অদ-ভূতুড়ে

মানুষকে বিশ্বাস না করার হাজারো কারণ থাকতেই পারে, কিন্তু অলৌকিক আর ভূতে যারা বিশ্বাস করেন না, তাঁরা নিতান্তই হর্দম, মানে হাঁদা। চাঁদ থই থই নিঝুম রাতে বাড়ির সবাই যখন ঘুমে বেহুঁশ, তখন ঘরে উত্তরের জানলাটা আমি খুলি না কেন? কারণ বাইরে কয়েকশো গজ দূরে রমাপিসিদের খোলা ছাদের ধারে পা ঝুলিয়ে কারা যেন বসে থাকে। লাল লাল চোখ। ফ্যাকফ্যাকে চেহারা। ড্যাবড্যাব করে ওরা তাকায় আমার ঘরের দিকে। খাটের থেকে পা নামাতেই কে যেন সড়াৎ করে পিছলে সরে যায় ভিতরের দিকে। একদিন সাহস করে কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করেছিলুম “কে? কে আছ নীচে?” খোনা গলায় পষ্ট উত্তর শুনেছিলুম “না, না কেউ না..”

সেই থেকে দিব্যি আছি ভূতদের নিয়ে। “ভূত যদি না থাকবে তবে কোত্থেকে হয় ভূতের ভয়?” বলেছিলেন স্বয়ং সুকুমার রায়। এর পরে আর কথা চলে না। সুতরাং ভূত আছেই। আর সেই ভূতের হাত থেকে বাঁচতে পারেননি কেউই। রবি ঠাকুর অবধি হানাবাড়ি নিয়ে বাংলায় প্রথম গপ্পোটা লিখেছিলেন। নাম ক্ষুধিত পাষাণ। বঙ্কিমের পণ্ডিত অবশ্য অন্য ভূত মানতেন। তিনি ছাত্র ভোঁদার কান পাকড়ে বুঝিয়েছিলেন ভূ ধাতুর সঙ্গে ক্ত প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নাকি ভূত হয়। সে ভূত আবার পাঁচ রকম। শুনে ভোঁদার মা অবাক। কী বলে ছেলে? মাত্র পাঁচ? কিন্তু তাঁদের সব সম্পত্তি যে ভূতে খেল, তাঁদের সংখ্যা তো বারোর কম না!! তবে ভূত নিয়ে একেবারে ঠিক ঠাক গবেষণা করেছিলেন ত্রৈলোক্যনাথ। তিনি নিজ চক্ষে দেখেছিলেন জল জমিয়ে যেমন বরফ হয়, তেমনি অন্ধকার জমিয়ে ভূত হয়। তাঁর মতে ভূত বায়বীয়। ঠিক যেমন ছিল শিবু। পরশুরামের ভুশন্ডীর মাঠে-র শিবু। তাঁর বায়ুভূত শরীরের মধ্যে দিয়ে একটা প্রজাপতি উড়ে গেছিল, মনে আছে? আর তাঁরই পরিচিত মহেশ মিত্তির ভূত না মানার কী কঠিন সাজাটাই না পেয়েছিলেন। মরার পরে মানতে বাধ্য হয়েছিলেন, “ও হরিনাথ, আছে আছে, সব আছে, সব সত্যি!”  কান পাতলেই শুনতে পাই মাথা ভাঙ্গার মাঠে মোটা ভূত গান গাইছে-

“শোন তবে কান পেতে ওরে দুরাচার

তোকে মোরা খাব করে চাটনি আচার”

লীলা আর শীর্ষেন্দুর ভূতেরা তো বেশ মাই ডিয়ার। তবু ফিসফিসিয়ে বলি, তাঁদের দেখেও ঘাড়ের লোম খাড়াখাড়া হয়ে চুলটুল সব আঁকশির মত হয়ে যায় আমার। তাই ভূত থাক বা না থাক, অচেনা আর অজানাকে বেজায় ভয় পাই। এই মা কালীর দিব্যি গেলে বলচি। 

বিদেশে আবার ভূতের ভারি কেতা। হাজার রকমফের। উইচক্রাফট, ভুডুইজম, ব্ল্যাকম্যাজিক থেকে শুরু করে ডাকিনীবিদ্যা, প্ল্যানচেট মায় ঝাঁড়ফুক অবধি। অশরীরীর কত না নামের মিছিল। পল্টারজিস্ট, আফ্রিৎ, ভ্যালকিরি, জোম্বি, মামদো, পিশাচ, নিশি, দানো এরকম অঢেল প্রজাতি। পড়তে পড়তে শিউরে উঠতে হয়। রাতে বাথরুম যেতে গেলেই গলা কাটা গুপির জিভটা ল্যা ল্যা করে মুখ ভ্যাংচায়। ডিকেন্স, ডয়েল, পো থেকে স্টোকার সবাই যে সময়ে একেবারে শুরুর দিনে অলৌকিক কাহিনির চর্চা করতেন, তখন এই গথিক ধারাটাই লোকে নিত ভাল। ইংল্যান্ডে এটি চালু হয় ১৮ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এবং ১৯ শতকে তা জনপ্রিয় হয়। এক বিরাট প্রাচীন পটভুমিকায় ধীরে ধীরে ভয়, বেদনা, নাটকীয়তা, সাসপেন্স, রোমান্স, সব মিলে মিশে যায়। লেখকের বর্ণনায় আর অনুবাদকের মুনশিয়ানায় ডুবে যেতে যেতে কখন যে আপনিও গল্পের একটা চরিত্র হয়ে যাবেন “ধরতে পারবেন না।” কুয়াশাঘেরা লন্ডন, টিমটিমে গ্যাসবাতি, বোগী ব্রুহামের শিকলের আওয়াজ, পুরনো কবরখানা আর সেখান থেকে উঠে আসা অপার্থিব আওয়াজ, ফিনিক ছোটা জ্যোৎস্নায় রূপালী ক্ষেত আর কালো বনজঙ্গল এক টাইম মেশিনে বসিয়ে আমাদের সোজা নিয়ে যায় উনিশ শতকের ইংল্যান্ডে, যেখানে প্রাচীন খণ্ডহরের উঠোন পরে যে দাঁড়িয়ে আছে তার মুখটা আমার বড্ড চেনা। চোখদুটো অন্য কারও। ওই গিলে খেতে আসা শ্যাওলা মাখা প্রাসাদ ওর নিজস্ব বিচরণ ভূমি। চিরপরিচিত দিনরাতের ঘর দুয়ার। কে এসে ওর চোখের ভিতর দিয়ে অর্পাথিব ছোঁয়া দিয়ে গেল আমার মনের বীণাতন্ত্রীতে। কৃষ্ণপক্ষের এক ঘোর আঁধারে প্রেতের দলকে পিছুটান দেয় ধরণী। ওরা ফিরে আসে নিজের নিজের বাসার আনাচে কানাচে। বিদেশী অলৌকিক বা ভয়ের গল্পের চেনা একটা ছক ছিল। বাংলাতেও সবাই সেই ছকেই খেলেছেন।

এক- গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রের সঙ্গে একজনের দেখা, আলাপ হবে। শেষে জানা যাবে, আলাপী লোকটি আসলে মৃত। মণিহারা অনেকটা এই ধরনের গল্প। 

দুই- ফায়ারপ্লেসের ধারে, বা ক্লাবে, বৃষ্টির দিনে এক জমায়েতে একজন তাঁর নিজের শোনা বা দেখা ভৌতিক অভিজ্ঞতা শোনাবেন। শরদিন্দুর বরদার গল্পগুলো এই শ্রেণীর।

তিন- লেখক নিজেই কোন ভৌতিক অভিজ্ঞতার শিকার হবেন। হেমেন রায়ের কুমুদিনী চৌধুরী বা মানুষ পিশাচ

চার- সরাসরি কোন ভূত নেই, কিন্তু পরিবেশ এক ভয়ের আবহাওয়া তৈরি করবে। সত্যজিতের খগম এই ধরনের গল্পের সেরা উদাহরণ। 

পাঁচ- মানুষ নয়, এক্ষেত্রে অশরীরী কোন পশু বা পাখি। শরদিন্দুর কালো মোরগ, হেমেন রায়ের শয়তান বা সত্যজিতের ব্রাউন সাহেবের বাংলো। 

সেই ধারা মেনে একে একে মণিহারা, নিশীথে বা মাস্টারমশাই লেখেন রবীন্দ্রনাথ। বাংলায় সিরিয়াস ভূতের গল্প। সেখান থেকেই হাতে ব্যাটন তুলে নেন হেমেন্দ্রকুমার রায়, দীনেন্দ্রকুমার রায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, নীহাররঞ্জন গুপ্তরা। হই হই করে চলতে থাকে বাংলা সিরিয়াস ভূতের কাহিনী। হেমেন রায় তো বিদেশী সাহিত্য থেকে ভ্যাম্পায়ার, জোম্বী, ওয়ার উলফ কিচ্ছুটি আনা বাকি রাখেননি। আর কী সুন্দর তাঁর ভাষা। পড়তে পড়তে শিউরে উঠতে হয়। তবে সাইকোলজিক্যাল ভূতের কথা যদি বলেন, তাঁর রাজা ছিলেন বিভূতি বাবু। আনমনে গল্প করতে করতে কখন যে মেরুদণ্ডে শীতল হাওয়া বইয়ে দেবেন তাঁর ঠিক নেই। অনেকটা সেই ধাঁচেরই লেখা লিখতেন সত্যজিৎ রায়। তাঁর কম কিন্তু অসামান্য ভয়ের গল্পগুলো বাংলা সাহিত্যের সম্পদ। এর পাশাপাশিই আসেন সুধীন রাহা আর মনোজ সেন। গল্পের গড়নে তাঁরা দুজনেই হেমেন বাবুর উত্তরসুরী। শব্দ দিয়ে পরিবেশের ছবি আঁকতে তাঁদের জুড়ি নেই। ঠিক যেমন কয়েকটা মাত্র বাক্যে এক একটা চরিত্রকে এঁকে দেন এক টানে। শুকতারা, নবকল্লোল-এ প্রকাশিত তাঁদের ভয়ের গল্পরা আমাদের চমকে দিয়েছে কতবার! কতরাত কেটেছে লেপের তলায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে।

এই চেনা ছকের বাইরে গিয়ে অলৌকিক বা ভৌতিককে নতুন আঙিনা যিনি দিলেন, তিনি লাভক্রাফট। হাড়হিম করা কুয়াশা ঘেরা রাত। নির্জন কবরখানা। চাঁদনি রাতে ভেসে যাচ্ছে চরাচর…এমন সময়ে একটা কবর নড়ে উঠল যেন!! বেরিয়ে আসছে মাংসহীন গলাপচা একটা হাত। ধারালো নখ। সাদা হাড় বের করা… এমন কিচ্ছু লিখে যাননি এইচ পি লাভক্রাফট। তবু ভয়ের গল্প বলতেই তাঁর কথা উঠবেই। বিংশ এবং একবিংশ শতকের সবচেয়ে কম পঠিত আর বহু আলোচিত এক লেখক। কেমন লিখতেন তিনি? প্রথমেই বলি নিজের জীবদ্দশায় মোটেই বেস্ট সেলার ছিলেন না তিনি। লিখতেন মূলতঃ পাল্প ম্যাগাজিনে। হারিয়েই যেতেন, যদি না বিংশ শতকের শেষ দিকে আবার তাঁকে আবিষ্কার করা হত। তাঁর লেখা নিয়ে মূল অভিযোগ তাঁর ভাষা। পাল্প ম্যাগাজিনে এমন ক্লাসিকভাষা খুব কম লোকই লিখেছেন। দ্বিতীয়তঃ তাঁর বিষয়। চেনা ছকের ভয়ের পাল্লায় না পড়ে তিনি ভয়কে নিয়ে গেছেন এক অন্য মাত্রায় যেখানে এক প্যারালাল ইউনিভার্সের সঙ্কেত রয়েছে অহরহ। আমাদের দুনিয়া আর সেই দুনিয়ার মাঝে এক অবিভাজ্য দেওয়াল। তাঁরা মানুষের এই দুনিয়াকে ঘৃণা করে। তবু হঠাৎ চিড় ধরতে পারে সেই দেওয়ালে। আর তখনই আমাদের দুনিয়ায় প্রবেশ করে সেই অন্য জগতের জীবরা। দেওয়ালের খাঁজে, বনের গাছের কোটরে, নদীর খাতে…কোথায় যে লুকিয়ে আছে সেই জগতে প্রবেশ প্রস্থানের চাবি…কেউ জানে না। যেমন জানে না কে এই থুলু? যার তৃষ্ণা একমাত্র রক্তের বলিতেই মেটে…কারা এর উপাসক? হয়তো আমার বাড়ির পাশের হাসিমুখ মানুষটি, কিংবা আমার কোন নিকট আত্মীয়! ভয়কে এভাবে শিরশিরানি শিহরণে মনে চারিয়ে দিতে পারেননি আগের কেউ। পো বা অ্যালজেরনন ব্ল্যাকউডের ধারাকে উত্তুঙ্গ শীর্ষে নিয়ে যান লাভক্রাফট। আর যে ভাষা নিয়ে অনেকের আপত্তি, তা অনেকটা চন্দনবনের মত। শুরুতে কাঁটা আর সাপের বাধা পেরিয়ে একবার ভিতরে ঢুকলেই স্বর্গীয় আনন্দ। 

বাংলায় অবশ্য ভূতের সবচেয়ে রমরমা ভূত চতুর্দশীর দিনে। এর গল্পটা কী? দেবরাজ বলি যিনি এককালে হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন দেবতাদের সমান। কিন্তু দেবতারা মানবেন কেন? অসুরের এই দেবতায়ন সহ্য করতে না পেরে দেবতারা বিষ্ণুকে পাঠালেন বলির কাছে। জানতেন বলির দুর্বলতা। কেউ কিছু চাইলে না করতে পারেন না। বিষ্ণুও ছলনার আশ্রয় নিলেন-

ছলয়সি বিক্রমনে বলিমদ্ভুতবামন

পদনখনীরজনিতজন পাবন!

কেশব ধৃত বামনরুপ জয় জগদীশ হরে!

আর চাইলেন তিন পা জমি। এক পা রাখলেন স্বর্গে, এক পা মর্তে… তৃতীয় পা কোথায় রাখবেন? বলি বাড়িয়ে দিলেন মাথা। তাঁর স্থান হল নরকে। কিন্তু এই ছলনায় বিষ্ণুর বিবেকে কোথাও যেন লেগেছিল। বললেন কালীপূজোর আগের দিনে চতুর্দশী তিথিতে বলিরাজ সদলবলে উঠে আসবেন মর্তে.. নেবেন মর্ত্যবাসীর অর্ঘ্য…

ভূতের ঠেলায় ফ্রাইডে দ্য থারটিন নিয়ে কিছু বলা হল না। বলে যাই। জনগণমনে একটা কথা খুব চলে। যিশু তাঁর লাস্ট সাপারে মোট তেরোজন মিলে রুটি ভাগ করে খেয়েছিলেন। তা থেকেই নাকি এই তেরোর গেরো। এখানে আর একটা কথা বলে রাখি, রুটিকে ল্যাটিনে বলে পানিস আর এক সঙ্গে শব্দের ল্যাটিন কম বাকন। তাই যার সঙ্গে একসঙ্গে রুটি ভাগ করে খাওয়া যায়, সেই আমার কম্প্যানিয়ন বা কোম্পানি। 

যাই হোক আসল কথায় আসি। বইটই ঘেঁটে যা পেলুম, তাতে বোঝা গেল তেরোর এই গল্প প্রভু যিশুর জন্মের অনেক আগে থেকে চলছে। সেই প্রাচীন নর্স মিথোলজিতে ভালহালার ব্যাঙ্কয়েটে বালদুরকে খুন করা হয় লোকি ঢোকার পরেই। লোকিই ছিল সেখানের তেরো নম্বর। সেই থেকেই নাকি তেরো নিয়ে এমন সংস্কার চলে আসছে। 

এত গম্ভীর আলোচনার পরে নিজের শোনা একটা সত্যিকারের গল্প না বললে নেহাত অন্যায় হবে। গল্পটা আমার না। আমার শোনা। আমার এক মাস্টারমশাই এক বৃষ্টির দিনে চা মুড়ি খেতে খেতে বলেছিলেন। প্রথমদিকে মনে হচ্ছিল এ তো চেনা গল্প। কিন্তু শেষে গিয়ে সব গুলিয়ে গেল। কথার মার না বাড়িয়ে গল্পটা বলি বরং…

আমাদের বাড়ি হাবড়া অশোকনগরে। সেখানেই বয়েজ সেকেন্ডারী স্কুলে আমার পড়াশুনো। ভাল ছাত্র হবার কারণে শিক্ষকদের ভালবাসা তো পেয়েইছি উপরন্তু দু একজনের সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠতা হয়ে গেছিল। এখন যার কথা বলছি তিনি আমাদের বাংলা শিক্ষক। একদিন স্যারের বাড়ি গেছি। প্রবল বৃষ্টি। সন্ধ্যা একটু আগেই নেমে গেছে যেন। বাড়ি ফেরার উপায় নেই তাই চা মুড়ি খেতে খেতে আলোচনাটা কেমন করে যেন ভূতে চলে এল। আমার ভূত দেখার অভিজ্ঞতা নেই। স্যারকে বললাম “আপনি দেখেছেন?” উনি হঠাৎ চুপ। খানিক ভেবে আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে বললেন “নাহহ! তবে এমন একটা কিছু দেখেছি, বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মেলে না।” আমি গল্পের আশায় চেপে ধরলাম। উনি চায়ে চুমুক দিয়ে গল্প শুরু করলেন…

“আমি যখন স্কুলে পড়তাম ততদিনে বড়দা চাকরি পেয়ে গেছে আর মেজদা কলকাতায় নাইট কলেজে পড়ে আর দিনে একটা ছোট চাকরি করে। আমি অশোকনগরের বাড়িতে বাবা মায়ের সঙ্গেই থাকি। দাদারা কখনো হপ্তায়, কখনো মাসান্তে বাড়ি আসতেন। তখন আমি ইন্টারমিডিয়েট দেব…একা রাত জেগে পড়তে ঘুম পায় দেখে পাড়ার বন্ধু মানিককে জুটিয়ে নিলাম। দুই বন্ধু মিলে গ্রুপ স্টাডি করলে পড়া ভাল হবে। আমাদের মূলবাড়ির পাশেই একটা ছোট ঘর ছিল। আলাদা। সেটাকেই স্টাডি রুম বানালাম। পড়া, আড্ডা ভালই চলতে লাগল। 

সেদিন সন্ধে থেকেই আকাশের মুখভার আর গুমোট গরম। তাও দেখি রাত নটা বাজতে না বাজতে মানিক খেয়েদেয়ে বইখাতা নিয়ে হাজির। অগত্যা পড়তে বসতেই হল। বসতে না বসতে প্রচন্ড মেঘের গর্জন আর তুমুল বৃষ্টি। এমন বৃষ্টি খুব কমই দেখা যায়। আকাশ থেকে ঘড়া ঘড়া জল কে যেন মাটিতে ঢালছে। এক ঘন্টা কেটে গেলেও বৃষ্টি থামার নাম নেই। মানিক একটু ঠান্ডা হাওয়া পেয়ে পড়তে পড়তে ঢুলছে। আমিও হ্যারিকেনের আলোয় শব্দ বিভক্তি আর ধাতু বিভক্তি পড়ছি। ঘরে জলের ছাঁট ঢুকছিল দেখে দরজাটা অনেক আগেই বন্ধ করেছি…তবু অতি ক্ষীণ একটা জলধারা ঘরে ঢুকে একটা দিক ভিজিয়ে দিয়েছে।

রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা হবে। আমি স্পষ্ট শুনলাম দরজায় কে যেন কড়া নাড়ল। ভাবলাম মনের ভুল। আবার এক আওয়াজ। এবার ভুল হতে পারে না। তাহলে কি বাবা কিংবা মা দেখতে এল আমরা ঠিক আছি কিনা! কে জানে? মানিক তখনও একভাবে ঢুলে যাচ্ছে। বৃষ্টি পড়ছে অবিরাম। আমি উঠে দরজা খুলে দিলাম। দিয়েই চমকে গেছি। এ কি!! এত রাতে মেজদা!! তাও আমার ঘরে। হ্যারিকেনের অল্প আলোয় দেখলাম দাদার গায়ে কালো বর্ষাতি। হাত খালি। সারা মুখে জল। আর জলের একটা ফোঁটা নাকের ডগায় ঝুলে চিকচিক করছে। আমি প্রায় চেঁচিয়েই বললাম ‘একি মেজদা! তুই এত রাতে!! ভিতরে আয়। সব ঠিক আছে তো!’ ঠিক এই সময়ে পিছন থেকে মানিক এক লাফে উঠে আমায় ঝটকা মেরে সরিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। ফিসফিস করে বলল এত রাতে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে তুই কার সঙ্গে কথা বলছিস বাবলু?’ বললাম ‘তুই কি পাগল? মেজদা এসেছে দেখ।’ ও বলল ‘দেখেছি। কেউ নেই।’

আমার জোরাজুরিতে দরজা আবার খোলা হল। কেউ নেই। বাড়ির ভিতর বাবা মা কে ডাকা হল। তাঁরা কিছু টের পাননি।টর্চ জ্বালিয়ে চারদিক দেখাও হল। 

কেউ নেই।

পরদিন সকালে বাবা বললেন ‘বাবলু, মনটা কেমন কু গাইছে। তুই একবার শিয়ালদায় মেজর মেসে যা। দেখ সব ঠিক আছে কিনা’।

শিয়ালদহ স্টেশনের কাছেই মেজদার মেস। পাঁচজন বোর্ডার। মেসে ঢুকতেই মালিকের বউ আভা কাকিমা কেঁদে বললেন ‘বাবলু আইস! তোমারে কে খবর দিল? তোমার দাদার তো কাইল রাত থেইক্যা ধুম জ্বর। অরা নিয়া এন আর এসে ভর্তি করসে’।

মোহাবিষ্টর মত গেলাম হাসপাতালে। দাদার খুব জ্বর, অজ্ঞান। পাঁচদিনের দিন চোখ খুলল দাদা। কাউকে চিনতে পারছে না। ফ্যালফ্যাল দৃষ্টি। সেদিনই রাতে মারা গেল। খুব সম্ভব মেনিনজাইটিস। বলেছিল ডাক্তার”।

এই অবধি বলে স্যার থামলেন। চায়ের কাপে চুমুক দিলেন আবার। “দেখ কৌশিক, আমি যা দেখলাম সেটা তো ভূত না, কারণ দাদা এর পরও পাঁচদিন বেঁচে ছিলেন। কিন্তু আমি কিছু একটা দেখেছি। আমার চোখের ভুল না। নইলে আমি কলকাতায় আসতেই বা যাব কেন??

আমি তাহলে কী দেখলাম?”

চিত্রঋণ – সুকুমার রায়, আবোলতাবোল 

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published.