দলিত প্যান্থার

১৯৭২। পুনের আকোলা জেলার ধাকালি গ্রাম। একজন দলিত মেয়েকে নগ্ন করে ঘোরানো হয়েছিল পুরো এলাকা। দুজন দলিত পুরুষের চোখ উপড়ে নেওয়া হয়েছিল। তার কিছু বছর আগেই ১৯৫৯-৬৪-এ দাদাসাহেব গায়েকয়াদের নেতৃত্বে মারাঠওয়াডা, খান্ডেশে তীব্র জমি আন্দোলন চলেছে। লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের দৌলতে নতুন ভাষা পাচ্ছে দলিত সাহিত্য, নতুন রাজনৈতিক ভাষা। ক্রোধের ভাষা, ক্ষোভের ভাষা। এই জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নামদেও ধাসাল, জেভি পাওয়ার, রাজা ঢালে, অরুণ কাম্বলে প্রমুখ আমেরিকার ব্ল্যাক প্যান্থার আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে স্থাপন করলেন দলিত প্যান্থার।

১৯৭৩ সালে প্রকাশিত হলো দলিত প্যান্থারের ম্যানিফেস্টো যা শুধু দলিত রাজনীতিকেই এক অন্য ভাষ্য দিল না, পাশাপাশিই শ্রেণি সংগ্রাম ও লিঙ্গ রাজনীতিকেও এক সূত্রে জুড়লো। ম্যানিফেস্টোতে  দলিতের সংজ্ঞা ঘোষিত হলো ‘তফসিলি জাত, তফসিলি উপজাতি, নব্য-বৌদ্ধ, শ্রমজীবী মানুষ, ভূমিহীন গরীব কৃষক, মেয়েরা ও সেই সমস্ত মানুষ যারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবে শোষিত হচ্ছেন, ধর্মের নামে শোষিত হচ্ছেন’। শ্রেণি ও জাত ব্যবস্থাকে ধবংস করার বিপ্লবী আহ্বান রেখে গড়ে উঠলো মেহনতি মানুষদের নজিরবিহীন সংগ্রামী ঐক্য।

কোনও গ্রামে দলিত নির্যাতনের খবর এলে সেখানে হাজারে হাজারে দলিত প্যান্থাররা পৌছে যেতেন। ভারতের স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী উদযাপনকে ‘কালা স্বাধীনতা’ বলে চিহ্নিত করে বয়কট করার আহ্বান দেয় দলিত প্যান্থার। মাতুঙ্গা লেবর ক্যাম্প, নাইগাও-দাদার, চেম্বুর, ঘাট-কোপার, সেউরি, পারেল, ওরলি সহ বিভিন্ন এলাকায় দলিত মানুষদের সংগঠিত করতে থাকেন তাঁরা। চ্যালেঞ্জ ছোঁড়েন শিবসেনাকেও। ১৯৭৪-এ ওরলি দাঙ্গা দমনের নামে শিবসেনা বাহিনী পুলিশকে সঙ্গ নিয়ে দলিত প্যান্থারের সদস্যদের উপর আক্রমণ নামায়। ১০ জানুয়ারি, ১৯৭৪-এ পারেল রেল স্টেশনের কাছে একটি মিছিলে এরকমই আক্রমণ নামিয়ে খুন করা হয় ভগওয়াত যাদবকে। ১৯৭৪-এ দলিত প্যান্থার থেকে মহারাষ্ট্রের বোম্বের বাই-ইলেকশন বয়কটের ডাক দেওয়া হয়। 

পরবর্তীকালে রাষ্ট্রীয় দমনের মুখে পরে আসতে আসতে ভাঙতে থাকে দল। নামদেও ধাসালের রাজনৈতিক অবস্থান পাল্টালে সেই ভাঙ্গন চূড়ান্ত হয়। তবু ক্ষণস্থায়ী হলেও আম্বেদকর, ফুলের মতাদর্শের সাথে মার্ক্সবাদ, লেনিনবাদের মেলবন্ধনে দলিত রাজনীতিকে এক নতুন বিপ্লবী আঙ্গিক দেয় এই আন্দোলন, বর্ণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগঠিত সংগ্রাম গড়ে তুলতে উঁচু জাতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ডিরেক্ট অ্যাকশনের স্লোগান তোলে। 

‘দলিত প্যান্থার’ ভেঙ্গে গেলেও যে মেহনতি মানুষের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের ডাক তারা দিয়েছিল তার রেশ থেকে গেছে উনা আন্দোলনে, ভিমা কোরেগাও দিবস উদযাপনে। তাই দলিত প্যান্থার বিলীন হয়ে গেলেও এই সংগঠন যে সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেই স্বপ্নকে সামনে রেখে আজও লড়াই জারি রয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, সেই স্বপ্নকে  মুছে দিতে তৎপর ফ্যাসিবাদীদের আজও কারারুদ্ধ করতে হয় সেইসব প্রতিরোধী স্বরকে যারা সংগ্রামী ঐক্যের কথা বলে, যারা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, যারা হিন্দু সামন্ততন্ত্রকে নগ্ন করে দেয়।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *