়! আকাশ ফাঁকা। আকাশে কাক উড়ছে।

খানিক পর আব্বা ফিরে এলো। হাতে বাজারের থলি।

রুকু বলল, মা আসবে না?

– মা তো রাতে ফিরবে।

– তাহলে তুমি বাজার নিয়ে এলে কেন?

– বারে, দুপুরের খাবার খাবি না?

– কিন্তু রাঁধবে কে?

আব্বা রহস্য মিশিয়ে বলল, ওয়েট কর। তাহলেই দেখবি।

রুকু আব্বার পিছুপিছু ঘুরতে থাকল।

সে দেখল আব্বা থলি থেকে মাছ বার করছে। মাছগুলো একটা বাটিতে রেখে জল দিয়ে ধুচ্ছে। কড়াইয়ে তেল ঢালছে। মাছে মশলা মাখাচ্ছে…

– তুমি রাঁধতে জানো? রুকু অবাক। সে আগে কখনো আব্বাকে রাঁধতে দেখিনি।

আব্বা বলল, আগে তো রাঁধিনি। রাঁধতে রাঁধতে শিখে নেব।

– পারবে?

– পারব না কেন। চেষ্টা করলে সবকিছু পারা যাবে।

কিন্তু রান্না শেখা আসলে সহজ কাজ নয়। প্রথদিনেই খুঁন্তির ছ্যাঁকায় হাত পুড়িয়ে ফেলল আব্বা। মাছে নুন কম, ঝাল বেশি। 

আব্বা জিজ্ঞেস করল, কেমন হয়েছে রে?

রুকু বড়োদের মতো খানিক চিন্তা করে বলল, মায়ের মতো না। তবে চেষ্টা কর। শিখে যাবে।

দুপুরে একটা টিফিনবাক্সে ভাত-তরকারি নিয়ে মায়ের কাছে চলে গেল আব্বা। এই সুযোগেরই সন্ধানে ছিল রুকু। আব্বা বেরিয়ে যেতে, সেও বেরিয়ে গেল।

মাঠে তখন জামালদা সবে এসেছে। রুকুকে দেখে বলল, ‘ঘুড়িটা তোল্লাই দে’।

রুকু ঘুড়িটাকে নিয়ে বেশ খানিকটা দূরে চলে গেল।

জামালদা বলল, এবার মাথাটা সোজা করে ধর।

সেইভাবে ঘুড়িটাকে ধরে জামালদার কথামতো সে ঘুড়িটাকে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিল। অমনি জামাল সুতোয় টান মেরে ঘুড়িটাকে উড়িয়ে দিল আকাশে। এখন নীল আকাশে পাখির মতো ঘুড়িটা উড়ছে, ঘুরছে, সুতোয় ঢিল দিলে ভেসে যাচ্ছে দূরে।

আজকের হাওয়া আগের দিনের থেকে কম। জামালদা বলল, প্যাঁচ খেলবি?

– আমি তো জানি না কিভাবে প্যাঁচ খেলতে হয়।

– ধুর বোকা। আমি তো রয়েছি। তোকে কিছু করতে হবে না। যখন ঢিল দিতে বলব, তুই লাটাই থেকে সুতোটা ছাড়বি। আর টানতে বললে সুতোটা ধরে টান মারবি। খুবই সহজ। 

এই কদিনে রুকু ঘুড়ির নামগুলোও শিখে ফেলেছে। পাশে যে ঘুড়িটা উড়ছিল সেইটার নাম মোমবাতি। জামালদা একবার মোমবাতিটার নিচ দিয়ে ঘুড়িটাকে নিয়ে গিয়ে আবার মুহূর্তের মধ্যে উপরে তুলে ফেলল। তারপর খানিকটা নিচে নামিয়ে সেটার সুতোর উপর নিজের ঘুড়িটাকে ছেড়ে দিল। এবার রুকুর হাতে সুতোটাকে দিয়ে বলল ঢিল দে’। 

রুকু লাটাই থেকে সুতো ছাড়তে শুরু করল। সে মাঝেমাঝেই জামালদার দিকে তাকাচ্ছিল।

জামালদা বলল, ছাড়। ছাড়। সুতো ছাড়তে থাক।

দুটো ঘুড়ি হাওয়ায় ভাসতে থাকল। মোমবাতি যত টান দিতে থাকল, রুকু ততই ঢিল দিতে থাকল। ঢিল দিতে দিতে একসময় সে নিজেই সুতোয় টান দিল। আর ওমনি মোমবাতি ঘুড়িটা কেটে গিয়ে খানিক ভেসে নারকেল গাছে জড়িয়ে গেল। 

জামালদা চেঁচিয়ে উঠল, ভোকাট্টা।

তাকে দেখে রুকুও চেঁচাল, ভোকাট্টা। 

আব্বার ফিরতে বিকেল পেরিয়ে গেছিল। একজন রুকু হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসল। কিন্তু অন্যজনের মন আকাশে। সে বইয়ের পাতায় কতোরকমের ঘুড়ি দেখল। বই-এর অক্ষরগুলো যেন ঘুড়ি হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে।

পরের দিনও একই রকম কাটল। এখন আর আব্বা মাকে প্রতিবাদ সভায় নিয়ে যায় না। মা নিজেই ওদের জন্য সকালের খাবার বানিয়ে চলে যায়। আব্বা কাজ থেকে ছুটি নিয়েছে। মা চলে গেলে পর প্রথমে ঘর ঝাঁট দেয়। তারপর রান্না করতে বসে। রান্না হয়ে গেলে কাপড় কাচে। আব্বার অফিস ছুটি। কিন্তু ঘরের কাজে তার ফুরসত নেই। আর রুকু আব্বা-মার আড়ালে মাঠে চলে যায়। ঘুড়ি ওড়ায়। আচার কিনে খায়।

সকালবেলা জামালদা জানালার কাছে এসে চুপিচুপি বলে গিয়েছে, মাঞ্জা বানাবি?

– কোথায়?

– মাফুজদের ছাদে।

– ওর মা রাগ করবে না?

– ওর মাও তো আমাদের মায়ের সঙ্গে মাঠের জমায়েতে গিয়েছে।

দুপুরে রুকু মাফুজদের ছাদে গিয়ে দেখল ওখানে আরো অনেকেই রয়েছে। রহিম, আব্দুল, রাজা। ছাদের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে টানটান করে সুতো বাঁধা হয়েছে। মাফুজ আর জামাল কোথা থেকে খারাপ হয়ে যাওয়া টিউবলাইট নিয়ে এসেছে। হামানদিস্তায় সেই টিউবলাইটের কাঁচ গুড়ো করা হল। নরম ভাতের সঙ্গে সেই কাঁচগুড়ো মিশিয়ে কচুপাতায় মোড়া হল। রুকু সেই কচুপাতা সুতোর উপর চেপে ধরে ঘষতে থাকল। ভাতের সঙ্গে কাঁচ জাপ্টে গেল সুতোয়। কচুপাতার জন্য হাল্কা সবুজ রঙও হয়েছে।

রুকু বলল, এবার?

মাফুজ বলল, ব্যাস, রেডি তো। এবার রোদে শুকিয়ে গেলেই মাঞ্জা কমপ্লিট।

ফিরতে দেরি হয়ে গেছিল রুকুর। ফিরে দেখল আব্বা চলে এসেছে। আব্বা বেশ ক্লান্ত। জিজ্ঞেস করল, কোথায় গেছিলিস?

– ঐতো ওখানে। রুকু যা-হোক একটা উত্তর দিল।

আব্বা বলল, কাল দুপুরে কোথাও যাবি না কিন্তু। কাল আধার সেন্টারে যাব। তোর নামের বানানটা ঠিক করে নেব।

চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এলো রুকুর। সে কিছুতেই নামের বানানটা ঠিক করতে চায় না। দুইজন রুকু মিলেই তো সে তৈরি হয়েছে। একটিতে U-আছে, আরেকটিতে জোড়া O. কেন সে একজনকে বাদ দেবে?

একজন রুকু তাকে বলল, আব্বার কথা শোনো।

আরেকজন রুকু তাকে অন্যরকম মতলব দিল। 

সে ভাত খাবার আগে পেট ধরে চেঁচিয়ে উঠল। ছুটে এল আব্বা, কী হয়েছে।

রুকু কাঁদতে কাঁদতে বলল, খুব যন্ত্রণা।

– কী খেয়েছিলিস?

– তোমার সঙ্গেই তো সন্ধেবেলা টিফিন করলাম।

– বাইরে গিয়ে কিছু খেয়েছিলিস?

রুকু দু-দিকে মাথা নাড়ল। ঘরে হোমিওপ্যাথি ওষুধ রাখা ছিল। এই ওষুধগুলো খেতে মিষ্টি। রুকু খেয়ে নিল। কিন্তু পেট যন্ত্রণার অভিনয় করা ছাড়ল না। মা ফিরলে সে মাকে দেখিয়ে কাঁদল কতোক্ষণ। 

রুকু স্বপ্নে দেখল সারা আকাশ জুড়ে ঘুড়ি উড়ছে। জোরে হাওয়া দিচ্ছে। সে যেন নিজেই ঘুড়ির সঙ্গে উড়ে যাচ্ছে। বহুদূর উড়ে যাচ্ছে। তাদের ঘর, মাঠ, রাস্তা সব ছোটো হয়ে যাচ্ছে। সে উড়ছে। আরো উঁচুতে। তার নাগালের কাছে চাঁদটাও চলে এলো। সে চাঁদের মাটিতে পা রাখল। ওদিকে জামাল তার নাম ধরে ডাকছে। মা ডাকছে। তবু সে পিছু ফিরল না। চাঁদটা যেন নতুন দেশ। এখানকার মাটি রূপোর মতো সাদা। গাছগুলো থেকে আলো বেরচ্ছে। সে ছুটে গেল। দূরে একটা ঢিবির মতো জায়গা। সেইখানে বসে রয়েছে আর একটা রুকু। সেই রুকুটাও তার মতো ফ্রক পরেছে। চুলে হেয়ারব্যান্ড। সে হাত বাড়িয়ে বলল, আয়। কিন্তু রুকু অন্য রুকুর কাছে যেতে পারছে না। যতই সে অন্য রুকুর দিকে হাঁটছে, ততই সে পিছিয়ে যাচ্ছে।

ঘুমের মধ্যেই চেঁচিয়ে উঠল সে। 

কী হয়েছে?

রুকু চুপ।

যন্ত্রণা হচ্ছে?

রুকু দু-দিকে মাথা নাড়ল।

ভয়ের স্বপ্ন দেখেছিস?

না।

তবে?

চোখ থেকে টপটপ করে জল পড়তে থাকল রুকুর। মা তাকে জড়িয়ে ধরল। আব্বাও। রুকু দুইজনের মধ্যে থেকে কোনোরকমে বলতে পারল, আমি কাল যাব না। কিছুতেই যাব না। কিছুতেই নামের বানান পাল্টাবো না। আমার নামের দুটো বানানই থাকবে। আমি কিছুতেই যাব না।

– কিন্তু নামের বানান ঠিক না করলে ওরা যদি ঝামেলা করে?

– ওরা কারা?

– ওরা বাজে।

– আমি বাজে লোকের কথা শুনব না। তোমার মতো মাঠে বসে থাকব। সারাদিন বসে থাকব। তবু ওদের মতো বাজে লোকের কথা শুনব না। কিছুতেই শুনব না।

রুকু একজন জেদি মানুষ। আব্বা-মা ওর কথা না শোনা অব্ধি সে কান্না থামালোই না।

ছবি – চূর্ণী ভৌমিক

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *