এক দাস মেয়ের জীবন

Harriet Jacobs Autobiography Title Pageআমেরিকার স্লেভ ন্যারেটিভ-এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হ্যারিয়েট জেকব-এর  আত্মজীবনী Incidents in the Life of a Slave Girl । হ্যারিয়েট জেকব-এর জন্ম দাস পরিবারে। পরবর্তীতে মালিক পরিবারের কবল থেকে পালিয়ে নিজের ও নিজের সন্তানদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেন হ্যারিয়েট। তাঁর আত্মজীবনীতে এক দিকে যেমন উঠে এসেছে দাস জীবনের বঞ্চনা ও নিপীড়নের কথা, পাশাপাশিই জায়গা পেয়েছে তাঁদের প্রতিরোধ ও দ্রোহের আখ্যানও। বইটি তিনি লেখেন লিন্ডা ব্রেন্ট ছদ্মনামে। বামা-য় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে এই  আত্মজীবনী, এবারের সংখ্যায় রইল দ্বিতীয় কিস্তি- নতুন মালিক ও মালকিন

নতুন মালিক আর মালকিন

 পাড়ার এক ডাক্তার ড. ফ্লিন্ট আমার মালকিনের বোনকে বিয়ে করেছিল, আর আমি এখন তাদের ছোট্ট মেয়ের সম্পত্তি। এমন নয় যে কোনওরকম গজগজানি ছাড়াই আমি আমার নতুন বাড়িতে যেতে প্রস্তুত ছিলাম; আমার মন খারাপ আরও বেড়েছিল কারণ আমার ভাই উইলিয়মকেও ওই একই পরিবার কিনে নিয়েছিল। আমার বাবার মধ্যে প্রকৃতিগতভাবে, ও দক্ষ মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করার স্বভাবে, আর পাঁচজন দাসের থেকে একজন মুক্ত মানুষের বোধ অনেক বেশি ছিল। আমার ভাই ছিল তেজী বাচ্চা; এবং এই ধরনের প্রভাবে বড় হওয়ায়, ও রোজ মালিক আর মালকিনের নামে ঘৃণা উগরে দিত। একদিন, যখন ওর বাবা আর মালিকন একই সময়ে ওকে ডাক পাঠায়, ও খানিক দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে; বুঝতে পারে না ওর আনুগত্যের ওপর কার দাবি বেশি। শেষ অবধি ও মালকিনের কাছে যাওয়াই ঠিক করে। বাবা যখন এই কারণে ওকে বকাঝকা করে, ও বলে, “তোমরা দুজনই আমাকে ডেকেছিলে, আমি জানতাম না কার কাছে প্রথমে যাওয়া উচিত।” 

 “তুমি আমার ছেলে” বাবা উত্তর দেয়, “আর আমি তোমাকে ডাকলে তোমার সঙ্গে সঙ্গে আসা উচিত, যদি তোমাকে আগুন আর জল পেরিয়ে আসতে হয় তাও।”

 বেচারা উইলি! এবার তাকে মালিকের প্রতি আনুগত্যের প্রথম পাঠ নিতে হত। দিদা ভবিষ্যত সম্পর্কে ভাল ভাল কথা বলে আমাদের মন ভাল করতে চাইত, আর আমাদের অসন্দিগ্ধ মনে তা প্রতিধ্বনিত হত। 

 আমরা নতুন বাড়িতে ঢুকে পেলাম শীতল দৃষ্টি, শীতল বাক্য, ও শীতল ব্যবহার। রাতের বেলা স্বস্তি। আমার সরু বিছানায় আমি গুমরোচ্ছিলাম, কাঁদছিলাম, ভীষণ একা একা লাগছিল, বিচ্ছিন্ন আর নিঃসঙ্গ।

  ওখানে যখন আমার প্রায় এক বছর কেটে গেছে, সেই সময়ে আমার প্রিয় ছোট্ট বন্ধুকে কবর দেওয়া হয়। আমি তার মাকে ফোঁপাতে শুনি যখন তার একমাত্র সন্তানের কফিনে মাটির দলা পড়ছে, আর আমি কবর থেকে মুখ ফিরিয়ে চলে আসি, কৃতজ্ঞ মনে হচ্ছিল আমার তখনও  – ভালবাসার জন্য কেউ তো আছে। আমি দিদার কাছে চলে যাই, দিদা বলে, “লিন্ডা, আমার সঙ্গে এস,” আর সেই গলার স্বরেই আমি বুঝি কিছু একটা ঘটেছে, দুঃখের। দিদা আমাকে অন্যদের থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়, তারপর বলে, “সোনা, তোমাদের বাবা আর নেই।” নেই! এ আমি কী করে বিশ্বাস করব? বাবা এতটাই হঠাৎ করে মারা গেছিল যে আমি তার আগে এটাও জানতে পারিনি যে বাবা অসুস্থ। আমি দিদার সঙ্গে বাড়ি যাই। আমার মন ভগবানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ওঠে, ভগবান, যে আমার থেকে আমার মা, বাবা, মালকিন আর বন্ধুকে কেড়ে নিয়েছিল। আমার ভীষণ ভাল দিদা আমাকে সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করে। “ভগবান কেন কী করে সে কথা আর কেই বা জানে?” দিদা বলে। “হয়তো, আগামীর ভয়ানক দিন থেকে রক্ষা করতেই ভগবান ওদের ওপর সদয় হয়ে ওদের নিয়ে গেছে।” বহু বছর পর আমি মাঝে মাঝেই এই কথাটা ভাবতাম। নাতি-নাতনিদের মা হয়ে উঠতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল দিদা, যতটা তার পক্ষে হওয়া সম্ভব, তার ভালবাসার জোরে। আমি মালিকের বাড়ি ফিরে যাই। আমি ভেবেছিলাম পরদিন সকালে আমাকে বাবার বাড়ি যেতে দেবে; কিন্তু আমাকে ফুল আনতে যেতে আদেশ দেওয়া হল, সান্ধ্য মজলিশের জন্য মালকিনের বাড়ি সাজানোর জন্য। আমি সারাদিন ধরে ফুল জোগাড় করি আর সেগুলো দিয়ে দরজায় টাঙানোর মালা গাঁথি, আর সেই সময়ে আমার থেকে মাইল খানেকের দূরত্বে আমার বাবার মৃতদেহ পড়ে থাকে। আমার মালিকের তাতে কীই বা আসে যায়? বাবাতো এক টুকরো সম্পত্তি বই আর কিছু নয়। তাছাড়া ওরা মনে করত বাবা তার ছেলেমেয়েদের নষ্ট করেছে, কারণ সে তার ছেলেমেয়েকে মনে করতে শিখিয়েছে তারা মানুষ। একজন দাসের পক্ষে, এই শিক্ষা দেওয়া ধর্মবিরোধী অপরাধেরই সামিল; বাবার জন্য এটা ছিল বিধি-লঙ্ঘন, আর মালিকদের জন্য বিপজ্জনক।      

  পরের দিন, আমি বাবার মৃতদেহর পিছু পিছু যাই যেখানে বাবাকে এক সাধারণ কবরে শুইয়ে দেওয়া হয়, আমার প্রিয় মা যেখানে শুয়ে আছে তার পাশে। যারা আমার বাবার মূল্য জানত, আর তার স্মৃতিকে সম্মান করত তারা সেখানে উপস্থিত ছিল। এরপর থেকে আমাদের বাড়ি বিষণ্ণতায় ডুবে থাকত। দাসদের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের হাসির শব্দ কঠোর ও নিষ্ঠুর মনে হত। অন্যের আনন্দের বিষয়ে এরকম ভাবা খুবই স্বার্থপরতা। আমার ভাই ভীষণ গম্ভীব মুখ করে ঘুরে বেড়াত। আমি ওকে সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করতাম, বলতাম, “উইলি, সাহস রাখ। আনন্দের দিন আসবে আস্তে আস্তে।”       

  “লিন্ডা, তুই এর কিছুই জানিস না,” ও উত্তর দিত। “আমাদের সারা জীবনই এখানে থাকতে হবে; আমরা কোনওদিনই মুক্ত হব না।”

  আমি তর্ক জুড়তাম, বলতাম, আমরা বড় হচ্ছি, শক্তি বাড়ছে, হয়তো, কিছুদিনের মধ্যেই আমরা নিজেদের মতো কিছুটা সময় কিনে নেওয়ার অনুমতি পাব, আর তখন নিজেদের স্বাধীনতা কেনার জন্য টাকা রোজগার করতে পারব। উইলিয়াম বলত এটা বলা যতটা সহজ করা তত সহজ না। এই বিষয়ে আমরা রোজ কথা বলতাম।

  ড.ফ্লিন্ট-এর বাড়িতে দাসেদের খাবার-দাবারের বিষয় বিশেষ নজর ছিল না। খাবার নিয়ে যাওয়ার সময়ে দাসরা যদি সেখান থেকে একটু খাবার পেত তো ভাল। এই বিষয়ে আমি খুব মাথা ঘামাতাম না, কারণ বিভিন্ন কাজে কর্মে আমি দিদার বাড়ির সামনে দিয়ে যাতায়াত করতাম, আর সেখানে সব সময়ই আমার জন্য কিছু না কিছু থাকত। আমাকে বারবারই শাসানো হত আমি যাতে যাতায়াতে পথে সেখানে না দাঁড়াই; আর আমি যাতে ধরা না পড়ি, আমার দিদা, দরজায় দাঁড়িয়ে থাকত আমার জন্য জলখাবার বা রাতের খাবার নিয়ে। আমি দিদার কাছে আমার যাবতীয় ভাল থাকার জন্য ঋণি, আধ্যাত্মিক ও পার্থিব ভাল থাকা। আমার ছবির মতো মনে আছে প্রতি শীতে মিসেস ফ্লিন্ট আমাকে মোটা চটের মতো জামা দিত। মনে আছে আমার কী ভয়ানক অপছন্দ ছিল এই জামা! এই জামা ছিল দাসত্বের চিহ্নগুলোর একটা।   

  আমার দিদা একদিকে যখন তার বহু কষ্টের রোজগার থেকে আমার পাশে থেকেছে, অন্যদিকে তার মালকিনকে ধার দেওয়া সেই তিনশো ডলার সে আর কোনওদিনই ফেরৎ পায়নি। যখন দিদার মালকিন মারা যায়, মালকিনের জামাই, ড. ফ্লিন্ট তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পায়। দিদা যখন তার কাছে টাকা ফেরতের আর্জি জানায় সে বলে, এস্টেট দেউলিয়া তাই টাকা দেওয়ায় আইনি বাধা আছে। যদিও, সেই টাকায় কেনা ঝাড়বাতিদান নিজের কাছে রাখার ক্ষেত্রে কোনও বাধা দেখেনি ড.ফ্লিন্ট। নিশ্চয়ই ওই ঝাড়বাতি পরিবারের মধ্যে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে হস্তান্তরিত হতে থাকে। 

  দিদার মালকিন সবসময়েই দিদাকে বলে এসেছে মালকিন মরে গেলে দিদা স্বাধীন; আর বলেছে সে তার উইল-এ এই প্রতিশ্রুতির কথা লিখে রেখেছে। কিন্তু যখন এস্টেট-এর দেনাপাওনার হিসবে হয়, ড.ফ্লিন্ট বিশ্বস্ত পুরনো পরিচারিকাকে বলে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাকে বিক্রি করে দেওয়া জরুরি।

  নির্ধারিত দিনে, নিয়মমাফিক বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়, “নিগ্রো আর ঘোড়া বিক্রির প্রকাশ্য হাট বসবে”। ড.ফ্লিন্ট আমার দিদাকে ডেকে বলে, সে দিদাকে নিলামে তুলে তার মনে দুঃখ দিতে চায় না, বরং তাকে আলাদা করে ব্যক্তিগতভাবে বিক্রি করতে চায়। আমার দিদা তার ভন্ডামি ধরে ফেলে; দিদা খুব ভাল করেই বোঝে ড.ফ্লিন্ট এই কাজটি করতে লজ্জা পাচ্ছেন। দিদা ছিল অত্যন্ত তেজী মহিলা, তার মালকিন তাকে মুক্তি দিয়ে যাওয়ার পরও ড.ফ্লিন্ট যখন তাকে বিক্রি করতেই চায়, তখন মানুষ সেটা জানুক – এ ব্যাপারে দিদা ছিল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। অনেক দিন ধরে বহু পরিবারকে ক্র্যাকার, জ্যাম জেলি বিক্রি করা; ক্রমে “আন্ট মার্থি,” বলে পরিচিত হয়ে ওঠা আমার দিদাকে যারা চিনত তারা সকলেই দিদার বুদ্ধিমত্তা ও সৎ চরিত্রেকে শ্রদ্ধা করত। দীর্ঘদিন যে বিশ্বস্ততার সঙ্গে ওই পরিবারে দিদা কাজ করেছে সেটা সকলেরই জানা ছিল, তার মালকিন যে তাকে মুক্ত করে যেতে চেয়েছিল সেকথাও সবাই জানত। হাটের দিন, দিদা বিক্রির মালপত্রের মধ্যে গিয়ে বসে, আর প্রথম ডাক শুরু হওয়াতেই লাফিয়ে নিলাম মঞ্চে উঠে পড়ে। অনেকে চিৎকার করে ওঠে, “ছি ছি! আন্ট মার্থি, আপনাকে কে বিক্রি করছে? ওখানে দাঁড়াবেন না! ওটা আপনার জায়গা না।” একটা কথাও না বলে, সে চুপচাপ নিজের পরিণতির অপেক্ষা করতে থাকে। কেউ তার জন্য নিলাম ডাকে না। শেষে একটি ক্ষীণ কন্ঠ শোনা গেল, “পঞ্চাশ ডলার।” এক অবিবাহিতা মহিলার কাছে থেকে এই ডাক এল, সত্তর বছর বয়স, দিদার মৃত মালকিনের বোন। আমার দিদার সঙ্গে চল্লিশ বছর এক ছাদের তলায় তিনি থেকেছেন; তিনি জানতেন দিদা কতটা বিস্বস্ততার সঙ্গে তার মালিকের কাছে কাজ করেছে, এবং কী নিষ্ঠুরভাবে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তাকে ঠকানো হচ্ছে; তিনি ঠিক করেন দিদাকে রক্ষা করবেন। নিলামকারী আরও বেশি দামের জন্য অপেক্ষা করে; কিন্তু সকলে সেই বৃদ্ধার ইচ্ছাকে সম্মান দেয় এবং কেউ তার থেকে বেশি দাম ডাকে না। তিনি লিখতে পড়তে পারতেন না; বিক্রির রসিদ যখন তৈরি হল, তিনি একটি ক্রস দিয়ে তাতে সই করেন। তার একটি মানবিক উদারতায় ভরা বিশাল হৃদয় ছিল, তার ফল কী? তিনি পুরনো পরিচারিকাকে মুক্তি দিলেন।   

   সেই সময়ে, আমার দিদার বয়স মাত্র পঞ্চাশ। এরপর থেকে তার কঠোর পরিশ্রমের দিন আর রইল না; আমি আর আমার ভাই তখন সেই মানুষটার দাস যে তাকে তার প্রাপ্য টাকা না দিয়ে ঠকিয়েছে ও তার মুক্তি থেকেও বঞ্চিত করে তাকে ঠকাতে চেয়েছে। আমার এক মাসি, আন্ট ন্যান্সিও ওই একই পরিবারে দাস ছিল। আমার প্রতি খুবই সদয় আর স্নেহশীল ছিল এই মাসি। এবং ওই বাড়িতে গৃহ পরিচারিকা ও মালকিনের ব্যক্তিগত পরিচারিকা দুইই ছিল আমার এই মাসি, বস্তুত, ওই বাড়ির সবকিছুর  শুরু আর শেষ ছিল আমার মাসি।        

  দক্ষিণের আরও অনেক মহিলার মতোই মিসেস ফ্লিন্ট ছিল কর্মশক্তিহীন নিস্তেজ। ঘরের কাজকর্ম দেখাশোনা করার মতো শক্তি তার ছিল না; কিন্তু তার স্নায়ু এতই জোরালো ছিল যে সে তার ইজি চেয়ারে বসে একজন মহিলাকে চাবুকের বাড়ি মারা দেখতে পারত, যতক্ষণ না প্রতিটি চাবুকের ঘায়ে শরীর থেকে রক্ত ঠিকরে বেরোয়। সে গির্জার সদস্য ছিল; কিন্তু ভগবানের সান্ধ্যভোজে অংশগ্রহণ তার মধ্যে খৃষ্টান মূল্যবোধ তৈরি করতে পারেনি। সেই নির্দিষ্ট রবিবারে যদি কাঁটায় কাঁটায় নির্ধারিত সময়ে খাবার পরিবেশন না হত, সে গিয়ে রান্নাঘরে বসে থাকত, এবং যতক্ষণ না খাবার দেওয়া হচ্ছে অপেক্ষা করত, খাবার দেওয়া হয়ে গেলে সে রান্নার প্রতিটি কেটলি ও পাত্রে থুতু দিয়ে আসত। এটা করত যাতে রাঁধুনি এবং তার বাচ্চারা পড়ে থাকা অবশিষ্ট যা কিছু ঝোল আর ঝড়তি পড়তি খাবার সেগুলি খেতে না পারে। তাদের জন্য বরাদ্দ খাবারটুকু ছাড়া আর কিছুই যাতে দাসেদের না জোটে। পাউন্ড-আউন্স মেপে তিনবেলা তাদের খেতে দেওয়া হত। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি সে তার দাসদের তার ময়দার পিপে থেকে একটা ময়দার রুটি খাওয়ারও সুযোগ দেয়নি। সে জানত ঠিক কত গ্রাম ময়দা থেকে কটা বিস্কুট তৈরি হয়, এবং সেগুলো ঠিক কোন মাপের হয়। ড.ফ্লিন্ট ছিল পান-ভোজনে আসক্ত। রাঁধুনি কখনও ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ছাড়া তাকে খাবার দিতে যায়নি; কারণ যদি সেই খাবার তার পছন্দ না হত তাহলে হয় ড.ফ্লিন্ট তাকে চাবুক মারার নির্দেশ দিত অথবা তাকে ওই খাবারের প্রতিটি কণা সেখানে বসে তার চোখে সামনে খেতে হত। গরীব, ক্ষুধার্ত প্রাণী হয়তো খাবারে না করত না; কিন্তু মালিক তার মুখে খাবার ঠুসে দিচ্ছে যতক্ষণ না তার দম বন্ধ হয়ে আসছে, এতে তার আপত্তি ছিল। 

  ওদের একটা পোষা কুকুর ছিল যে বাড়ি মাথায় করে রাখত। রাঁধুনিকে একদিন তার জন্য ভারতীয় জাউ বানাতে বলা হয়। কুকুরটা খেতে চায় না, আর ওর মাথা যখন খাবারের পাত্রের ওপর ধরা হয়, কুকুরটার মুখ থেকে গ্যাঁজলা গড়িয়ে পাত্রে পড়ে। কয়েক মিনিট পর কুকুরটা মারা যায়। ড. ফ্লিন্ট আসে, বলে জাউটা ঠিক করে রান্না হয়নি সেই জন্যই পশুটা সেটা খায়নি। রাঁধুনিকে ডেকে পাঠায় ও তাকে সেই খাবারটা খেতে বাধ্য করে। ড.ফ্লিন্ট ভাবে সেই মহিলার হজম শক্তি কুকুরটার থেকে ভাল; কিন্তু পরে ওই রাঁধুনিকে যা সহ্য করতে হয় তা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় ডা.ফ্লিন্টের ধারণা ভুল ছিল। এই বেচারি মহিলা তার মালিক ও মালকিনের হাতে অনেক নিষ্ঠুরতা সহ্য করেছে; কখনও কখনও তাকে সারা দিনরাত  ঘরে আটকে রাখা হয়েছে, বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে না দিয়ে।    

  আমি যখন ওই পরিবারের সঙ্গে কয়েকদিন ছিলাম, মালিকের আদেশে একজন বাগিচা দাসকে শহরে নিয়ে আসা হয়। সে যখন পৌঁছয় তখন প্রায় রাত, এবং ড.ফ্লিন্ট তাকে মূল বাড়ির বাইরে কাজের ঘরে নিয়ে গিয়ে এমনভাবে কড়ি-বর্গার সঙ্গে বেঁধে রাখার নির্দেশ দেয়, যাতে তার পা মাটি থেকে একটু ওপরে থাকে। সেই অবস্থায় তাকে অপেক্ষা করতে হয় যতক্ষণ না ডাক্তার তার চা শেষ করে। এর আগে কোনওদিন আমি একজন মানুষের শরীরে এরকম মুহুর্মুহু শয়ে শয়ে চাবুকের বাড়ি পড়তে শুনিনি। তার করুণ গোঙানি, আর তার গলায় “দয়া করুন, মাসা, আর না,” বহু মাস আমার কানে বেজেছিল। এই ভয়ানাক শাস্তির কারণ কী তাই নিয়ে নানা জল্পনা ছিল। কেউ বলল, মালিকের ধারনা হয়েছিল সে বাগিচা থেকে ভুট্টা চুরি করেছিল, আবার কেউ বলল একজন কারো সামনে সে তার বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করার সময়ে অভিযোগ করেছিল তাদেরর বাচ্চার আসল বাবা ওই মালিক। ওরা দুজনেই ছিল কালো, বাচ্চাটা ছিল খুব ফর্সা।         

 পরদিন সকালে আমি সেই বাইরের কাজের ঘরে যাই, দেখি গোয়ালঘর তখনও রক্তে ভেজা, আর চারদিকের দেওয়ালে জমাট বাঁধা রক্ত। সেই দুর্ভাগা অবশ্য বেঁচে ছিল, আর বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া চালিয়ে গেছে। কয়েকমাস পরে ড.ফ্লিন্ট তাদের দুজনকেই দাস-ব্যবসায়ীর হাতে তুলে দেয়। দোষী লোকটি এই দুই দাস বিক্রির টাকা পকেটস্থ করে আর তারা যে তার চোখের সামনে থেকে দূর হয়েছে এই নিয়ে সন্তুষ্ট বোধ করে। মা-টিকে যখন ব্যবসায়ীর হাতে তুলে দেওয়া হয়, সে বলে, “আপনি কিন্তু কথা দিয়েছিলেন আমাকে ভাল ভাবে রাখবেন।” মালিক উত্তরে বলে “তুমি বড্ড বেশি কথা বলে ফেলছ, জাহান্নামে যাও!” সেই মহিলা ভুলে গেছিল একজন দাসের তার সন্তানের বাবার নাম জানানো অপরাধ।

 এই ধরনের ঘটনায় শুধু মালিক নয়, অন্যরাও শাস্তি দেয়। একবার আমি দেখেছিলাম একটি অল্প বয়সের দাস মেয়ে তার বাচ্চার জন্ম দেওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই মারা যায়, বাচ্চাটা ছিল প্রায় সাদা। 

  সে যন্ত্রণায় কঁকিয়ে ওঠে, “ভগবান, দয়া করো, আমায় নিয়ে যাও!” মালকিন সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে আর পাক্কা পাষণ্ডের মতো বলে ওঠে “কী কষ্ট হচ্ছে?” চিৎকার করে বলে “আমি খুব খুশি, এটাই তোরর প্রাপ্য, এর থেকেও বেশি কষ্ট তোর প্রাপ্য।”

 মেয়েটির মা বলে, “বাচ্চাটা মরে গেছে, ভগবানের অশেষ কৃপা; আশা করি আমার বেচারা মেয়েটাও তাড়াতাড়িই স্বর্গে চলে যাবে।”

“স্বর্গ!” মালকিন খিঁচিয়ে ওঠে। “ওর মতো বা ওর বেজন্মা বাচ্চার মতো লোকেদের জন্য সেখানে কোনোও জায়গা নেই।”

 বেচারা মা কাঁদতে কাঁদতে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। তার মৃতপ্রায় মেয়ে তাকে ডাকে, ক্ষীণ গলায়; মা তার মুখের কাছে ঝুঁকলে, আমি শুনি সে বলে “দুঃখ করো না মা, ভগবান সবই জানে, আর তিনি আমাকে ঠিকই দয়া দেখাবেন।”

  মেয়েটির কষ্ট এরপর এতটাই তীব্র হয়ে উঠল যে তার মালকিনও আর সেখানে থাকতে পারল না; কিন্তু ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ও তার ঠোঁটে সেই ঘেন্না মাখা অবজ্ঞার হাসিটা লেগে ছিল। সাতজন শিশু তাকে মা ডাকত। আর সেই দুঃখী কালো মহিলার শুধু একজনই সন্তান ছিল, যাকে সে মৃত্যুতে চোখ বুজতে দেখে, এবং জীবনের আরও বড় তিক্ততা থেকে তার মেয়েকে রক্ষা করার জন্য সে ভগবানকে ধন্যবাদ জানায়।    

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *