সম্পাদকীয়, আগস্ট, ২০২১

“গর ফির্দৌস বুর্রে জমিনস্ত 

হামি নস্ত, হামি নস্ত, হামি নস্ত…”

এই পৃথিবীতে যদি কোথাও স্বর্গ থেকে থাকে, তবে তা এখানেই, এখানেই, এখানেই – আমির খুসরুর এই লাইন দুটিই হয়তো আমাদের বেশিরভাগের কাশ্মীরকে চেনার প্রধান সূত্র। নৈসর্গিক কাশ্মীর। যে কাশ্মীরকে আমরা চিনি শীতকালের শালওয়ালাদের নকশার বুননে। যে কাশ্মীরের সাথে আমাদের পরিচয় ‘মিশন কাশ্মীর’, ‘রোজা’, কিম্বা ‘কাশ্মীর কি কলি’র মাধ্যমে। ভূস্বর্গের পটভূমিকায় মুসলমান সন্ত্রাসবাদী দমিয়ে দেশপ্রেমের শিহরণের জমজমাট গল্পে। বরফে ঢাকা চিনার, স্থির টলটলে জলের ডাল লেক, লাল আপেল, ফুলে সাজানো শিকারার পোস্ট কার্ড চিত্রে। সুন্দর। নিখুঁত। শান্ত। এক ফালি জমি। যে জমি বারংবার দখল হয়েছে, লুট হয়েছে। যে মাটির ইতিহাস বারবার লেখা হয়েছে শোষিত মানুষের রক্তে। তাই হয়তো সেই ইতিহাস জোর করে মুছে দিলে, সেই ইতিহাস ভুলিয়ে দিলেও তা থেকে যায় সেখানকার মানুষের মনে, তাদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া স্মৃতিতে। কাশ্মীরের কাহিনী তাই ছায়া মানুষদের গল্প। যে মানুষেরা মাটি কামড়ে লড়ে চলেছেন সেই ডোগরা রাজের সময় থেকেই। যে কাহিনী লেখা থাকে শ্রমজীবী মানুষের জমির লড়াইয়ে, অযাচিত করের বিরুদ্ধে সংগ্রামে। বারবার বিশ্বাসভঙ্গ হওয়ার কাহিনী। 

কাশ্মীর। বিশ্বের সবচেয়ে সামরিকায়িত অঞ্চল। যেখানে প্রতি দশজন মানুষ পিছু একজন সেনা মোতায়েন থাকে। যেখানে মানুষ হঠাৎ ‘নেই’ হয়ে যেতে পারে। স্কুল ফেরত, আপিস ফেরত, বাজার ফেরত যেকোনো সময়ে বুকে বুলেট গুঁজে দিতে পারে ভারতীয় সেনা। যেখানে ছোটরা বড় হয়ে ওঠে স্কুলপথে বাঙ্কার দেখে। যেখানে কোনো রকম শোরগোল হলেই বাড়ির ছেলেরা মসজিদ চলে যায় যাতে সেনাবাহিনী এসে তুলে নিয়ে না যায়। সেই কাশ্মীর যেখানে যে কোনো সময় যে কোনো কারণে কারো বাড়ি তছনছ হতে পারে ভারত রাষ্ট্রের ‘শান্তি’ রক্ষার্থে। সেই কাশ্মীর যেখানে প্রতি অলিতে গলিতে বন্দুক হাতে সেনা মজুত থাকাটাই স্বাভাবিকতা। যেখানে যে কোনো মানুষের হঠাৎ কবর হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিকতা। সেই কাশ্মীর যেখানে বন্দুকের নলে গণতন্ত্র বেঁচে থাকে। যেখানে নির্বাচন রিগ করে একের পর এক পুতুল সরকার বসানো হয়। যেখানে শাসনের নামে, প্রশাসনের নামে, উন্নয়নের নামে যখন তখন গুলি চলে, যখন তখন মানুষ নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। যেখানে প্রতিনিয়ত গুলি, টিয়ার গ্যাস, পেলেট, কার্ফিউ দিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয় আজাদির স্বপ্ন। ভারতীয় সেনার অনুপ্রবেশ মেয়েদের ঘর বাহিরের গণ্ডি মুছে সমস্তটাই যুদ্ধক্ষেত্র করে তোলে। গণধর্ষণে শেখানো হয় দেশপ্রেমের পাঠ। গ্রাম উজাড় করে দিয়ে চলে কর্ডন সার্চ। 

কাশ্মীরের কাহিনী তাই আট বছরের হেবার চোখে পেলেট গুঁজে অন্ধ করে দেওয়ার কাহিনী। নিলোফার আর আসিয়ার ছিন্ন ভিন্ন দেহ হাঁটু জলে ডুবে থাকার কাহিনী। মায়েদের নিরুদ্দেশ ছেলের ছবি হাতে দিন গোনার কাহিনী। বাড়ির নিরাপদ স্থলগুলিতেও সেনার অবাধ প্রবেশের দরুন ঘরের নিরাপদ ক্ষেত্রও সংঘর্ষ স্থল হয়ে ওঠার কাহিনী। ভারতীয় পৌরুষের দখলদারির ক্ষেত্র হয়ে ওঠার অবমাননার কাহিনী। কোনান পোশপোরার যমজ গ্রামে রাজপুতানা রাইফেলের তান্ডবের হাড়হিম করা কাহিনী। আট থেকে আশি বছরের মেয়েদের সারা রাত ধরে চলা নিপীড়নের কোনো রকম সাজা না হওয়ার কাহিনী। কার্ফিউ আর কাঁটাতারের ঘেরাটোপে প্রেম থমকে যাওয়ার কাহিনী। স্কুলগুলোর সেনা ক্যাম্প হয়ে ওঠার কাহিনী। বন্ধ ইন্টারনেট, ঝাঁপ ফেলা দোকান আর খাঁ খাঁ রাস্তার কাহিনী। যত্ন করে বানানো বাড়ির সাজানো বাগান বুট আর বন্দুকে ছারখার হয়ে যাওয়ার কাহিনী। বিনা বিচারে যথেষ্ট প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও ‘জাতীয় বিবেক’-কে তুষ্ট করতে মকবুল আর আফজলের ফাঁসির কাহিনী। নতুন ডোমিসাইল আইন এনে মুলনিবাসি মানুষকে ছিন্নমূল করার, বেনাগরিক করার কাহিনী। চেকপোস্ট আর গণকবরের কাশ্মীর। পুঞ্চ, গায়কাডাল, বিজবেহারা গণহত্যায় রক্তস্নাত কাশ্মীর। ভারতের শান্তি বজায় রাখার গুরুভারে বিধ্বস্ত, ক্ষত বিক্ষত কাশ্মীর।  

তবু গুলি, পেলেট, টিয়ার গ্যাস, কনসার্টিনা তার দিয়ে কি আর মানুষের আকাঙ্ক্ষা দমন করা যায়? চোখ উপড়ে দিলেও যে আজাদির স্বপ্ন থেকেই যায়। তাই এই কাহিনী লড়াইয়ের। প্রতিরোধেরও। রান্নাঘর তছনছ হয়ে গেলে আবারও মা মেয়ে, শাশুড়ি বৌয়ের একসাথে এসে আবার সবকিছু গুছিয়ে ফেলে তাণ্ডবের চিহ্ন মুছে দেওয়ার কাহিনী। বিয়েবাড়ির গান স্লোগান হয়ে ওঠার কাহিনী। শবযাত্রায় হাজার মানুষের মিছিলের কাহিনী। মুছে দেওয়া, বিকৃত করা ইতিহাসের উত্তরাধিকার মুখে মুখে আওড়ে বাঁচিয়ে রাখার কাহিনী। বুলেটের সামনে মরিয়া হয়ে পাথর ছোঁড়ার প্রত্যয়ের কাহিনী। মৃত দেহ, কেস নম্বর, আর অবরোধের দিন গুনতে থাকার কাহিনী। ভুলতে না চেয়ে, চিৎকার করতে না পেরে কবি হতে বাধ্য হওয়ার কাহিনী। চিনার গাছে আঁচড় কেটে আজাদির দাবি জানানোর কাহিনী। ইন্টারনেট, যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দিলে মাজারের প্রতিবাদ স্থল হয়ে ওঠার কাহিনী। মধ্যরাতে দরজায় টোকা পড়লে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার কাহিনী। অতর্কিতে গোপনে খবর চালাচালি করার কাহিনী। রাষ্ট্রের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে মেয়েদের মিছিল, “জিস কাশ্মীর কো খুন সে সেঁচা ও কাশ্মীর হামারা হ্যা” বলে উর্দিধারিদের দিকে মুষ্টিবদ্ধ হাতে লড়াই জানান দেওয়ার কাহিনী। ভিনদেশে বসে বাড়ির খবর না পেয়ে প্রতিরোধের গান গাওয়ার কাহিনী। ইট, টিনের শিট, কাঠের গুঁড়ি দিয়ে ব্যারিকেড গড়ে তোলার কাহিনী। দেওয়ালে পিঠ ঠেকতে ঠেকতে মরিয়া হয়ে অস্ত্র তুলে নেওয়ার কাহিনী। রাষ্ট্রের নজরদারিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রেম, বন্ধুতা, সংহতির কাহিনী। 

এই কাশ্মীর আমাদের অচেনা, অজানা। ভারতের খবরের কাগজে, সিনেমায়, গানে, গল্পে, ইতিহাস বইয়ে এই কাশ্মীর খুঁজে পাওয়া যায় না। রাষ্ট্রের নির্মিত মানচিত্রে এই কাশ্মীরের অস্তিত্ব নেই। কিন্তু যত্ন করে সুপরিকল্পিত ভাবে নির্মিত বয়ানেও চিড় ধরে। ভূত হয়ে তাড়া করে দেওয়ালে দেওয়ালে “ভারত কাশ্মীর ছাড়ো”, “ইন্ডিয়া গো ব্যাক”, “ফ্রি কাশ্মীর”, “আজাদি” লেখা গ্র্যাফিটি। অতর্কিতে মানুষের আজাদি স্লোগান জাহির করে শান্তি বজায় রাখার দায় শোষিতের উপর বর্তায় না। বুটের তলায় মানুষকে পিষ্টে যদি শান্তি স্থাপন করতে হয় তাহলে সে শ্মশানের শান্তি বই কিছু না। তাই পুতুল সরকার বসিয়ে সংসদীয় রাজনৈতিক দলগুলিকে কিনে নিলেও, মানুষের আত্মনির্ধারণের দাবি, স্বাধীনতার দাবি নাকচ করে দেওয়া যায় না। পালটা কবিতা, গান, ছবি, গল্প, উপন্যাস, স্মৃতিকথা লেখা হয়। লেখা হয় পালটা ইতিহাস। বাধ্যতায়, অবাধ্যতায়। ট্যুরিস্ট ম্যাপের পরিধি ছাপিয়ে তা উলঙ্গ করে ভারত রাষ্ট্রের চেহারা। তাই ১৫-ই আগস্ট ভারত রাষ্ট্র স্বাধীনতা দিবসের উগ্র জাতীয়তাবাদী উদযাপনে মাতলেও কাশ্মীর প্রতিবাদে অন্ধকারে কাটায়। ৫ই আগস্ট ৩৭০ ধারা বাতিল করে স্পেশাল স্টেটাসের কঙ্কালকবচটি ছুঁড়ে ফেলে কাশ্মীর দখলকে আইনি বৈধতা দিতে চাইলেও ভারতের নির্মিত ‘স্বাভাবিকতা’-র চিত্র ভেদ করে রক্তাক্ত কাশ্মীর বেরিয়ে পড়ে। ভারতের নির্মিত ‘গণতন্ত্র’-কে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। ভারতীয় সংবিধানকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। ৫ই আগস্ট ভারতের ‘কাশ্মীর বিজয়’কে মান্যতা দিতে তাই রাম মন্দিরের ভূমিপুজো করতে হয়। মান্যতা দিতে হয় বাবরি মসজিদের ধবংসকে। মান্যতা দিতে হয় ৯০ পরবর্তী ভারতের বদলে যাওয়া রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে। তাই কাশ্মীরের লড়াই আঘাত হানে হিন্দুত্ববাদের মতাদর্শে, ভেঙ্গে দেয় হিন্দুত্ববাদ নির্মিত নারীত্বের সংজ্ঞা। প্রশ্ন তোলে সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে, মুসলমান মানুষদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করে রাখার রাষ্ট্র কাঠামো নিয়ে। এই অসম সমাজ ব্যবস্থায় প্রান্তিক মানুষের প্রতিবাদের, প্রতিরোধের, প্রতিশোধের বার্তা নিয়ে। চ্যালেঞ্জের ছুঁড়ে দেয় আমাদের ‘দেশ’, ‘জাতি’, ‘জাতীয়তাবাদ’ নির্মাণের চাপিয়ে দেওয়া কাল্পনিক একীকরণের ধারণাকে। তাই কাশ্মীরের মেয়েদের লড়াই ভারতের হিন্দু ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মেয়েদের লড়াইয়ের হাত শক্ত করে। তাই কাশ্মীরের লড়াই ভারতের সংখ্যালঘু মানুষের লড়াইয়ে সংহতি রাখে। অত্যাচারের মানচিত্রে মুষ্টিবদ্ধ হাতগুলি মিলেমিশে যায়। একে অপরের হাত ধরে। 

১৫-ই আগস্ট যখন ভারত ইংরেজদের দখল মুক্ত হওয়ার আনন্দে স্বাধীনতার বাণী আওড়ায় তখন কাশ্মীর সামনে এসে দাঁড়ায়। কাশ্মীর অখণ্ড ভারতের সম্পত্তি, গেরুয়াবাহিনীর এই খোয়াবে জল ঢেলে কাশ্মীরের শ্রমজীবী মানুষ মাটি আঁকড়ে, জল, জঙ্গল, জমি আঁকড়ে রুখে দাঁড়ায়। টাডা, পোটা, পিএসএ, এনএসএ, ইউএপিএ দিয়ে রাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদের নিজস্ব সংজ্ঞা নির্মাণ করতে চাইলেও মানুষ নিজেদের সমস্ত কিছু বাজি রেখে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়ে। ভিলেজ ডিফেন্স কমিটি তৈরি করে রাষ্ট্র নিজস্ব লেঠেল বাহিনী তৈরি করলেও মানুষের মগজে কার্ফিউ জারি করতে পারে কই! প্রতিরোধে মানুষ বুঝিয়ে দেয় সন্ত্রাসের অধিকার রাষ্ট্রের একচেটিয়া হতে পারে না – রাষ্ট্র সন্ত্রাস করলে, মানুষও রুখে দাঁড়াবে।  সোচ্চার হয়ে বলে যত দিন দখলদারি থাকবে, ততদিন কাশ্মীর লড়বে আজাদির স্বপ্ন বুকে নিয়ে। 

“Till the soldiers return their keys and disappear…” – যত দিন না ভারতীয় সেনা তাদের চাবি ফেরত দিয়ে উধাও হচ্ছে… 

কাশ্মীরের আত্মনির্ধারণের এই জানকবুল লড়াইয়ের সংহতিতে থাকার অঙ্গীকার নিয়ে প্রকাশিত হল ‘বামা’-র প্রথম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা। 

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *