কারাগারশূন্য ভারত বিষয়ক কিছু ভাবনা

দিব্যা চান্দ-এর লেখা মূল প্রবন্ধটি ৪ অগস্ট, ২০২১ তারিখে রাইয়ত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধটি পড়া যাবে এখানে

মিনিয়াপোলিস পুলিশের হাতে জর্জ ফ্লয়েডের নির্মম মৃত্যু। নতুন দিল্লীতে জেলবন্দী নওদীপ কৌর। ইজরায়েল প্রশাসনের দ্বারা আটক আহেদ তামিনি। কাশ্মীরে গৃহবন্দী সৈয়দ আলি শাহ গিলানি। পৃথিবীর বিভিন্নপ্রান্তে ঘটে চলা এই আপাত বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলির মধ্যে কি কোন যোগসূত্র আছে? ঠিক কীভাবে জাত, বর্ণ, পুলিশি ব্যবস্থা এবং সৈন্যবাহিনী দ্বারা ভূমি দখলের মত ব্যবস্থা সীমান্তরেখা পেরিয়ে কমবেশি একইরকমভাবে কাজ করে? জেল ব্যবস্থা বিলোপের সাথে জাতি বৈষম্য প্রথার সম্পর্কটাই বা ঠিক কী? বিলোপ পন্থী দৃষ্টিভঙ্গী থেকে যদি জাতি বৈষম্যের বিষয়টিকে পর্যবেক্ষণ করা যায়, জাতি বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন এবং জেল বিলোপের আন্দোলনের মধ্যে সংহতিপূর্ণ যোগসূত্র অবশ্যই পাওয়া যাবে। রাষ্ট্র কর্তৃক নির্দেশিত শাস্তি ঐতিহাসিকভাবে বারংবার রাষ্ট্র ব্যবস্থার কদর্যরূপটাকে নগ্ন করে দিতে চাওয়া মানুষদের কণ্ঠস্বরকে অবদমিত করতে ব্যবহৃত হয়েছে। ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে শাস্তি বিষয়টি রাষ্ট্রের হিন্দু-মৌলবাদী ভাবনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। কারা শাস্তিযোগ্য আর শাস্তি ঠিক কী হবে তা নির্ধারণ করে যে পুলিশি ব্যবস্থা বা সৈন্যবাহিনী সেখানে আদতে উচ্চবর্ণের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিদ্যমান, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হয়। জাতি প্রথায় ‘নীচের তলার’ অবদমিত মানুষ এবং আদিবাসী মানুষদের কাছ থেকে সমস্ত কিছু কেড়ে নিয়ে ঐতিহাসিকভাবে ভারতরাষ্ট্র তাদেরকেই অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং এখনো করে চলেছে। বর্তমান প্রবন্ধটি উচ্চবর্ণের নাগরিকদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার জন্য খতিয়ে দেখবে কীভাবে জাতিগত বৈষম্যের শিকার মানুষদের আরও আরও অবদমিত করবার হাতিয়ার হিসেবে শাস্তি এবং জেল ব্যবস্থা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। 

শোষণ কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে কী অদ্ভুতভাবে স্থানীয় বা সার্বজনীন স্তরে কোন নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর মানুষ/মানুষদের উপর চলা অবদমন এবং হিংসার ঘটনাকে মান্যতা দেওয়া হয়। উচ্চবর্ণের মানুষেরা এই শোষণ কাঠামোকে সচল রাখতে ঠিক কী ভূমিকা পালন করে এবং এই শোষণ কাঠামোর বিরুদ্ধে সংগঠিত আন্দোলনে তাদের সামিল হবার সম্ভবনার দিকটি পর্যালোচনা করবার প্রয়োজন রয়েছে। আমেরিকার কালো মানুষদের স্থানীয়স্তরসহ সার্বজনীন স্তরে জেল এবং পুলিশি ব্যবস্থা বিলোপের জন্য যে আন্দোলন, তা থেকে বোঝা যেতে পারে কীভাবে জেল বা আইনি ব্যবস্থা ভারতবর্ষের ক্ষেত্রেও আদিম নিবাসী মানুষদেরকে মূল থেকে উচ্ছেদ করবার কাজে ক্রমাগত ব্যবহৃত হয়ে চলেছে।  

হিন্দু শাস্ত্রের পাতায় পাতায় জাতভিত্তিক বৈষম্যের সাথে শাস্তি নিয়ে আলোচনা রয়েছে। হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী ‘জাত’ নামক ধারণাটাই কর্মফলের সাথে জড়িত। আগের জন্মে করা পাপ কাজের শাস্তি হিসেবে মানুষ নাকি নিচু জাত হয়ে জন্মায়।, এই তত্ত্ব নিচু জাতের মানুষদের উপর শোষণ, অত্যাচারকে মান্যতা দেয়। এই তত্ত্ব অনুসারেই ‘দলিত’ মাত্রেই অপরাধী। এবং ‘আগের জন্মে’ করা কোন অজানা ‘পাপের’ শাস্তি ভুগতে বাধ্য হয় প্রতিটি ‘দলিত’ মানুষ। একই তত্ত্ব মনুস্মৃতি অনুসারে উচ্চবর্ণের কাছে ‘দলিত’ মানুষের দাসত্বকেও স্বীকৃতি দেয়। মনুস্মৃতির ৮.৪১৫ লাইন অনুসারে সাত রকমের ‘দাস’ স্বীকৃত:

১। যুদ্ধ বন্দী 

২। খাবারের জন্য দাসত্ব

৩। পারিবারিক সূত্রে পাওয়া দাস

৪। কেনা দাস

৫। উপহার হিসেবে পাওয়া দাস

৬। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দাস

৭। শাস্তি হিসেবে দাসত্ব

যাদের পূর্বপুরুষ দাস ছিল, যাদের বাবা-মা দাস, যারা খাবারের জন্য দাসত্ব গ্রহণ করেছে- ইত্যাদি সমস্ত শর্ত জাতিভেদ প্রথার উপর নির্ভর। সাত নম্বর শর্ত হল শাস্তিমূলক দাসত্ব, যা বর্তমান ভারতবর্ষের জেল ব্যবস্থার প্রতিফলন। এ দেশের জেলের ভিতর বন্দী মানুষদের উপর নির্মম অত্যাচার জারি থাকে ঠিক একইরকমভাবে। 

‘দ্য অ্যাবলিশন প্রজেক্ট’ এর সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘দাসত্ব’ হল এমন এক শর্ত যা মানুষকে অন্যের ‘সম্পত্তি’তে পরিণত করে, মালিক পক্ষ কিছু মানুষের কাছ থেকে তাদের সম্মতির অধিকার, মানবাধিকারসহ সমস্ত টুকু কেড়ে নিয়ে নিজেরা একচ্ছত্র ক্ষমতা ভোগী হয়ে ওঠে। শুধুমাত্র জেলের ভিতর বন্দীদের তদন্তের নামে নগ্ন করে হেনস্থা করা, পর্যাপ্ত ওষুধ-জল-খাবার না দেওয়া কিংবা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নির্বাসিত থাকতে বাধ্য করার মত বিষয়গুলো প্রকাশ্যে এসেছে, আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে। মনুস্মৃতির বিধান স্বাধীন ভারতের আইনে সেভাবে প্রতফলিত নাহলেও  দলিত বা আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষদের প্রান্তিকায়নের ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণভাবে পরিলক্ষিত হয়। সুকন্যা সান্থা তার “From Segregation to Labour, Manu’s Caste Law Governs the Indian Prison System” প্রবন্ধে দেখিয়েছেন কীভাবে জেলের ভিতর কাজের ভাগের ক্ষেত্রেও মনুস্মৃতির জাতি বৈষম্যের নীতি প্রতিফলিত হয়ে চলে। 

জাত-অপরাধ-শাস্তি: শাস্তির কাঠামো ঠিক করে দেয় কে অপরাধী আর অপরাধী মানসিকতা ঠিক করে কে নিষ্পাপ! প্রেন্তিস হেম্ফিল তাঁর “Letting Go of Innocence” (২০১৯) প্রবন্ধে বলেছেন, “আমরা ভুলে যাই যে ‘অপাপবিদ্ধতার’ ধারণা আমাদের নিরাপত্তার জন্য তৈরি হয়নি, আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবার জন্য তৈরি করা হয়েছে। আমেরিকার সাদা চামড়ার মানুষেরা কালো মানুষদের উপর ঐতিহাসিকভাবে অন্যায় অত্যাচার (বর্তমানে আইনত) করার পরও ‘নিষ্পাপ’”। ‘অপরাধী’-র অস্তিত্ব অপরাধের জন্য। কিন্তু যেখানে সাদা চামড়ার ক্ষমতার শীর্ষে থাকা মানুষেরা ‘অপরাধ-এর’ সংজ্ঞায়ন করে সেখানে এমেট টিলের মত অসংখ্য কালো চামড়ার পুরুষদের হত্যার পরেও সাদা চামড়ার নারীরা ‘নিষ্পাপ’ কারণ কালো চামড়া মানেই আইনের চোখে ‘অপরাধী’ এবং শ্বেতাঙ্গ নারীদের ‘আতঙ্কের’ কারণ। ঠিক একইভাবে ভারতবর্ষে দলিত পুরুষদেরকে উচ্চবর্ণের নারীদের ‘পবিত্রতা’ এবং ‘সরলতার’ উপর আক্রমণকারী ‘অপরাধী’ হিসেবে দেখা হয়। সোফি জোসেফ তার ‘Castration’ as a Hegemonic Form of Punishment: A Legal History Point of View’(২০১৩) প্রবন্ধে দেখিয়েছেন কীভাবে অপরাধী যদি নিচু জাতের এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি যদি উঁচু জাতের হয়, তাহলে শুধু ‘জাতের’ পরিচয়ের উপর নির্ভর করে অপরাধীর শাস্তির মাত্রা বেড়ে যায়। একই অপরাধের জন্য নিচু জাতের মানুষদের শাস্তি হিসেবে নিপীড়ন এবং অত্যাচার সইতে হয় উঁচু জাতের অপরাধীর সাপেক্ষে, অথচ উঁচু জাতের অপরাধীর ক্ষেত্রে আইন অনেক বেশি সহনশীল ভূমিকা পালন করে। 

দলিত সম্প্রদায়ের ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ এই বর্ণাশ্রম প্রথা ভাঙলে বা ভাঙার চেষ্টা করলে, উঁচু জাতের লোকেদের কাছে তাঁরা ঐতিহাসিকভাবেই ‘অপরাধীর’ তকমা পেয়ে এসেছেন। ভারতীয় সমাজে দলিত পুরুষদের চিরকাল উঁচুবর্ণের মেয়েদের ‘সতীত্বের’ উপর আক্রমণকারী হিসেবে দেখা হয়েছে এবং সেই ‘সতীত্ব’ রক্ষার জন্য নির্মমভাবে হত্যা সংগঠিত হয়ে এসেছে। উচ্চবর্ণের নারী কর্তৃক যৌন নিগ্রহের মিথ্যে অভিযোগের কারণে ১৯৯১ সালে চুন্দুরু হত্যাকান্ডে ১৩ জন দলিত পুরুষকে খুন করা হয়েছিল। জেনি রোয়েনা তার “The “Sexual Harassment” Discourse: A Bahujan Woman’s Perspective” (২০১৭) প্রবন্ধে লিখেছেন ‘যৌন নিগ্রহের’ অভিযোগকে কীভাবে বহুজন সম্প্রদায়ের মানুষদের শায়েস্তা করবার জন্য হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ইকনোমিক উইকলি তে প্রকাশিত “Upper Caste Violence: Study of Chunduru Carnage”(১৯৯১) প্রবন্ধে সমতা সাঙ্গাথনা লিখেছেন, জাতি বৈষম্যকে মাথায় রেখেই চুন্দুরু সিনেমাতে বসবার জায়গার ব্যবস্থা করা। রবি নামে এক দলিত পুরুষ উঁচু বর্ণের জন্য সংরক্ষিত জায়গায় বসলে, এক উঁচু জাতের নারীর গায়ে পা লেগে যায়। এই অপরাধে তাকে পুলিশের কাছে নিয়ে যাবার আগে জবরদস্তি মদ খেতে বাধ্য করা হয় এবং থানায় গিয়ে অভিযোগ নথিভুক্ত করা হয় এই মর্মে যে রবি মদ খেয়ে উঁচু জাতের এক নারীর প্রতি যৌন নিগ্রহের ঘটনা ঘটিয়েছে। গত বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে তামিলনাড়ুর ২৪ বছর বয়সী আর. শক্তিভেল রাস্তার পাশে মলত্যাগ করেছিল বলে তাকে মিথ্যে যৌন নিগ্রহের অভিযোগে পিটিয়ে মারা হয়। শুধুমাত্র দলিত হবার অপরাধে। শৌচাগার ব্যবহারের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবার বিষয়টি ছাড়াও এ ঘটনায় উল্লেখযোগ্য বিষয় হল শক্তিভেলের বিরুদ্ধে যৌন নিগ্রহের অভিযোগ আনা। গত বছরই পুনেতে ২০ বছরের  দলিত ছেলে ভিরাজ ভিলাসকে উচু জাতের মেয়ের সাথে প্রেমের সম্পর্কে থাকার অপরাধে মেয়েটির বাড়ির লোক, ভিরাজের বিরুদ্ধে যৌন নিগ্রহের অভিযোগ এনে ওকে খুন করে। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই দলিত পুরুষদের বিরুদ্ধে মিথ্যে যৌন নিগ্রহের অভিযোগ আনা হয়েছে শুধুমাত্র ‘জাতে’র নিয়ম ভেঙ্গে উচ্চ বর্ণের জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় বসা কিংবা সম্পর্কে জড়িয়ে যাবার জন্য, শক্তিভেলের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র রাস্তার ধারে মলত্যাগের কারণে। দলিত পুরুষ কোনভাবে জাতপাতের নিয়মের বেড়া টপকালেই উচ্চবর্ণের মানুষেরা তা সম্মতি ভঙ্গের মত ভয়ঙ্কর অপরাধ হিসেবে দেখে এবং যৌন হিংসার মিথ্যা দোষ আরোপ করে খুন করে অবলীলা ক্রমে।  

ভারতবর্ষের হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতি দ্বারা সমাজের মূল স্রোতে দলিত পুরুষ, ভারতীয় মুসলমান এবং কাশ্মীরী মুসলমানদের অত্যাচারী, বর্বর হিসেবে যে চিত্র তুলে ধরা হয়, তার ফলে এই মানুষগুলো নিজেরা উচ্চবর্ণ কর্তৃক যৌন হিংসাসহ অনান্য অত্যাচার, নিপীড়নের শিকার হওয়ার কথা তুলে ধরার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। যৌন হিংসার বিরুদ্ধে সংগঠিত আন্দোলনগুলিও দলিত পুরুষদের উচ্চ বর্ণের দ্বারা মিথ্যে অভিযোগে প্রকাশ্যে নগ্ন হতে বাধ্য করবার ঘটনায় প্রতিবাদে ফেটে পড়ে না। দলিত পুরুষদের সমর্থনে মূলস্রোতের সংবাদমাধ্যমে #metoo ভাইরাল বা ব্রেকিং নিউজ হয় না। ২০১৯ সালে মন্দিরে প্রবেশ করার অপরাধে দলিত বালককে নগ্ন করে গরম টালির উপর বসতে বাধ্য করা হয় এবং  ছেলেটি মন্দির থেকে চুরি করছিল এই সাফাই দিয়ে পুলিস নিপীড়কদের পিঠ বাঁচায়। ২০২০ সালে উচ্চবর্ণের এক ব্যক্তির বাইক ছুঁয়ে ফেলার জন্য এক দলিত পুরুষকে নগ্ন করে মারধর করা হয়। এইসব কটি ক্ষেত্রেই দলিত পুরুষদের উপর যৌন হিংসা সংঘঠিত হয়েছে, কিন্তু এর বিচার কে করবে! বিচার তো দূর অস্ত উচ্চবর্ণের নারীবাদী আন্দোলনে ধর্ষণ-সংস্কৃতি এবং যৌন নিগ্রহের বিরধীতার প্রসঙ্গে দলিত পুরুষদের সাথে ঘটে চলা অন্যায় আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে না। বরং দলিত, ভারতীয় এবং কাশ্মীরী মুসলমানদের ‘পৌরুষ’ নিয়ে মূলস্রোতের চিত্রণ অত্যাচারীদের অত্যাচারকে বৈধতা দেয়। একইরকম ভাবে আফস্পার মাধ্যমে ভারত রাষ্ট্র, ভারতীয় সৈন্যবাহিনী স্বাধীনতাকামী প্রতিটি কাশ্মীরী মানুষকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে যৌন নিগ্রহ চালাবার বৈধতা দিয়ে রেখেছে। সৈন্যবাহিনী আফস্পার সাহায্যে যৌন হিংসার মাধ্যমে এভাবেই দেশকে রক্ষা করে চলেছে। 

মানুষ হিসেবে নূন্যতম সম্মান এবং অধিকার দাবি করবার অপরাধে দলিত এবং আদিবাসী নারীদের অপরাধী বানিয়েছে। ভারতীয় পুরাণ অনুসারে যথেচ্ছ ভাবে দলিত ও আদিবাসী নারীদের নানাবিধ অবমাননাকর চিত্রায়ণ তাদের বিরুদ্ধে সংঘঠিত হওয়া অপরাধকে মান্যতা দিয়ে চলেছে। তাদের যৌনতাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপনা করা এবং তা উচ্চবর্ণের পবিত্রতার দিকে ধেয়ে আসা আক্রমণ হিসেবে তুলে ধরা বৈষম্যের আরেকটি দিক। রামায়ণে লক্ষণের দ্বারা শূর্পণখার উপর আক্রমণের যে প্রচলিত কাহিনী, সেখানে কী সহজে লক্ষণের অপরাধকে লঘু করে শূর্পণখাকে হাস্যপদ এবং অপরাধী হিসেবে চিনতে শেখানো হয়েছে উচ্চবর্ণের মানুষদেরকে। এইক্ষেত্রে শূর্পণখাকে অপরাধী হিসেবে দেখা মানে উচ্চবর্ণের দৃষ্টিভঙ্গী থেকে ঘটনার পর্যবেক্ষণ করা। আদিবাসী বা দলিত নারীদের উপর যৌন হিংসার ঘটনা বরাবর আইনি মান্যতা পেয়ে এসেছে, যেমন- ১৯ শতকের কেরালায় দলিত নারীদের স্তন ঢাকবার জন্য কর দেবার ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। শালীনতা শুধুই ছিল উচ্চ বর্ণের নারীদের অধিকার। ক্রিশ্চিনা ধনরাজ তার “Swipe Me Left, I’m Dalit” প্রবন্ধে লিখেছেন, কীভাবে ভারতীয় সমাজে দলিত নারীদের অনৈতিক এবং যৌন নৈতিকতার পরিপন্থী হিসেবে চিত্রিত করা হয়ে চলেছে যুগ যুগ ধরে। উচ্চ বর্ণের নারীবাদীরা যখন দুশ্চরিত্রা, অনৈতিক ইত্যাদি বিষয়গুলিকে ‘রিক্লেইম’ করবার কথা বলে, তখন তারা মনে রাখে না এই বিশেষণগুলো দলিত নারীদের উপর জবরদস্তি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। একদিকে দলিত-আদিবাসী নারীদের মধ্যেকার তথাকথিত ‘পৌরুষের’ প্রতিফলনকে চিত্রিত করে আবার অন্যদিকে তাদের ভোগ্যবস্তু হিসেবে ভেবে নিয়ে তাদেরকেই সবচেয়ে নিপীড়িত এবং প্রান্তিক অবস্থানের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ‘নারী জাতির প্রতি হিংসা’ নিয়ে চর্চার ক্ষেত্রে দলিত নারীর উপর অত্যাচারের বিনিময়ে উচ্চ বর্ণের নারীর প্রাপ্ত নিরাপত্তার ইতিহাস এড়িয়ে যাওয়া হয় সহজেই। অন্যদিকে দলিত-আদিবাসী নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই নিরাপত্তার অধিকার দাবী করলেই ‘অপরাধী’ তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয়। 

অনেক দলিত ব্যক্তিই স্বাতন্ত্র্যভাবে রাষ্ট্রের সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘ন্যায়’এর ধারণার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করেছেন বা করে চলেছেন, যার ফলে ভারতবর্ষে জাতপাতের বৈষম্যের বিলোপ ঘটতে একদিন বাধ্য হবে। ১৯ শতকে নিজের স্তন কেটে স্তন করের বিরুদ্ধে নাঙ্গেলির প্রতিবাদ ছিল আদিবাসী নারীর অধিকার হরণকারী শোষণ কাঠামোর ওপর এক বিরাট ধাক্কা। ২০০৪ সালে নাগপুরে কোর্টের ভিতর, শোষিত শ্রেণির ২০০ জন নারী, পুলিশি সহায়তায় পার পেয়ে যাওয়া প্রচুর ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত এক উচ্চবর্ণের ব্যক্তিকে কুপিয়ে মেরে ফেলে। অসংখ্য ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র উচ্চবর্ণ হওয়ার সুবাদে তার বিরুদ্ধে সঠিক তদন্ত হচ্ছিল না। ফলত মেয়েরাই নিজেদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে ধর্ষককে মেরে ফেলে এবং নিজেদের প্রাপ্য বিচার ছিনিয়ে নেয়। এবং পরবর্তী অন্য মেয়েদের পুলিশের হাত থেকে বাঁচাতে সবাই নিজেদের কাঁধে ধর্ষক খুনের দায় নেয়। এক্ষত্রে মেয়েরা কিন্তু পুলিশ এবং আইনি ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে নিজেরাই নিজের সম্প্রদায়ের মেয়েদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে। ঐক্যবদ্ধভাবে ঘটনার দায় স্বীকার করে উচ্চবর্ণ নিয়ন্ত্রিত পুলিশ এবং রাষ্ট্রের হাত থেকে ‘অপরাধী’ চিহ্নিত করবার ক্ষমতাও মেয়েরা কেড়ে নিয়েছিল। ২০১৮ সালে রায়া সরকার একটি লিস্ট প্রকাশ করে সমাজের উঁচু তলায় থাকা এক ঝাঁক যৌন নিগ্রহকারীর নাম সামনে নিয়ে আসে। এই লিস্ট আসলে সেই সমস্ত যৌন নিগ্রহের ঘটনার সারভাইভারদের আওয়াজকে তুলে ধরে, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলি যাদের পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে তাদের চুপ করতে বাধ্য করেছিল। 

সীমান্ত পেরিয়ে সংহতি:  

জেল ব্যবস্থার বিলোপ ঘটাতে হলে বা বিশ্বব্যাপী বিলোপপন্থীদের এক জোট হতে হলে আগে বুঝতে হবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে রাষ্ট্রযন্ত্র কীভাবে পুলিশকে কাজে লাগায়। এই ইস্যুতে আমেরিকার কালো মানুষরা সংগঠিত আন্দোলন গড়ে তুলেছে, তারা আলোচনায় এনেছে কীভাবে জেল ও পুলিশ কালো মানুষদের উপর নজরদারি এবং তাদের দাস বানানোর প্রক্রিয়া জারি রাখে। আমেরিকার সংবিধানের ১৩তম সংশোধন অনুযায়ী ‘দাসত্ব’ ব্যবস্থার পুরোপুরি বিলোপ ঘটানো হবে শুধুমাত্র অন্যায়ের শাস্তি হিসেবে ছাড়া। এই বক্তব্যের সাথে মনুস্মৃতির ‘দাসত্ব’ নিয়ে বক্তব্যের হুবহু মিলে যায়। এই মিল আসলে দেখিয়ে দেয় কীভাবে সীমান্তরেখা এবং সময়রেখা পেরিয়ে শোষণ কাঠামো একই সুরে কথা বলে। আমেরিকা এবং ভারতবর্ষ- উভয় দেশের জেলেই একদম প্রান্তিক শ্রেণির প্রতিনিধিদের সংখ্যাই বেশি। ভারতের জেলবন্দীদের মধ্যে যেমন দলিত, আদিবাসী, মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষই সংখ্যাগুরু, আমেরিকাতেও ঠিক তেমনি কালো মানুষেরাই জেল বন্দীদের মধ্যে সংখ্যাগুরু। ভারতীয় পুলিশ এবং সৈন্যবাহিনী নির্বিচারে প্রান্তিক মানুষদের আটক করে, জেলে পুরে শারীরিক নিগ্রহ, যৌন নিগ্রহ করে থাকে, উত্তর-পূর্ব ভারতে আফস্পা দিয়ে স্বাধীনতাকামী মানুষদের নির্বিচারে খুন করে, ধর্ষণ করে। ঠিক যেমনভাবে পুলিশি নিপীড়নের শিকার হতে হয় আমেরিকার কালো মানুষদের। শুধু জাতি বা ধর্মীয় বিদ্বেষেই শেষ নয়, এমনকি বর্ণ বিদ্বেষেও ভারত রাষ্ট্র এগিয়ে। ২০১৩ সালে জলন্ধরে  বর্ণ বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের প্রতিবাদ করার অপরাধে ২১ জন কঙ্গো দেশের শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়। 

বিশ্বব্যাপী সংহতি এমনি এমনি গড়ে উঠবে না। সেজন্য আমাদের বিভিন্ন দেশের শোষণ কাঠামোর মধ্যের যোগসূত্রগুলো খুঁজে বের করতে হবে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রভাবকে বুঝতে হবে। বুঝতে হবে আমেরিকার জেল বিলোপের আন্দোলনের সাথে ভারতবর্ষে জাতিভেদ প্রথা বিলোপের যোগসূত্র কিংবা পালেস্তাইনের মুক্তি আন্দোলনের সাথে কাশ্মীরের স্বতন্ত্রতার আন্দোলনের যোগসূত্রকে। পুলিশ, সৈন্যবাহিনী, জেল, ডিটেনশন ক্যাম্প ইত্যাদি কোন কিছুই বিচ্ছিন্ন নয় একে অপরের থেকে। ইজ্রায়েলের পুলিশ এবং সৈন্যবাহিনী ভারত এবং আমেরিকার সৈন্যবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয়। সাদা চামড়ার মানুষদের কিংবা হিন্দুত্ববাদীদের আধিপত্যবাদ জায়নবাদী শোষণ কাঠামো একইসাথে শলা পরামর্শ করে পথ হাঁটে। তাই আমেরিকায় কালো মানুষদের অধিকার মিছিলে নির্বিচারে যেমন গুলি চলে, তেমনি গুলি বর্ষিত হয় কাশ্মীর এবং প্যালেস্তাইনের মানুষদের উপর। ভারত রাষ্ট্র কাশ্মীরে রোহিঙ্গাদের আটক করে এই অজুহাতে যে তাদের উপস্থিতিই নাকি অপরাধের সমান। আর কাশ্মীর এখন একটি উন্মুক্ত জেল খানা, চারিদিক থেকে সবরকমভাবে কাশ্মীরী জনতাকে বন্দী করে রাখা হয়েছে তাদেরই মাটি জবরদখল করে। 

ইজ্রায়েলি সৈন্যবাহিনীর থেকে শেখা পদ্ধতি মেনেই ভারতীয় পুলিশ শোষিত সম্প্রদায়গুলির উপর নজরদারি জারি রাখে, জারি রাখে নিপীড়ন, হত্যা, আটকসহ অন্তহীন অবদমনের নীতি। এই জাতি বৈষম্যমূলক পুলিশি ব্যবস্থা এবং জেলখানা, বিশ্বের জেলব্যবস্থা আর সৈন্যবাহিনীর নৈতিকতার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। বিশ্বব্যাপী এই ব্যবস্থাগুলো টিকে আছে কারণ প্রত্যেকটা রাষ্ট্র অনান্য রাষ্ট্রগুলিকে এবিষয়ে মদত দিয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। জাতি বৈষম্যের অবলুপ্তি এবং উচ্চবর্ণের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত শাস্তি ব্যবস্থা ধ্বংস করতে হলে সারা বিশ্বে ঘটে চলা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সংহতিতে এক জোট হতে হবে। 

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *