গৃহশ্রমিকদের রোজনামচা, গৃহশ্রমিকদের লড়াই

শহরের কোন এক ফ্ল্যাটবাড়িতে সাতসকালে একজন মেয়ে এসে পৌঁছলো। কলিং বেলের শব্দে দরজা খুলে দিল গৃহকর্ত্রী। মেয়েটি নিঃশব্দে ঢোকে এবং তারপর একে একে সেরে ফেলে সিঙ্কে নামানো বাসি এঁটো বাসন মাজা, ঘর ঝাঁট দেওয়া মোছা, ময়লা জামাকাপড় কাচা, কখনও বা রান্নাবান্না করা টিফিন বানানো এইসব; যে কাজগুলোর সাথে ওতপ্রোত জুড়ে থাকে কিছু মানুষের ‘ভালো’ বা ‘সুস্থ’ থাকা, অর্থাৎ সময়মতো পরিষ্কার জামা পরা, পরিচ্ছন্ন ঘরে থাকা, খাবার খাওয়া ইত্যাদি। নয়ের দশকের পর থেকেই এই চিত্র আমাদের কাছে খুবই পরিচিত। অথচ এইসব অপরিহার্য কাজগুলো যাঁরা করেন, যাঁরা এই শহরের এই ফ্ল্যাটবাড়িগুলোর-ম্যানসনগুলোর, এই হাইরাইজের মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত মানুষগুলোর রোজনামচার সাথে প্রবলভাবে জড়িত তাঁদের রোজনামচার খবর আমরা ক’জন রাখি? ক’জন খবর রাখি তাঁদের সুবিধা অসুবিধার? গত এক বছরে করোনা অতিমারিতে যে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এই মানুষগুলোর জীবনে, তার কতটুকু সুরাহা হল এ বছর? এইসব প্রশ্নের উত্তরগুলো আজও অজানাই রয়ে গেছে বহু বহু মানুষের কাছেই।

কাক ডাকা ভোরে উঠে বাড়ির এটা সেটা কাজ আর রান্নাবান্না সেরে দুটো নাকে মুখে গুঁজে আর বাকিটা টিফিন কৌটোয় পুরে বেরিয়ে পড়েন এই মেয়েরা। তারপর হয়তো খানিক হেঁটে বা ভ্যানে করে গিয়ে কয়েক মাইল দূরের কোন রেলস্টেশন থেকে শহর কলকাতায় পৌঁছে যাওয়া। দক্ষিণ কলকাতায় গড়িয়া, বাঘাযতীন, যাদবপুর, পার্কসার্কাস কিংবা উত্তর কলকাতার বেলঘরিয়া, দমদম, উল্টোডাঙা স্টেশনগুলো সেই সাতসকালে ঠেলাঠেলি ভিড় হয়ে ওঠে একদল কাজের মেয়েদের। আর যারা শহরের প্রান্তের বস্তিতে থাকেন তারা শুধু ট্রেন ধরাটুকু বাদে বাকিটা এক রুটিনেই সব কাজ সেরে পৌঁছে যান অন্যের বাড়িতে অন্যের বাড়ির কাজ গুছোতে। তারপর সারাদিন সেই একই কাজ করেন যে কাজের কোন দাম নেই, মান নেই, নেই কোন পরিচিতিও। গৃহশ্রম আজও মেয়েদের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক মজুরিবিহীন শ্রম বলেই, এই কাজ যাঁরা করেন তাঁরা ঠিক শ্রমদানকারী ‘শ্রমিক’-এর মর্যাদাটুকুও পান না। সংবিধানের পরিভাষায় একটি শ্রমিকের সংজ্ঞা অনুসারে অন্তত প্রত্যহ চার ঘন্টা যে মানুষ কোন রকম সামাজিক উৎপাদনমূলক কাজের সাথে যুক্ত থাকবে সেইই শ্রমিক বলে গণ্য হওয়ার কথা। সেই হিসেবে ধরলে এই গৃহশ্রমের পেশার সাথে যুক্ত মেয়েরা তাদের দৈনিক জীবনে অন্তত ১২ থেকে ১৬ ঘন্টা পর্যন্ত শ্রম দিয়ে থাকেন। এর মধ্যে নিজের পরিবারের জন্য ব্যয় করা সময়ও ধরা আছে। কিন্তু তবুও শ্রমিক পরিচয় জুটলো না কেন? 

আসলে ‘গৃহ’ও যে সামাজিক শ্রমের ক্ষেত্র এবং বাড়ির কাজও যে সামাজিক শ্রম এই বোধটিই আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়নি আজ পর্যন্ত। একটি পরিবার সুস্থভাবে টিকে থাকতে পারে না যদি না দিনের মধ্যে যৌথতার প্রয়োজনের কাজগুলি, যেমন ঘর পরিষ্কার, খাবার বানানো, বাসন মাজা, জামাকাপড় পরিষ্কার, বাচ্চা দেখা, অসুস্থ রুগীর সেবা করা, বয়স্কদের দেখাশুনা করা ইত্যাদি আরও নানাবিধ কাজ সম্পাদিত হয়। তাই এই কাজগুলি পরিবারের অন্য সদস্যদের সামাজিক উপার্জনের সহায়ক পুনরুৎপাদনমূলক শক্তি সরবরাহ করে। প্রত্যক্ষ না হলেও তাই এই গৃহশ্রমের ‘সামাজিক শ্রম’ হিসেবে গুরুত্ব কিন্তু অপরিসীম। পরিসংখ্যান বলছে ভারতে এই মুহূর্তে প্রায় তিন কোটি মহিলা যুক্ত আছেন এই পেশার সাথে এবং বলাই বাহুল্য শ্রমিকের স্বীকৃতি ব্যতিরেকেই। যদিও ভারতবর্ষে সম্পূর্ণ অসংগঠিত ভাবে চলা এই ক্ষেত্রটিতে নিযুক্ত মানুষের সংখ্যা নিয়ে সরকারি বেসরকারি স্তরে মতপার্থক্য রয়েছে। ২০১১ সালের  NSSO এর ৬৬ রাউন্ডের রিপোর্টে যেখানে মোট শ্রমিক সংখ্যার ০.৮% মানুষ গৃহ পরিষেবার কাজে (গৃহ পরিচারিকা, রাঁধুনি, বাড়ীর দারোয়ান ইত্যাদি) যুক্ত বলে দাবী করা হয়েছে সেখানে শ্রম ও কর্মনিযুক্তি দফতরের ২০১০ সালের রিপোর্টে সেই সংখ্যাটা বলা হয়েছে ২.৭%। সম্পত্তি-সম্পর্ক ভিত্তিক পরিবার ব্যবস্থাকে টিঁকিয়ে রাখার অন্যতম প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করেছে যে লিঙ্গভিত্তিক শ্রমবিভাজন, পরিবার ব্যবস্থা এবং সেই লিঙ্গভিত্তিক শ্রমবিভাজন উভয়কেই আমাদের সমাজে নতুন করে নতুন ভাবে অক্সিজেন যোগাচ্ছে এই নারী গৃহশ্রমিকরা। 

বিগত ত্রিশ বছর ধরে নয়া উদারবাদের অর্থনীতির হাত ধরে আমাদের দেশে ক্রমশ বেড়ে চলেছে গৃহ পরিষেবার এই নতুন পণ্য পরিসরটি; যেখানে কর্মরত মেয়েদের না আছে তথাকথিত পুঁজি বা রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত শ্রমিকের মর্যাদা-সুবিধা, না আছে সামন্ততান্ত্রিক মুল্যবোধে আধারিত পুরানো গৃহস্থালির ‘পুরাতন ভৃত্যের’ প্রাপ্ত সুরক্ষা-সহচর্য। ফলে আজকের দিনে শ্রমিকের প্রাপ্য অধিকার বুঝে নিতে প্রয়োজন গৃহশ্রমিকদের নিজস্ব সংগঠন গড়ে তোলার। অথচ শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে বিশেষত ভারতবর্ষে সাধারণ ভাবে নারীশ্রমিকদের সংগঠিত করার উদ্যোগ খুবই অপর্যাপ্ত থেকেছে। যেহেতু গৃহশ্রমের পরিসরে নিযুক্ত অধিকাংশ শ্রমিকই নারী (প্রায় ৯০%), তাই আলাদা করে নারী শ্রমিকদের সংগঠিত করার প্রশ্নটিকে সামনে আনার প্রয়োজন। গৃহশ্রমিকদের সংগঠিত করার নানা উদ্যোগ ১৯৮০-১৯৯০ দশকে শুরু হলেও আনুষ্ঠানিক ভাবে বিভিন্ন রাজ্যে কার্যকরী ইউনিয়ন বা সংগঠন গড়ার কাজ শুরু হয় ২০০০ সালের পর থেকে।

শ্রমিকের স্বীকৃতি আসলে শ্রমিকের অধিকার বুঝে নেওয়ার প্রথম ধাপ। যারা শ্রমিক বলেই পরিচিত নন, তাদের কাজের ক্ষেত্রে যে স্বাধিকারের জায়গা কতটুকু হবে সেটা বোঝাই যায়। এই গৃহশ্রমের নির্দিষ্ট কোন মজুরিই নেই। যে যার দর কষার ক্ষমতার উপরে মাইনে পান। সেখানেও থেকে যায় প্রভূত সমস্যা। বাইরের গ্রামগুলিতে যেখানে জীবনযাত্রা একটু কম টাকাতেও চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়, স্বভাবতই সেখান থেকে আসা মেয়েরা যে কাজটা হাজার টাকার নীচে করতে রাজি হয়ে যান, শহরতলির মেয়েরা সেটা করতে রাজি হতে পারে না এবং মজুরির নির্দিষ্টকরণ নেই বলে দারিদ্র্যের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে কম টাকায় খাটিয়ে নেওয়ার রাস্তা খোলা থাকে মালিকেরও। আর এই রেষারেষিতে পরিচারিকাদের নিজেদের মধ্যেই গণ্ডগোল বেঁধে যায়। বাইরে থেকে কাজ করতে আসা মেয়েদের অনেক সময়ে নিজেদের এলাকায় কাজে ঢুকতে দেন না শহরতলির মেয়েরা। অথচ যদি ভেবে দেখা যায় সমস্যা অনেক গভীরে। গৃহশ্রমে মজুরি ঠিক করলে এই পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত নড়ে যেতে পারে। কারণ পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উদ্বৃত্ত মূল্যই আসলে সেই গৃহশ্রমের মূল্য যা কোন শ্রমিক পান না, পান পুঁজিব্যবস্থার ওপরের তলার লোক। এখন এই কারণেও এই কাজের ক্ষেত্রে মালিক শ্রমিক সহজ সম্পর্ক জটিল আকার ধারণ করেছে। যে মধ্যবিত্ত বাড়িটি গৃহশ্রমিকের কর্মক্ষেত্র, সেই বাড়ির গৃহকর্তা অন্য কোথাও নিজের শ্রম দেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গৃহকর্ত্রীটিও দেন। তাঁদেরকে প্রদেয় শ্রমমূল্যেই আসলে বাদ থেকে যায় গৃহশ্রমের মূল্য। তাই তাঁরাও পারেন না সঠিক মূল্য দিয়ে প্রয়োজনীয় গৃহস্থ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে, তাঁদেরও অনেক কম মানের বেতন দিতে হয় পরিচারিকাদের। অথচ কাজটি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে সেটি না হলে কোন পরিবার টিঁকেই উঠতে পারবে না। 

আবার বর্তমান পরিস্থিতি এই অবস্থাটিকে আরওই কঠিন জায়গাতে ঠেলে দিয়েছে। বিভিন্ন এলাকাতে, বিভিন্ন দরকষাকষির ফলে যতটুকু বা মজুরি নিজেরা ঠিক করে নিতে পারছিলেন শ্রমিকরা, গত একবছরে লকডাউনের প্রভাবে সেই সবই আবার হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে। একদিকে ট্রেন-বাস- যোগাযোগব্যবস্থা অচল হওয়ায় মেয়েদের কাজের জায়গাতে যাওয়া বন্ধ হয়েছে, অন্যদিকে কাজের বাড়ির তুলনায় কর্মহীন শ্রমিকের সংখ্যা এতটাই বেড়ে গেছে যে কাজের মূল্যও অনেক কমে গেছে। লকডাউনে যারা কাজে আসতে পারেননি তারা প্রথম এক দু মাস কাজের বাড়ি থেকে সহায়তা পেলেও বাকি সময়টা পাননি। দীর্ঘ লকডাউনে সেই কাজগুলিও চলে যায়। বহু কষ্টে এবছর জানুয়ারি মাসের দিকে কিছু কাজ সকলে পেলেও তাঁরা দেখেন মাইনে আগের তুলনায় অর্ধেক হয়ে গেছে প্রায়। ফলে এই গোটা সময়ে তাদের স্বল্প যা সঞ্চয় ছিল তাও শেষ হয়ে কপর্দক শূন্য অবস্থায় পুরোপুরি সরকারি রেশন সহ অন্যান্য সুবিধার ভরসায় দিন গুজরান করতে হয়েছে। তাই এই মুহূর্তে কাজের সুরক্ষা না থাকাতে, ন্যূনতম মজুরি পাওয়ার যে অধিকারের লড়াই ছিল গৃহশ্রমিকদের এতদিনকার আন্দোলনের মূল দাবী, সেখান থেকেও পিছু হঠতে হচ্ছে তাঁদের। 

এই পেশায় শ্রমের মজুরি ঠিক করা যেমন প্রধান অসুবিধে, সেরকমই আরেক অসুবিধে হল সঠিক বিশ্রাম বা অবসরের অভাব। অনেক জায়গাতে সবেতন মাসিক চারটে ছুটি বরাদ্দ হলেও বেশীরভাগ জায়গাতেই আজও এই নিয়ম লাগু করা সম্ভব হয়নি। অনেক সময় পারিবারিক প্রয়োজন বা অসুস্থতার কারণে এই ছুটির অতিরিক্ত ছুটি নিয়ে ফেললে মাইনে কাটা যায় এমনকি কাজটিও হারাতে হয় গৃহশ্রমিকটিকে। আবার ফিরে আসে লকডাউনের প্রসঙ্গ। প্রথম অতিমারীর ঢেউতে কাজে না আসার জন্য কাজ চলে গিয়েছিল প্রায় সবার। তারপর কাজ চালু হলেও এই মুহূর্তে মার্চ এপ্রিল জুড়ে যেভাবে করোনার প্রকোপ বাড়ছে তাতে আবার কাজ হারানোর ভয় পাচ্ছেন তাঁরা। গৃহশ্রমিকরা যেহেতু সরাসরি বাড়ির কাজে নিযুক্ত থাকেন, আবারও সবার প্রথম কোপ পড়ছে তাঁদের কর্মক্ষেত্রে। অনেক জায়গাতে গত বছরের মত কাজ থেকে ছুটি দিচ্ছেন না মালিকপক্ষ, ফলে নিজের থেকে ছুটি নিতে হচ্ছে, এতে মাইনে পাওয়ার নিশ্চয়তা আর থাকছে না। এর জন্যই বেশ কিছুজন নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েই কাজ করে যাচ্ছেন, এমনকি কাজের বাড়িতে করোনা হলেও কাজ ছাড়তে বা ছুটি নিতে পারছেন না নিজেদের অর্থনৈতিক পরিণতির কথা ভেবে। পরিসংখ্যান বলছে গতবছর লকডাউন থেকে এবছর এপ্রিল মাসের মধ্যে ভারতে মোট শ্রমিকদের ১৩.৯ শতাংশ কাজ হারিয়েছেন।1 এই কর্মহীন শ্রমিকের মধ্যে মহিলা শ্রমিক রয়েছেন ৪৯ শতাংশ। এমনিতেই মহিলা শ্রমিকের সংখ্যা মোট শ্রমিকের সংখ্যার ২০.৫ শতাংশ, ফলে এই সংখ্যাটা এক ধাক্কায় ৪৯ শতাংশ কমে যাওয়ার অর্থ প্রায় অর্ধেক হয়ে যাওয়া। কাজের নিরাপত্তার এই অভাব সর্বক্ষণের সঙ্গী হয়ে থাকে এই শ্রমিকদের। এই নিরাপত্তাহীনতা কখনও শ্রমিক হিসেবে প্রাপ্য অধিকার না থাকার জন্য আবার কখনও শুধু ‘নারী’ শ্রমিক হওয়ার জন্যেও পিছু করে তাদের। কর্মক্ষেত্রটি একটি ‘পরিবার’ হওয়ার কারণেই সমাজের অন্যান্য বৈষম্য মাথাচাড়া দিয়ে ঢুকে পড়ে সেখানে।

শ্রেণিবৈষম্য তো আছেই, তার সাথে আছে জাতপাত ধর্মের ভেদ। মেয়ে বলে বেশি করে হেনস্থার অভিযোগ ভুরি ভুরি। অনেক বাড়িতে আজও বেসিনের তলায় বা তাকের একটু নিচের দিকে আলাদা কাপ, আলাদা প্লেট রাখা থাকে চা জলখাবারের। যাদের ছোঁয়া দিয়ে সাংসারিক সব কাজ চলছে, তাদের ছোঁয়াতেই থাকে আপত্তি। সামাজিক মর্যাদাহানির আরও অনেক রূপ প্রকট হয়ে ওঠে সময়ে সময়ে। যেমন চুরির অপবাদ দেওয়া। দুবছর আগে কলকাতা পুলিশ চুরি রুখতে গৃহস্থদের সাবধান করার উদ্দেশ্যে একটি লিফলেট বিলি করে, যাতে লেখা ছিল, বাড়ির পরিচারিকাদের থেকে সচেতন থাকতে। অনেকটা এরকম, যেন পরিচারিকা মাত্রই পোটেনশিয়াল চোর। বছর চারেক আগে বন্দনা মাহাকুড়ের ঘটনা অদ্ভুত নাড়িয়ে দিয়ে যায় আমাদের। একটি বছর চোদ্দর মেয়ে বন্দনা, মেদিনীপুরের দাঁতন গ্রামে বাড়ি, সর্বক্ষণের লোক হিসেবে খাওয়া পরা আর সামান্য মাইনের চুক্তিতে কাজ করত দমদম এলাকায়। দেড় লক্ষ টাকা চুরির অপবাদ দিয়ে সেই বাড়ির লোক তাকে একটি ঘরে আটকে রেখে দেয় দিনের পর দিন, পরিবারের লোকের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে। মারধোর দিয়ে, বুকে লঙ্কা পিষে অকথ্য নির্যাতন করে তাকে। এমন সময়ে আমরা খবর পাই, অনেক ঝামেলা করে পুলিশ এবং বস্তিবাসী গিয়ে উদ্ধার করে আনে মেয়েটিকে। 

এই হল বাস্তব পরিস্থিতি। এরকম ছোটখাট থেকে বড়সড় অনেক ঘটনাই ঘটে যা সামাজিক দৃষ্টিতে অবমূল্যায়নকর। এর সাথে যৌন হেনস্থা তো আছেই। যৌন হেনস্থার সাথে সাথেই তাড়া করে ফেরে অবিশ্বাসী কিছু চোখ। এরকম ঘটনাও ঘটেছে বাড়ির কর্তা যৌন হেনস্থা করেছে অথচ জানাজানি হতেই কাজ চলে গেছে পরিচারিকাটির, সাথে জুটেছে ‘চরিত্রহীনা’র তকমাও। বাড়ির দিদিরা অনেক ক্ষেত্রেই কাজে রাখতে চান না এরকম ‘বাজে’ চরিত্রের মেয়েদের। এই ঘটনাগুলি সংখ্যায় হয়তো কম। কিন্তু শুধু মেয়ে বলেই এই যে অপদস্থ হওয়ার বিষয়, এটা কিন্তু কোন অংশেই কম নয়। অনেক পরিচারিকা দিদিদের বলতে শুনেছি, একটু ভালো শাড়ি পরে গেলে বা সেজে গেলে কাজে নিতে চায় না, বা নিলেও কথা শোনায়। অর্থাৎ আর একটি মেয়ের বিদ্বেষের মুখে পড়তে হয়, সন্দেহের শিকার হতে হয়। অদ্ভুত এই দাঁড়িপাল্লার খেলা। শ্রেণি বৈষম্য তফাত হিসেবে চাক্ষুষ বোঝা না গেলেই কিন্তু ভয়ানক চিন্তার ভাঁজ পড়ে বৈষম্যের ওপরের তলার মানুষের।

গৃহশ্রমিকদের অধিকার রক্ষার লড়াই অনেক কঠিন। দাবি যত না বেশি সরকারের কাছে, তার চেয়ে অনেক বেশি সামাজিক। সরকার হয়তো নিয়ম করে মাসে চারটে ছুটি কিংবা নির্দিষ্ট ন্যূনতম মাইনে ঠিক করে দিতেই পারে, কিন্তু সামাজিক অসাম্য ও ঘৃণা মোছাবে কী করে? এরপরেও নোংরা গ্লাসে চা খেতে দেওয়া থাকবে, বাথরুম ব্যবহার করতে না দেওয়াও থাকবে, থাকবে অবিশ্বাস আর সন্দেহও। সুতরাং এই লড়াই শুধু কাঠ-কাঠ নিয়ম করে কিছু সুযোগ সুবিধা আদায়ের লড়াই নয়। এখানে মধ্যবিত্ত শ্রেণির যে মানুষগুলি কর্মদাতা বা দাত্রী, তাদের এ বিষয়ে আরও সক্রিয়, সচেতন এবং সহানুভূতিশীল হয়ে উঠতে হবে। তাই পরিচারিকাদের এই লড়াইতে তাদেরকেও পাশে থাকতে হবে। কারণ শেষত তারাও প্রচণ্ডভাবে নির্ভরশীল নিজেদের পরিবার টিঁকিয়ে রাখতে এই ‘কাজের মেয়ে’-দের ওপরেই।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *