সম্পাদকীয়

জ্যোতি সিং বা তথাকথিত ‘নির্ভয়া’র সঙ্গে ঘটা অপরাধ দেশকে হতচকিত করার পর কেটে গেছে প্রায় এক দশক। ধর্ষণ সংস্কৃতিতে ধর্ষণ অনেকদিনই আর বেশি শোরগোল ফেলে না৷ ধর্ষণকালীন নির্যাতনের যে নৃশংসতা জ্যোতির ঘটনার ক্ষেত্রে দেশকে বিহ্বল করেছিল, এই দশ বছরে সেই নৃশংসতাও যে গা-সওয়া হয়ে গেছে, তা বোঝা যায় যখন সেপ্টেম্বর সংখ্যা বেরোনোর প্রাক্কালে মুম্বাইয়ে কাউকে ধর্ষণ করা হয়, আর তারপর যোনিতে একই উপায়ে ঢোকানো হয় লৌহদণ্ড। এ ঘটনায় অপরাধী সংখ্যাগুরু হওয়ায়, বা বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি না হওয়ায়, সরকারপক্ষ বা বিরোধীপক্ষ কারওরই বিশেষ ভ্রূক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। অথচ লিঙ্গগত প্রান্তিক ভাবছে, শিউরে উঠছে ভেবে যে, লোহার রড, স্টোন চিপস, কাচের টুকরোর পর আগামীতে আর কী কী তার জন্য অপেক্ষা করছে? হয়ত নিজেকে অত্যাচারিতর স্থানে কল্পনা করে চমকে উঠছে সে। বিনিদ্র রজনী যাপন করছে, যেভাবে ঘুম ছুটে গিয়েছিল দলিত কবি সুকীর্থারানির, যখন খয়রলাঞ্জিতে আরেক দলিত কন্যা প্রিয়াঙ্কাকে নগ্ন করে ঘুরিয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল। সুকীর্থারানির যন্ত্রণা ফুটেছিল তাঁর কবিতায়। তাই তা বাদ গেছে দিল্লি ইউনিভার্সিটির সিলেবাস থেকে। আরও বাদ গেছে বামা-র আত্মজীবনীমূলক লেখা, কারণ তাঁর লেখাই তাঁর রাজনীতি, তাঁর শ্রেণি-বর্ণ-লিঙ্গগত প্রান্তিকতার স্বর। বামা-র কাহিনীতে (‘সঙ্গতি’) পার্শ্বচরিত্র হিসেবে ছিল শিশুশ্রমিক মাক্কিয়ান্নি- যে কারখানায় কাজ করতে গিয়ে যৌন নির্যাতনের ভয়ে থাকত। আর দিল্লির উপকণ্ঠে সম্প্রতি বাস্তবেই ধর্ষিতা ও খুন হল এক দলিত ভিখারিনী বালিকা। তার দেহটিও পুড়িয়ে দিয়েছিল পুলিশ। যাতে ময়নাতদন্ত সম্ভব না হয়, সেজন্যই কি? এসব ঘটনার পর, রাষ্ট্র-পোষিত বিশ্ববিদ্যালয় কেন দলিত লেখিকাদের লেখা বাদ দেয়, তা বোঝা কঠিন নয়। 

অথচ এই কিছুদিন আগেও নাগরিক মজে ছিলেন অলিম্পিকে নারী অ্যাথলেটদের কৃতিত্বে। এমন মন্তব্যও ঘোরাফেরা করছিল যে, এঁরাই দেশে নারী-ক্ষমতায়নের প্রমাণ তথা প্রতিনিধি। প্রধানমন্ত্রীর টুইট হ্যান্ডেল অলিম্পিকের ধারা-বিবরণী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু দিল্লিতে নয় বছরের দলিত নাবালিকার ধর্ষণ ও খুনের পর তা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে বা বিবৃতি দিতে তিনি ভুলে গিয়েছিলেন। হাথরসের ঘটনার পর একবছরও পূর্ণ হয়নি। সেই দলিত মেয়েটির গলায় ফাঁস লাগিয়ে টেনে নিয়ে গিয়ে, জিভ ছিঁড়ে, মেরুদণ্ড ভেঙে অত্যাচার করা হয়। পনের দিনের যুদ্ধ শেষে সফদরগঞ্জ হাসপাতালে তার মৃত্যু ঘটেছিল। যতই বিরল নির্মমতা মনে হোক, হাথরস বা দিল্লির বা হায়দ্রাবাদের বা উন্নাওয়ের বা মুম্বাইয়ের ঘটনা আসলে ব্যতিক্রমী নয়। লিঙ্গগত ঘৃণা তীব্রতম হলে ধর্ষণ ঘটে। আবার লিঙ্গগত ঘৃণার সঙ্গে বর্ণগত ঘৃণা মিশলে কী হয়, তার প্রমাণ ছড়িয়ে উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাত, মহারাষ্ট্র,হরিয়ানা জুড়ে অসংখ দলিত মেয়ের ধর্ষণে। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস বুরো-র রিপোর্ট অনুসারে, ভারতে রোজ অন্তত দশজন দলিত নারীর ধর্ষণ নথিভুক্ত হয়।

ধর্ষণ ও হত্যা যদি হয় বর্ণগত বিদ্বেষের চরমতম প্রকাশ, তবে তার দৈনন্দিন প্রকাশ দেখা যায় শ্লেষে-অপমানে। হরিদ্বারের বন্দনা কাটারিয়া জাতীয় মহিলা হকি দলে ফরোয়ার্ড পজিশনে খেলেন। অলিম্পিক সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ভারতীয় নারী দলের পরাজয়ের পর প্রতিবেশী তিন উচ্চবর্ণের যুবক বন্দনাদের বাড়ির সামনে এসে, অপমানজনক মন্তব্য আর গালাগাল করতে করতে, শেষ পর্যন্ত খুনের হুমকিতে পৌঁছয়। তাদের মতে, দলে এত বেশি দলিত মেয়ে থাকার জন্যই এই পরাজয়, বন্দনা সেই দলিতদের অন্যতম। এই বন্দনাই ক’দিন আগে হ্যাটট্রিক করেছিলেন সাউথ আফ্রিকার বিরুদ্ধে। ব্যক্তি নারীর উদযাপন প্রশংসার্হ। কিন্তু ক্ষমতাতন্ত্র প্রায়শ কৃতি নারীকে সমষ্টির থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, টেনে নেয় নিজস্ব বৃত্তে। তাই মীরাবাই চানুর অতীত টুইটের সেই অংশ ভাইরাল করা হয়, যেখানে তিনি নিজের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন। আর নাগরিক ভুলে যায় ইরম শর্মিলা চানুর অনশন, থাংজাম মনোরমার ধর্ষণ, মণিপুরি নারীদের নগ্ন প্রতিবাদ, আফস্পার আগ্রাসন। এই সূত্রে মনে পড়ে, দিল্লি ইউনিভার্সিটির সিলেবাস থেকে বাদ গেছে মহাশ্বেতা দেবীর ছোটগল্প ‘দ্রৌপদী’-ও, যেখানে ধর্ষিতা আদিবাসী দোপদী মেঝেন ‘সেনানায়ক’-কে তার নগ্নতা দিয়েই ভয় দেখায়, ঠিক যেমন ভাবে বহু বছর পরে মণিপুরী নারীরা নগ্ন প্রতিবাদ করেছিল। 

অন্যদিকে শুধু মীরাবাঈ চানু বা বন্দনা নয়, কৃতিত্বের দাবিদার প্যারালিম্পিক্স-এ বিজয়িনী অবনী লেখারা বা ভাবিনা পাটেলও, যাঁরা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করেছেন, সোনা বা রূপা জয়ের আগে। দলিত, আদিবাসী বা সংখ্যালঘু নারীর মতো, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন নারীও থেকে যান আলোচনা-বৃত্তের বাইরে। আবার প্যারালিম্পিক নিয়ে যদি বা আমাদের আনন্দের অবকাশ থাকে, ঘটমান বর্তমানেই এক বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুর মা যে শুধু তাঁর কঠিন মাতৃত্ব ও কাজের জগতের ক্ষমাহীন চাহিদা মেলাতে পেরে বাড়ির কাছে বদলি চেয়েছিলেন, এবং তা না পেয়ে আত্মহত্যা করেছেন, তা নিয়ে আন্দোলিত হওয়ার অবকাশ আমাদের কই? এই মৃত্যু শুধু বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের অধিকার আন্দোলনকেই নয়, নারীর কর্মস্থলে প্রাপ্য অধিকারের প্রশ্নকেও আবার প্রকট করল। 

বামা-র লক্ষ্য যেমন একদিকে মূলধারার ইতিহাসে প্রান্তিক হয়ে থাকা অতীত স্বরগুলির অনুরণন খুঁজে বের করা, তেমনই বর্তমান প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে দিনে দিনে আরও বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে ওঠা। বহুস্বরের প্রকাশমাধ্যম হয়ে ওঠা। হাজার প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বামা-কে প্রেরণা জোগায় দেশের মেয়েদের স্পর্ধা, প্রতিবেশী মেয়েদের প্রতিরোধ। তালেবান আক্রমণের সম্মুখে আফগান নারীদের প্রতিস্পর্ধা যদি সম্ভব হয়, তাহলে সব চরম পিতৃতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধেই রুখে দাঁড়ানো সম্ভব। রোজাভা আন্দোলনের কুর্দি মেয়েদের মতো, আফগান নারীরাও বিশ্বজনীন নারীবাদী আন্দোলনকে পথ দেখাক- এমনই বামা-র আশা। কুর্দি কমরেডদের আফগান মেয়েরা যেমনটা বলেছিল, এই দুঃসময়ে সেই স্বপ্নই দেখে বামা।

‘আমরা চাই সমানাধিকার। নারী-স্বাধীনতা হচ্ছে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের উপর নির্মিত সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের অংশগ্রহণ।’

সংগ্রামী শুভেচ্ছা। 

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published.