সম্পাদকীয়

আমরা এমন একটা সময়ে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে পক্ষ বিপক্ষের আপাত সংঘর্ষে পৃথিবী দু’ভাগ। একদিকে ন্যাটোর সামরিক আঁতাত, অপরদিকে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ। আমরা ব্যস্ত এই খেলায় পক্ষ নিতে। কোন সামরিক নেতা বেশি হাসাতে পারেন, কার পৌরুষের আস্ফালন চোখে পড়ার মতো, কে উঠে আসছেন মানবতার নতুন মুখ হয়ে। অথচ, আমরা ভুলে যাচ্ছি যে দেশের সরকার, দেশের সামরিক বাহিনীর লড়াই আর তুলনামূলক শক্তি প্রদর্শনের এই আঙিনায় কোনোদিনই সাধারণ মানুষের মতামতকে পাত্তা দেওয়া হয়নি। সোভিয়েত-উত্তর রাশিয়া এবং ইউক্রেনের এই সামরিক লড়াইয়ে আক্রান্ত হাজার হাজার সাধারণ মানুষের পাশে থাকার জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাসীন সরকারকে সমর্থনের কোন প্রয়োজন পড়েনা। আর তাই হাজার হাজার শান্তিকামী মানুষ পথে নেমেছেন রাশিয়ার বিভিন্ন শহরে, ইউক্রেনের বিভিন্ন রাস্তায়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। তাঁরা বলছেন, তাঁরা ন্যাটো বা রাশিয়া কারুর সামরিক আস্ফালন সমর্থন করেন না। শক্তি প্রদর্শনের এই খেলায় তাঁরা রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে, আর সাধারণ মানুষের পক্ষে। 

 

অথচ, এই সাধারণ মানুষের সংজ্ঞাও বহুমুখী। যে লড়াইয়ে রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছি, সেখানে দেখছি কীভাবে সাধারণ মানুষ বাঁটোয়ারা হয়ে যায় জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, ধর্ম পরিচয়ের ভিত্তিতে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যেসব সীমান্তে অপসারণ চলছে, সেখানে ইউক্রেনের সাদা মানুষরা প্রাধান্য পাচ্ছেন। প্রবাসী বা অধিবাসী কালো চামড়ার, বাদামী চামড়ার মানুষদের বলপ্রয়োগ করে হঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে, ইউক্রেনের সেনা গুলি চালাচ্ছে তাঁদের উপর। ইউরোপের ভূমিপুত্রদের লড়াইয়ে ইউরোপের ভূমিপত্রদের অধিকার প্রতিষ্ঠা হচ্ছে প্রত্যেক মুহূর্তে। বিবিসি-র সাংবাদিক বলছেন, তিনি স্তম্ভিত, কারণ এই লড়াইয়ে সোনালী চুল, সাদা চামড়া আর নীল চোখের ইউরোপীয় মানুষ আক্রান্ত, আর তাই, সভ্যতা ধ্বংসের পথে। এই ইউরোপেই ঘটে চলা ইজরায়েলের প্যালেস্তাইন অধিগ্রহণ, তুরস্কের রাজনৈতিক হিংসার কথা এঁদের চোখে সভ্যতার সঙ্কট হয়ে ওঠেনি। বর্তমান সময়েও ফ্রান্স, ব্রিটেন এবং অন্যান্য শক্তি কীভাবে অন্যান্য দেশের উপর তাঁদের উপনিবেশিক আধিপত্য বজায় রেখেছে, সেকথা এঁরা উহ্যই রাখতে ভালোবাসেন। এঁরা ভুলিয়ে দিতে চান আমেরিকার ইয়েমেনে বোমা নিক্ষেপ, ইরাক আফগানিস্তানে সামরিক আধিপত্যের সাম্প্রতিক ইতিহাস। এই ভুলে যাওয়া, আর বাছাই করে মনে রাখার রাজনীতির বিরুদ্ধেই সোচ্চার হয়েছেন এরকম অনেক সাধারণ মানুষ, যারা পশ্চিমী সাদা মানুষের সাধারণ্যের সংজ্ঞার বাইরেই থেকে যান। তাঁরা বলছেন, ইরাক আফগানিস্তান প্যালেস্তাইন নিয়ে কথা বলতে হবে। রাশিয়ার ছাত্রছাত্রীদের, চলচ্চিত্রনির্মাতা, কবি লেখক লেখিকাদের যদি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নিষিদ্ধ করা হয় তাহলে একই নিষেধাজ্ঞা কেন লাগু হবেনা পশ্চিম ইউরোপ, উত্তর আমেরিকার দেশগুলির ক্ষেত্রে? কার আক্রমণ মানবতা-বিরুদ্ধে হিসাবে আর কার আক্রমণ শান্তি রক্ষার্থে সাহায্য হিসাবে গণ্য হবে, তা কীভাবে স্থির হবে? 

 

এইরকমই পক্ষ নেওয়ার প্রশ্ন সাম্প্রতিক সময়ে ভারতবর্ষেও উঠলো। কর্ণাটকের একটি স্কুলে ছাত্রীদের হিজাব পরে ক্লাসে আসাকে কেন্দ্র করে। পড়ুয়াদের, শিক্ষক শিক্ষিকাদের অনড় আশ্বাস পাওয়া সত্ত্বেও মেয়েটিকে কোণঠাসা করে দেওয়া হলো সংখ্যাগুরুর হিন্দুত্ববাদী আস্ফালনের মাধ্যমে। আমরা দেখলাম হিজাব পরার জন্য একটি বাচ্চা মেয়েকে তাড়া করে ছুটল শয়ে শয়ে গেরুয়াধারী পুরুষ। আমরা দেখলাম হিজাব পরে আসার বিরোধিতায় উত্তাল হয়ে উঠলো এক পক্ষ, বলল হিজাবের মতো পিছিয়ে পড়া প্রথাকে কিছুতেই সমর্থন করা যায় না। অন্যদিকে প্রশ্ন উঠলো সরকারী স্কুলগুলোতে সরস্বতী পুজোর অনুষ্ঠান হতে পারলে কি এই প্রতিষ্ঠানগুলি সত্যিই ধর্মনিরপেক্ষ? এখানেও আমরা দেখলাম ভুলে যাওয়া আর ভুলিয়ে দেওয়ার রাজনীতি। হিজাবের পক্ষে আর বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার মেরুকরণে শিক্ষার অধিকারের প্রশ্ন চাপা পড়ে গেল। সামাজিক, ব্যক্তিগত পরিচয় নির্বিশেষে শিক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত করার প্রশ্নে এই মেয়েটির পোশাক, এবং পোশাক সংক্রান্ত ধার্মিক পরিচয় হয়ে উঠলো মুখ্য আলোচনা। 

 

এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে আমরা প্রকাশ করছি বামা’র বর্তমান সংখ্যা। আমরা পক্ষ নিচ্ছি। আমরা পক্ষ নিচ্ছি পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষের, যারা একইসাথে ন্যাটো আর পুতিনের বিরোধিতা করছেন। আমরা পক্ষ নিচ্ছি সেইসব এলাকার যেখানকার সামরিক সঙ্ঘর্ষ আর অধিগ্রহণের ছবি মূলধারার বয়ানে জায়গা পায়না। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে আমরা পক্ষ নিচ্ছি মেয়েদের জাতিধর্ম পরিচয় নির্বিশেষে শিক্ষার অধিকারের। সেই রাজনৈতিক প্রত্যয়ের সাথেই এই সংখ্যায় আমরা তুলে ধরছি নয়া নাগরিকত্ব আইনের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো, হিজাব বিতর্ক এবং নারীশিক্ষার অধিকার, বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্পে নারীশ্রমের অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন লেখা। পাশাপাশি কাশ্মীরের কবিতা, জেলের স্মৃতিগদ্য, মীনা কন্দস্বামীর গেরুয়া পরিহিত ছোটদেরকে লেখা খোলা চিঠি, এবং আরো নানান ছবি গল্পের মাধ্যমে এই সংখ্যায় আমরা বিভিন্ন আন্দোলনের স্বরূপ বিশ্লেষণ করছি।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published.