ভারতের প্রান্তিক লিঙ্গ যৌনতার আন্দোলনের কিছু মুহূর্ত

লিঙ্গ ও যৌনতার আন্দোলন যাকে আমরা LGBTIQKH আন্দোলন বলেও চিহ্নিত করে থাকি তা একরকম ভাবে শুরু হয় ১৯৬৯ সালের স্টোনওয়াল রেবেলিয়ন থেকে। ‘স্টোনওয়াল রায়ট’ বা ‘স্টোনওয়াল রেবেলিয়ন’ শুরু হয় নিউ ইয়র্ক এর ম্যানহ্যাটন শহরে, যখন গ্রীনউইচ এলাকায় পুলিশ স্টোনওয়াল ইন নামে একটি গে-বারে হামলা করে। স্টোনওয়াল ইন-এর গে, লেসবিয়ান, ট্রান্সজেন্ডার (GLT) মানুষেরা এবং ওই এলাকার বিভিন্ন গে-বার এর সদস্যরা রাস্তায় নেমে পুলিশের এই আক্রমণের মোকাবিলা করেন। আমেরিকার গে লিবারেশন মুভমেন্ট শুরু হয় এই স্টোনওয়াল ইন-এর ঘটনা থেকেই। প্রতিনিয়ত ঘটে চলা এরকম রাজনৈতিক ও সামাজিক হিংসার প্রতিবাদে পথে নামেন প্রান্তিক লিঙ্গ-যৌনতার মানুষ। ১৯৭০ র সালের জুন মাসে শিকাগো, লস এঞ্জেলেস, নিউ ইয়র্ক সিটি, সান ফ্রান্সিসকো ইত্যাদি বিভিন্ন শহরে আয়োজিত হয় প্রথম প্রাইড প্রোটেস্ট মার্চ। যে প্রান্তিক লিঙ্গ-যৌনতার মানুষেরা  পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও রাষ্ট্রের কাছে এতদিন লাঞ্ছিত ও অবহেলিত হয়েছিল, তারাই “সম্মানের পদযাত্রা” শুরু করেন  LGBTIQKH মানুষের সমান নাগরীকত্বের প্রশ্নে, নারী-পুরুষ দ্বৈততা নির্ভর পরিবার কাঠামোর বাইরে প্রেম ও পরিবার গঠনের কথা বলে, লিঙ্গ-যৌনতার বিভিন্ন পরিচয়ের স্বীকৃতীর দাবীতে।

ভারতবর্ষের বুকে প্রান্তিক লিঙ্গ যৌনতার অধিকার আন্দোলন বহুমুখী এবং জটিল। ১৯৯৯ সালের জুন মাসে কলকাতার বুকে প্রথম “সম্মানের পদযাত্রা”/ কলকাতা রেইনবো প্রাইড ওয়াক অনুষ্ঠিত হয়। এই পদযাত্রা ফ্রেন্ডশিপ ওয়াক বা বন্ধুত্বের পদযাত্রা বলেও পরিচিত। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে প্রান্তিক লিঙ্গ-যৌনতার মানুষরা বেরিয়ে আসেন নিজেদের মতো মানুষ খোঁজার তাগিদে – সংঘবদ্ধ হয়ে বিভিন্ন দল, সংগঠন গড়ে ওঠে, ম্যাগাজিন বেরোয়, প্রতিবাদ মিছিল আয়োজিত হয়। সমকামিতা একটি ‘ঘৃণ্য রোগ’, ‘অপরাধ’, সমকামী ও রূপান্তরকামী মানুষ ‘সমাজের কলঙ্ক’ — সমাজের এই প্রচলিত ধারণাগুলির মোকাবিলা শুরু হয়। 

এই একটু একটু করে দানা বেঁধে, ভারতে লিঙ্গ ও যৌনতার রাজনীতির পথ চলা শুরু কিন্তু HIV/AIDS সংক্রমণ কে ঘিরে। ১৯৯২ সালে দিল্লী তে সমকামী পুরুষদের ওপর পুলিশের হামলার বিরুদ্ধে এইডস ভেদভাও বিরোধী আন্দোলন (ABVA) একটি প্রতিবাদ মিছিল আয়োজন করে। সমকামী পুরুষ, কতি, হিজড়া, রূপান্তরকামী নারী – যাদের মধ্যে অনেকেই জীবিকা অর্জনের জন্য যৌন কাজের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জীবনে HIV/AIDS একটি কঠিন ব্যাধি হয়ে দেখা দেয়। HIV/AIDS কে মোকাবিলা করার জন্য রাতারাতি অনেকগুলো CBO, NGO তৈরী হয় বিভিন্ন শহরে। ১৯৯০-এর দশকে ভারত সরকারের নয়াউদারীকরণ, বেসরকারীকরণ এবং বিশ্বায়নের নীতি এইভাবেই এদেশের লিঙ্গ-যৌনতার আন্দোলন কে শুরু থেকেই বিদেশী পুঁজিতে সংগঠিত হওয়ার দিকে ঠেলে দেয়। একদিকে সমাজের লাঞ্ছনা, অপরদিকে রাষ্ট্রের বৈষম্য যা মানুষকে ঘরছাড়া করে, স্কুলছাড়া করে, মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে দেয় না, সেখানে দাঁড়িয়ে যে প্রান্তিকতার নির্মাণ  হয় তা LGBTIQKH-এর এক বড় অংশ কে সরকারের উদারীকরণ নীতির জালে জড়িয়ে ফেলে। ভারতে তাই লিঙ্গ ও যৌনতার আন্দোলনে স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার সন্দর্ভ এবং রোগ সম্পর্কিত বৈষম্য অগ্রাধিকার পায় এবং সমকামী পুরুষ ও রূপান্তরকামী নারীরা বিশ্বের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার এই কাঠামোয় প্রাধান্য পান।

পাশাপাশি আইনি পদ্ধতিতে কিভাবে স্বীকৃতি ও অধিকারের আন্দোলন লড়া যায় তার জন্য শুরু হয় IPC 377 কে চ্যালেঞ্জ করার প্রস্তুতি। ভারতীয় পেনাল কোড এর ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী যেকোনো যৌন প্রক্রিয়া যেখানে পুরুষ লিঙ্গ নারীর যোনি তে প্রবেশ করে না, তা অপ্রাকৃতিক ও দন্ডনীয় অপরাধ। অর্থাৎ, IPC ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী LGBTIQKH মানুষমাত্রেই অপরাধী। ঠিক আমেরিকার মতন এখানেও পার্ক, ময়দান, রাস্তায় কতি, হিজড়া, সমকামী ও রূপান্তরকামী মানুষদের ওপর পুলিশ অত্যাচার করে। গে ক্রুসিং1 কে রাষ্ট্র তার নীতিপুলিশী দিয়ে বেঁধে রাখতে চায়। এই আইনি লড়াইয়ে স্বভাবতই সমকামী পুরুষ ও রূপান্তরকামী নারীরা বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এর একটি প্রধান কারণ হলো তাদের জীবিকা এবং দৈনন্দিন জীবন যাপনে ক্ষেত্রে তাঁরা সবসময়ই এইধরনের পুলিশি হামলার সম্মুখীন হতে বাধ্য হতেন। ১৯৯৪ এ ABVA প্রথম চ্যালেঞ্জ করে IPC ৩৭৭ এর সাংবিধানিকতা কে। ২০০১ সালে লখনৌ এ Naz Project এ কর্মরত ৯ জনকে গ্রেফতার করা হয় এবং HIV/AIDS নিয়ে সমস্ত ক্যাম্পেইন মূলক কাজ, অফিস তছনছ করে দেওয়া হয়। মিডিয়াতে রটিয়ে দেওয়া হয় তারা  যৌন ব্যবসা এবং পাচারের সঙ্গে যুক্ত। সারা দেশ জুড়ে বিক্ষোভ মিছিলের পর সেই আন্দোলনকর্মীরা ছাড়া পান। একই বছরে National School of Indiana Universisty, National Law Commission কে সুপারিশ পাঠায়, সংবিধানের আর্টিকেল ১৫-এ তে “সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন” কে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য। ২০০১ সালের ডিসেম্বর মাসে Naz Foundation এবং Lawyers Collective এই লড়াই কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দিল্লী হাইকোর্টে ৩৭৭ খারিজ করার রিট পিটিশন জমা দেয়

IPC ৩৭৭-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটি প্রধান বক্তব্য ছিল দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যেকার যৌন বা প্রেমজ সম্পর্ক তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার, এবং এর মধ্যে রাষ্ট্র নাক গলাতে পারে না। এই যুক্তিতে সমকামী পুরুষদের আন্দোলনের সঙ্গে সমকামী নারীদের আন্দোলনের মতভেদ তৈরী হয়। সমকামী নারীরা বলেন যে এই একি যুক্তির নিরীখে মেয়েদের ক্ষেত্রে পারিবারিক হিংসাও ব্যক্তিগত ব্যাপারে পর্যবসিত হবে। ফলে, IPC ৩৭৭ খারিজ করার আইনি লড়াইয়ের প্রথম দিন থেকে সমকামী নারী এবং পুরুষদের আন্দোলনের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়। তবে ভিন্ন রাজনৈতিক মতামত সত্ত্বেও, LGBTIQKH মানুষদের আইনি অধিকার, সমান নাগরিক হবার অধিকার, স্বীকৃতি ও সম্মানের দাবীতে সমকামী পুরুষ ও নারী আন্দোলন একসঙ্গে গলা মিলিয়েছেন। দিল্লী তে সেই সময় PRISM এবং Voices against 377 বলে দুটি মঞ্চ তৈরী হয়েছিল যেখানে সমকামী পুরুষ, নারী ও রূপান্তরকামী মানুষরা একসাথে কাজ করেছেন। ২০১১ সালে যখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত, দিল্লী হাই কোর্ট-এর ২০০৯ সালের রায়ের বিরুদ্ধে IPC ৩৭৭ পুনর্স্থাপন করার নির্দেশ দেয়, তখন যে No Going Back Campaign তৈরি হয়, তাতেও বিভিন্ন লিঙ্গ যৌনতা পরিচিতির মানুষ একসঙ্গে সংগঠিত হন।

এই প্রসঙ্গে বলে রাখা দরকার, ভারতবর্ষে তথা সারা পৃথিবীতেই সমকামী নারীর আত্মপ্রকাশ ও আন্দোলনের পথ সমকামী পুরুষ এবং রূপান্তরকামী নারীদের থেকে আলাদা থেকেছে। যে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ মেয়েদেরকে সবসময় জাত, ধর্ম, শ্রেণী ইত্যাদির দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করেছে, সেখানে মেয়ে হয়ে আর একটি মেয়েকে ভালোবাসা সমাজের চোখে ক্ষমাহীন অপরাধ। এমনিতেই সমাজের চোখে মেয়েদের যৌন ইচ্ছা, আকাঙ্খা, চেতনা বলে কিছু থাকতে নেই। নারীর যৌন ক্ষুধা ও চেতনা পুরোটাই পুরুষদের দ্বারা নির্মিত এবং পুরুষ কেন্দ্রিক হিসাবেই দেখা হয়। নারী শুধু সেই চেতনায় স্ত্রী, মেয়ে, মা, বোন এর ভূমিকা পালন করে। তাই সে কখনো কখনো সহযোদ্ধা, কমরেড, বন্ধু, প্রেমিকা হওয়ার ভূমিকায় থাকলেও তা ক্ষণস্থায়ী, এবং কখনই নারীর সেই ভূমিকা সমাজে অগ্রাধিকার পায়না। তাই যে সমাজে নারীর মূল পরিচয় শুধু মা, মেয়ে, বোন, স্ত্রী হিসেবে ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যেই বাঁধা থাকে হেটেরোনরমেটিভ2 পিতৃতান্ত্রিক পরিবারকে টিকিয়ে রাখার জন্য, সেই সমাজ স্বাভাবিক ভাবেই নারীর যৌন চেতনা এবং বিশেষ করে সমকামী নারীর যৌন চেতনা নিয়ে কথা বলতে নারাজ। এই বিষয়ে সবকিছুই হয়ে ওঠে নিষিদ্ধ।

ভারতে সমকামী নারীদের সংগঠিত হওয়া শুরু হয় ৯০ এর দশকেই। ১৯৯১ সালে দিল্লী তে ‘সখী’ বলে একটি গবেষণাগার ও কালেক্টিভ তৈরী হয়। তারও আগে শোনা যায়, ১৯৮৭’র  খবরের কাগজে লীলা ও উর্মিলার কথা, পুলিশে চাকরিরত দুই মেয়ে, যারা বিয়ে করেছে বলে তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। খবরের কাগজের রেকর্ড ধরলে অনেক খবরই সেই সময়ে বেরোতো যেখানে দুটি মেয়ে যুগলে আত্মহত্যা করছে। তাদের রেখে যাওয়া চিঠি থেকে তাদের মধ্যেকার সম্পর্ক এবং পারিবারিক, সামাজিক হিংসার কথা জানা যেতো। এরকম ঘটনা এখনো বিরল নয়। উর্মিলা এবং লীলা’র ক্ষেত্রে বম্বের কিছু নারীবাদী সংগঠন আওয়াজ তোলে এবং তাদের চাকরিতে পুনর্স্থাপনের ব্যবস্থা করে। বড় শহরগুলোতে কিছু বছরের মধ্যেই বিভিন্ন লেসবিয়ান এবং বাইসেক্সুয়াল নারী সংগঠন তৈরী হয় – বম্বে তে স্ত্রী সঙ্গম (১৯৯৫), দিল্লী তে সঙ্গিনী (১৯৯৭), কলকাতায় স্যাফো (১৯৯৯), পুনে তে ওলাভা (২০০০) ইত্যাদি। 

তবে নব্বই এর দশকের শেষের দিকে এই ধরনের কালেক্টিভ তৈরী হওয়ার একটা বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও আছে। দেশে হিন্দুত্ববাদী মৌলবাদের উত্থান, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবকের সক্রিয় হওয়া, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদির উপস্থিতি নারীবাদী এবং অন্যান্য মানবাধিকার আন্দোলনে প্রভাব ফেলে। তার মধ্যেই ১৯৯৬-এ মুক্তি পায় দীপা মেহতা’র সিনেমা “Fire”। “Fire” এ হিন্দু পরিবারের দুটি মেয়ের সাবলীল ভাবে একে অপরের প্রতি প্রেমে পড়া ও একে অপরকে নির্ভর করে সব লাঞ্ছনা, নির্যাতন উপেক্ষা করে বেরিয়ে আসার আখ্যানকে হিন্দু, ব্রাহ্মণ্যবাদী পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। বম্বেতে শিবসেনা, কলকাতা, দিল্লী, ব্যাঙ্গালোরে হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ভাঙচুর, হামলা শুরু করে। এই হামলাই আবার একভাবে সমকামী নারীদের একজোট হতে, নারী আন্দোলনের সাথে হাত মেলাতে সাহায্য করে।

তবে সমকামী নারীদের নারী আন্দোলনের মধ্যে জায়গা করে নেওয়াও খুব সহজ ভাবে হয়নি। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের লড়াই, জমি ও জীবিকার লড়াই, মেয়েদের ওপর হিংসা এইসব কিছুর সাথেই যে মেয়েদের শরীর, যৌনতা জড়িয়ে আছে, এবং সেই কারণেই যে মেয়েদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যৌনতা নিয়েও কথা বলা প্রয়োজন তা নারী আন্দোলন অনেক পরে বুঝেছে। একটা সময় অবধি সমকামী নারীর জীবনবোধ ও লড়াইকে অনেক লঘু চোখে দেখা হয়েছে নারী আন্দোলনের পরিসরেও। ১৯৯৪ সালের তিরুপতি তে আয়োজিত ‘Autonomous Womens Conference’-এ প্রথম ‘লেসবিয়ান সেক্সসুয়ালিটি’কে নারী আন্দোলনে একটি রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক তৈরী হয়। যৌন হিংসা, পারিবারিক হিংসা, জমি- সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, সবই যে মেয়েদের শুধুমাত্র প্রজননকারী শ্রমে আটকে রাখার ব্যবস্থা, এবং এর উপর ভিত্তি করেই যে হেটেরোনরমেটিভ পিতৃতান্ত্রিক পরিবার টিকে আছে, সেটা নারী আন্দোলনের ইতিহাসে অনেক পরে চর্চার বিষয় হয়ে ওঠে। দুজন নারীর সম্পর্ক কিভাবে বাধ্যতামূলক বিসমকামিতা ও পিতৃতান্ত্রিক পরিবার কে ধাক্কা দেয় তা সমকামী নারী আন্দোলন বোঝানোর চেষ্টা করে। লেসবিয়ান ফেমিনিস্ট রাজনীতি বোঝানোর চেষ্টা করে নারীদের মধ্যে রোমান্টিক, যৌন বা শুধুমাত্র বন্ধুত্বের সম্পর্কও কিভাবে গুরুত্বপূর্ণ। লেসবিয়ান ফেমিনিস্ট দর্শন বা কুইয়ার ফেমিনিস্ট দর্শন শুধুমাত্র দুটি মেয়ে নয়, বরং বিভিন্ন বন্ধুত্বের সম্পর্ক, নারী-পুরুষ পরিবার কাঠামোর বাইরের সম্পর্ক, রক্তের সম্পর্কের বাইরে যেসব বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা, ঘনিষ্ঠতা, তাদের নিয়ে সমাজ গঠন, সমষ্টি গঠনের, একসাথে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। সেই দর্শন এক নতুন স্বপ্ন দেখায় যা পুরুষ প্রধান সমাজের ওপর নির্ভরশীল নয়। 

২০০৬ সালের ‘Autonomous Womens Conference’ এ আরও একটি নতুন প্রশ্ন উঠে আসে। রূপান্তরকামী নারীরা কি কনফারেন্সে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে? কলকাতায় আয়োজিত এই কনফারেন্সে অনেক রূপান্তরকামী নারীই যোগ দিতে চেয়েছিলেন। ২০০৬ সালের সেই বিতর্ক থেকে লিঙ্গ এবং তার বিভিন্নতা একটি আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায় সমকামী নারী আন্দোলনে। লিঙ্গকে যে শুধু নারী-পুরুষের দ্বৈততায় দেখা যায় না তা হিজড়া, কতি, আরাভালি, যোগাপ্পা সমাজ আমাদের অনেক আগেই বুঝিয়েছে। এই সমাজে প্রধানভাবে রূপান্তরকামী নারীরাই সংখ্যায় অনেক বেশি হলেও রূপান্তরকামী পুরুষও এই সমাজের অংশ ছিলো। সমকামী নারীদের দলগুলিতেও অনেকে নিজেদের রূপান্তরকামী পুরুষ, জেন্ডার–কুইয়ার ব্যক্তি হিসেবে অভিব্যক্ত করেন। সমাজে ট্রান্স নারী বা রূপান্তরকামী নারীরা রাজনৈতিকভাবে অনেক দিন আগে থেকে সংগঠিত হয়েছেন। কিন্তু রূপান্তরকামী পুরুষ বা ট্রান্স পুরুষেরা সেইভাবে নিজেদের কে অভিব্যক্ত করেছেন অনেক পরে। তাই তাদের রাজনৈতিক ভাবে সংগঠিত হওয়াও অনেক পরে শুরু হয়। সেই সুত্রে ২০১৪’র NALSA রায় রূপান্তরকামী পুরুষদের আত্মপ্রকাশ এবং রাজনৈতিক  লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

NALSA রায়ের ঠিক পরপরই তামিল নাড়ুতে একটি রাজনৈতিক দল, দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাজাগাম (DMK), রূপান্তরকামী মানুষদের অধিকার নিয়ে একটি Private Members Bill উপস্থাপনা করে। রাজ্য সভায় সেই বিল পাস হলেও লোক সভায় তা আটকে যায়। ২০১৬ তে সরকার লোকসভা থেকে বিল পাস করে। কেন্দ্রীয় সরকারের এই বিলকে LGBTIQKH কমিউনিটির সদস্যরা তীব্র সমালোচনা করে। বিল পার্লামেন্টারি কমিটি’র কাছে যায় এবং ২০১৭ সালে একটি রিপোর্ট বেরোয় যা কেন্দ্রীয় সরকার প্রত্যাখ্যান করে। ২০১৮ ও ২০১৯ এ বিল-এর দুটি সংস্করণ বেরোয় এবং ২০২০-তে তা Transgender Persons (Protection of Persons) Act 2020 হিসেবে পাস হয়। ট্রান্সজেন্ডার এবং কুইয়ার কমিউনিটির অনেক সমালোচনা, মিটিং, বিক্ষোভ মিছিল এর পরেও এমন একটি রায় বার করা হয় যা ট্রান্স মানুষদের আরো প্রান্তিকতার দিকে ঠেলে দেয়। এই আইনের ফলবশত ট্রান্স ব্যক্তিদের আত্মনির্ধারণের প্রক্রিয়া আরো কঠিন হয়ে যায়, জীবিকা ও সমষ্টিগত ভাবে বেঁচে থাকার উপায়গুলোও বাস্তবত অপরাধে পর্যবসিত হয়। 

এরমধ্যে দেখা যায়, একদল রূপান্তরকামী মানুষ এই আইনটি কে স্বাগত জানিয়েছেন। গত কিছু বছরে বোঝা গেছে যে ভারত সরকারের এই নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি আসলে দক্ষিণ পন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাসী কিছু সমকামী ও রূপান্তরকামী মানুষদের পরামর্শ করেই তৈরি হচ্ছে। বিজেপি শাসিত ভারতবর্ষে আজকে প্রত্যেক মুহূর্তে  যে ফ্যাসিস্ট হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মুখোমুখি হচ্ছি আমরা, সেই হিন্দুত্ববাদী চিন্তাধারায় যে ক্যুয়ার ও ট্রান্স মানুষদের একটি বড় অংশও অংশীদার তা বোধহয় আমরা সবচেয়ে ভালো বুঝতে পারছি গত কিছু বছরে। ভারতের বিভিন্ন বড় শহরে প্রাইড ওয়াক-এ এখন নতুন নিয়ম মেনে হাঁটতে হয়। এমনও ঘটনা ঘটেছে যেখানে CAA-NRC-NPR, কাশ্মীর নিয়ে স্লোগান উঠলে সেই কুইয়ার ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা হয়েছে। সরকারের উদারপন্থী নীতি নিয়ে, রাষ্ট্রীয় দমন ও অত্যাচার নিয়ে কটাক্ষ করলে সেই ব্যক্তিকে প্রাইড ওয়াক থেকে বহিষ্কৃত করা হয়েছে। প্রাইড ওয়াক শুধুমাত্র এখন সমকামী ও রূপান্তরকামী মানুষদের উৎসব হয়ে গেছে বড় শহরে। প্রাইড ওয়াক কে ঘিরে বাজারও তৈরি হয়ে গেছে। ভারতবর্ষের বর্তমান উদারনৈতিক সমাজব্যবস্থায় প্রাইডকে কেন্দ্র করে চলে বিভিন্ন কোম্পানি, কর্পোরেট এবং প্রসাধন ও ফ্যাশন ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন, আর তার সাথে মুনাফার রমরমা। 

LGBTQIKH আন্দোলনে দক্ষিণপন্থী রাজনীতি এবং পুঁজিবাদী উদারনীতি এক বড় ভূমিকা নিলেও, রাজনৈতিক চেতনার অবসান ঘটেনি। তাই ট্রান্স মানুষরা নতুন ভাবে সংগঠিত হচ্ছেন। লেসবিয়ান ফেমিনিস্ট ও কুইয়ার ফেমিনিস্ট সংগঠনগুলি প্রতিনিয়ত মোকাবিলা করছে সামাজিক ও রাজনৈতিক হিংসার। এই সংগঠনগুলি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবিকার অধিকাররক্ষার লড়াই, বৈষম্য ও হিংসার বিরুদ্ধে আইনি প্রতিরোধের লড়াই আরও জোরদার করেছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থী আন্দোলনে এবং নারী আন্দোলনে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লিঙ্গ-যৌনতার রাজনীতির প্রভাব বিপ্লবী রাজনীতির সহায়ক চেতনা এবং দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করছে। তবে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের দমন যে বিভিন্ন প্রান্তিকতার মানুষকে একসাথে এনে গণআন্দোলনের জায়গা তৈরী করছে সেখানে কুইয়ার,  ট্রান্স মানুষদের যোগদান আরও বাড়াতে হবে। গড়ে তুলতে হবে কুইয়ার ফেমিনিস্ট রাজনীতির সঙ্গে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানবিরোধী এবং বিপ্লবী রাজনীতির আরও সক্রিয় আদান প্রদান।

শেয়ার করুন

1 thought on “ভারতের প্রান্তিক লিঙ্গ যৌনতার আন্দোলনের কিছু মুহূর্ত”

  1. sayanta kr kuila

    খুব ভালো একটি লেখা, এই স্বাধীনতার লড়াই ভাবতে শেখায়।
    ভালো উপস্থাপনা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *