হারাম

    বড় প্রার্থিত ঘন এক ব্যক্তিগততম ফিসফিস হয়ে বেরিয়ে এল, “আল্লাহ”। এইসব ইঁটপাথালি অবশ্য পাঁচ ছ’শ বছর ধরে হরেক ফিকিরের ফিসিফিস শুনে আসছে। তাই আলাদা করে তারা কান দিল না। নিজেদের ঝুরঝুরে হয়ে যাওয়া ফাঁকগুলোকে খানিক জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে দিয়ে সেই ফিসিফিসকে নিজেদের ভিতর নিয়ে নিল। একটা ইঁট সরিয়ে আল্লাকে এখন মীনা মুছে  যাওয়া এককালের মীনা করা ইঁটগুলোর কোটরে রেখে, ইঁটটা আবার যথাস্থানে ঢুকিয়ে দিল সে। হাত ধুয়ে নিল। আল্লাকে যথাস্থান থেকে বার করে, গামছায় পেঁচিয়ে শিকলি খুলে গোসলঘর থেকে বেরিয়ে এল। মগরীবের আজানের জন্য গলা খাঁকারি দিতে শুরু করেছে তার বড় চাচা। বাড়ি লাগোয়া মসজিদ থেকে এখনই ভেসে আসবে বড় বাঁজখাই গলার সে আজানের শেষটুকু। সেই আজানের সময়ে কয়েকটা ঘোড়াকে চড়ে বেড়াতে দেখছে সে, এখান থেকে কয়েক মাইল দূরে বয়ে চলা নদীর চরে। একফালি মিষ্টি কুমড়ার মত চাঁদ যোগ হলে সেই দৃশ্যে আল্লা লুকিয়ে আছে আশেপাশে কোথাও বলে তার মনে হয়।   

    “আর্জিনা খাতুন, সেভেন ডি, রোল একশ পনেরো, হাইট পাঁচ এক, সাতান্ন কেজি। নেক্সট  গোলাপী মোমিন আয়”, হাঁক দেয় পিটি ম্যাডাম। ডিপ ডিফেন্সে তার যে কোনোও বিকল্প নাই এই ইস্কুলে। তাকে পুরা মাস জুড়ে এইটা মনে করিয়ে দিয়েছে পিটি ম্যাডাম। এই একমাস জুড়ে সে শিখে নিয়েছে সাইড ট্যাকেলে বল থাকলেই যেতে পারে, কিন্তু পেছন থেকে ট্যাকেল একেবারেই না; পেনাল্টি বক্সে হাত পিছনে, জার্সি ধরে টানা যাবে না এখানে, আর এখানে বল পায়ে এলেই কিছু না ভেবে দুম করে উড়িয়ে দিতে হবে মাঝমাঠের দিকে, কর্ণারের সময় তাকে উঠতে হবে হেড নিতে, তারপর সড়পট মেরে নামতে হবে নিচে। তার মাথায় এত কথা একসাথে থাকে না। খাতায় লিখে দিয়েছে দিদিমণি। সে বারবার দেখে নেয় আর মাঠে নেমে পায়ে বল পেলে সব ভুলে গোল করতে উঠে যায়। “অই আর্জিনা নেমে আয়। মেরে মুখ ভেঙে দিব”, কানে আসে পিটি ম্যাডামের গলা। 

    গোটা মহকুমায় চারটা স্কুল পাওয়া গেছে যারা মেয়েদের ফুটবল দল নামাতে পারছে। তাই পুরা মাস জুড়ে হরসুন্দরী বালিকা বিদ্যালয়ে এই তোড়জোড়। জার্সি কেনা হয়েছে নতুন। মোজাগুলো রোজ রোদে শুকোচ্ছে। আর্জিনার পায়ে বল নিয়ে দৌড় এই প্রথম। তার আগে অবধি আর্জিনা  খাতুন স্কুল স্পোর্টস, জোনাল স্পোর্টস, ব্লক স্পোর্টস আর ডিস্ট্রিক্ট স্পোর্টস জুড়ে একশ মিটার, দু’শো মিটার আর আটশ মিটার দৌড়ে আসছে সেই ক্লাস থ্রি থেকে। চোস্ত লেগিংস পরে আর্জিনার দৌড়কে অনেক দূর থেকে দেখলে লাল ফড়িঙের ইতলবিতল ছুট ঠেকে, উড়াল শেষে যেন দুলফি ফুলের মধু অপেক্ষা করছে ফড়িঙ আর্জিনার। অবশ্য এমনিতে খুব একটা মিষ্টি তাকে সারা বছর ঠেকে না হরসুন্দরী বালিকা বিদ্যাপীঠের ক্লাস ফাইভ থেকে ক্লাস এইট অবধি মেয়েদের। আর্জিনার হাতে কিল খায় নি এমন মেয়ে বড় দুর্লভ। আর্জিনা কারুর পাত থেকে মিড ডে মিলের বরাদ্দ ডিম তুলে খেয়ে নেয় নি, এমন পাতও বড় দুর্লভ। তবু আর্জিনা প্রশ্রয় পেয়ে যায় খেলাধূলা হেতু। আর এই মাস জুড়ে তো আলাদাই খাতির পাচ্ছে সে। যদিও তাতে এই গঞ্জের কিছুই এসে যায় না। বড় নির্লিপ্ত ভাবে এই জায়গা নিজেকে প্রায় একইরকম রেখে দিয়েছে এর পত্তনের দিন থেকে। সেই কবে থেকে ঘোড়ার গাড়ি করে জিনিষ আসে আর যায় এখানে খালি । 

    আর্জিনা এখনও জানে না সেই সব কথা যা জানে তার গোসলঘরের ইঁটরা । এই গঞ্জের  থেকে  মাইল খানেকের ভিতরেই আলতামাস গড়। পাশে মরে যাওয়া নদীর খাত। ঔরঙ্গজেব  দিল্লীর  মসনদের দখল নিতেই মীর  জুমলাকে পাঠায় বাংলায়  শাহ সুজাকে খতম করতে। জুমলা  আসার আগেই সুজা দেয় চম্পট। পুরা হারেম নিয়েই  আরাকানের দিকে সুজা ভাগান দেয়। চাটগাঁ  হয়ে হাজার হাজার পালকি যখন আরাকানের দিকে এগোচ্ছে নাফ নদীর ধার দিয়ে, মওকা বুঝে  আলতামাস ঝাঁপিয়ে পড়ে। অজস্র পালকির দখল নেয় আলতামাস। পালকির ভেতরের হারেম কন্যাদেরও। কিছু মেয়ে ফুরসত বুঝে জলজংলার দেশে পালিয়ে যায়। যারা পালাতে পারে না  পালিয়ে যাওয়ারা চিরসুখী হয়েছে ভেবে শ্বাস ফেলে মীনা করা ইঁটের ঘরগুলোয়। আলতামাসের মতো গুরুত্বহীন কোটালও জুমলার জিগরি হয়ে ওঠে নাফ নদীর ধার থেকে লুঠে আনা মাল  নজরানা দিয়ে। কিছু স্বর্ণ, কিছু হাতির দাঁত, পোখরাজ খানিক, ঘোড়া কয়েকশো, দশ-বিশটা মেয়ে। কিছুই পারে না এরা নাচ ছাড়া। সুলতানের কানে হারেম কন্যাদের খবর গেলে কী হবে এই ভেবেই জুমলা মেয়েগুলোকে কাছে রাখার সাহস দেখায় না। নাচ ছাড়া তো এইগুলো আবার কিছু পারেও না। আলতামাসের কাছেই থাকে এরা। যারা নাচকে সবকিছু দেয়, জীবন তাদের কাছে বাকি সব জানলা বন্ধ করে দেয়। সব জানলা বন্ধ মানুষগুলিকে নিয়ে এখানে চলে আসেন আলতামাস। ঔরঙ্গজেবের নাম নিয়ে শুরু হয় শক্তিশালী হওয়া। খুবই ভালো কোটাল, এবং বাদশাহ আর কোরান হারাম মনে করে যেগুলোকে সবকিছুতেই আসক্ত। আর বাদশাহের ভয়ে ভরা দরবারে পেচ্ছাপ করে ফেলতে পারেন এমন এক  মানুষ। আসক্তি আর ভয় মিলে জন্ম নেয় আলতামাসের গড়। দরবার, কারাগার আর কোটালের প্রাসাদ ছাড়া বাকি সব দালান মসজিদ এখানে। ফজর থেকে ঈশা অবধি মসজিদে ইমাম থাকেন। তারপর ইমানের সাথে  তারা বিদায় নেন, আলতামাসের হাত থেকে নিজেদের গর্দান বাঁচাতে। ঈশা থেকে ফজর আলতামাস প্রহর। যে নর্তকীরা পুরা দিন বাড়িতে জানলা লাগিয়ে কলমা পড়ে গেছেন, তারা  জীবনের অন্য জানলা খুলে দেন। বেজে ওঠে সুরমণ্ডলী। আলতামাস বরফ জলে চোবানো একটা ইলাইচিখাস আম বেতের ছুরিতে গেঁথে মুখে চালান করতে করতে বলে বসেন, “ইনশাল্লাহ! ভাগ্যিস ভগবান কার্তিক এমন যন্ত্র পৃথিবীতে ভুলে গিয়েছিলেন”। ফজরের সময় এগিয়ে এলে এই পৃথিবীকে ভুলতে শুরু করে আলতামাসের গড়। আরেকটু পরে গৌড়ীয় মীনা করা ইঁটগুলি আলো হয়ে আসবে। সবুজ, হলুদ, গেরুয়া, সাদারা সারাদিন ধরে ধর্মে ভিজবে। ঈশার অপেক্ষায়।

    বাসে করে বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল আর্জিনার। বাস জুড়ে হাত পা ব্যথা নিয়ে মেয়ের দল আর হিপ হিপ হুররে। আর্জিনার বাঁ পায়ের থাই-এর উপরে এখনও টনটন। সিধা বুট খেয়েছে সেখানে। চারদিন পর ফাইনাল। সেরে যাবে একদম, পিটি দিদিমণি বলেছে। দিদিমণি পাশে এসে বসেছে। টনটনানির জায়গাটায় ঠান্ডা স্প্রে করে দিচ্ছে। কী আরাম আল্লাহ! জানলার বাইরে একটা মিষ্টিকুমড়ার ফালির মত চাঁদ। কয়েকটা ঘোড়া চড়ছে নদীটার ধারে। ঘোড়া থেকে গঞ্জ ফেরতা গাড়িগুলান  আলাদা হয়ে আছে সারাদিনের খাটনি শেষে।     

    “চাচা হে! শুনেছি এইসব মসজিদে বাঈজী নাচতো। ঘর বানাতে লেওয়া কি ঠিক হবে এইসব দালানের ইঁট”, দোনামোনা করে প্রায় সবাই জিজ্ঞাসা করে। 

    আলতামাসের এন্তেকাল হয়েছে দুই’শ বছর। ঔরঙ্গজেবের মরার এক যুগ আগেই। এই গড়ের এন্তেকাল প্রায় দেড়শ সন। তারপর অর্ধ শতাব্দী যথেষ্ট সাদা, গেরুয়া, হলুদ, সবুজ সব মীনাকে প্রাথমিক লালে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সেগুলোকে আবার হরেক রঙা সবুজের তলে নিয়ে যেতে বেশি সময় লাগে না ক্রান্তীয় বৃষ্টিদের। ইতিউতি তাকিয়ে গুইসাপ চলে যায়। দিনের আলো পড়তে না পড়তে বেলায় শেয়াল হাঁক মারে। লতা ভর্তি গম্বুজে রোদ পোহাতে থাকে একলা এক দুধগোখরো। এইসব অতিক্রম করে মানুষ নামক দানো আসে। বাড়ি বানাবার লাগি ইঁট নিতে। শেয়াল ভাগায়। সাপ মারে। খরগোশ ঝলসে খায়। সারদিন ইঁট ভাঙার মাঝে।  শাবল, গাঁইতি দিয়ে ঘোড়াগাড়ি ভর্তি ইঁট নিয়ে যাওয়ার সময় তামাকু হাতে নিয়ে প্রায় সবাই জিগায়, “ হারামের মসজিদের ইঁটের দালান কি হারাম?” । 

    “এই হারামে তোমাকে পুরা দায়ী করা যায় না ঠিকই, কিন্তু হাফপ্যান্ট পরি তোমার ফুটবল খেলা ঠিক হয় নাই”, বড় চাচার গলা তাকে ত্রস্ত করে তুলছে। “তোমারে তো খেলাধূলায়, পড়াশুনায় বাধা দেওয়া হয় নাই। তুমি কি আরও সতর্ক হয়ে আদবের সাথে এগুলান করতে পারতা না?”— আর্জিনা চুপ। “তুমি কি জানো মৌলানা বাড়ির মেয়েদের আদব সহি না হলে সে হারামের দায়ে সে বাড়ির নামাজীদেরও আল্লাহ শাস্তি দেন?”— আর্জিনা চুপ। “তুমি আর খেলবা না ফুটবল, কাল তো রবি, আমি সোমে তোমার স্কুলে গিয়ে বলে আসব”— আর্জিনা চুপ। এইসব কথার ঠিক পনেরো মিনিট আগে মগরীবের নামাজ শেষে বড় চাচা ফোন খুলে ধরে আর্জিনার  কাছে। তার চাচাতো দাদা সহেবুলের ফোন। শেখপুরার রিন্টু শেখ ফেসবুকের রকিং রিন্টু হয়ে  আর্জিনার থাইয়ের ছবি দিয়েছে। মুখ কুঁকড়ে প্রায় নব্বই ডিগ্রিতে পা তুলে আছে সে, হাফপ্যান্ট গুটিয়ে স্প্রে করছে পিটি দিদিমণি। ছবির সাথে লেখাঃ “লেডিস লেগ— এনজয়”। 

    প্রয়োজন আর ফোকটে পাওয়া আলতামাসের গড়ের কাঁচামালে মন খচখচ করলেও একের পর এক দালান গড়ে ওঠে এই গঞ্জে। তারও কেটে গেল একশ বছর। কিছু ইঁট ঝুরঝুরে হয়ে গেল। কত ইঁটের উপর সিমেন্টের পলেস্তরা পড়ল। কিছু গোসলঘরের চোরাকুঠুরি তৈরি হয়ে থাকল।

    খুব নরমেই নামে এসব সন্ধ্যা। খানিক দূরের জিভ বের করে নাগাড়ে লালা ঝরিয়েও এক চুরুক ঠাণ্ডা না পাওয়া কুকুরের দুপুর, বা, খানিক কাছের তিসির পিঠার পেটের ভাপ ছাড়া বিকেলের ফেলে যাওয়া খাতে যে তিশকিন রঙ লাগছে তা টের পায় মসজিদের পেছনের বাগানের  এককোণে থাকা ধ্যারাশ লম্বা মেহেগনি গাছটার সবচেয়ে উপরে থেকে রোদতিক্ত হওয়া পাতাটা। মেহেগনি গাছটা এ বাগানের বাকিদের সাথে কি করে ইয়ারানা নেভায় তা ভাবলে খানিক গুড়ুম হতে হয় বটে। কাঁঠাল, কাঁচামিঠা, জাম, কুল, লখনা, খানিক দূরের পিতোনিয়া, কাগজি লেবু, খুব কাছের পেয়ারা, অতসী, ভোর বেলা সব ফুল চুরি হয়ে যাওয়া টগর, নিম, বৃহদাকার শিশু, বাতাবিলেবু, পেঁপে, সজনা, ল্যাটল্যাটে মাদার, এদের সঙ্গে মেহেগনিটা কেমন করে যেন একসাথে আছে সেই  কবে থেকে। তার সরলবর্গীয় ঘ্যাম আজকাল এই আলফাল ক্রান্তীয়দের সাথে থাকতে থাকতে খানিক কমেও গেছে। আর্জিনার বিশ্বাস মেহেগনি গাছটার মাথায় চড়তে পারলে আলতামাস গড়ের  অনেকটা দেখা যাবে। সামনে চিকচিকাবে জল, সূর্য গোলা জল। সেটা পার  করেই খেলতে গিয়েছিল সে। শুধু গোল আটকায়নি। দু’টা গোল করেওছিল। চারপাশ থেকে সিটি পড়ছিল। তারপরে দৌড়তে গিয়েই জাঙে টান ধরে। পিটি দিদিমণি ছুটে আসে স্প্রে নিয়ে। এইসব ভেবে ভেবেই কেটে যাচ্ছে একটা রবিবার। আর সে বুঝতে পারছে তার আর ফাইনালে খেলা হবে না। কী আর করা? 

    আর্জিনা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। 

    বড় যত্ন করে মেশায় সরিষার তেল আর সাবান গোলা জল। মগরীবের নামাজ সেরে গোসলখানার পাশের কলতলায় খানিক বাদেই আসবে বড় চাচা। বড় যত্ন করে পিচ্ছিল হয়ে উঠছে কলতলা। এক শুদ্ধ নামাজীর পায়ের অপেক্ষায়। হারাম যখন হচ্ছেই পুরাই হারাম হোক। সহেবুল নামাজ পড়তে গেছে। বিছানায় তার মোবাইল। তুরতুরে পায়ে সেই মোবাইল হাতে আসে। গোসলঘরে ঢুকে যায় সে। আগেও এই কাজ করেছে সে বেশ কয়েকবার। এইবার আলাদা মজা আসছে। নামাজ শুরু হতে আর কতক্ষণ? জেড এঁকে খুলে ফেলে তালা মোবাইলের।  নামাজ  শুরু হয়েছে। এইবার একে একে খুলে ফেলে নিজের সব পোষাক। ঠান্ডা মেঝেতে বসে পা ছড়িয়ে দেয়  দু’দিকে। মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ। কী হারাম ঘটে চলেছে সেখানে! উফফ! আঙুল খুঁজে নিয়েছে তার প্রার্থিত স্থান। হে আল্লা তার হারামের শাস্তি যেন পায় তার বড় চাচা।  

    বড় প্রার্থিত ঘন এক ব্যক্তিগততম ফিসফিস হয়ে বেরিয়ে এল, “আল্লাহ”।

ছবি- কৌশিক সরখেল

শেয়ার করুন

1 thought on “হারাম”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *