এক দাস মেয়ের জীবন (তৃতীয় কিস্তি)

আমেরিকার স্লেভ ন্যারেটিভ-এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হ্যারিয়েট জেকব-এর  আত্মজীবনী Incidents in the Life of a Slave Girl । হ্যারিয়েট জেকব-এর জন্ম দাস পরিবারে। পরবর্তীতে মালিক পরিবারের কবল থেকে পালিয়ে নিজের ও নিজের সন্তানদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেন হ্যারিয়েট। তাঁর আত্মজীবনীতে এক দিকে যেমন উঠে এসেছে দাস জীবনের বঞ্চনা ও নিপীড়নের কথা, পাশাপাশিই জায়গা পেয়েছে তাঁদের প্রতিরোধ ও দ্রোহের আখ্যানও। বইটি তিনি লেখেন লিন্ডা ব্রেন্ট ছদ্মনামে। বামা-য় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে এই  আত্মজীবনী।

ক্রীতদাসদের নববর্ষ

ডা. ফ্লিন্ট-এর শহরে একটা অভিজাত বাড়ি, বহু খামার আর জনা পঞ্চাশেক ক্রীতদাস ছিল, এছাড়া প্রতি বছরই আরও আরও দাসদের সে কাজে লাগাত।

দক্ষিণে, ক্রীতদাস নিয়োগের দিন হল ১ জানুয়ারি। ২ জানুয়ারিতে দাসদের তাদের নতুন মালিকের কাছে চলে যেতে হয়। ভুট্টা আর তুলো যতদিন না কাটা হচ্ছে তারা খামারে কাজ করে। তারপর দুদিন ছুটি পায়। কোনও কোনও মালিক তাদের গাছের তলায় বসিয়ে ভালমন্দ খাওয়ায়। এরপর থেকে ক্রিসমাস-এর আগেরর দিন পর্যন্ত আবার তারা খাটে। ইতিমধ্যে যদি তাদের বিরুদ্ধে খুব গুরুতর কোনও অভিযোগ আনা না হয় তাহলে চার অথবা পাঁচদিন ছুটি পায়, মালিক বা তত্ত্বাবধায়ক  যা ভাল বোঝে। তারপর আসে নিউ ইয়ার্স ইভ; তারা তাদের যা কিছু স্বল্প সম্পদ জড়ো করে, বা বলা ভাল, তাদের যাবতীয় অপ্রাপ্তি জমা করে, এবং পরদিন ভোরের জন্য উৎকন্ঠা ভরে অপেক্ষা করে। পূর্ব-নির্ধারিত সময়ে মাঠে নারী, পুরুষ আর বাচ্চাদের ভিড় জমে। অপরাধীর মতো শাস্তি ঘোষণার অপেক্ষায় তারা প্রহর গোনে। একজন দাস চল্লিশ মাইল দূর থেকে বলতে পারে কোন মালিক নিষ্ঠুর আর কার খানিক মনুষ্যত্ব আছে।       

এই দিন সহজেই বলে দেওয়া যায়, কোন মালিক তার ক্রীতদাসদের ভাল খাওয়ায় পরায়; কারণ তাকে এই দিন ভিড় ঘিরে থাকে, পীড়াপীড়ি চলে, “মাসা, দয়া করুন, এবছর আমাকে কাজে নিন। আমি খুব খাটব মাসা। ”

কোনও দাস যদি তার নতুন মালিকের সঙ্গে যেতে অনিচ্ছুক হয়, তাকে চাবুক মারা হয়, অথবা জেলে ভরে দেওয়া হয়, যতক্ষণ না সে যেতে রাজি হচ্ছে, এবং কথা দিচ্ছে যে সে গোটা বছরই থাকবে, পালাবে না। জোর করে আদায় করা এই প্রতিশ্রুতির খেলাপ করা ন্যায়সঙ্গত মনে করে যদি সে মন বদলায় এবং ধরা পড়ে, তাহলে তার কপালে অশেষ দুঃখ! পা অবধি রক্ত গড়িয়ে না পড়া অবধি চাবুক মারা চলে; শক্ত হয়ে আসা হাত-পায় বেঁধে দেওয়া হয় শিকল, দিনের পর দিন সেই শিকল টেনে তাকে চলতে হয়! 

যদি পরের বছর অবধি সে বেঁচে থাকে, তাহলে সেই মালিকই আবার তাকে কাজে রাখে, হয়তো কেনা-বেচার মাঠে যাওয়ার সুযোগ না দিয়েই। যাদের নিয়োগ এরকম আগে থেকেই ঠিক হয়ে থাকে প্রথমে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় তারপর শুরু হয় বিক্রিবাটা।  

এই যে সুখী স্বাধীন মেয়েরা, তোমাদের নতুন বছরের দিনের সঙ্গে সেই বেচারা পরাধীন মেয়েটার নিউ ইয়ার-এর দিনটা তুলনা করে দেখ! তোমার কাছে এ এক খুশির মরশুম, ঝকঝকে দিনের আলোয় সৌভাগ্যের বার্তা। চারদিক থেকে শুভেচ্ছার ফুলঝুড়ি, উপহারে উপহারে ছয়লাপ। যারা কিনা দূরে চলে গেছে, তাদের মনও নরম হয়ে আসে এই সময়ে, যারা কথা বন্ধ করেছে সেই ঠোঁটও এই সময়ে বলে ওঠে, “হ্যাপি নিউ ইয়ার। নববর্ষের শুভেচ্ছা জেনো।” শিশুরা তাদের ছোট ছোট উপহার নিয়ে এসে উপস্থিত হয়, গোলপের পাপড়ির মতো ঠোঁট মেলে ধরে আদর পেতে। এরা তোমাদের সন্তান, মৃত্যু ছাড়া আর কেউ ওদের তোমার থেকে কেড়ে নিতে পারবে না।

কিন্তু একজন ক্রীতদাস মায়ের কাছে নতুন বছরের প্রথম দিনটা এক আশ্চর্য কষ্ট নিয়ে হাজির হয়। ঠান্ডা খুপড়ি ঘরের মেঝেতে বসে সে তার সন্তানের দিকে চেয়ে থাকে, যাকে হয়তো পরদিনই তার থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হবে। অনেক সময়ই সে মনে মনে চায় পরদিন ভোর হওয়ার আগেই যেন সে আর শিশুরা মারা যায়। হতে পারে সে এক অবোধ প্রাণী, ছোটবেলা থেকে এই ব্যবস্থায় অত্যাচারিত হতে হতে সে চুরমার হয়ে গেছে, কিন্তু মায়ের স্বভাবজাত প্রবৃত্তি তাকে ছেড়ে যায়নি, মায়ের যন্ত্রণা বোঝার শক্তি তার রয়েছে।  

একবার বিক্রির দিনে আমি দেখেছিলাম একজন মা তার সাতটি ছেলেমেয়ে নিয়ে নিলামের জায়গায় যাচ্ছে। সে জানত, এর মধ্যে কয়েকটি সন্তানকে তার থেকে কেড়ে নেওয়া হবে, কিন্তু শেষ অবধি সবাইকেই কেড়ে নেওয়া হয়। বাচ্চাগুলোকে এক দাস-ব্যবসায়ীর হাতে তুলে দেওয়া হয়, আর তাকে কিনে নেয় শহরেরই এক বাবু। রাত হওয়ার আগেই তার ছেলেমেয়েরা তার থেকে বহু দূরে। সে ওই ব্যবসায়ীর হাতে পায়ে ধরে, জানতে চায় তার বাচ্চাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে; কোনও উত্তর পায় না। ব্যবসায়ী  কীই বা উত্তর দিত! সে তো জানত যেখানে বেশি দাম পাবে সেখানেই এক এক করে ওই বাচ্চাদের সে বিক্রি করবে। রাস্তায় সেই মায়ের সাথে আমার দেখা হয়েছে, তার বুনো কালিমাখা মুখ আজও আমার চোখে ভাসে। যন্ত্রণায় হাত কচলাতে কচলাতে সে বলে, “চলে গেল! সব চলে গেল! ভগবান আমাকে মেরে ফেলে না কেন?” তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার কোনও ভাষা আমার ছিল না। এই ধরনের ঘটনা প্রতিদিন ঘটত, প্রতি ঘন্টায়।  

বয়স হয়ে যাওয়া ক্রীতদাস, যারা সারা জীবন শ্রম দিয়ে নিঃশেষ হয়ে গেছে তাদের তাড়ানোর একটা পদ্ধতি ছিল এই সব দাস মালিকদের, তাদের প্রতিষ্ঠানের অনন্য এক নিয়ম। আমি এক বুড়িকে জানি যে সত্তর বছর ধরে তার মালিকের কাছে কাজ করেছে। কঠিন শ্রম আর রোগভোগ তাকে প্রায় অক্ষম করে দিয়েছিল। তার মালিকরা অ্যালাবামা চলে যায়, সেই বুড়ি কালো মহিলাকে ফেলে রেখে যায় বিক্রির জন্য। বলে, যে কুড়ি ডলার দিতে রাজি হবে তার কাছেই বেচে দেওয়া হবে। 

 যে ক্রীতদাস নিজেকে মানুষ ভাবার ধৃষ্টতা দেখিয়েছিল

আমার ডা.ফ্লিন্ট-এর পরিবারে আসার দুবছর কেটে গেছিল, অভিজ্ঞতাজাত শিক্ষা হয়েছে অনেকটাই, তবে অন্য কোনওরকম জ্ঞানশিক্ষার বিশেষ সুযোগ তারা রাখেনি। 

আমার দিদা তার অনাথ নাতি-নাতনিদের মা হয়ে ওঠার যথাসাধ্য চেষ্টা করত। অধ্যাবসায় আর ক্লান্তিহীন শ্রমের মাধ্যমে ততদিনে দিদা একটা মোটামুটি গোছের ছোট বাড়ি করেছে, বাড়ির চারপাশ জীবনের প্রয়োজনীয় উপাদানে ঘেরা। সন্তানদের সঙ্গে সেখানে থাকতে পারলে দিদা খুশি হত। পড়ে ছিল তার দুই সন্তান আর দুই নাতি-নাতনি, সকলেই তারা দাস।

দিদা মনে প্রাণে চাইত আমরা যাতে মনে করি এটা ভগবানেরই ইচ্ছে: ভগবান আমাদের এই পরিস্থিতিতে রাখাই যথোপযুক্ত বলে মনে করেছে, আর কঠিন মনে হলেও আমাদের উচিত তৃপ্তি আর আনন্দের জন্য প্রার্থনা করা। 

একজন মা যে তার সন্তানদের নিজের বলে দাবি করতে পারেনি, তার পক্ষে এ এক সুন্দর বিশ্বাস। কিন্তু আমি আর তার সবথেকে ছোট ছেলে বেঞ্জামিন এর বিরোধিতা করতাম। আমাদের যুক্তি ছিল, ভগবানের আসল ইচ্ছে হল দিদা যেমন আছে আমরাও যেন তেমনই থাকতে পারি। দিদার মতো একটা বাড়ির জন্য আমরা হাপিত্যেশ করতাম। সব সমস্যার মিঠে উপশম মিলত সেই বাড়িতে। দিদা ছিল স্নেহময়ী আর সহমর্মী! সব সময়ে হাসিমুখে কথা বলত, আমাদের সব দুঃখ শুনত ধৈর্য ধরে। দিদার কথায় এতই আশার আশ্বাস থাকত যে না জানতেই মেঘ সরে আলোকে জায়গা করে দিত। দিদার সেই বাড়িতে একটা ইয়াব্বড় ওভেন-ও ছিল, রুটি আর আরও সব ভাল ভাল জিনিস বেক করে শহরে বিক্রির জন্য, আর আমার জানতাম সবসময়েই আমাদের পছন্দের কিছু না কিছু সেখানে রাখা আছে আমাদের জন্য।   

কিন্তু দুর্ভাগ্য! সেই প্রাচীন ওভেন-এর মাধুর্যও আমাদের কঠিন জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কিছু মাত্র সাহায্য করতে পারেনি। বেঞ্জামিন ততদিনে এক লম্বা সুদর্শন পুরুষ, কঠোর তার দেহ সৌষ্ঠব; একজন ক্রীতদাস হিসেবে তার আচার-আচরণ মাত্রারিক্ত সপ্রতিভ ও সাহসী। আমার ভাই উইলিয়মের বয়স তখন বারো। সাত বছর বয়সে মালিক শব্দটার প্রতি তার যতটা ঘৃণা ছিল, বারোতেও ততটাই রয়েছে। আমি ছিলাম তার সুখ-দুঃখের গল্প বলার লোক, বিশ্বস্ত বন্ধু। যাবতীয় সমস্যা নিয়ে ও আমার কাছে আসত। আমার একটা ঘটনা মনে আছে। সেটা ছিল এক সুন্দর বসন্তের সকাল, সূর্যের আলো এদিক ওদিক নেচে বেড়াচ্ছিল, মনে হচ্ছিল ওই সুন্দর আলো আমার দুঃখকেই বিদ্রুপ করছে।  (চলবে)

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *