ফ্রান্সের দীর্ঘ ১৯৬৮: লিপ আন্দোলন, ১৯৬৮-১৯৮১

ডোনাল্ড রেইড-এর Opening the Gates: The Lip Affair, 1968-1981 বই থেকে নির্বাচিত অংশ।

দেওয়ালে টাঙানো ব্যানারটিতে লেখা আছে “ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে – পুলিশকে সরিয়ে দেওয়ার সপক্ষে – লিপ শ্রমিকদের সাথে সম্পূর্ণ সংহতিতে – সত্যিকারের আলোচনা শুরু হোক।” লিপ ঘড়ির কারখানার হরতালরত শ্রমিকরা বেসাসঁ স্পোর্টস সেন্টারে মিলিত হন। ১৯৭৩ সালে ১,৩০০ শ্রমিকের চাকরি চলে যাওয়ার উপক্রম হলে লিপ শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্যরা অধিবেশন করেন, এবং কোম্পানি নির্মিত ঘড়ি বিক্রি জারী রাখেন। বেসাসঁ, ফ্রান্স, মে ১৯৭৩। চিত্রঋণঃ অ্যালোইন নোগস / সিগমা, গেটি ইমেজ।

ফ্রান্সের সুদীর্ঘ ১৯৬৮ অনুপ্রাণিত আন্দোলনের ধারা শুরু হয় ১৯৬৮-এর মে মাস থেকে, আর শেষ হয় ১৯৮১ সালের নির্বাচনে ফ্রাঁসোয়া মিতেরঁর জয়লাভের মধ্যে দিয়ে। তবে এই আন্দোলনের উৎসের সন্ধান আরো এক দশক আগে থেকেই করা চলে – আলজেরিয়া যুদ্ধের বিরুদ্ধে আন্দোলন, আর নব্য বামপন্থীদের সমাজতন্ত্রী আর কম্যুনিস্ট পার্টির বিকল্প রূপ খোঁজার ইতিহাসে পাওয়া যায় ১৯৬৮-র ইঙ্গিত। সংগ্রামী শ্রমিকদের সৃজনশীলতা, শ্রমজীবী মানুষের নৈতিক শক্তিই যে সামাজিক পরিবর্তনের মূল ধারাটি নির্ধারণ করে – এই বিশ্বাসও এই আন্দোলনের পরে আর এত বৃহৎ আকারে ফ্রান্সে কখনো দেখা যায়নি। এই বিশ্বাসের সবচেয়ে লক্ষণীয় উদাহরণটি ঘটে ফ্রান্সের বেসাসঁ-র লিপ কোম্পানির কারখানাকে কেন্দ্র করে। কোম্পানির পক্ষ থেকে শ্রমিকদের গণছাঁটাইয়ের একটি পরিকল্পনা করা হয়, যেখানে শ্রমিকদের শ্রমবিরতির অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। মে ১৯৬৮-র পরবর্তীতে যে ধরনের শ্রমিক ধর্মঘট সাধারণভাবে ফ্রান্সে দেখা যেত, লিপ কারখানার আন্দোলন সেই নিরীখে আলাদা ছিল। ধর্মঘটের পাশাপাশি এই শ্রমিক আন্দোলন যে সামাজিক আকার গ্রহণ করেছিল, সেকথা মাথায় রেখে সংবাদমাধ্যম এই আন্দোলনকে “সংগ্রাম” বা lutte বলে আখ্যায়িত করে। লিপ কারখানার ধর্মঘট প্রচলিত শ্রমিক আন্দোলনের আদলে শুধুমাত্র ধর্মঘটেই থেমে থাকেনি,  বরং এক শ্রেণিসংগ্রামের ভূমিকা নিয়েছিল – এই নতুনধারার শ্রেণিসংগ্রামকে স্রেফ “সংগ্রাম” বলে অভিহিত করাই প্রচলিত হয়ে পড়েছিল। এক শ্রমিক যেমন জানান, “আমরা যা করছি সেটা ধর্মঘট নয়, বরং সংগ্রাম।”1 লিপের ক্ষেত্রে কোনও মালিক ছিল না যার সাথে শ্রমিকরা আলাপ আলোচনা চালাতে পারে (১৯৭৩ সালে এহেন ঘটনা বিরল হলেও পরবর্তী কয়েক বছরে বিভিন্ন অধিগৃহীত কোম্পানির ক্ষেত্রে এই ঘটনা ক্রমেই সাধারণ হয়ে দাঁড়ায়)। ফলে শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে ফরাসি জনসাধারণের সামনেই তাদের কাহিনী তুলে ধরেন, আহ্বান জানান গোটা ফ্রান্সকে তাঁদের কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে। লিপ কোম্পানির শ্রমিকরা কারখানা দখল করে নেন, কোম্পানির পণ্য আগের মতোই উৎপাদন ও বিক্রি করতে থাকেন, আর নিজেদের মাইনে দেবার ব্যবস্থাও নিজেরাই করে নেন। মে ১৯৬৮-র আন্দোলনকে জাঁ পল সার্ত্র অভিহিত করেন, “সম্ভাবনা ক্ষেত্রের সম্প্রসারণ” হিসেবে; লিপের শ্রমিকরা নিজেদের এবং তাদের সমস্ত সংগ্রামী সাথীদের সামনে সেই সম্ভাবনার প্রকৃত রূপ উন্মোচিত করেন।2 প্যারি কমিউন সম্পর্কে মার্ক্স বলেছিলেন, প্যারিকমিউনের সাফল্য তার কার্যকরী অস্তিত্বের মধ্যেই প্রকাশ পায় – এই কথা লিপের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।3 খুব তাড়াতাড়িই ফরাসী পরিসরে লিপ কারখানা হয়ে দাঁড়ায় এক রাজনৈতিক ও সামাজিক সংঘর্ষের স্থল। এ ছিল এমন এক সংগ্রাম যা গোটা ফ্রান্সকে দ্বিখণ্ডিত করে দেয়, এবং ফরাসি জনগণকে গুরুত্বপূর্ণ নানা সমস্যার রাজনৈতিক পর্যালোচনা করতে বাধ্য করে। 

পুঁজিবাদী সংবাদমাধ্যম লিপকে অভিহিত করে, “শ্রমিকদের ১৯৬৮” হিসাবে, পত্রপত্রিকায় লেখা হয়, “তাঁদের কার্যকলাপ পুঁজিবাদী বাজারকেন্দ্রিক অর্থনীতির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নীতিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। সেই হিসাবে এই আন্দোলন মে, ১৯৬৮র থেকেও ধ্বংসাত্মক।”4 সমসাময়িক ফ্রান্সে ‘লিপ’ – এই শব্দের সঙ্গে শ্রমিকরা এক ও অভিন্ন হয়ে পড়েন। বহু বছর পরে, জাঁ ক্লদ সেঁসেমাত লিপের লোগো বা মার্কা কেনবার সময় অভিযোগ করেন যে লিপ নামটা শ্রমিকরা যেভাবে ব্যবহার করেছেন, তা ট্রেডমার্ক আইন ভঙ্গ করারই সামিল! পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে কোনও শ্রমিকের তাঁর উৎপাদিত পণ্যের সাথে যে সম্পর্ক, তা শ্রমের সঙ্গে শ্রমিকের বিচ্ছিন্নকরণের (alienation) চিহ্ন হিসেবে ধরা দেয়। কিন্তু সেসেঁমাত বুঝতে পেরেছিলেন, এক্ষেত্রে “লিপ” শব্দটাই দৈনন্দিন কথোপকথনে আদতে হয়ে দাঁড়িয়েছিল ধর্মঘটী শ্রমিকদের দৃঢ়তার প্রতীক।5 লিপের প্রকৃতি ছিল যৌথ উদ্যোগের, একাধিক ঐক্য আর সংহতির বার্তা তার এই যৌথ চরিত্রকে একইসঙ্গে নির্মাণ করে, এবং বহির্সমাজে এই যৌথতার প্রতিফলন ঘটায়। শ্রমিক ইউনিয়নদের নেতৃত্বে শ্রমিকদের সাধারণসভায় বক্তব্য ও আলোচনার মাধ্যমেই লিপ সংগঠিত হয়। সমস্ত স্তরের শ্রমিকদের লিপ আন্দোলনে দৈনন্দিন অংশগ্রহণের মাধ্যমে লিপ কারখানার এই যৌথ চরিত্র আন্দোলনের এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি হিসাবে গড়ে ওঠে। 

লিপ ঘড়ি কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন বিক্ষোভ প্রদর্শন। বেসাসঁ, ফ্রান্স, মে ১৯৭০। চিত্রঋণঃ ফোটো ১২/ ইউনিভার্সাল ইমেজ গ্রুপ, গেটি ইমেজ।

প্রথম থেকেই লিপকে কেন্দ্র করে এই ধারণা গড়ে ওঠে যে লিপ দুটি ভিন্ন যুগের মধ্যে এক যোগসূত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। ১৯৬৮র আন্দোলন থেকে উঠে আসা বিভিন্ন পন্থা এবং যৌথব্যবস্থা আর সত্তরের দশকে শ্রমিকরা যে ভয়াবহ মন্দার মুখে পড়েন – লিপ এই দুইয়ের মধ্যে মধ্যস্থতা করে এক নতুন পথ দেখাতে পেরেছিল। ১৯৭৫ সালে লিপ মডেলকে সামনে রেখে সারা ইউরোপ জুড়ে শ্রমিকরা বহু দেউলিয়া কোম্পানি অধিগ্রহণ করে নেন এবং সাফল্যের সঙ্গে চালাতে থাকেন।6 কয়েকশো লিপ কর্মচারী নিজেদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও নানা সমবায় স্থাপন করেন, এবং অধিগৃহীত লিপ কারখানায় ১৯৮১ পর্যন্ত থেকে যান। লিপকে নিয়ে জনমানসে যে কল্পনা গড়ে ওঠে, তার মধ্যে যেমন শ্রেণীসংগ্রামের আঙ্গিক ছিল, তেমনই ছিল জাতীয়তাবাদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফরাসি প্রতিরোধের এক সদস্য, মরিস ক্লাভেল, লিপকে শার্ল দে গলের ১৮ই জুনের বক্তৃতার (১৯৪০ সালে পরাধীন ফ্রান্স থেকে ইংল্যাণ্ডে পৌঁছে শার্ল দে গল ১৮ই জুন প্রথম বেতারে বক্তৃতা দেন) সঙ্গে একই পংক্তিতে রাখেন, এবং বলেন –

“গত তিরিশ বছরে এই প্রথম মানুষ স্বপ্ন দেখছে। লিপকে মনে না রাখতে পারলে বলতে হবে ফরাসি জনগণ তাদের নিজেদের আত্মপরিচিতিকেই ত্যাগ করতে চলেছে।”7 ক্যাথলিক রক্ষণশীল পণ্ডিত অন্দ্রে ফ্রসার্দ (যিনি ঘটনাচক্রে ফরাসি কম্যুনিস্ট পার্টির প্রথম সাধারণ সেক্রেটারির ছেলেও বটে)-এর মতে, “লাগামহীন পুঁজিবাদ, একনায়কতন্ত্রী সমাজতন্ত্রের বাইরে যদি কোনো বিকল্প থেকে থাকে, তবে লিপের থেকেই আমাদের তার শিক্ষা নিতে হবে।”8

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সংগ্রামী প্রতিরোধী শক্তির জাতি হিসাবে ফরাসী আত্মপরিচিতি, আর শ্রেণীসচেতন প্রোলেতারিয়েত হিসাবে ফরাসি শ্রমজীবী মানুষের পরিচিতি – ফ্রান্সের জাতিসত্তার এই দুই আখ্যানই সত্তরের দশকে সংকটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে বহু মানুষই লিপকে এই সংকটের সুযোগ্য উত্তর হিসাবে দেখতে থাকেন – একদিকে প্রতিরোধ আর অন্যদিকে শ্রমিকদের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের প্রতিভূ হিসাবে লিপ আন্দোলন পরিচিত হয়ে ওঠে।

১৯৭৬ সালে সার্ত্র বেনি লেভিকে বলেন, “লিপ আদতে মাদাম বোভারি।”9 মাদাম বোভারির মতো লিপও এমন এক আখ্যান যা নিজস্ব এক জগত তৈরি করতে সক্ষম হয়, সমসাময়িক আইনকানুনকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়, আর আমাদের চিন্তনকে উত্তরোত্তর তাড়া করে চলে, প্রশ্ন করতে থাকে। বামপন্থী হোক বা ডানপন্থী, রাজনৈতিক দল হোক বা ইউনিয়ন, সকলেই তাদের কার্যকলাপের মধ্যে ‘মে ১৯৬৮’ থেকে উদ্ভূত সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে থাকেন লিপকে কেন্দ্র করে। গোটা সত্তরের দশক জুড়ে যেসব ঘটনার মধ্যে দিয়ে ‘মে ১৯৬৮’ কে খুঁজে পাওয়া যায় – লার্জাক-এ সেনা অধিগ্রহণ বিরোধী কৃষক আন্দোলন যেমন তার মধ্যে একটা, তেমনি লিপের শ্রমজীবী ঐক্যও আরেকটা।10 বামপন্থীরা অবাক হয়ে দেখেন লিপের সংগ্রাম যেন এক নতুন অধ্যায়ের শুরু, এক নতুন বিকল্প ফ্রান্সের অঙ্কুরোদ্গম।11 ১৯৬৮র আন্দোলনকারীরা আন্দোলনের পর যে ব্যক্তিপরিচয়হীন বৈষম্যমূলক সমাজকে অবশ্যম্ভাবী ভাবতে শুরু করেছিলেন, লিপ তাঁদের ভাবনাচিন্তাকে এক বড়সড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে ফেলে দেয়। 

ধর্মঘটকারী শ্রমিকরা ১৯৭৩ সালে তাদের কারখানায় লার্জাক কৃষকদের জন্য উপহার হিসাবে ভেড়ার আদলে ঘড়ি তৈরি করেছিলেন। ধর্মঘটকারী শ্রমিকদের দ্বারা অধিগৃহীত কারখানায় ঘড়ির বিক্রি অব্যাহত ছিল। বেসাসঁ, ফ্রান্স, মে ১৯৭৩। চিত্রঋণঃ অজ্ঞাত/ এএফপি, গেটি ইমেজ।

এইসব পরিবর্তনের কেন্দ্রে ছিল ১৯৭৩ সালে লিপ কারখানার গেট বহিরাগতদের জন্য খুলে দেবার সিদ্ধান্ত (১৯৬৮ সালের আন্দোলনে ফ্রান্সের সাধারণ শ্রমিক সংঘ সিজিটি লিপ ও অন্যত্র কারখানার দরজা বন্ধ করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল)। কারখানার গেট খুলে দেবার ফলে ১৯৬৮র দাবির সঙ্গে সমমনস্ক অনেকেই শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলতে আসেন। ১৯৭৩ সালে নান্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী, দমিনিক বার্বিয়ে কারখানার গেট পেরিয়ে ঢোকেন; বার্বিয়ে পরে জানান, “আর হঠাৎ আমার মনে হল দুটো জায়গার মধ্যে যেন কোনো দূরত্ব নেই – আমি নান্তে থেকে বেরোচ্ছি আর লিপে ঢুকছি, ছাত্র আন্দোলন থেকে শ্রমিক আন্দোলনে।” বার্বিয়ের পরিকল্পনা ছিল বেসাসঁতে এক সপ্তাহ সময় কাটানোর, কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় পরের গোটা বছরটাই তিনি লিপে কাটাচ্ছেন, আর লিপই তাঁর গোটা বছরের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে।12 লিপের আন্দোলনের সঙ্গে ওতোপ্রতভাবে জড়িত আরেক ছাত্র দমিনিক বন্দ্যুর মনে হয়, তিনি যেন লিপের শ্রমিকদের মাঝে এক যৌথ ভাষা খুঁজে পেয়েছেন।13 লার্জাক-এর ক্ষেত্রে যেমন, লিপেও ঠিক তেমনি সারা ফ্রান্স থেকে অজস্র ছাত্রছাত্রী, তরুণ সমর্থক শ্রমিকদের সঙ্গে নানাভাবে যোগাযোগ স্থাপন করেন – এবং বহুক্ষেত্রে কোনো দল বা জাতীয় ইউনিয়নের মধ্যস্থতা ছাড়াই তাঁরা আন্দোলনে শামিল হন। ছাত্রছাত্রী এবং শ্রমিক – উভয়ই উভয়ের সামনে যেন এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটান

জাভিয়ের ভিন্য আর মিশেল জাঙ্কারিনি-ফুর্নেল সঠিক বিশ্লেষণ করেছেন মে ১৯৬৮ পরবর্তী ইতিহাসের। তাঁদের মতে, ১৯৬৮র যে ইতিহাস জনপ্রিয় হয়েছে, সেসব আখ্যানে ভিন্ন স্তরের, ভিন্ন মতাদর্শের মানুষের এমন সব “বিরল সাক্ষাত” যথার্থ গুরুত্ব পায়নি।14 যেসব ঐতিহাসিকরা সত্তরের দশকে ফরাসি বুদ্ধিজীবীরা কেমন করে মার্ক্সবাদী রাজনীতিকে পরিত্যাগ করছিল তার বিস্তৃত বিবরণ দিতে চান, তাঁদের লেখায় এইসব বুদ্ধিজীবীরা কীভাবে শ্রমজীবী মানুষের প্রত্যক্ষ সংযোগের মাধ্যমেই তাঁদের এহেন রাজনৈতিক অবস্থানে পৌঁছতে পেরেছিলেন তার কোনও বিবরণ দেন না।15 আবার উল্টোদিকে, শ্রমব্যবস্থার ইতিহাস রচয়িতারাও ১৯৬৮-র শ্রমিকরা কীভাবে আক্ষরিক অর্থেই এক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন – সেই ইতিহাস সম্পূর্ণ এড়িয়ে যান। ১৯৬৮র পরবর্তীতে শ্রমিকদের সঙ্গে নানা ধারার আন্দোলনকারী এবং পার্টিসানদের সাক্ষাতের অভিঘাতে এই আন্দোলনে কী কী নতুন প্রশ্ন বা কর্মপদ্ধতি উঠে এসেছিল, তা নিয়েও তাঁরা বিশেষ পর্যালোচনা করেননি। অথচ লিপ আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এমন সব অসম সাক্ষাতের গুরুত্ব প্রবল। লিপের শ্রমিকরা কোনোদিন ভাবেননি কোনো ভ্যানগার্ড দল এসে তাঁদের আন্দোলনকে নিজেদের কুক্ষিগত করতে চাইবে, ফলে বিভিন্ন ধারার রাজনৈতিক দলগুলির লিপ আন্দোলনে যোগদান নিয়ে তাঁদের কোনও আপত্তি ছিল নাঃ

“এইসমস্ত বিভিন্ন ফলপ্রসূ আলোচনার পরিসর না থাকলে আমরা যা যা বলেছি, তৈরি করেছি, স্বপ্ন দেখেছি তা করতে পারতাম কি? আমাদের কারখানা নতুন করে চালাবার সাহস করতে পারতাম? এটুকু নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, আমরা যেভাবে এগিয়েছি সেভাবে অন্তত এগোতে পারতাম না। আমাদের সার্বিক অভিজ্ঞতা বলে যে, আন্দোলনের প্রতিটা নির্ণায়ক মুহূর্তে, প্রতিটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্য আমরা শুধু নিজেদের নয়, বরং অন্যদের সাহায্য নিয়েছি। আমাদের যে কল্পনা বা সাহসের অভাব ছিল তা কিন্তু নয়, বরং আমরা মনে করেছিলাম যেকোনো চিন্তাপদ্ধতিকেই এক যৌথ জন্মপ্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় (ঠিক যেভাবে একটি বাচ্চার জন্মের ক্ষেত্রে একজন ধাইমার অবদান অনস্বীকার্য)।”16

বেসাসঁর এইসব বিরল যৌথ সাহচর্যের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছিল সমাজতন্ত্রী নারীবাদীদের সঙ্গে মহিলা শ্রমিকদের সহাবস্থান। তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন যৌথ কার্যকলাপ এবং আলোচনার পরিসর থেকে উভয়পক্ষই সমাজে নারী হিসাবে নিজেদের অবস্থান নিয়ে নতুন দিশার সন্ধান পান।

লিপ ঘড়ির কারখানা তরলীকরণের প্রতিবাদে কারখানায় শ্রমিক ধর্মঘট ও বিক্ষোভ অবস্থান। বেসাসঁ, ফ্রান্স, মে ১৯৭৬। চিত্রঋণঃ রজার ভায়োলেট, গেটি ইমেজ।

লিপের গেট পেরিয়ে যেসব বাইরের মানুষ ঢোকেন, তাঁদের সঙ্গে লিপের শ্রমিকদের এক বিশেষ সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। এই সম্পর্কের ভিত্তি ছিল একে অপরের দক্ষতার প্রতি আস্থা। স্টটন লিণ্ড একেই “সাহচর্য” বলে অভিহিত করেছেন।17 লিপ কারখানা নিয়ে তাঁর লেখাতে শ্রমশক্তির সামাজিক ইতিহাস বা ঘড়িশিল্পের অর্থনৈতিক ইতিহাসে জোর না দিয়ে, লিন্ড বরং শার্ল পিয়াজে বা ফাতিমা দেমোজোঁ এর মতো শ্রমিকদের সঙ্গে জাঁ রাগুনে, দমিনিক বন্দ্যুদের মতো বুদ্ধিজীবীদের যে “সাহচর্য” সে নিয়েই বিশদ আলোচনা করেছেন। মে ১৯৬৮র আন্দোলনে অভিজ্ঞ বহু এরকম বুদ্ধিজীবী লিপ শ্রমিকদের সঙ্গে একসাথে থেকেছিলেন, এবং একসঙ্গে কাজ করেছিলেন। লিপের রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপকে যেরকম তাঁরা নানা প্রশ্নের মুখে ফেলেছিলেন, লিপও তেমনি তাদের দিকে পাল্টা প্রশ্ন ফিরিয়ে দিয়েছিল। লিপের শ্রমিকরা আর তাঁদের সহযোগীরা একে অপরের জন্য প্রায় অনুঘটকের ভূমিকা নিয়েছিলেন – উভয়েই নিজেদের মধ্যেকার সুপ্ত রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে নানান স্বতঃস্ফূর্ত (যদিও লিপ আন্দোলন স্বতঃস্ফূর্ত নয়, বরং সংগঠিত আন্দোলন ছিল), নতুন এবং অপ্রত্যাশিত দিশা দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই আন্দোলনে সহকর্মীদের সঙ্গে শ্রমিকদের পারস্পরিক আদানপ্রদান বিভিন্ন ধারার বামপন্থীদের তাঁদের নিজস্ব বিচ্ছিন্নতাবাদী নানান অভ্যাসের বাইরে আসার বাসনাকেও দিশা দেখাতে সফল হয়েছিল। পিয়াজে যেমন বলেছিলেন, লিপের শ্রমিকরা তত্ত্ব জানতেন না, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল তাঁরা তত্ত্বকে আসলে অভ্যাসে পরিণত করেছেন।18 সার্ত্র বলেছিলেন, বামপন্থী সংবাদপত্রে আরো তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দরকার, কিন্তু সেই তত্ত্ব তাঁর মতো লেখকের বইয়ের তত্ত্ব নয়। বরং তাঁর মতে লিপের তত্ত্ব কেবলমাত্র লিপের শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই জানা  সম্ভব।19 বহু বছর পরে লিপের শ্রমিকরা আর তাঁদের সহযোগীরা মিলে একটা মিটিং ডেকেছিলেন নতুন পত্রিকা প্রকাশের জন্য। এই উপলক্ষ্যে তাঁরা লেখেন,

“এই শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ সমন্বয় গঠিত হতে চলেছে…মুনিয়ে এবং সার্ত্রকে ছাপিয়ে যাবে এই পত্রিকা…আধুনিককালের প্রকৃত বাস্তবতা জানতে এই অসাধারণ ত্রৈমাসিকটি পড়ুন!”

ফ্রান্সের পঞ্চম রিপাবলিক শুরু হবার প্রথম দশকে চরমপন্থী বামেদের অনেকেই ফ্রান্সের কারখানার থেকে মুখ ফিরিয়ে পশ্চিমী দুনিয়ার বাইরের নানা আন্দোলনে মনোনিবেশ করেন।20 কিন্তু মে ১৯৬৮র সম্ভাবনার জোয়ারের ফলে ফ্রান্সের বিপ্লবীদের অনেকেই আবার ফ্রান্সকেন্দ্রিক রাজনৈতিক চর্চায় মনোনিবেশ করেন। তৎকালীন সময়ে ভিয়েতনাম বা অন্যত্র ঘটে চলা বিভিন্ন মুক্তি  সংগ্রাম থেকে লক্ষ্য সরিয়ে পুনরায় ফ্রান্সের সমাজ-রাজনীতিকে চর্চার বিষয় করে তোলার ক্ষেত্রে লিপ আন্দোলন অপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বোধহয় আর কিছুই ছিল না। তৎকালীন মাওবাদী বন্দ্যু যেমন বলেছিলেন,

“ভিয়েতনামের মুক্তাঞ্চলগুলির মতোই লিপ আন্দোলন আমাদের কল্পনাকে বাস্তব ভিত্তি যোগায়, আমাদের লক্ষ্যগুলোকে এক যৌথ রূপ দেয়।”21 ধাতুশ্রমিক সংগঠনের জাতীয় নেতা আলফঁস ভেরোনেজ ১৯৭৩ সালের জুলাই মাসে লিপে আসেন। এক মিটিংয়ে তিনি বলেন যে লিপের শ্রমিকদের বিভিন্ন সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে “অতিসতর্ক” থাকতে হবে, তখন শ্রমিকদের তরফ থেকে উত্তর আসে, “আমরা নিজেদের কারখানাকে ক্ষুদে ভিয়েতনামের মতো মুক্তাঞ্চল মনে করি।” কারখানায় রাখা অজস্র পোস্টারের মধ্যে ছিল এক শ্রমিকের বানানো একটা পোস্টার, যাতে দেখা যায় একটা প্লেন বোমার জায়গায় যন্ত্র ফেলছে, আর তার নীচে লেখা, “ভিয়েতনামে যখন শেষ, লিপে তখন শুরু।”22

আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনায় রাগ্যুনে বলেন, “আমি মানুষের মুক্তির স্বপ্ন দেখতাম। আর ভাবতাম একজন মানুষ যেভাবে মুক্তি পেতে পারে, একটি কারখানাও সেভাবে মুক্ত হতে পারে।” পুঁজিকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থা থেকে এমন এক ব্যবস্থায় উত্তরণের স্বপ্ন দেখতেন রাগ্যুনে, যা মানুষকেন্দ্রিক। এই স্বপ্নকে দিশা দিতে তিনি বলছেন, “সমাজের নানা স্তরে একাধিক ভিয়েতনাম তৈরি করতে হবে – ভিয়েতনাম-কারখানা, ভিয়েতনাম-চার্চ, ভিয়েতনাম-পুলিশ, ভিয়েতনাম-বিচার, ভিয়েতনাম-লিপ। শুধুমাত্র কারখানার মধ্যে ভিয়েতনাম তৈরি করলে হবে না। বরং বিচারব্যবস্থায়, পুলিশের মধ্যে, চার্চের মধ্যে সব স্তরে ভিয়েতনাম প্রয়োজন আমাদের। যেদিন সমাজের সব স্তরে যথেষ্ট ভিয়েতনাম তৈরি হবে, সেদিন শাসক আর শাসিতের মধ্যে, শিক্ষক আর ছাত্রর মধ্যে, পাদ্রী আর ধর্মভীরুর মধ্যে ক্ষমতার সব পার্থক্য ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে, আর সমাজে পরিবর্তন আসবে।”23 লিপের মতো শান্ত একটি মফস্বল অঞ্চলকে ফ্রান্সের ক্ষুদে ভিয়েতনামে পরিণত করার রাগ্যুনের এহেন প্রচেষ্টা দেখে গলপন্থী মন্ত্রী শার্বোনেল পর্যন্ত অবাক হয়ে যান।24 

“ইহা সম্ভব” – লিপ ঘড়ির কারখানা তরলীকরণের প্রতিবাদে কারখানায় শ্রমিক ধর্মঘটের সময় কর্মীদের প্রতিবাদী ব্যানার। বেসাসঁ, ফ্রান্স, মে ১৯৭৬। চিত্রঋণঃ রজার ভায়োলেট, গেটি ইমেজ।

লিপের কারখানার উপর বড় ব্যানারে লেখা ঝুলত “ইহা সম্ভব”। লিপ আন্দোলননের সমর্থকদের কাছে এই বার্তার অর্থ ছিল পরিষ্কার – সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রথম ধাপ হিসাবে শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক আত্মনিয়ন্ত্রণ সম্ভবপর করেছিল লিপ। কারখানার দক্ষ কর্মচারীদের কাছে যদিও এই “সম্ভব”-এর মানে ছিল অন্য – ছাঁটাই না হওয়া, শ্রমিক হিসাবে কোনো সুযোগসুবিধা না হারানো। প্রাথমিকভাবে তাঁদের মনে কারখানার ভিতরে শ্রমিকদের আভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কাঠামোকে ভাঙার কোনো ভাবনা আসেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ফোর্ড কোম্পানির অনুসৃত “বেশি কাজ, বেশি মাইনে” নীতি অন্যান্য কোম্পানিকেও প্রভাবিত করে। প্রথাগতভাবে এই নীতি ফরাসী অর্থনৈতিক বিকাশের ক্ষেত্রে সহায় হয়, এবং যুদ্ধ পরবর্তী এই উন্নয়ন ফ্রান্সে “তিরিশ বছরের গৌরবোজ্জ্বল যুগ” নামে পরিচিত হয়। ১৯৬৮র সময়ে ফ্রান্সের বহু কোম্পানিতে ধর্মঘট শুরু হয়েছিল এই মধ্যস্থতাকে প্রত্যাখ্যান করার মধ্য দিয়ে। অথচ, লিপের ক্ষেত্রে কিন্তু তা হয়নি। তা বলে লিপ আন্দোলনের দক্ষ শ্রমিকদের অধিকারের দাবিদাওয়া অন্যদের তুলনায় কম বৈপ্লবিক ছিল তা বলা যায় না। লিপের আন্দোলন মূলত শুরু হয়েছিল শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বাঁচানোর উদ্দেশ্য নিয়ে, অথচ গোটা ফ্রান্স থেকে লিপের জন্য সমর্থন আসে তাঁদের আন্দোলনের পদ্ধতির সপক্ষে, তাঁদের সংগ্রামের আত্মনিয়ন্ত্রক চরিত্রের জন্য। আর এই সংগ্রামের ধারাই লিপের শ্রমিকদের, বিশেষত নারী এবং তরুণদের আমূল পাল্টে দেয়। লিপের শ্রমশক্তির অর্ধাংশ জুড়ে ছিলেন নারীরা। নারী শ্রমিকরা ছিলেন মূলত বিশেষ প্রশিক্ষণহীন সাধারণ শ্রমিক, কারখানার কাজের পাশাপাশি তাঁদের উপরে তাঁদের সংসার চালানোর মূল দায়িত্বও ন্যস্ত ছিল। কিন্তু এতদসত্ত্বেও লিপ চালানোর সমস্ত প্রক্রিয়ায় মহিলারা নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা নেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ এমনকি আরো এক ধাপ এগিয়ে, ১৯৬৮র “শ্রমিক অবাধ্যতা”-র ধারা মেনে, ইউনিয়নের পুরুষ নেতৃত্বকেও চ্যালেঞ্জ জানান। এই সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে যে যৌথতার জন্ম হয়, তার ভিন্নভাবে জীবনযাপন এবং ভিন্নভাবে কাজ করার চাহিদা প্রায় এক দশক ধরে গোটা ফ্রান্সকে আলোড়িত করে তোলে। আর শেষ অবধি চাকরি বাঁচানোর পরিবর্তে এই যৌথ গোষ্ঠীই ক্রমে ক্রমে লিপের আন্দোলনের লক্ষ্য আর মাধ্যম দুইই হয়ে ওঠে। 

লিপ কারখানায় শ্রমিক ধর্মঘট। বেসাসঁ, ফ্রান্স, মে ১৯৭৩। চিত্রঋণঃ জঁ-পিয়ের রে/ গামা র‍্যাফো, গেটি ইমেজ।

লিপের শ্রমিকদের কর্মকাণ্ডের মূল প্রেরণা ছিল যে বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদী ব্যবস্থা শ্রমিকদের চাকরি কেড়ে নেয়, তার সর্বাঙ্গীণ বিরোধিতা। কিন্তু লিপের সমর্থকদের কাছে আন্দোলন প্রসূত যৌথতার ধারণা পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় তৈরি বিচ্ছিন্নকরণ, ক্ষমতা ও পুঁজির কেন্দ্রীকরণ, ক্ষমতার ভেদাভেদ – ইত্যাদি সমস্ত বাস্তবতার এক প্রত্যুত্তর হয়ে ওঠে। ফ্রান্সের পঞ্চম রিপাবলিক পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে, বা ইউনিয়নের ক্ষেত্রে যে আমূল আমলাতান্ত্রিক কাঠামো বিদ্যমান ছিল, লিপের সমর্থকরা তার বিরোধিতা করেন। এই প্রচলিত কাঠামোর সম্ভাব্য বিকল্প হিসাবে লিপ এক নতুন গণতান্ত্রিক বিকল্পের সন্ধান যোগায়। লিপ আন্দোলনে শ্রমিকরা এক অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থা লাগু করেছিলেন, যেখানে গণতান্ত্রিকভাবে বিচারবিবেচনা করে আন্দোলনের নীতি নির্ধারণ হতো। এই অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্য থেকেই উঠে আসে লিপ কারখানায় শ্রমিকদের আত্মনিয়ন্ত্রণের বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। এই আন্দোলনে শ্রমিকরা শুধুমাত্র পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরোধিতা করে, বা ধর্মঘট করেই থেমে থাকেননি। উল্টে শ্রমিকশ্রেণির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং শ্রমিকশ্রেণির অংশগ্রহণের মাধ্যমে অধিগৃহীত কারখানাকে নতুন করে চালু করেন লিপ শ্রমিকরা, এবং সমস্ত শ্রমিকশ্রেণির কাছে এক নতুন বিকল্প কাঠামোর উদাহরণ স্থাপন করেন। শ্রমিকশ্রেণির আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সৃষ্ট অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক কাঠামোকে তুলে ধরে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকা সার্বিক নিরাপত্তাহীনতার বিরোধিতা শ্রমিকরা এর আগেও করেছেন। কিন্তু ছাঁটাই, ব্যবসা অধিগ্রহণ আর নব্য বিশ্বায়নের যুগে শ্রমিকদের সংঘাতের যে বাস্তবরূপ, লিপ যেন সেই পরিসরে ১৯৬৮র আন্দোলন থেকে উঠে আসা আদর্শ, চর্চা এবং কর্মপদ্ধতিকে এনে হাজির করে। বিশ্বায়নের যুগে সমস্ত শিল্পই ক্রমশ এক পৃথিবীব্যাপী আকার ধারণ করতে উন্মুখ ছিল, এবং এই কারণে কারখানার বাস্তব পরিসরে ঘটে চলা বৈষম্যের স্বরূপ পুঁজিপতিরা ধর্তব্যের মধ্যেই আনতেন না। লিপ আন্দোলন শিল্পোদ্যোগকে বিশ্বায়নের ধারণার বিপরীতে তাদের নিজস্ব ভৌগোলিক পরিসরে পুনর্স্থাপন করলো। বলল কারখানা হবে এমন এক জায়গা, যেখানে শ্রমিকদের আত্মনিয়ন্ত্রনের অধিকার থাকবে, কর্মচারীরা বিকল্প যৌথ গোষ্ঠী গড়ে তুলতে পারবেন, শ্রম ও পুঁজির অবাধ অগ্রগতির বিরোধিতা করতে পারবেন, আর সর্বোপরি নিজেদের ভবিষ্যত নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেন। লিপ ছিল কারখানার শ্রমিকদের এমন এক আন্দোলন যা এক বৃহত্তর বিকল্প বামপন্থী গোষ্ঠীকে একত্রিত করতে পেরেছিল, এবং তার ফলে মে ১৯৬৮-র আন্দোলনের অপূর্ণ স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে পেরেছিল। লিপ আন্দোলনের উত্তরাধিকার ১৯৬৮র উত্তরাধিকার, যা আজও আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়, সংগঠিত হতে অনুপ্রেরণা যোগায়।

ডোনাল্ড রেইড আধুনিক ফ্রান্সের ঐতিহাসিক। রেইড মূলত শ্রমের ইতিহাস চর্চা করলেও ফ্রান্সের “দীর্ঘ ১৯৬৮” নিয়ে তাঁর অনেক রচনা আছে। মে ‘৬৮ আন্দোলনের পটভূমিকা, ফরাসী রাজনীতি এবং জনমানসে তার প্রভাব নিয়ে রেইড স্থায়ীভাবে কাজ করেন। বর্তমানে তিনি নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যাপক।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *