শর্মিষ্ঠার স্মৃতিতে কয়েকটি কথা

আজ যখন এই লেখা লিখছি তখন শর্মিষ্ঠার প্রয়াণের একমাস পূর্ণ হয়েছে। যে অস্বাভাবিক শূন্যতা এবং নিরাপত্তাহীনতা জুন মাসের ১৩ তারিখে আমাদের কাঁধে আচমকা চেপে বসেছিল তাতে আমরা এখনও ডুবে রয়েছি এক শ্বাসরোধকারী মগ্নতায়। এখনও পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারিনি কীভাবে কী সামাল দেব! কীভাবে দেব? কার ভরসায় আমরা লড়ে যাব? শর্মিষ্ঠা আমাদের অনেকটা জায়গা জুড়ে ছিল। 

শর্মিষ্ঠার এই চলে যাওয়াটা খুব একটা প্রত্যাশিত ছিল না। অসুস্থতা ওর ছিল। কিন্তু তা প্রাণঘাতী ছিল না। আমি ওকে যবে থেকে দেখছি, সেই ২০০৫ সাল থেকে, তবে থেকেই দেখি ও মাঝেমাঝেই অসুস্থ হয়। সাইনাসের মাথা-যন্ত্রণায় মাঝে মাঝেই কাবু হয়ে পড়ত। একটু ডিপ্রেশনের সমস্যাও ছিল। ওষুধ খেতে দেখেছি মুঠো মুঠো।

একটা খুব ছোট রাজনৈতিক গোষ্ঠীতে কাজ করতে গেলে কর্মীদের মধ্যে পারষ্পরিক সম্পর্ক খুব একটা ফর্মাল রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকে না। ঘনিষ্ঠতা অনেক বেড়ে যায়। শর্মিষ্ঠার সঙ্গেও তাই হয়েছিল। ২০০৭ সালে আমি যখন কমরেড অলিক, শর্মিষ্ঠা, মানসদা ইত্যাদিদের সাথে যোগ দিই তখন ঐ গোষ্ঠীর সদস্য সংখ্যা কুড়ি বাইশ হবে। তার আগে ২০০৫ সালে ওরা একটা বেশ সাড়া জাগানো লড়াই লড়েছিল ন্যাশানাল জুট ম্যানুফ্যাকচারিং কর্পোরেশন বা NJMC-র খড়দা আর টিটাগড় ইউনিটের বাধ্যতামূলক অবসর প্রকল্পের বিরুদ্ধে। লড়াইটা সাড়া জাগিয়েছিল মানে এই নয় যে, খবরের কাগজে, মিডিয়ায় তা প্রচুর জায়গা পেয়েছিল। কিন্তু টিটাগড়/ খড়দা এলাকায় সংগ্রামী ধারার শ্রমিক আন্দোলন নতুন উদ্যমে শুরু হবার স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল সেই আন্দোলনে। তাই শ্রমিকদের কাছে তা যেমন আশা ভরসার বার্তা নিয়ে এসেছিল তেমনি মালিকপক্ষের কাছে আশঙ্কার সিঁদুরে মেঘ হয়ে উঠেছিল। 

এখানেই আমি প্রথম শর্মিষ্ঠাকে দেখি। ও অনশন করছিল। অনশন শেষ হতে যথারীতি অসুস্থ হয়ে পড়ে। হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। শারীরিকভাবে খুব একটা শক্তপোক্ত কখনোই ও ছিল বলে আমার মনে হয়নি। কিন্তু আগুন ছিল ওর মনন-বলয়তে। শারীরিকভাবে শক্তপোক্ত পুরুষদের মধ্যেও যা খুবই বিরল। সেই আগুন নারীদের মধ্যেও চট করে দেখা যায় না। বিরল আর পবিত্র সেই আগুন। কবিরা বলেন বটে, “এসো আমরা আগুনে হাত রেখে প্রেমের গান গাই” (মুখে যদি রক্ত ওঠে/ বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়), কিন্তু অভিজ্ঞতায় দেখেছি সেই আগুনকে স্পর্শ করার হিম্মত খুব বেশি লোকের ছিল না। 

আমি যে সময়কালে বড় হয়েছি সে সময়ের কিছু সুবিধা ছিল, কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। আমাদের সময়ে সংশোধনবাদ, আপোষকামীতা এসবই ছিল প্রগাঢ় রাজনৈতিক। বিপ্লববাদও তাই। শর্মিষ্ঠা আমার থেকে সাত বছরের ছোট। কিন্তু আসলে ওর সঙ্গে আমার একটা বড় যুগের ফারাক ছিল। আমি ছিলাম নয়া-উদারবাদ পূর্ববর্তী সময়ের প্রোডাক্ট। শর্মিষ্ঠারা এমন একটা সময়ে রাজনীতি করতে শুরু করেছে তখন দেশে বিশ্বায়ন তথা উদারবাদ সেট করে গিয়েছে। এই নয়া যুগে দেখা গেল এখানে সংশোধনবাদ, বিপ্লববাদ উভয়েই কেরিয়ারমুখী। কেরিয়ার মানে এক বিচিত্র বস্তু। এ এক বিশেষ মানসিক অবস্থান। এক বিশেষ আইডিওলজি। পার্টি করাটাই কেরিয়ার হয়ে উঠতে পারে। আবার নিখাদ কেরিয়ার গড়েও কেরিয়ার-দর্শনের বাইরে এবং বিরোধে থাকা যায়। এই বিরোধ এবং প্রত্যাখ্যানের দর্শনটাই সমাজ থেকে হারিয়ে যেতে লাগল এই নয়া পর্বে। “পলিটিক্যাল কেরিয়ার” — এমন কথা আমরা কখনও ব্যবহার করিনি, বলতাম “পলিটিক্যাল লাইফ”। এই নতুন যুগে আকছার এই নতুন কথাগুলো ব্যবহৃত হতে থাকল।

শর্মিষ্ঠা নয়া-উদারবাদের সময়কার হলেও সজোরে প্রত্যাখ্যান করেছিল এই নেতিবাচক নতুনত্বকে। চাকরি ছেড়ে পার্টির হোলটাইমার হয়ে গেল ২০০২-তে। আমি শুনেছিলাম এই সময়ে ওদের সংগঠন একটা ভাঙনের মধ্যে দিয়ে যায়। ওদের গোষ্ঠীটিতে তখন সাত/আটজন কমরেড ছিলেন। অপূর্ব দুঃসাহস না থাকলে এমন কান্ড ঘটানো সম্ভব নয়। এই দুঃসাহস আমাদের আগের প্রজন্মের দান যা আমাদের সময়ে টিমটিম করে হলেও বেঁচেছিল। কিন্তু যে সময়ে তা ইতিমধ্যে কবরে শায়িত, তাকে জাদুকাঠি ছুঁইয়ে বাঁচিয়ে তুলেছিল শর্মিষ্ঠা। তাই কত সহজেই না আমরা যুগ-ব্যবধান পার করে বন্ধু হয়ে উঠেছিলাম। 

আমাদের সময়ের একটা বড় সীমাবদ্ধতা ছিল মার্কসবাদী রাজনৈতিক বীক্ষা এক প্রবল যান্ত্রিকতায় সমাচ্ছন্ন ছিল। কিন্তু সমাজতন্ত্রের আন্তর্জাতিক বিপর্যয় এই যান্ত্রিকতাকে ফিরে দেখতে, প্রশ্ন করতে বাধ্য করে। নারীমুক্তির প্রশ্নটি আমাদের সময়কার বিপ্লবী রাজনীতিতেও অধরা ছিল। বর্ণ-ব্যবস্থার বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়ের মত নারীমুক্তির সংগ্রামটাকেও বিবেচনা করা হত শ্রেণি-ঐক্য এবং শ্রেণি-সংগ্রাম গড়ে তোলার পথে একটা বাধা, একটা ডিসরাপশান বলে। একটা তথাকথিত সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত বলে। এর অনিবার্য ফলাফল ছিল পুরুষ-চোখে দুনিয়া দর্শন। বিপ্লবও ছিল পুরুষদের, বৈপ্লবিক কর্মকান্ড ছিল প্রবলভাবে পুরুষালী। দিন বদলের কাজটা মূলত পুরুষদের কাজ বলেই ভাবা হত। রোমান্টিক কবিতায় পুরুষ যে কাজ সম্পন্ন করে নারীর প্রতি ভালোবাসার অনুপ্রেরণায়। নারীকে ভালোবেসে, নিরন্ন-বুভুক্ষু জনতাকে ভালোবেসে যে লড়াইতে জীবন উৎসর্গ করে বিপ্লবী পুরুষ। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার ঐ লাইনগুলো নিয়ে শর্মিষ্ঠার সাথে প্রায়ই আলোচনা হত, যেখানে কবি বলছেন, “দিগন্তে কারা আমাদের সাড়া পেয়ে সাতটি রঙের ঘোড়ায় চাপায় জিন/ তুমি আলো, আমি আঁধারের আল বেয়ে আনতে চলেছি লাল টুকটুকে দিন।” খেয়াল করলে দেখা যাবে, পুরুষ বিপ্লবের এই যে প্রজেক্টটা আমাদের সামনে আঁকা হল সেখানে যেমন নারীর ভূমিকা খুব একটা নেই, তেমনই নেই জনগণের ভূমিকাও। খুব সম্ভবত, যে কারণে নারীর ভূমিকা বর্জিত হয়েছে সেই একই কারণেই জনগণের ভূমিকাও এখানে খুব একটা স্বাগত নয়। কমিউনিষ্ট আন্দোলনে বাম ও দক্ষিণ উভয় বিচ্যুতিরই অতি গভীরে কি তাহলে পুরুষবাদই হল সক্রিয় কারণ?

অথবা এখান থেকে আমরা আরও একটু এগিয়ে আসতে পারতাম আমাদের সমসাময়িকতায়। আমাদের সময়কার বিপ্লবী কবিতায় নারী আর শুধুমাত্র “আলো” হয়ে গৃহে বা মন্দিরে উপবিষ্টমাত্র নয়। সে বাইরে এসেছে, লড়াইয়ে এসেছে। কিন্তু এসেছে পুরুষের হাতছানিতে। যেখানে নারী পুরুষের ক্যাডারমাত্র। “অনেকদিন তো রইলে ঘরে মেয়ে/ লজ্জানত শান্ত এবং বধির/ এবার না হয় উজান বেয়ে নদীর/ বাইরে এলে মাথায় আকাশ নিয়ে!” (প্রিয়তমাসু/ শ্যামল ভট্টাচার্য)। অথচ ইতিহাস তো সম্পূর্ণ অন্য কথাই বলে। আমাদের ইতিহাসের কোনো যুগেই শুধু পুরুষরা লড়াই করেছে আর নারী লজ্জানত, বধির হয়ে বাড়ি বসে থেকেছে তা তো হয়নি! আমরা সবাই আজকাল তা ভালোই জানি। তাই এ নিয়ে কথা খরচ নিরর্থক। কিন্তু পুরুষচোখে যখন ইতিহাস দেখা হয় তখন তা হয়ে দাঁড়ায় সম্পূর্ণভাবে বিকৃত, এবং এই বিকৃত ইতিহাসই ইতিহাসের মূল ভাষ্য হয়ে দাঁড়ায়। কমিউনিষ্ট পার্টির ভেতর থেকে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের স্বরটা শর্মিষ্ঠার আগে এত চিৎকৃত ছিল না। এবং খুব সম্ভবত অতটা গভীরও ছিল না। আমরা কখনই খেয়াল করিনি কখন যেন আমাদের বিপ্লবের চরিত্র যেমন হয়ে উঠেছে পুরুষ-বিপ্লব, তেমনি কমিউনিষ্ট পার্টির লিঙ্গ হয়ে উঠেছে একান্তভাবেই পুরুষ। ব্যক্তি পুরুষের আদলেই কমিউনিষ্ট পার্টিকে নির্মাণ করা হয়েছে। শর্মিষ্ঠা প্রথমেই এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝান্ডা একেবারে সজোরে উড়িয়ে দেয়। এই লড়াইতে একটা সুবিধা অবশ্য ও পেয়েছিল। ২০০৭ থেকে একই সংগঠনে কাজ করার সুবাদে ওর অসাধারণ ক্ষমতা উপলব্ধি করেছিলাম। বিভিন্ন বিষয়ে ও সত্যি প্রতিভাবান ছিল। ফলে ২০১০ সালে যখন আমরা রেডস্টারের সঙ্গে মিলন প্রক্রিয়ায় গেলাম তখন ও সহজেই কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা করে নেয়। শুধু তাই নয়, বিশ্বনারী সম্মেলন (World Women’s Conference) নামের আন্তর্জাতিক সংগঠনের একজন নির্ভরযোগ্য নেতৃত্ব হয়ে উঠে। জার্মান, ডাচ কিংবা সুইডিশ মহিলাদের পাশে ভারত থেকে একজন প্রতিভাশালী আন্তর্জাতিক নারী সংগঠকের উদয় হয়। এসবের ফলে “ফ্রম উইদিন” ওর লড়াইটাও জমজমাট হতে পেরেছিল। আর এই লড়াইতে ও আমাদের মত একযুগ আগেকার লোকেদের টান মেরে সীমাবদ্ধতার চেকপোস্ট পার করে এনেছিল। আবারও  ঘুচে গেছিল যুগ-ব্যবধান।

আমরা বুঝেছিলাম, কমিউনিষ্ট পার্টিকে নারীদের টেনে আনতে হবে বিপ্লবের ময়দানে। কিন্তু এটা ভাবি নি যে, সে বিপ্লব যদি হয় নিছক পুরুষ বিপ্লব তবে তাতে নারীরা আসবে কেন? শর্মিষ্ঠা প্রথমত এটা আমাদের ভাবিয়েছিল। দ্বিতীয় যে বিষয়টা নিয়ে ও গভীরভাবে কাজ করেছিল তা হল কমিউনিষ্ট পার্টি নারীপ্রশ্নে সঠিক অবস্থান নিতে না পারলে সত্যিকারের অর্থে কি হয়ে উঠতে পারে কমিউনিষ্ট পার্টি? এটি আরও গভীর দার্শনিক-সাংস্কৃতিক ট্রান্সফর্মেশনের প্রশ্ন। শর্মিষ্ঠা এইভাবে পার্টির রাজনৈতিক স্তরটা একটা অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছিল। 

অবশ্য এই লড়াইটা খুব মসৃণ ছিল না। ভেতরে বাইরে প্রভূত সংঘাত ঘটতে ঘটতে গেছে। আসলে পুরুষদের মধ্যে “পুরুষ চোখ” এতটাই স্বাভাবিক যে, ব্যাপক সামাজিক পরিসরের কথা তো ছেড়েই দিলাম, অধিকাংশ সময়ে পুরুষ সাথীরা বুঝতেই পারেন না সমস্যাটা কোথায় হচ্ছে। শর্মিষ্ঠার একটা বড় গুণ ছিল, সংঘাতকে ও কখনই এড়িয়ে যায় নি। সদা সর্বদাই, কখনও হয়তো একটু খাড়াখাড়িই হবে হয়তো, ও একেবারে মুখোমুখি সামনা করেছে সকল বিরোধিতা অথবা প্রতিকূলতার। জনপ্রিয়তার তোয়াক্কা ও করে নি। কিন্তু তার পরেও ও পেয়েছে পার্টির ভেতরে বাইরে বহু মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা। আপোষপথে সংঘাতহীন মিষ্টি হয়ে না থেকেও যে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা পাওয়া যায় তা শর্মিষ্ঠাকে দেখে শেখার ছিল।

ট্রেড ইউনিয়ন থেকে নারীমুক্তি আন্দোলন, কমিউনিষ্ট পার্টির পুনর্জীবন থেকে বাস্তবের মাঠে ময়দানের লড়াই সবেতে ও প্রবলভাবে ছিল। নইলে ভাঙড় আন্দোলনের অন্যতম প্রধান রূপকার ও হতে পারত না। সরকারের রোষানলে রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলায় অভিযুক্ত হতে হত না। জেলবাস করতে হত না। তাই ভাঙড়ের মানুষের মত অনেক জায়গার সাধারণ মানুষের নয়নের মণি ছিল শর্মিষ্ঠা। 

শর্মিষ্ঠার সাথে একসাথে কাজ করতে পারার সৌভাগ্য তাই সত্যিই বিরাট। শর্মিষ্ঠার অভাব পূর্ণ করতে পারা তাই অতীব কঠিন। 

শেষ বিদায় কমরেড। 

রক্তিম স্যালুট!

 

শর্মিষ্ঠা চৌধুরীর বাংলা এবং English অন্যান্য লেখা পড়তে পারবেন বামায়। 

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *