মেরি টাইলারের পথ ধরে

নারী অধিকার আন্দোলন কর্মী বি.অনুরাধার গল্প সংকলন Prison Notes of A Woman Activist- এর ‘In Footsteps of Mary Tyler’-গল্পের বাংলা অনুবাদ। ২০০৯ সালের অক্টোবর মাসে, অনুরাধাকে গ্রেফতার করে ঝাড়খণ্ড পুলিস। সিপিআই (মাওবাদী) দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিযোগ আনা হয় তাঁর বিরুদ্ধে। চার বছর হাজারিবাগ কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে থাকেন অনুরাধা। এখানেই জেলের অভিজ্ঞতা নিয়ে, সহবন্দীদের নিয়ে তেলুগু ভাষায় ২৮টি ছোটগল্প লেখেন।  এর মধ্যে ১৭টি গল্প নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। পরে সেই গল্পগুলির ইংরেজি তর্জমা একটি সংকলন আকারে প্রকাশিত হয়। বর্তমান গল্পটি সেই সংকলন থেকে অনূদিত। গল্পটি তেলুগু থেকে ইংরেজি করেছেন গীতা রামাস্বামী।

মহিলা ওয়ার্ডের সামনে একটা বিশাল কাঁঠাল গাছ ছিল। তার নীচে ছিল একটা গোল বেদি। রোজ সকালে আমাদের খবরের কাগজ পড়ার জায়গা ছিল এই বেদি। সেই সময়ে ডিউটি-তে থাকা জমাদারও সাধারণত আমাদের সাথেই বসতেন। তিনজন মহিলা পালা করে জমাদারের দায়িত্বে থাকতেন— দুজন বয়স্ক মহিলা আর একজনের বয়স কম। প্রতি শিফ্ট-এ থাকতেন দুজন। 

সেদিন ডিউটি-তে ছিলেন এক বয়স্ক আদিবাসী মহিলা। এই সময়ে আমি সবে সবে রাজনৈতিক বন্দী হয়ে জেলে গেছি। আমি অন্ধ্র প্রদেশের লোক, হিন্দি খবরের কাগজ পড়তে আমাকে বেশ বেগ পেতে হত, সাহায্য চাইতে হত এর ওর। 

সেদিন সেই বয়স্কা জমাদার আমাকে এসে বলেন, 

‘তোমাকে দেখলে আমার একজনের কথা মনে পড়ে জানো? বিদেশী একজন। অনেকদিন ছিল এখানে। তোমার মতই হিন্দি জানত না, শেখার চেষ্টা করছিল। তুমি অন্য বন্দীদের সঙ্গে যেভাবে কথা বল, যেভাবে ব্যবহার কর, সেও তা করত। সেও রাজনৈতিক বন্দী ছিল, তোমার মতই পার্টি কেস-এ ঢুকেছিল। ব্রিটিশ মহিলা…’

‘মেরি টাইলার-এর কথা বলছ নাকি?’ তাকে মাঝপথে থামিয়ে কৌতুহলী হয়ে জানতে চাই

তিনি অবাক, ‘তুমি তার কথা জানলে কী করে?’

‘আমি ওর বই পড়েছি।’

জমাদার তো আনন্দে আত্মহারা। ‘তাই? খুব ভাল মানুষ ছিল। বইয়ে আমার কথাও লিখেছে।’

আমি মেরি টাইলারের বইটা পড়েছিলাম ১৯৯২ বা ৯৩ সাল নাগাদ, তেলুগু অনুবাদে। ষোল সতেরো বছর পর ২০০৯ সালে সব কিছু আর মনে ছিল না। মেরি টাইলারও যে হাজারিবাগ জেলেই ছিল এটা আমার মাথাতেই আসেনি।
জমাদার বলে চলেন, ‘ওর বর অমলেন্দু ছিল ছেলেদের ব্যারাকে। তুমি ঝা-বাবুকে চেন, ওয়ার্ডার? সে আর আমি তখন কাজ করতাম। ঝা-বাবু আমার থেকে দুবছরের বড়। অমলেন্দুর সেল-এর কাছে ওঁর ডিউটি পড়ত। একজন বাঙালি মহিলাও ছিল— কল্পনা। সেই সময়ে ১ নম্বর আর ২ নম্বর ওয়ার্ড একটা সেল হিসেবে ব্যবহার করা হত। মেরি আর কল্পনাকে দুটো আলাদা সেল-এ রাখা হয়েছিল।’
আমি তো হতবাক। এখন ওই ছোট ঘরগুলির একেকটিতে তেরজন করে বন্দী আর চারটে বাচ্চা। আমি সেলগুলি আবার দেখতে যাই। সেল-এর সামনের ছোট্ট ঘরটা তখন জমাদাররা ব্যবহার করত মেরি আর কল্পনার ওপর নজর রাখতে। আমি যখন জেলে ছিলাম এটাকে রসুইঘর বলা হত। জেল কর্তৃপক্ষ ঘরটা এমনিই ফেলে রেখেছিল। সাজাপ্রাপ্ত বন্দীরা, যারা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজে বহাল হত, ওখানে রান্নাবান্না করত। তাই নাম রসুুইঘর। রান্না করা মানে ঠিক পুরোপুরি রান্না না। স্বাদ-গন্ধহীন ডালকে একটু জল মরিয়ে নিয়ে বা পেঁয়াজ টমেটো দিয়ে নেড়ে নেওয়া। 

মেরি টাইলার এই জেলেই ছিল জানতে পারার পর থেকে আমি ছটফট করতে থাকি। মনে হয় মেরি টাইলারের বইটা আমাকে আবার পড়তেই হবে। তখনই বইটা চেয়ে পাঠাই বাড়ি থেকে। চিঠি পাঠানো এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া। একজন বন্দী চিঠি লেখার পর সেটা প্রধান ওয়ার্ডারের কাছে যাবে। সে অফিসে চিঠি জমা করবে। সেখানে রেজিস্টারে নথিবদ্ধ করে চিঠিটা পাঠানো হবে বড়বাবুর কাছে। বড়বাবু চিঠিটা পড়ে সেটা পাঠাবে জেলার-এর কাছে। সাধারণ চিঠি হলে জেলার সই করে চিঠিটা পাঠিয়ে দেবে। যদি রাজনৈতিক বন্দীর চিঠি হয়, তাহলে জেলার চিঠিটা পড়বে তারপর জেল-সুপারকে পাঠাবে অনুমোদনের জন্য। সুপার পড়ে সই করলে তারপর চিঠি ছাড়া হবে। একটা চিঠি পোস্ট হতে সাধারণত হপ্তা খানেক পার হয়ে যায়।

আমার চিঠি পৌঁছতে তিন সপ্তাহ লেগে গেছিল। সেই সময়ে আমার পার্টনার হায়দ্রাবাদ জেলে বন্দী। আমার চিঠি পৌঁছনোর পর ওকে একবার হাজারিবাগ কোর্টে আনা হয়। আমার জন্য বই, জামাকাপড়, শুকনো খাবার আর ফল নিয়ে এসেছিল। আমাকে সেগুলি দেওয়ার জন্য বিচারপতির থেকে অনুমতি চাইলে বিচারপতি নির্দেশ দেন আমাকে পাহারা দেওয়া পুলিসদের হাতে ওগুলো দিতে। জিনিসগুলো ভাল করে পরীক্ষা করে দেখে তারপরই আমাকে দেওয়া হবে। আমার পাহারায় থাকা ঝাড়খণ্ড পুলিসের কর্মীরা, অন্ধ্র প্রদেশ পুলিস, আদালত কর্মী ও দুপক্ষের উকিলের সামনে জিনিসগুলো পরীক্ষা করে। ওখানে কী আছে আর কী সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে সেদিকে আমার তখন বিশেষ নজর ছিল না। তখন বরের সঙ্গে কথা বলাতেই বেশি উৎসাহ। 

সে বলে আমার জন্য মেরি টাইলারের বইটা সে এনেছে। ওর কাছে একটাই কপি ছিল। ‘ভেবেছিলাম ওদের বলব জেরক্স করে দিতে, তারপর ভাবলাম এতটা বয়ে আনলামই যখন আর ফেরৎ নিয়ে যাই কেন?’ সে বলে।

এরই মধ্যে পুলিসের তরফ থেকে বিচারপতিকে জানানো হয় আমার জন্য আনা জিনিসের মধ্যে আপত্তিকর কিছু নেই। আমাকে বলা হয় জেলে জিনিসগুলো পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তবে জিনিস আমি পাই না। দুদিন পর খোঁজ করলে জানতে পারি জেলা পুলিস কর্তৃপক্ষ জিনিসগুলো নিয়ে নিয়েছে। একের পর এক অজস্র দরখাস্ত করতে থাকি, খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিই,  তারপর গিয়ে সেই জিনিস আমার হাতে আসে। প্রথমে আমাকে শুধু খাবার আর কাপড়জামা দেওয়া হয়। আরও একবার অনশন শুরু করার পর, পত্রপত্রিকাগুলো হাতে পাই, তবে শুধুই মূলধারার পত্রপত্রিকা। কোন ক্ষোভ-বিক্ষোভেই কাজ হয় না। মেরি টাইলারের বই আর আমার জন্য আনা ব্যাগভর্তি অন্যান্য বই কিছুতেই আমাকে দিতে রাজি হয় না জেল কর্তৃপক্ষ। মনে হয়, এত বছর পরেও মেরির নামে ওরা কাঁপে!

এর কিছুদিনের মধ্যে আমি খোঁজ পাই জেলের লাইব্রেরিতে মেরি-র বইয়ের একটা হিন্দি অনুবাদের কপি আছে। কী পরিহাস! হিন্দি ভাল করে পড়তে না পারলেও ওই অনুবাদটাই জোগাড় করব ঠিক করি। প্রথমে আমাকে বলা হয় বইটা কেউ একটা পড়তে নিয়েছে। মাসের পর মাস বইটা পাই না। শেষ অবধি জেলার বলেন তিনি প্রথমে বইটা পড়ে দেখতে চান। আমি এতবার করে চাওয়ায় তিনি কৌতুহলী হয়ে পড়েন। বইটা শেষ করতে তাঁর বহুদিন লেগে যায়। ডিউটির মাঝে সময় হত না। মাঝে মাঝে একটু একটু করে পড়তেন। আমি হাল ছাড়িনি। যখনই আমাকে কোর্টে নিয়ে যাওয়া হত আমি বইটা চাইতাম। আমার লাগাতার জ্বালাতন সহ্য করতে না পেরে শেষ অবধি জেলার বইটা আমাকে দেন। হিন্দি বইটা চাওয়া শুরুর করার পর পাক্কা দুবছর লেগেছে বইটা হাতে পেতে। আমার শেষ ইন্টারভিউ-এর দিন তেলুগু বইটাও আমি পেয়েছিলাম। আমি ছাড়া পাওয়ার আগে শেষ যখন বাইরের কেউ আমার সঙ্গে দেখা করে, সেদিন।

মেরি টাইলার এই জেলে ঠিক পাঁচ বছর ছিলেন, ১৯৭০ থেকে ১৯৭৫। জরুরি অবস্থা ঘোষণা হওয়ার দিন মেরিকে জেল থেকে সোজা বিমান বন্দরে নিয়ে গিয়ে লন্ডন পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই পাঁচ বছরে তাঁকে একবারের জন্যও অমলেন্দুর সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি, এমনকি ডিপোর্ট করার দিনও না।

লন্ডন পৌঁছে মেরি লেখেন My Years in an Indian Prison। প্রথমে হিন্দিতে ও পরে তেলুগুতে অনুবাদ হয় এই বই। এর প্রায় চার দশক পর হাজারিবাগ জেলে আমি তাঁর অভিজ্ঞতার কথা পড়ছিলাম। কোন কোন ক্ষেত্রে কিছু বিষয় প্রায় একই আছে দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম। সেই সময়ও জেলের ব্রেকফাস্টে ছোলা দেওয়া হত। কেউ সেগুলো খেতে চাইত না, ইন্টারভিউ-এর দিনের জন্য জমিয়ে রাখত। এই দিন এই একই জেলে থাকা আত্মীয়দের সঙ্গে তারা দেখা করতে পারে। কিছু জিনিস অবশ্যই বদলেছে। মেরি লিখেছেন মাছিরা সকালের শিফ্ট-এ কাজ করত আর মশারা রাতের শিফ্ট-এ। আমার সময়ে মাছি আর মশা দুটোই দুই শিফ্টেই কাজ করত। রাতের বেলা মাছি দেখে আমি বিরক্ত হয়ে যেতাম।

একই জেলে থাকা সত্ত্বেও মেরিকে একবারের জন্যও তার পার্টনারের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। আমিও যখন প্রথমবার আমার বরের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি চাই, আবেদন খারিজ হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে আমি সুপারকে লিখি, ‘নিয়মে আছে বন্দীরা তাদের আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে পারে। আমিও আমার বরের সঙ্গে দেখা করতে পারি। আমার অধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে কেন? কোন আইনে জেল কর্তৃপক্ষ আমার হক আমার থেকে কেড়ে নিচ্ছে? জেল কর্তৃপক্ষ জানাতে বাধ্য কেন আমার অধিকার আমাকে দেওয়া হচ্ছে না ও একজন বন্দী হিসেবে এটা জানা আমার অধিকার।’
যে জমাদার আমার আবেদনটি জমা নেন তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘তোমার পার্টির কাউকে কোনওদিন ইন্টারভিউয়ের অনুমতি দেওয়া হয়নি। তোমার আবেদনও ওরা মঞ্জুর করবে না।’ 

সুপার আমাকে পরে বলেন, আমার আবেদনটি নিয়ে জেল কর্তৃপক্ষ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে, আর তারাও খুব ভাল করে জানত আমার আবেদন খারিজ করার কোনও যুক্তি তাদের কাছে নেই, তাই তারা ঠিক করে যে আমার আবেদন মঞ্জুর করে দেওয়াই ভাল। এইভাবে আমি আমার পার্টনারের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাই। আমি অবশ্য ঠিক করেছিলাম আবেদন মঞ্জুর না হলে আমি আবার অনশনে বসব— জেলের ভেতর প্রতিবাদের তো ওটাই একমাত্র পথ।

মেরির দেওয়া ইন্টারভিউয়ের দিনের বর্ণনার সঙ্গে আমার অভিজ্ঞতা মিলে যায়। এই দিনটা বেশ উৎসবের মেজাজ থাকে জেলে। বন্দী মহিলারা সেজেগুজে তৈরি হয়, যেন যাত্রা দেখতে যাচ্ছে। পাকোড়া ভাজে। একটাই পার্থক্য, মেরির সময়ে মেরিকে রান্না করার জন্য রেশন দেওয়া হত। আর সেই জন্য মেরির কাছে একটা স্টোভও ছিল। তাই ইন্টারভিউয়ের দিন সকলে তাদের বাঁচিয়ে রাখা ছোলা দিয়ে কিছু জলখাবার বানাতো মেরির স্টোভে। সবার হয়ে গেলে শেষে মেরি রান্না করতেন। আমি যখন জেলে ছিলাম তখন কারোরই জেলের ভিতর রান্না করার অনুমতি ছিল না। আমাদের বলা হয়েছিল কেউ যাতে গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করতে না পারে তাই এই নিয়ম। জেলের ভেতর আগুন জ্বালানোর অনুমতি না থাকলেও, কাগজ, শুকনো পাতা, ও অন্যান্য দাহ্য আবর্জনা জ্বালিয়ে আমরা টুকটাক রান্না করতাম। এটা সকলেই জানত। ক্ষুব্ধ মহিলাদের শান্ত রাখার জন্য কর্তৃপক্ষ এগুলো দেখেও দেখত না।

একবার একটি বাচ্চা ছেলে মেরিকে একটা ফুল এনে দেয়। এত আনন্দ পেয়েছিলেন যে একটা গ্লাসে জল ভরে তাতে ফুলটা রেখে দেন মেরি। সুপার হঠাৎ করেই পরিদর্শনে আসে এবং ফুলটা দেখতে পেয়ে তাণ্ডব শুরু করে। মেরির সব জিনিসপত্র ভেঙে চুরমার করে দেয়।

আমার সময়ে বিপ্লবী পার্টির মহিলা কর্মীদের আলাদা সেল-এ রাখা হত না, পুরুষদের যেমন হত। মহিলা ওয়ার্ডের  ভিড়ে ভরা সেলগুলোকে পরিবর্তন করে ওয়ার্ড করা হয়েছিল। রাজনৈতিক বন্দীদের কড়া নিরাপত্তায় আদালতে নিয়ে যাওয়া হত। অনেক সময়ই পাহারা দেওয়ার লোকের অভাবে কোর্টেই নিয়ে যাওয়া হত না, মেরিও তার বইতে এই অভিজ্ঞতার কথা লিখেছে। আদালতে পেশ করার সময়ে হাতকড়া পরিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যাওয়া হত, যদিও এবিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে মহিলা রাজনৈতিক বন্দীদের হাতকড়া পরানো হত না।
অনেক ক্ষেত্রে অবশ্য উন্নতি হয়েছে। মেরি লিখেছেন, প্রচন্ড ঠাণ্ডার মধ্যেও মেয়েদের চটি পরার অনুমতি দেওয়া হত না। আমার সময়ে এটা ছিল না। আমরা জেলে জুতো পরতে পারতাম। তবে, জেলারের ঘরে ঢোকার আগে বাইরে জুতো খুলে ঢোকার রীতি ছিল। আমি কোনওদিনই এটা মানিনি। একবার ওয়ার্ডার যখন আমাকে জুতো খুলে ঢুকতে বলে, আমি বলি, জেলারের ঘরেই তো ঢুকছি, কোনও মন্দিরে তো আর ঢুকছি না। সে চুপ করে যায়। কেউ কেউ রাজনৈতিক বন্দীদের শ্রদ্ধা করত, আর বাকিরা ভয় পেত।

মেরি লিখেছেন, জেলে আসার সময়ে সে যে জামাটা পরেছিল তা ছাড়া তার কাছে আর কোনও জামা ছিল না। আমি চমকে গেছিলাম, মেরি যখন অন্তর্বাস চান জেল কর্তৃপক্ষ গৃহ মন্ত্রককে জানায়। সাজাপ্রাপ্ত বন্দীদের ইউনিফর্ম দেওয়া হয়। কিন্তু মহিলা সাজাপ্রাপ্তদের কোনও অন্তর্বাস দেওয়া হয় না। বাড়ি থেকে এগুলো আনানোর অনুমতি রয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ সাজাপ্রাপ্ত মহিলাদের সঙ্গে কেউ দেখা করতে আসে না। মেরি লিখেছেন, জেলে কোনও বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল না। অন্যদিকে আমাদের, সারা রাত ধরে জ্বলা চড়া আলোতে ঘুমোতে অসুবিধা হত। 

মেরি জেলের ভিতর ভারতের বাস্তবতা দেখেন। সহবন্দীদের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে ভারতের পিতৃতান্ত্রিকতার বিভিন্ন দিক মেরি বুঝতে পারেন। বর্ণ ও জাতি ব্যবস্থা ও অস্পৃশ্যতার পচাগলা রূপ দেখে মেরি চুপ করে সিঁটিয়ে থাকেননি। এই ধরনের প্রথার বিপরীতে গিয়ে মেরি একজন দলিত মহিলার রান্না করা খাবার খান, যার সঙ্গে মেরির বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেছিল। জাতি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বিশেষ বদল আসেনি। একদিক দিয়ে দেখতে গেলে, জেল জাতি ব্যবস্থাকে মেনে চলে, এবং বাইরের দুনিয়ার জাতি প্রথাকে জেলের ভেতর অনুসরণ করে। সাজাপ্রাপ্ত বন্দীদের তাদের জাত অনুযায়ী কাজ দেওয়া হয়। এটা কোনও সরকারি নিয়ম নয়। যারা কাজগুলো দেয়, তাদের মধ্যে থাকা বর্ণবাদ এখানে কাজ করে। দলিত ও সংখ্যালঘুরা বাইরে যে সমস্ত জিনিসের মুখাপেক্ষী হয়, জেলের ভেতরেও তাদের একই জিনিসের মধ্যে যেতে হয়। তাই অবাক হই না, যখন দেখি আদিবাসী জমাদার লেভিনি, মেরি টাইলারকে মনে রেখেছেন। মেরি তাঁর প্রতি সহমর্মী ছিল। তিনি আমাকে জিগেস করেন, ‘মেরি টাইলার বেঁচে আছে? কী করে জানতে পারা যায় বলতো!’

আমার জেল জীবনের শেষ দিকে একদিন আমাকে মহিলা ওয়ার্ডে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পড়ে ঝা-বাবুর ওপর। তাঁর কাছে অমলেন্দুর কথা জানতে চাওয়াতে, তিনি খুব স্নেহমাখা গলায় অমলেন্দুর গল্প করতে শুরু করে। বলেন, অমলেন্দুকে তিনি এতটাই পছন্দ করতেন যে একদিন লুকিয়ে নিজের টিফিনবাক্স থেকে এক টুকরো মাছও চালান করতে গেছিলেন। কারণ জানতেন বাঙালিরা মাছ ভালবাসে।

পরে, আমি ছাড়া পাওয়ার পর আমার পার্টনারের সঙ্গে দেখা করতে হাজারিবাগ জেল যাই। তখন সেখানে দেখা হয় লেভিনির সঙ্গে। জেল থেকে বেরোনর পর মেরি সম্পর্কে আমি যতটুকু খোঁজ খবর পেয়েছিলাম সেটা জানার পর লেভিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন।

ছাড়া পাওয়ার পর আমি ইন্টারনেট ঘেঁটে মেরি সম্পর্কে নানা তথ্য পাই, জানতে পারি মেরি তখন লন্ডনে থাকেন। একজন সাংবাদিকের ব্লগে থেকে জানতে পারি তিনি ২০০৫ সালে মেরির সঙ্গে দেখা করেছেন। মেরির তখন বয়স হয়েছে, কিন্তু তখনও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়ে চলেছেন।

এই সাংবাদিকের মাধ্যমে আমি মেরিকে একটা চিঠি পাঠাই। আমার গল্প ওকা পারো কথা-র একটি ইংরেজি কপি পাঠাই।  Paro’s Children নামে গল্পটা প্রকাশ করেছিল কমিটি ফর দ্য রিলিজ অফ পলিটিক্যাল প্রিজনার্স (সিআরপিপি)। মেরি সাংবাদিককে লেখেন, ‘তোমার চিঠি আমাকে অতীতের অনেক কথা মনে করিয়ে দিল। তুমি কী জান অনুরাধা কখন হাজারিবাগে ছিল? তবে যাই হোক, আমার সময়ের থেকে অনেক উন্নতি হয়েছে দেখছি, টিভি, বাচ্চাদের জন্য ফল, দুধ ইত্যাদি।’
মেরি যে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে কাজ করতে ঝাড়খন্ড গেছিলেন, যাদের মধ্যে কাজ করার জন্য তাঁকে জেলে যেতে হয়, সেই সাঁওতাল গোষ্ঠীর মেয়ে শীলা মারান্ডি বিপ্লবী আন্দোলনে প্রভাবিত হন। রাজনৈতিক কাজের মধ্যে দিয়ে নিজেকে শিক্ষিত করেন, মাওবাদী পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন, এবং ২০১৩ সালে সেই একই জেলে যান। উৎসাহের সঙ্গে মেরির আত্মজীবনী পড়েন শীলা। এটাই হয়তো এই পুরো গল্পের যৌক্তিক সমাপ্তি হতে পারে… অথবা ধারাবাহিকতা।     

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *