বেয়াদপ মেয়েছেলে 

আমেরিকান সাহিত্যিক রোক্সেন গে-র গল্প সংকলন Difficult Women-এর বাছাই অংশের অনুবাদ।

ছেনাল মাগি 

ছেনাল যাকে শ্রদ্ধা করে 

নিজের মাকে নয়। তাকে তো সে মেরে ফেলতে চাইছে, অন্তত মায়ের যে টুকরোগুলো (সে টের পায় ) তার চামড়ার নিচে লুকিয়ে রয়েছে। পা দুটো ফাঁক করতে করতে সে ভাবে – আশা করে বলা চলে – মায়ের সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়ছে এভাবেই। কত কি দেখেছে সে, ছেনালের মনে পড়ে। তার মা, বিবর্ণ, ভঙ্গুর, তার বাবার সামনে নত হয়ে থাকা। তার বাবার ভারী মাংসল শরীর, তেমনি ভারী দাবিদাওয়া। 

ছেনাল যেখানে থাকে 

তার মহল সাফসুতরো ঝকঝকে, বড় রাস্তার ওপরেই। এক পলক দেখে মনে হয় না কেউ থাকে, তবে নজর করলে ইশারা-ইঙ্গিত মেলে। এক জায়গায় সে বেশিদিন থাকে না, থাকার দরকার পড়ে না। বাবুরা এলে কামরার ভেতর তাদের  ভারিক্কি স্বরের প্রতিধ্বনি শোনা যায়।  সদর দরজা দিয়ে ঢুকেই একটা সাদাকালো ছবি চোখে পড়ে। কেউ কেউ বেরোনোর সময় থমকে দাঁড়ায়, ছবিটা ঠাহর করে দেখে।  নরম চাদর জড়িয়ে ছেনাল চুপ করে অপেক্ষা করে। একদিন এক বাবু জিজ্ঞেস করেছিল, “চমৎকার ছবিটা, কিন্তু এর মানে কি?” সে উত্তর দেয় না, কেবল হাসে। 

ছেনাল মাগিকে যেমন করে ছুঁতে হয় 

একটা ছেলেকে চিনত ছেনাল। দুজনেরই তখন তেইশ। তার অকপট স্বভাবটা ছেনালকে ধাঁধা লাগিয়ে দিত। এই সিধে আন্তরিক ভাবটা বিপজ্জনক, সেই বয়সেই জেনে গেছে ছেনাল। ছেলেটা ওকে মনের কথা বলত, ও কি চায় তা জানতে চাইত। কোমল অথচ দৃঢ় হাতে খুব নিশ্চিত অভিপ্রায়ে ওকে স্পর্শ করত। ছেলেটির শরীরের নিচে শুয়ে ছেনাল নিজেকে ধনুকের মতো বাঁকিয়ে নিত, তখন ওর শরীরজুড়ে তাপ। বড় বেশি জড়িয়ে পড়েছিল, ছেনাল ভরসা করে এগোতে পারেনি। ছেলেটাকে কষ্ট দিয়েছিল। চোখ বন্ধ করলে এখনো ও মনে করতে পারে সেই আঙ্গুলগুলোর ছোঁয়া, ওর শিরদাঁড়ার হাড়গুলো চিনে নিচ্ছে। 

বার-এ ছেনাল মাগির চালচলন 

‘স্মুদ’ হলো যাকে বলে আল্ট্রা লাউঞ্জ – চামড়ার সোফা, টিমটিমে আলো, গলাকাটা দামের মদ। স্পিকারে গাঁকগাঁক করে ইলেক্ট্রনিকা। ড্রেস কোডও আছে, বিশেষত পুরুষদের জন্য, তাই ওদের গায়ে দামি জ্যাকেট, কারুর কারুর গলায় টাই, চকচকে মশমশে জুতো, ওদের চুলের মতোই মসৃন। অনেকের পেশাদারি উপাধিও আছে – ইংরেজি “er” অক্ষরগুলো দিয়ে শেষ। ছেনাল মাঝে মাঝে যায়।  যাদের সঙ্গে যায় তারা বন্ধুস্থানীয়, কিন্তু ওর সম্বন্ধে তারা বিশেষ কিছু জানে না। বেছে বেছে ও এমন জায়গায় বসে যেখানে অন্যেরা ওকে বেশ ভালো করে দেখতে পাবে, যদিও কে দেখল তাতে ওর ছেঁড়া যায়। পা দুটো ভাঁজ করে। চোখের পলক ফেলতে ভুলে যায়। ওর উদ্দেশ্য: সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে ওঠা। 

ছেনাল মাগি আয়নায় যা দেখে 

কিচ্ছু না। আয়নার ধারেকাছে সে যায় না। কি দরকার? নিজেকে ও খুব ভালো করে জানে। 

শীতল মেয়েছেলে 

এমনটা হলো কি করে?

তখন শীতলের ক্লাস টু। স্কুল থেকে ফেরার পথে হাঁটুটা ছড়ে গেল। ও পরেছে চেককাটা উলের স্কার্ট, মেরি জেন জুতো। রান্নাঘরের কাউন্টারে বসিয়ে শীতলের মা ক্ষতে ওষুধ লাগিয়ে দিচ্ছে। জায়গাটা পরিষ্কার রাখা দরকার। শীতলের ইচ্ছে করছিল ওখানে আঙ্গুল রাখে, নতুন ঘায়ে খোঁচা মারে। নিজেকে কতটা আঘাত করা যায়? কতটা যন্ত্রনা সহ্য করা যায় …? 

যারা শীতলকে ঘিরে রাখে 

শীতলের স্বামী-সন্তান আছে, ভালোওবাসে তাদের। অবশ্য তারা প্রায়ই ওর ওপর হামলা চালায়, বলে শীতল নাকি বড্ড উদাসীন, একেবারে ঠান্ডা। দু’ পক্ষের যুদ্ধ জারি থাকে। শীতলের রাগ হয়, তবে মুখে কিছু বলে না। ঠোঁটে নিস্তেজ হাসি। রাতে স্বামী ওর কাছে ঘেঁষলে ও পাশ ফিরে শোয়, ঠেলে সরিয়ে দিতে গিয়ে শীতলের নখ বসে যায় তার কব্জিতে। ওর স্বামী ভুল বোঝে। ইয়ার বন্ধুদের সাথে গল্ফ খেলতে গিয়ে, কি বিয়ার-সিগারেট খেতে খেতে (বাড়িতে সে এই আড্ডাগুলোর গন্ধ নিয়ে ফিরবে) বলে, আমার বউ দেয় না, ভিজে ন্যাকড়া, মাইরি বলছি। তবে পরকীয়ার ধার ধরেনি শীতলের স্বামী। ব্যস্ত মানুষ। বাচ্চাটাকে সময় দেয়। তবে হাঁ, স্ট্রীপক্লাবে যায় মাঝেমধ্যে (এবং সেখানকার যাবতীয় গন্ধ বাড়ি নিয়ে আসে)। শীতল চুপ করে শুয়ে থাকে, বুকে জ্বালা। নিশ্বাস নিতেও ভুলে যায়। 

 শীতল যা পরে 

ভোর পাঁচটায় ঘুম ভাঙে শীতলের।  তারপর দৌড়। ছুটতে ছুটতে এক একসময় মনে হয় বুঝি শরীরটা ভেঙেচুরে যাবে। সবাই বলে ম্যারাথন দৌড়োতে, কিন্তু শীতল গা করে না। বুকে একটা নম্বর ঝুলিয়ে কি হবে? ওরা থাকে শহরের বাইরে, যত খুশি দৌড়ও। ও ২৬ মাইলের বেশি টানতে পারে। যা ইচ্ছা করতে পারে। দৌড়োয়, কারণ সেটা ওর ভালো লাগে। ওর নিজের শরীর, ওর শরীরের জোর-সহনশক্তিকে ও ভালোবাসে। এই শরীরের জন্যই শীতল বেঁচে গেছে। ইচ্ছে করেই ও আঁটসাঁট পোশাক পরে, যাতে ওর পায়ের দৃঢ়তা, দেহের সুন্দর বাঁক, ওর মসৃন পেট আরও প্রকট হয়ে ওঠে। লোকে তাকালে শীতল দৌড়ের কথা ভাবে। একদিন ও যেতে যেতে আর থামবে না। 

শীতলের মা মারা যাওয়ার পর যা ঘটল 

ওর পেটে তখন বাচ্চা, যেকোনো দিন প্রসব, ফোলা শরীর নিজের কাছেই অচেনা। একটা ফোন এলো।  কথা শেষ হওয়ার পর শীতল চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো, কানে ডায়াল টোন। রান্নাঘরের সিঙ্কে গরম জল ঝরছে। অলসভাবে একবার ভাবলো, কলটা বন্ধ না করলে জল পড়েই যাবে। গাড়ি চালিয়ে হাসপাতাল, স্টিয়ারিংয়ে ওর পেট ঠেকে। কি অস্বস্তি। বরকে ফোন করল, ধরলো না। ওর মায়ের ঠান্ডা, শক্ত শরীর একটা নীল চাদরে ঢাকা। শীতল মায়ের পাশে শুয়ে পড়লো। পেট ঠেকছে নিষ্প্রাণ শরীরে। আত্মীয়স্বজন এলো, ওদের ঘিরে ধরলো।  শীতল মাকে ছাড়লো না। 

রাত হলে শীতল যেখানে যায় 

গোপনীয়তার জায়গায়। ওর সব গোপন কথা ওর গলা টিপে ধরে। শীতল নিভৃতে অপেক্ষা করে। 

পাগলী

পাগলীকে যে কারণে ভুল বোঝা 

তিন-তিনবার মুলাকাত, তারপর ছেলেটার বাড়ি। শোয়া। মনে রাখার মতো কিছু না, কিন্তু শরীরকে ভুলিয়ে রাখার পক্ষে যথেষ্ট। পরদিন সকালে রেস্তোরায় ব্রেকফাস্ট। পাগলী মাখন-সিরাপ মাখা প্যানকেক খাচ্ছে, ওর সঙ্গী নিয়েছে স্ক্র্যাম্বল্ড এগ। “তুমি এভাবে খাও! দুর্দান্ত লাগছে, ওহ তুমি আশ্চর্য!” পাগলী হাসলো, মেপলের গন্ধ ওর নাকে। ঘরে ফেরার আগে আবার চুমু, গাঢ়, তীব্র। বেশ কিছুক্ষন পর পাগলীর মনে পড়ল ও নিজের ব্রিফকেস ফেলে এসেছে ছেলেটির ফ্ল্যাটে। ফোনে তাকে ধরা গেল না, অথচ ওর জরুরি কাগজপত্র, একটা আইপ্যাড রয়েছে সেখানে। বেশ কবর ফোন করল পাগলী, ছেলেটির দিক থেকে উত্তর নেই। সেই সময় সে তার ইয়ারকে বলছে, “এই পাগলী কুত্তিটা ফোন করেই চলেছে!” শেষমেশ পাগলীকে ছেলেটির বাড়ি যেতে হলো। দরজা খুলে সে বললো, “জানি, আমি সুখ দিতে জানি।” পাগলী চোখ ঘুরিয়ে বলল, “অতটাও না।” বলে ব্রিফকেসের দিকে আঙুল। ছেলেটার মুখ লাল। পাগলী আর কথা বাড়াল না, ব্রিফকেস তুলে নিয়ে কোনোদিকে না তাকিয়ে বেরিয়ে গেল। 

থেরাপিতে পাগলীর বক্তব্য 

মনোবিদ ভদ্রলোকের অফিসটা ছোট, এতো ছোট যে সেখানে বেশিক্ষন আটকে থাকলে মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। দুজনে মুখোমুখি কাউচে বসে, হাঁটুতে হাঁটুতে ঠেকে যাওয়ার অবস্থা। মাঝে মাঝে পাগলীর ইচ্ছে করে পালিয়েই যাবে, কিন্তু থাকতে হয়। কথা বলার লোকের বড় দরকার ওর। এমন কেউ যে শুনবে, বুঝবে। থেরাপিস্টের কাছে ওর এই প্রথম আসা নয়, আগেও কয়েকজনের কাছে গেছে। একজন বলেছিল ওকে দেখতে ভালো, যাবতীয় সমস্যা ওর মাথার ভিতর ও নিজেই পাকাচ্ছে। আরেকজন বিয়ে করার উপদেশ দিয়েছিলো। পাগলী ভাবছে, আজকের এই মনোবিদের সঙ্গেও ওর ঠিক জমলো না। কথাবার্তা শেষ হলে ভদ্রলোক পাগলীকে কিছু কাগজপত্র দিলেন। ও দেখল, মোটামুটিভাবে নিজের যত্ন নিতে যা যা করতে হয়, তারই একটা ফর্দ। পাশে দাগ দেয়ার খোপ কাটা আছে। কি আশ্চর্য ! আ্যপয়েন্টমেন্টের গোড়াতেই ও পরিষ্কার বলেছিলো যে অনুমোদন-স্বীকৃতিভিত্তিক থেরাপিতে ওর বিশ্বাস নেই। দ্বিতীয়দিন ভদ্রলোক কাগজগুলো দেখে যেন অবাক হলেন। প্রত্যেকটা খোপে পাগলী ১ সংখ্যাটা লিখেছে। পাগলী দেখলো, লোকটা ঝুকে পড়েছে ওর দিকে, চুলের ফাঁক দিয়ে মাথার শুকনো ত্বক দেখা যাচ্ছে। “আপনার কখনোই মনে হয় না নিয়মমতো খাওয়াদাওয়া করা উচিত?” ভ্রু তুলে লোকটা পাগলীর দিকে তাকিয়ে। পাগলী চোখ সরালো না। 

রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে পাগলী যা ভাবে 

খুব বেশি আস্তে বা জোরে সে হাঁটে না, যাতে কারুর চোখ না টানে। ভেসে আসা শীষ, নোংরা টিটকিরিগুলো ও গায়ে মাখে না। মাঝেমধ্যে অবশ্য পাগলী ভুলে যায় দুনিয়াটা এরকম, পরে ফেলে হাতকাটা টপ, ছোট স্কার্ট (বাইরে যে গরম, ও শরীরজুড়ে বাতাস চাইছে)। তবে আপশোস করতে দেরি হয় না। পাগলী হাতে চাবির গোছাটা রাখে, আঙুলের ফাঁকে তিন-তিনটে চাবি দিয়ে একটা ভোঁতা নখর। খুব প্রয়োজন ছাড়া পাগলী কোনো পুরুষের চোখের দিকে তাকায় না, দৈবাৎ চোখাচোখি হলে চোয়াল শক্ত করে। কখনো কখনো পাগলীর অফিস (অথবা বার) থেকে বেরোতে দেরি হয়। সেসব রাতে ও ট্যাক্সি ডেকে নেয়। গাড়ি থেকে নেমে সামান্য যেটুকু রাস্তা পেরিয়ে ওকে বাড়ি ঢুকতে হয়, সেই অন্ধকারের ফালিটাকে দেখে নেয় বারবার। হামেশা সতর্কতা জারি। পাগলী একবার এক পুরুষ বন্ধুকে এই সাবধানতার আচার-আচরণের ব্যাপারটা বোঝাতে চেষ্টা করেছিল। সে শুধু বললো, “তোমার মাথা খারাপ।” অফিসের একটি নতুন মেয়েকে বলতে সে বললো, “তুই পাগল না, তুই মেয়েছেলে। “

পাগলী যা খায় 

ক্রীম-মাখন-নুনের স্বাদ আর মনে পড়ে না পাগলীর। ওর রান্নাঘরের একটা তাকে বেশ কিছু রেসিপির বই সাজানো – “লাইট ইটিং রাইট”, “নতুন রকম কেল-এর রান্না”, “থিন ইটস” আর একটা পুরোনো, ছেঁড়াখোঁড়া “আর্ট অফ ফ্রেঞ্চ কুকিং”। শেষের বইটা কালেভদ্রে খোলা হয়, যখন পাগলীর খিদে চরমে ওঠে, যেসব সময়ে ভেলুয়েট কি বুইয়াবেসের বিশদ বর্ণনা ছাড়া কিছুই ওকে তৃপ্তি দিতে পারেনা। রবিবার করে ও বইগুলো নিয়ে বসে, সারা সপ্তাহে যা খাবে তার একটা লিস্ট করে রাখে। বিরক্ত লাগে, তবু করে। পাগলীর স্টোভের পাশেই একটা ছোট্ট দাঁড়িপাল্লা। আগে ওজন না করে ও কিছু মুখে দেয় না। পাগলী জানে পরিমাপ গুরুত্বপূর্ণ। 

পাগলী যখন ভাঙে 

ও দিনের কাজ গুছিয়ে আনছে। বেশ একটু শব্দ করে ওর বস ওর কেবিনে ঢুকলো। ওর টেবিলের একধারে বসেছে। খুব কাছে, অতিরিক্ত কাছেই বলা যায়। অনেকটা জায়গা নিয়ে বসে নিজেকে ঘোষণা করছে লোকটা। পাগলীর বুক দেখছে। বেপরোয়া। লোভ লুকোনোর চেষ্টা নেই ছিটেফোঁটাও। কি যেন হয়ে যাচ্ছে পাগলীর মাথায়। কখন ধারাল কাগজকাটা ছুরি তুলে নিয়েছে। ওর ঠান্ডা স্থির হাতে ছুরিটা।  

মা 

সন্তানের মুখে মা যা দেখে 

জন্মের মুহূর্তেই ও দেখে নিয়েছিল ওর ছেলে অবিকল বাবার মতো দেখতে। ওর মা ছেলে কোলে নিয়ে বলল, “বাপের ব্যাটা!” শেষমেশ যখন একা হতে পারল বাচ্চাটাকে বুকের কাছে নিয়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজলো – কোথাও ওর ছাপ আছে কি? ন’ মাস যে ছেলেকে নিজের শরীরে বয়েছে, যার জন্য বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেনি, যে ওকে ছিঁড়েখুঁড়ে এই দুনিয়ায় এসেছে, তার মুখে ওর সঙ্গে লেশমাত্র মিল নেই? নেই। 

ছেলের স্কুলের অন্য বাচ্চাদের মায়েদের ও যা বলে 

মাসে একটা বুধবার ওকে ওর ছেলের ক্লাসের সব বাচ্চাদের জন্য স্ন্যাক্স নিয়ে যেতে হয়। এছাড়া হাতে হাতে সাহায্য করা। ওর বরও প্রতি বৃহস্পতিবার বাচ্চাগুলোর দেখাশোনা করে। এই কাজটা করতে হয় বলে ওর অফিসের কাজ জমে ওঠে, রাত জেগে শেষ করতে হয়। অফিসের মাথাব্যথা নেই, ‘ফ্লেক্সিটাইম’-এর ব্যবস্থা তো এইজন্যই। মনে মনে ও বলে, ফ্লেক্সি নয়, স্ট্রেচ টাইম। সত্যি, মা হওয়ার পর ও নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে চলেছে। তারপর এই স্ন্যাকসের ব্যাপার। ও ভেবে পায় না বাচ্চাদের কি ভালো লাগবে। একবার বিস্কুট-পিনাট বাটারের ব্যবস্থা করেছিল। আরেকটি বাচ্চার মা বললো বাদামে নাকি অনেকের এলার্জি থাকে। পরের ক’মাস  ও কমলালেবুর টুকরোর ব্যবস্থা করল। তাতে এক নতুন ফ্যাসাদ। বাচ্চারা নাকি এক খাবার বারবার পছন্দ করে না, একটু বৈচিত্র না হলে ওদের চলে? ও বলে ফেলল, “কেন, বাকি সপ্তাহে বৈচিত্র হচ্ছে না বুঝি?” ক’দিন পর খবর পেল, ওর ছেলের স্কুলে ওকে আর লাগবে না। বুধবার এল। বাচ্চাদের দেখাশোনা করার দায়ভার থেকে ও মুক্ত। অফিসে বসে ভাবছে, এবারটা ও বেঁচে গেল। 

ছেলেকে বড় করা নিয়ে ও যা ভাবে 

প্রেগন্যান্সির সময়টা ও নিশ্চিত ছিল ওর মেয়ে হবে। ও তৈরী ছিল মেয়েকে ভালোবাসতে। মা-মেয়ের জীবন একছাঁচেই তো গড়া। ডাক্তার যখন ওর সদ্যজাত ছেলেকে ওর বুকে দিলেন ও একটা প্রকান্ড ধাক্কা খেল। মুখে কথা নেই। দেখল, বাচ্চাটা বেশ মোটাসোটা। ওই ছোট্ট দেহের চর্বির ফাঁকে ফাঁকে ও যত্ন করে পাউডার লাগিয়ে দিত। কি সুন্দর গন্ধ ওর ছেলের গায়ে। কব্জির কাছেও নরম ভাঁজ। বারবার চুমু খেত সেখানে। কবে যেন অজান্তে ও ছেলেকে ভালোবেসে ফেলেছে। ওর বর আবার সেটা পছন্দ করত না, বলত এত আদরে ছেলের আর মর্দানি বলে কিছু থাকবে না। ও পাত্তাই দিত না। কতবার দেখেছে, ডায়পার পাল্টাতে কি ঘুম পাড়াতে গিয়ে ছেলের বাবা ছেলেকে আদরে ভরিয়ে দিচ্ছে।  

আবার যখন ওর পেটে বাচ্চা এলো 

ওদের অফিসের কাছের বারে বেশ ভালো মার্টিনি বানায়, জিন দিয়ে, মার্টিনি ঠিক যেমন হওয়া উচিত। একদিন কাজকর্ম শেষে সেখানে গেল। গা গুলিয়ে উঠছে ওর, মেজাজ খারাপ। একাই সন্ধ্যেটা কাটিয়ে দিল। একটার পর একটা মার্টিনি গিলছে। উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই।  বরকে ফোন করতে এসে বাড়ি নিয়ে গেল। কোনোরকমে সিঁড়ি ভেঙে ওঠা।  ওর বর ওর জামাকাপড় ছাড়িয়ে দিচ্ছে, জল-এসপিরিন দিয়েছে। ওকে বুকে জড়িয়ে ধরেছে, কিন্তু কি হয়েছে তা বুঝে উঠতে পারছে না। স্বগতোক্তির মত ও বলে চলেছে, “আর না, আর আমি পারবো না।” ওর বর বিভ্রান্ত।  বুঝতে চাইছে, কিন্তু পারছে না। 

মা যেভাবে ভালোবাসতে পারে 

মা-ছেলে একসাথে ডকুমেন্টারি দেখে, বিশেষ করে জন্তু জানোয়ারদের ছবি। বন্য পশু-মায়েরা বাচ্চাদের আগলে রাখে, প্রয়োজনে শানিত দাঁতনখ বের করে। ও ভাবে, ছেলেকে ঠিক এইভাবে ও ভালোবাসে না। মানুষ কি আর জানোয়ারদের মত খাঁটি হতে পারে? 

মরা মেয়ে 

মরা মেয়ে জবর। মরলে আরও সুন্দর। খোলা চোখ, নীলচে ঠোঁট, ঠান্ডা শক্ত হাতপায়ে শেষ একবার নিজেদের জাহির করে মরা মেয়েগুলো। এবার সব শান্ত নিশ্চুপ। শান্তি ! 

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published.