হিন্দুত্ববাদ, ফ্যাসিবাদ ও নারী

( রায়া দেবনাথ স্মারক বক্তৃতা, প্রথম বর্ষ, প্রথম বক্তৃতা, ২/৮/২০২১)

পশ্চিমবঙ্গে এবারের ভোটে বিজেপির পরাজয় আমাকে অভাবনীয় আনন্দ দিয়েছে। আপনারা যারা আরএসএস-বিজেপি বিরোধিতার কাজ করেছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। আপনাদের জন্য আমার ভয় করত দিল্লিতে বসে, কারণ বিজেপির শক্তি অপরিসীম। কিন্তু একটা সাবধানবাণী- এবারে ভোটে বিজেপি হেরে গেল বলেই যে সে ল্যাজ গুটিয়ে পালাবে পশ্চিমবঙ্গ থেকে, সে বান্দাই সে নয়। এটাও মনে রাখতে হবে যে যতগুলো সিট ওরা পেয়েছে, সেরকম আর কখনও পায়নি। সব রাজ্য বা রাষ্ট্রই দমননীতি অবলম্বন করে কম-বেশি, কিন্তু বিজেপির দমননীতি মাত্রাছাড়া, লাগামছাড়া। 

দলিত-কৃষক-শ্রমিক-নারী স্বার্থ নিয়ে আন্দোলন করা ছেড়ে দিলাম, এমনকি তা নিয়ে চিন্তা করা পর্যন্ত সন্ত্রাসবাদ বলে ওরা মনে করে। চিন্তার স্বাধীনতা ওরা অমার্জনীয় অপরাধ মনে করে। হালের একটি সুইডিশ রিপোর্টে প্রকাশ পেয়েছে যে সমস্ত গণতন্ত্রের মধ্যে ভারতবর্ষের গণতন্ত্রের অবস্থা সবচেয়ে মুমূর্ষু, এত বিপন্ন আর কোনো গণতন্ত্রই নয়। সাম্প্রদায়িকতা, পিতৃতন্ত্র, দমননীতি- এসব তো সমস্ত রাজনৈতিক দলই ব্যবহার করেছে। ইউএপিএ, আফস্পা, এনএসএ এবং কলোনিয়াল সিডিশন আইনে কংগ্রেস অনেক বেশি নখ দাঁত বসিয়েছে স্বাধীনতার পর। আর গণহত্যা তো আমরা দেখেছি ১৯৮৪ সালে। সাম্প্রদায়িকতাও প্রকট বা প্রচ্ছন্ন ভাবে সব শাসনকালেই বর্তমান ছিল। বিজেপি কোনো ফাঁকা মাঠে দাঁড়িয়েছ, এমন নয়। এর বীজ আগে থেকেই ছিল। সাম্প্রদায়িকতা কতদূর যেতে পারে তা আপনারা এ রাজ্যেও রিজওয়ানুরের ঘটনার সময় দেখেছেন।

হিন্দুত্ববাদ নিয়ে বলার আগে আমি একটা কথা বলব। অনেক বার শুনতে হয়েছে ‘আপনারা হিন্দু ধর্মের নিন্দা করেন।’ হিন্দু ধর্ম আর হিন্দুত্ববাদ এক নয়, সমার্থক নয়। হিন্দুত্ববাদ হল অতি-উগ্র রাষ্ট্রবাদ। হিন্দুত্ববাদীরা এই ভারতবর্ষকে হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। তারা বলে, এ দেশ হিন্দুদের। যতদিন ধরেই অন্য ধর্মের বা সম্প্রদায়ের মানুষ এদেশে থাকুন না কেন, তাঁরা ঠিক এদেশের মানুষ নন। প্রায় একশ বছর আগে তাঁদের চিন্তাগুরু সাভারকর একথা বলেছিলেন। ১৯৩৮ সালে সংঘের দ্বিতীয় সৎসঙ্গ চালক গুরুজি গোলওয়ালকর বলেছিলেন, নাৎসি আদর্শই ভারতের আদর্শ হওয়া উচিত৷ এই আদর্শ অনুযায়ী ভারতবর্ষে সংখ্যালঘুদের কোনোরকম অধিকার থাকতে পারে না। এমনকি বাঁচার অধিকারও থাকতে পারে না। বরং রাষ্ট্রের দয়ার উপর নির্ভর করে তারা বাঁচতে পারে। খুব সম্প্রতি মোহন ভাগবৎ বলেছেন যে গোলওয়ালকরের ঐ বক্তব্য তখন প্রয়োজনীয় হলেও আজকে প্রাসঙ্গিক নয়। তাই গোলওয়ালকরের রচনাবলী থেকে ওই প্যাসেজটা বাদ দেওয়া যায়। তাই নিয়ে মিডিয়ায় ধন্য ধন্য পড়ে গেছে। আরএসএস নাকি উদার হচ্ছে, নরম হচ্ছে। সুখবিন্দর কুলকার্নি এ বিষয়ে হিন্দুদের প্রতি উৎসাহব্যঞ্জক লেখা লিখেছেন। মোহন ভাগবতের বৈশিষ্ট্যই এই যে, তিনি মাঝে মাঝে এরকম মধুর কথা বলে আমাদের এবং বিশ্বকে ভুলিয়ে দিতে চেষ্টা করেন সংঘের প্রকৃত রূপ ঠিক কী। একটা প্রশ্ন আসলে এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে, তা হল- নাৎসি আদর্শ আজ অপ্রাসঙ্গিক হলে ১৯৩৮ সালে কি তা প্রাসঙ্গিক ছিল? সিএসডিএস-এর একটি হালের সার্ভে বলছে যে, নতুন মহিলা ভোটারদের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, তাঁরা বিজেপিকে ভোট দিচ্ছেন। অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গ ব্যতিক্রম। কিন্তু সারা দেশের ছবি এরকম নয়। যাঁরা সংঘের বিভিন্ন নারী বিভাগ, নারী সমিতি নিয়ে কাজ করেছেন, তাঁরা বুঝেছেন, এই নারীরা বোকা, বিভ্রান্ত, পুরুষ-চালিত মাত্র নন। তাঁদের নিজেদের একটা দৃঢ় চেতনা ও লক্ষ্য আছে। আমরা সচরাচর সংঘকে প্রাচীনপন্থী, মৌলবাদী ইত্যাদি বলে থাকি এবং কথাগুলো সত্যি। কিন্তু এর বাইরেও অনেক কথা থেকে যায়। আমাদের বোঝা দরকার, নাৎসি মহিলারা বা আজকের ইউরোপীয় দক্ষিণপন্থী দলের নারী সংগঠকরা এই ধরনের রাজনীতিকে, যা নারীবাদী তো নয়ই, বরং যেখানে নারী কল্যাণমূলক কাজের ছিটেফোঁটা করা হয় না, সেই রাজনীতিকে কীভাবে সমর্থন করেন? এই রাজনীতিতে তাদের সঠিক ভূমিকাই বা কী? শত্রুকে গাল দেওয়া সহজ, কিন্তু শত্রুর শক্তির উৎস খোঁজা জরুরি। হিন্দু সম্প্রদায়ের চিন্তায়, আমার ধারণা, মেয়েদের একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা আছে। আমরা যদি আমাদের সাহিত্য দেখি, যেমন ধরা যাক ‘আনন্দমঠ’- সেটি স্পষ্টতই খ্রিশ্চান ও  মুসলমান বিরোধী উপন্যাস। মুসলমানরা এই সব সাহিত্যে সবাই গো-হত্যাকারী, মন্দির-ধ্বংসকারী, সবচেয়ে বড় কথা তারা সবাই হিন্দু নারীকে অপমান ও ধর্ষণ করে। তাদের মতো অত্যাচারী, অন্যায়কারী আর হয় না। ‘আনন্দমঠ’-এ দেশমাতৃকা স্বয়ং তাঁর সন্তানদের আহ্বান করছেন মুসলমান নিধনে। এটি সংঘীদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় উপন্যাস। অনেক সংঘীই আমাকে বলেছেন, তাঁরা এই উপন্যাস বারবার পড়েছেন ও ‘বন্দে মাতরম’-কে সত্যি জীবনের মূলমন্ত্র বানাতে চান। লক্ষণীয়, উপন্যাসগুলি মুসলমান রাজেন্দ্রবর্গের তথাকথিত অত্যাচার বর্ণনা করে। হিন্দু নারীরা হয় তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়েছেন, নয় আত্মহনন করে ‘হিন্দু নারীর মহিমা’ রক্ষা করেছেন। অনেকে আবার এও বলেছেন যে এই ঔপন্যাসিকরা নিজেরা সাম্প্রদায়িক ছিলেন না, কিন্তু সাম্প্রদায়িক হিংসা প্রকাশ করার ক্ষেত্রে এঁরা নারীকে প্রধান স্থান দিয়েছেন। ‘পদ্মাবৎ’ ছবিটি যদি দেখেন, তাহলে মনে হবে আলাউদ্দিন খলজি এতটাই জান্তব যে কাঁচা মাংস ছিঁড়ে খান। পদ্মিনী তাঁর থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আগুনে ঝাঁপ দিলেন। বলে রাখা ভাল, পদ্মিনী আদৌ ছিলেন কিনা তা সন্দেহাতীত নয়, যদি তিনি থেকেও থাকেন তাহলেও তিনি আর আলাউদ্দিন এক শতাব্দীর মানুষ ছিলেন না। তাহলে বিদ্বেষ নির্মাণের ক্ষেত্রে হিন্দু-নারীর পবিত্রতা রক্ষার অজুহাতের একটা ভূমিকা আছে। সাভারকার একে অসম্ভব বলশালী করে তোলেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই যে, মুসলমানরা ভারতে আসতেন যেন শুধুমাত্র হিন্দু নারীদের ধর্ষণ করতে, হিন্দু নারীর গর্ভে মুসলমানদের সন্তানের বীজ বপন করতে। সাভারকর এমনকি শিবাজিকে দোষ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শিবাজি কেন পালটা মুসলমান মেয়েদের ধর্ষণ করেননি? অর্থাৎ ধর্ষণকে যুদ্ধের ন্যায্য অস্ত্র বলা হল। দুটো দলই তা যথেচ্ছ ব্যবহার করতে পারে। এই ধারণাকে আরও দৃঢ় করল দেশভাগ ও দাঙ্গার অভিজ্ঞতা৷ সরকারি নথিতে স্পষ্ট দেখা যায় যে, দেশভাগের আগে যে রক্তক্ষয়ী অন্তর্যুদ্ধ চলেছিল, সেখানে হিন্দু-মুসলিম সকলেই একই ভাবে নারীদের উপর অত্যাচার করেছিল। কিন্তু সাধারণ হিন্দুদের বেশীরভাগ মনে করেন যে ধর্ষণ করেছিল শুধু মুসলমানরা। জ্যোর্তির্ময়ী দেবীর ‘এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা’-য় একজন হিন্দু মেয়ে খুব অবাক হয়ে শুনছে যে মুসমমান মেয়েদেরও ধর্ষণ করা হয়েছিল দাঙ্গার সময়। সে হতবাক হয়ে যাচ্ছে। এখনও অনেক হিন্দু এভাবেই ভাবে। ভিএইচপি-র এক শীর্ষস্থানীয় নেতা আমাদের কাছে আড়াই ঘণ্টা ধরে বর্ণনা করেছিলেন কীভাবে মুসলমানরা ধর্ষণ কাণ্ড চালায়, এতটাই গুরুত্বপূর্ণ এই ন্যারেটিভ। রাষ্ট্রীয় সেবিকা সমিতির এক মহিলা একবার আমাকে বলেছিলেন, ‘ওরা আমাদের অনেক ধর্ষণ করেছে, এবার আমাদের ওদের ধর্ষণ করার পালা।’ অর্থাৎ একই বাক্যে তিনি নিজের লিঙ্গ পরিবর্তন করছেন। একবার তিনি ধর্ষিতা হিন্দু নারী, একবার তিনি হিন্দু পুরুষ ধর্ষক। প্রথম যে বার রাষ্ট্রীয় সেবিকা সমিতিতে যাই, সেবার আমার সঙ্গে ছিলেন প্রখ্যাত পণ্ডিত গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক। প্রথমে থতমত খেয়ে যাই। কমবয়সী মেয়েরা তাদের অধিকারের কথা, রাজনীতি করর ইচ্ছার কথা বলছিল- যা আমাদের বেশ স্বাভাবিকই লাগছিল। তারপর বাবরি মসজিদের কথা উঠল (তখনও বাবরি ভাঙা হয়নি), আর তাদের ভোল পালটে গেল, চোখমুখ বদলে গেল। তখন তাদের কথাবার্তা শুনে আমাদের চুল খাড়া হয়ে গেল। গায়ত্রীদিকে জিজ্ঞাসা করলাম বেরিয়ে এসে, ‘কী মনে হয়? ফ্যাসিবাদ?’ উনি বললেন, ‘না, ফ্যাসিবাদকে এরা পিছনে ফেলে এসেছে। এ ফ্যাসিবাদ নয়, এ হল ন্যাশনালিস্ট সোশালিজম… নাৎসিবাদ।’ 

মনে রাখতে হবে, মুসলিম-বিরোধী প্রচার বিজেপি একা করে না, তাকে সাহায্য করে অনেক পরস্পর-সংযুক্ত নানারকম নামের সংগঠন, তৃণমূল স্তরে যারা কাজ করে। এরকম সংগঠন অগণিত, এদের কর্মী অসংখ্য, বেশির ভাগ সংগঠনের নামও আমরা জানি না। ছাত্র-শিক্ষক-শ্রমিক-কৃষক-পুঁজিবাদী-আর্মি-নেভি সবের মধ্যেই, সমাজের সর্বস্তরে এদের সুসংগঠিত সেল কাজ করে। সেবা, সাংস্কৃতিক কাজ, স্কুল ইত্যাদি গঠনমূলক দরকারি কাজ, যা সে অঞ্চলে অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তি করে না, মাটি কামড়ে পড়ে থেকে এরা তা করে। মানুষকে কিছু দেওয়ার তাগিদ থাকে এদের। রাষ্ট্র যেখানে কাজ করেনি, সেই শূন্যস্থানকে তারা টার্গেট করে। এ’দেশে সব থেকে বেশি নন-গভর্নমেন্টাল স্কুল আছে আরএসএসের। ‘একল বিদ্যালয়’ দলিত আদিবাসীদের জন্যই প্রত্যন্ত স্থানে গড়ে তোলা হয়েছে (এখানে আরএসএস-এর লোকেরা কিন্তু নিজেদের ছেলেমেয়েদের পাঠায় না)। এছাড়া ক্যাম্প করে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ট্রেনিং দেওয়া হয় যে, সমাজের বিভিন্ন অনুকূল বা প্রতিকূল অঞ্চলে কীভাবে পড়াতে হবে, কাজ করতে হবে, কীভাবে জনসংযোগ তৈরী করতে হবে। কীভাবে ছাত্র-পরিবারের ভিতরে ঢুকে গিয়ে প্রভাব বিস্তার করতে হবে। অফিসে, কর্মস্থলে, আত্মীয় মহলে, প্রতিবেশী মহলেও সাহায্য করে পাশে দাঁড়িয়ে প্রভাব বিস্তার করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে সৎসঙ্গ, যোগ, ভজনমণ্ডলী, পূজা, অর্চনা ইত্যাদির মাধ্যমে একটু একটু করে, দৈনন্দিন ভাবে, প্রায় নীরবে কীভাবে নিজেদের মতামত রেখে যেতে হবে- তাও শেখানো হয়। এদের আরও শেখানো হয় প্রতিদিনের খবর প্রতিদিনই নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গিতে রাঙিয়ে মানুষের কাছে কীভাবে পরিবেশন করতে হবে। এছাড়া চলে যেসব বধূরা আরএসএস পরিবার থেকে আসেনি কিন্তু আরএসএস পরিবারে যাদের বিয়ে হয়েছে, তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ। 

এরা অনেক কাজেই কিছু লব্ধপ্রতিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানকে পাশে পায়। যেমন আরএসএসের বিবেকানন্দ কেন্দ্রের সঙ্গে হাত মিলিয়ে রামকৃষ্ণ মিশন কাজ করে দেশের অনেক জায়গায়। ভারত সেবাশ্রম সংঘের সঙ্গে তো এরা কাজ করেই। এইভাবে নানা সমাজকল্যাণমূলক কাজ, সহমর্মী সংগঠনের সঙ্গে কাজ ইত্যাদির মাধ্যমেও ওরা জনসংযোগ করে, হিংসার রাজনীতি ছড়ায়৷ ফলে যখন দাঙ্গা হয়, তখন আর আলাদা করে জনগণকে ‘মবিলাইজ’ করতে বা উস্কে দলে টানতে হয় না এদের৷ এরা যাদের মধ্যে কাজ করে, তারা সহজেই দাঙ্গার মধ্যে শামিল হয়ে যায়। তবে জনসংযোগের প্রথম পর্বেই এরা হিংসার কথা বলে না, ধীরে ধীরে সেই প্রসঙ্গ নিয়ে আসে।  দাঙ্গার সময় এদের দ্বারা প্রভাবিত মহিলাদেরও আলাদা করে ‘মবিলাইজ’ করতে হয় না।

রাষ্ট্রীয় সেবিকা সমিতির প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৩৪ সালে। এদেশে কমিউনিস্ট মহিলাদের প্রথম অর্গানাইজেশন তৈরি হয় ১৯৫৪ সালে। মানে, আরএসএস-এর মহিলা সমিতি তারও আগে থেকে কাজ করে চলেছে। ঐ সময়পর্বে আন্দোলনকারী নারীরা ঔপনিবেশিক শাসকের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন, ভোটাধিকারের লড়াই করেছেন, দুর্ভিক্ষ-পীড়িত অঞ্চলে ত্রাণ বিলি করেছেন। কিন্তু এই মহিলারা, আরএসএস-প্রভাবিত মহিলারা, এগুলো থেকে নিজেদের গা বাঁচিয়ে চলেছিলেন। এসব ব্যাপারে তাঁদের আগ্রহ বা কৌতূহল ছিল না। কোনো ঝুঁকিপূর্ণ, প্রতিবাদমুখর কাজে এঁদের দেখা যায়নি। মূলত হিন্দু উচ্চবর্ণের, কিন্তু শ্রেণি-চরিত্র অনুযায়ী নিম্ন-মধ্যবিত্ত মহিলারা এতে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তাঁরা হিন্দুত্ববাদের আদর্শে রাজনৈতিক ভাবে তৈরি করছিলেন নিজেদের। 

আরএসএস-এর মোটো হল, ম্যান মেকিং, মানুষ গড়া। একটা একটা করে সমমনস্ক মানুষ তৈরি করা। শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতাদখল আরএসএস-এর উদ্দেশ্য নয়। যাইহোক, এই সমিতির মেয়েরা অনেক লড়াই করে, অনেক বার দাবি করে, গোলওয়ালকরের সাথে অনেক ঝামেলা করে, আলাদা মহিলা সভা তৈরি করেন। লক্ষ্মীবাই কেলকর, যিনি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা, তিনি বারবার গোলওয়ালেকরের কাছে গিয়ে দাবি আদায় করে ছাড়েন। এই সমিতির একধরনের স্বাধীন উপস্থিতি আজ সর্বত্রই লক্ষ্য করা যায়। এখানকার মেয়েরা  যখন সমিতির কথা বলে, তখন বেশ গর্বের সঙ্গে বলে যে ‘এটা সংঘের শাখার মতোই চলে বটে, কিন্তু এটা আমরা নিজেরা চালাই।’ সংঘের শাখায় যেমন, সমিতির শাখায়ও তেমন দৈনিক দুরকম কাজ। একদিকে দৈনিক ব্যায়াম, খেলাধুলো, আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণের রুটিন। অন্যদিকে সাম্প্রদায়িকতার শিক্ষা, যাকে ওরা ‘বৌদ্ধিক শিক্ষা’ বলে। আগেই বলেছি, সাম্প্রদায়িকতা তথাকথিত উদারবাদীদের মধ্যেও আছে। সুচিত্রা ভট্টাচার্যের একটা সুন্দর গল্প আছে এ বিষয়ে- ‘অসাম্প্রদায়িক’। কিন্তু ‘অল্পবিস্তর’ একটা প্রচলিত কথা হলেও এই ‘অল্প’ আর ‘বিস্তরে’ আকাশ-পাতাল তফাত, এমনকি জীবন আর মৃত্যুর তফাত। আমাদের মধ্যে জট পাকিয়ে যে নানা ধরনের ভাবনা থাকে- কোনোটা ভাল, কোনোটা মন্দ- আরএসএস-এর কাজ হল টিপে টিপে অন্য সব ভাবনা-চিন্তার সম্ভাবনাকে নাশ করে বিশুদ্ধ নির্ভেজাল সাম্প্রদায়িক ভাবনারই বিকাশ ঘটানো, তাতেই আমাদের ভরিয়ে তোলা। কীভাবে সেটা করতে হয়, সংঘ আর সমিতির মূল শিক্ষা সেটাই।

আমি একটা ছোট্ট ব্যক্তিগত গল্প বলি। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময়ে স্বয়ং আমারই এক আত্মীয় বলেছিলেন, ‘মুসলমানরা ভালো লোক নয়৷ তাদের আমি বাড়িতে খাওয়াতে পারি, কিন্তু বাড়িতে যেহেতু কমবয়সী মেয়ে আছে, তাই আমি রাতে বাড়িতে মুসলমানদের রাখব না৷’ আবার তিনি বিজেপির কথা উঠলে বললেন, ‘বিজেপি একটা ফ্যাসিবাদী দল৷’ আমি অবাক হতে তিনি বললেন, ‘আমরা কাকে না গাল দিই? মেড়ো, খোট্টা, রাঢ়ি-বারেন্দ্র, ঘটি-বাঙাল- নানা নামে নানাজনকে ডাকি। সেরকম মুসলমানদের সম্পর্কেও বলেছি। তার মানে কি তারা দেশের লোক নয়?’ 

তাই বলছিলাম, আমাদের মনে নানা ভাবনা জট পাকিয়ে থাকে। আরএসএস-এর কাজ হল জট ছাড়িয়ে একটা মূল ধারাকে বের করে তাকে পরিপুষ্ট করা।

আরএসএস, যা কিনা সঙ্ঘপরিবারের মস্তিষ্ক, সেই শীর্ষস্থানীয় সংগঠনে মেয়েদের স্থান নেই। এটা আর কোনো সংগঠনে দেখা যায় না। অথচ বিজেপি, ভিএইচপি-তে মেয়েরা আছে। আরএসএস-এর লিঙ্গধারণা মূলত প্রাচীনপন্থী। তারা ভাবে, মেয়েদের মূল কাজ শুধু ঘর সামলানো। সংসারকে রক্ষা করার ভার একান্ত তাদের, পুরুষের নয়। ঘরে যদি অশান্তি হয়, তবে দোষ তাদের, দায় তাদের। পুরুষের এক্ষেত্রে কিছু করণীয় নেই। যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, গৃহে নির্যাতন হলে তা নিবারণের চেষ্টা কি সংঘ করবে? তাহলে উত্তর হল, না। গৃহে অত্যাচার হলে ধরে নেওয়া হবে মহিলাই দায়ী, তাকেই সমস্যা মিটিয়ে নিতে হবে। অবশ্য দরিদ্র হিন্দু মেয়ের বিয়ের জন্য তারা পণের অর্থ জোগাড় করে দেয়, একে তারা সমাজসেবা বলে। অর্থাৎ পণপ্রথার পক্ষে তারা। পশ্চিমী কোনো চিন্তাধারার প্রবেশ সমিতিতে নিষিদ্ধ। অবশ্য সেই মহিলারা বলেছিল, বিদেশী কিছু জিনিস তারা নিতে পারে। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘কী কী?’ তারা বলেছিল, ‘বিদেশী মেয়েদের মতো ফিগার।’ কিন্তু বৌদ্ধিক ভাবে কোনো পশ্চিমী শিক্ষা গ্রহণ করা যাবে না। যেমন, নারীবাদ বা মার্ক্সবাদ, এমনকি দলিতদের মুক্তি নিয়ে চিন্তাও প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। আম্বেদকরকেও ‘পশ্চিমী শিক্ষায় শিক্ষিত’ হিসেবে পরিচিত করায় এরা। এসব চিন্তাভাবনা করার অনুমতি একেবারেই নেই। সেসব এদের মতে অপসংস্কৃতি। 

ভিএইচপি-র মেয়েদের নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি হয়েছিল- দ্য ওয়ার্ল্ড বিফোর হার। সেখানে প্রাচী নামের এক কমবয়সী মেয়েকে দেখা যায় আরএসএস পরিবারের। সে কঠোর অনুশাসনে বড় হয়েছে। সে গর্ব করে বলে, ছোটবেলায় কোনো একটা কথা অমান্য করায় তার বাবা তার পায়ে গরম ইস্ত্রি চেপে ধরেছিল। এখন সে বড় হয়েছে, বিয়ে করতে তার খুব অনীহা। কিন্তু বিষণ্ণ ভাবে সে বলে, বাবা চাইছেন যখন, তখন বিয়ে করতেই হবে। বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যায়? এর উত্তরে সে বলে, ‘না।’ কেন? উত্তর, ‘মেয়ে হয়ে জন্মেছি, বাবা আমাকে তা সত্ত্বেও বাঁচতে দিয়েছেন, মেরে ফেলেননি, তাই আমার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।’ আমাদের সংস্কৃতি ও সমাজের স্বরূপ ভেবে দেখুন তাহলে। 

মেয়েদের ভিতর বিভিন্ন বিষয়ে যে রাগ থাকে অসাম্যের কারণে বা অন্য কারণে, সেই রাগকে মুসলমান-বিরোধী খাতে বইয়ে দেওয়া হয়। মেয়েরা ধীরে ধীরে এমনকি বন্দুক চালানোও শেখে। প্রথমে তারা ভয় পায়, কিন্তু ধীরে ধীরে তারা বন্দুক হাতে  মুসলমানদের মারার জন্য উদগ্র হয়ে ওঠে।

তবে গোলওয়ালকর গার্হস্থ্য রাজনীতির ব্যাপারেই মূলত মেয়েদের ভূমিকাকে দেখতে চেয়েছিলেন। সেই প্রসঙ্গে গার্হস্থ্য নারীর শিক্ষা ও আচার-আচরণ, রীতি-নীতির প্রবর্তন, পোশাক, খাদ্য ইত্যাদি বিষয়ে নির্দেশিকা জারি হয়। মনে রাখতে হবে, বাইরে, কাজের জগতে আরএসএস-এর কোনো কর্মী আলাদা একটা শিক্ষা-দীক্ষার খোলস পরে থাকতে পারে। কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে সাম্প্রদায়িক হিন্দু ভাবধারায় দীক্ষিত।

মা হিসেবেও মেয়েদের অপার ভূমিকা নিতে হবে, আরএসএস-এর মতে। অর্থাৎ সন্তানদের শেখাতে হবে সাম্প্রদায়িকতার মন্ত্র, পুঁততে হবে ঘৃণার বীজ। এভাবেই ‘হিন্দু শিশু’ তৈরী করতে হবে। এই শিক্ষার  অঙ্গাঙ্গী অংশ হল মুসলমান ও খ্রিশ্চান বিরোধী হিংসার শিক্ষা৷ সাভারকর মা-শিশুর সম্পর্ক নিয়ে বলতে গিয়ে, আদর্শ মাতৃত্বের কথা বলতে গিয়ে, দিয়েছিলেন সিংহিনীর উপমা। সিংহিনী যেমন রক্তমাখা হাড়-মাসের উপর বসে শিশুকে স্তন্যপান করায়, এবং সিংহ শিশু বুঝতে পারে, বাঁচতে গেলে মারতে হয়, তেমনই হিন্দু মাকে হিন্দু সন্তানকে শিক্ষা দিতে হবে বাঁচতে গেলে তাকে মুসলমানদের মারতেও হবে, সেজন্য দরকার হলে মরতে হবে। 

এইটাই যদি একমাত্র কথা হত, শেষ কথা হত, তাহলেও অত ভয়ের কিছু ছিল না। গোলওয়ালকর বলছেন, নারী গৃহেই থাকবে বটে, গৃহেই তার ভূমিকা বটে। কিন্তু তার আশেপাশে নিশ্চয় দরিদ্র বসতি আছে, দরিদ্র ছেলেরা আছে। প্রতিটি মায়ের কর্তব্য হল, এরকম দু-একজন দরিদ্র বালককে বাড়িতে রেখে সযত্নে লালনপালন করা, অবশ্যই তার লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা। এই লালনের ভেতরেও অবশ্য হিন্দু আচার-বিচারের শিক্ষা, মুসলিম-বিদ্বেষী শিক্ষা থাকবে। গৃহপরিচারিকা যদি শিশু কোলে আসে, আর শিশু যদি কাঁদে, তবে গৃহবধূ পরিচারিকাকে বলবেন সব কাজ ফেলে আগে নিজের শিশুকে দেখতে, এমন নিদানও আছে স্বয়ং গোলওয়ালকরের। এরা দলিত-আদিবাসী হলে, এসসি, এসটি হলে তাদের বারবার স্পর্শ করার নিদান দিচ্ছেন গোলওয়ালকর।

এই মায়েদের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ছেলেরাও বড় হয়ে কিছু দরিদ্র দলিত ছেলেদের ডেকে আনবে, তাদের সাহায্য করবে, শিক্ষায় সহায়তা করবে, হস্টেলের ফিজ দিয়ে দেবে দরকারে, তাদের জন্মদিনে ডেকে খাওয়াবে, এমন ভাব করবে যেন তারা পরিবারের একজন হয়ে গেছে। এবং আবার সেই একই নিদান- ‘বার বার তাদের ছোঁবে।’ তিনি অস্পৃশ্যতা দূরীকরণের কোনো চেষ্টাই কিন্তু করেননি। তাঁর প্রয়াস ছিল, অস্পৃশ্যতা, জাতিভেদ যাতে বজায় থাকে, কিন্তু তার উপরে যেন একটা মোলায়েম প্রলেপ পড়ে। যাতে বিদ্রোহ-ভাবনা না জেগে ওঠে, যাতে আম্বেদকর যাকে ‘অ্যানিহিলেশন অব কাস্ট’ বলেছেন, তা না হয়। যাতে একরকম শোধনবাদ চলে, যাতে কাঠামোগত পরিবর্তন না হয়। এগুলো শুধু মুখের কথা ছিল না- এই আদর করা, ছোঁয়া, অনুষ্ঠানে ডাকা ইত্যাদি। 

মেঘাবর ভাবন একদর্শী নামে এক দলিত যুবক ছিল। ‘৯০-এর দশকে আরএসএস তার প্রতি সদয় হয়, আরএসএস-এর তত্ত্বাবধানেই তার বেড়ে ওঠা, স্কুলে যাওয়া, পড়াশোনা। বাবরি মসজিদ ভাঙতে সেই দলিত ছেলেও উৎসাহী ছিল। তার ভুল আকস্মিক ভাবে ভেঙে গেছিল একদিন। সে বাড়িতে আরএসএস কর্মীদের খেতে ডেকেছিল। তারা কাজের ছুতোয় আসেনি। কিন্তু খাবার নিয়ে গেছিল। পরে তার এক বন্ধু খবর দেয়, ‘তোমার মায়ের হাতের তৈরি খাবার ওরা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল, সে এখন কুকুর বেড়াল খাচ্ছে।’ সে গিয়ে দেখে, সত্যিই তাই ঘটেছে। তার মোহ ভাঙে। সে আরএসএস-বিরোধী হয়ে ওঠে। পার্থ ব্যানার্জি দুই দশক আরএসএস কর্মী ছিলেন, পরে তাঁরও মোহভঙ্গ হয়। তার বইতে তিনি আরএসএস-এর সম্পর্কে অনেক তথ্য দিয়েছেন। কিন্তু তিনি স্বীকার করেন যে, গঠনমূলক কাজটা ওরা খুব মন দিয়ে করে। তিনি দীর্ঘদিন নাগাল্যান্ড আর মণিপুরে আরএসএসের কাজকর্ম অনুসরণ করেছেন। সেই বর্ণনা পড়লে গা শিউরে ওঠে। মাটি কামড়ে, দেশে না ফিরে, স্থানীয় ভাষা শিখে, দিনের পর দিন তারা কাজ করে চলেছে। পড়ানো, স্কুল তৈরি করা, চিকিৎসা করা, অন্যদিকে খ্রিশ্চান ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো ও আদিবাসীদের বিশ্বাস করানো যে তারা নাকি আসলে হিন্দু- এই তাদের কাজ। তারা সমান মর্যাদা দিতে রাজি নয় আদিবাসীদের। কিন্তু  হিন্দু ধর্মের সঙ্গে তাদের একাত্ম বোধ করাতে তৎপর। তারা বলে, ‘আমরা এক পরিবারের সন্তান। বড় ভাই আর ছোট ভাই-এর বিরোধ তো হতেই পারে।’ এমনকি গুজরাতের বানিয়া হিন্দু সেখানে সকলের সঙ্গে পাত পেড়ে গোমাংস খায়, কিন্তু প্রতি রাতে আবার তা বমিও করে ফেলে। 

সংঘপরিবারের মহিলাদের মধ্যে এখন ভিএইচপির মহিলা শাখাই প্রধান। এর দুটো ভাগ। দুর্গা বাহিনী, যারা যুদ্ধশিক্ষায় প্রশিক্ষিত। আরেকটা নারীসমাজ- সেখানে ভালো হিন্দু মা, ভালো স্ত্রী, আদর্শ হিন্দু রমণী হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়। 

সমিতিতে আরও একটি প্রধান শেখানোর বিষয় হল, মহিলাদের ভালো ক’রে গল্প বলতে শেখানো। সেই গল্পের ভেতর দিয়ে আদর্শ প্রচার করা হয়। কারণ গল্প শুনতে বসে আমরা ভাবি না, গল্পটি ঠিক না ভুল, কল্পিত না যথার্থ, কোথায় এ গল্পের উৎসমুখ। তাই প্রচারে গল্প-বলার পদ্ধতি খুব কাজের। 

অংশু সালুজা দেখাচ্ছেন, মধ্যপ্রদেশে অ্যান্টি-রোমিও স্কোয়াডে প্রচুর মহিলাদের ঢোকানো হয়েছে। এঁরাও প্রেমিক-প্রেমিকা দেখলে একইরকম খড়্গখস্ত হয়। এছাড়া মেয়েদের জন্য আছে ‘মিলনকেন্দ্র’। সেখানে ভজন, পূজা-আচ্চা ইত্যাদির মাধ্যমে প্রচার চলে। মায়েদের শেখানো হয়, মেয়েদের সারাক্ষণ নজরে রাখতে হবে। যেন মুসলমান বান্ধবীর সাথেও সে না মেশে। তাহলে একসময় সেই মেয়ের ভাইয়ের সাথে দেখা হবে….পরিণয়, বিবাহ, শেষ পর্যন্ত মুসলমানের দ্বারা গর্ভবতী হয়ে মুসলমান সন্তান ধারণ, কিছুই অসম্ভব নয়। এরপর তাকে মধ্যপ্রাচ্যে বা বাংলাদেশে পাচার করে দেওয়া হবে- এমন ভয়ও দেখানো হয়। তাদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ হল খ্রিশ্চান মিশনারী স্কুলগুলিতে জোর ক’রে গেটের তালা খুলিয়ে অ্যাসেম্বলি হলে এই সব গল্প বলা। বারবার হিন্দু ছাত্রীদের জিজ্ঞাসা করা, মুসলমান বান্ধবী তার আছে কিনা।  

আমরা আশা করি অপর লিঙ্গচেতনা, অপর যৌন চেতনার মানুষরা স্বভাবতই বিজেপির থেকে দূরে থাকবে। কিন্তু, এনডিএ এবার NLSA -এর ট্রান্স-জেন্ডারদের নিয়ে আইন কেটেছেঁটে মেনে নিয়েছে। এরা কিন্তু এই লিঙ্গগত প্রান্তিকদের সমান অধিকারের কথা বলে না৷ বলে, হিন্দু ধর্মের মধ্যে ট্রান্সদের স্থান আছে। এই বলে তাদেরও এরা হিন্দু ধর্মীয় পরিচয়ে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করে। এরা সমকামীদের থেকে ট্রান্স কমিউনিটিকে আলাদা করছে। এইভাবে এরা এলজিবিটিকিউ সমাজে ফাটল তৈরি করছে। গড়ে উঠছে ‘কিন্নর আখাড়া’৷ অনেক ট্রান্স মানুষ সেখানে ছুটছেন। ফলে এই সম্প্রদায়ের ফাটল বাড়ছে। এই এলজিবিটিকিউ সমাজের মধ্যে আবার মুসলমান এলজিবিটিকিউ মানুষরা সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছেন।

এই বিদ্বেষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে ভালোবাসা। তাই ভালোবাসা নিয়ে সংঘ পরিবারের এত আপত্তি। এক্ষেত্রে তথাকথিত লাভ জিহাদ বিরোধী আইনের কথা বলা যেতে পারে। প্রাপ্তবয়স্ক হিন্দু মেয়ে যদি বলে সে নিজের পছন্দের মুসলিম ছেলেকে বিয়ে করেছে, সেটা যথেষ্ট নয়। তার বাবা-মা বা প্রতিবেশী যদি অন্যরকম সাক্ষ্য দেয়, তাহলেও সেই বিয়ে নাকচ হতে পারে। আমার পরিচিত এক হিন্দু মেয়ে যেমন এক মুসলিম ছেলের সঙ্গে প্রেম করত। প্রেম ভেঙ্গে গেলে অপ্রাপ্তপবয়স্ক মেয়েটিকে পুলিস বলে ছেলেটির বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনতে৷ মেয়েটি রাজি না হলে জোর করে তার হাত ধরে লেখানো হয়। মনে পড়ে নাৎসি জার্মানীর কুখ্যাত নুরেনবার্গ আইনের কথা, যা জার্মান-ইহুদি বিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিল। এসব ঘটনা এখন উত্তরপ্রদেশেও ঘটছে। এই মানবনিধনের সঙ্গে তুলনা করা যায় সাউথ আফ্রিকার অ্যাপারথেইডের। তবে আরও বেশি করে মনে পড়ে আর্য জার্মান রক্তের বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য হিটলারে রাইখ সিটিজেনস ল, যার সঙ্গে তুলনীয় নাগরিক অধিকারের সংকোচনের ক্ষেত্রে আমাদের সিএএ। এই প্রথম দেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার ব্যাপরে ধর্ম একটি শর্ত হতে চলেছে৷ 

১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এক শপথ গ্রহণ করেছিল আরএসএস। সেই শপথের সকল কার্যসূচিতেই তারা ইতোমধ্যে সফল করেছে। ইউনিফর্ম সিভিল কোড লাগু করাই শুধু বাকি। অর্থাৎ হিন্দুরাষ্ট্র গড়ার পথে তারা অনেকটা এগিয়েছে। মহিলারা এতে সবল ভূমিকা গ্রহণ করেছে। তারা এর সক্রিয় অংশীদার, শুধু এই রাজনীতির শিকার নয়।

অনুলিখন: শতাব্দী দাশ

চিত্রঋণ স্বীকার: Newsclick

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *