পরিযায়ী শ্রমিক – ত্রাণের রাজনীতি পেরিয়ে, প্রথম কিস্তি

গতবছর থেকেই আমরা দেখেছি পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর নেমে আসা আঘাতের বীভৎসতা। যে শহরগুলোকে তাঁরা নিজেদের শ্রম দিয়ে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন, রুজিরুটি হারিয়ে, কোনও সাহায্য না পেয়ে সেই শহর থেকেই বিতাড়িত হতে হয়েছে তাঁদের। সরকার কোনও ব্যবস্থা না করায়, যেটুকু যাতায়াতের ব্যবস্থা করা গেছে, তাতেই গাদাগাদি করে বাড়ি ফিরেছেন হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষ। যাঁরা যানবাহনের ব্যবস্থা করতে পারেননি, তাঁরা কয়েকশো কিলোমিটার হেঁটেছেন। মারা গেছেন পথেঘাটে, রেললাইনে। এ বছর করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা শুরু হতেই আমরা দেখেছি আবার একই ছবি। গতবছর থেকে জাতীয় স্তরে পরিযায়ী শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করেছে মাইগ্র্যান্ট ওয়ার্কার্স সলিডারিটি নেটওয়ার্ক বা পরিযায়ী শ্রমিক সংহতি মঞ্চ। বামার পক্ষ থেকে জিগীষা কথা বললেন মঞ্চের সদস্যা শ্রেয়া ঘোষের সাথে। শ্রেয়া বর্তমানে গবেষণারত, এবং শ্রমজীবী অধিকার, ছাত্রছাত্রী আন্দোলন ও নারী অধিকার আন্দোলনের কর্মী।

প্রথমত, এত ব্যস্ততার মধ্যেও আমাদের সাথে কথা বলার জন্য অনেক ধন্যবাদ। শুরুতে যদি লকডাউনের পরিস্থিতিতে মাইগ্র্যান্ট ওয়ার্কার্স সলিডারিটি নেটওয়ার্ক (এমডব্ল্যুএসএন) বা পরিযায়ী শ্রমিক সংহতি মঞ্চ কীভাবে শুরু হলো, সেটা একটু বলো। 

এমডব্ল্যুএসএন আমরা শুরু করছি গত বছরের (২০২০) মার্চ মাসে। দিল্লীর আনন্দ বিহার ইত্যাদি জায়গায় বীভৎস অবস্থা দেখেই আমাদের মনে হয়েছিল যে এই পরিসরে কাজ করা আশু প্রয়োজন। কিন্তু, তাছাড়াও, পরিযায়ী শ্রমিকরা যে ভারতবর্ষের শ্রমিক শ্রেণির একটা বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ – সেটা শুধু সংখ্যার হিসাবেই নয়, তার বাইরেও তাঁদের গুরুত্ব রয়েছে, সেটা আমাদের কয়েকজনের নিজের কাজের অভিজ্ঞতার নিরিখে অনেকদিন ধরেই মনে হচ্ছিল। আমরা যারা এমডব্ল্যুএসএন তৈরি করলাম, তাদের মধ্যে অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক, এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের মধ্যে যারা পরিযায়ী শ্রমিক তারা আমাদের দেশের শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে কতটা গুরুত্ব রাখে, সেই আলোচনাও দীর্ঘদিন চলেছে। 

শ্রমজীবী শ্রেণির মধ্যে এক বিশাল অংশ হয়েও, গত দশ বছর ধরে ভারতবর্ষের সামগ্রিক অর্থনৈতিক এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটে তাঁদের অবস্থান কী, বা তাঁদের সংগঠিত হওয়ার উপায়ই বা কী – এই প্রশ্নগুলো আমাদের সবার মধ্যেই কমবেশি ছিল। গতবছরে লকডাউন পরবর্তী অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণভাবে সমাজে, মূলধারার মিডিয়ায় পরিযায়ী শ্রমিকরা যে আসলে সমাজের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ সে নিয়ে প্রথম ব্যাপকভাবে আলোচনা হতে শুরু করে। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে এমনিতেই ত্রাণ এবং সাহায্যের সরাসরি প্রয়োজন ছিল ব্যাপক সংখ্যক শ্রমিকের, এবং সেই প্রয়োজনীয়তা বুঝে ত্রাণ, যোগাযোগ, রেশন, পরিবহনে সাহায্য ইত্যাদি কর্মসূচী দিয়েই আমরা কাজ শুরু করি। সমাজে পরিযায়ী শ্রমিক প্রশ্নকে এক প্রকার যেভাবে অদৃশ্য করে রাখা হতো, গতবছর থেকে সেটা খানিকটা বদলালেও মূলধারার লেখাপত্র, মিডিয়া ইত্যাদি সবজায়গাতেই এঁদের শুধুমাত্র সাহায্যপ্রত্যাশী, অসহায় রূপই তুলে ধরা হয়েছে। আমরা সেখানে রাজনৈতিক ভাবে এক ধরনের হস্তক্ষেপ করতে চেয়েছিলাম। এই ধরনের অসহায়তার আখ্যানের মাধ্যমে পরিযায়ী শ্রমিকশ্রেণির অস্তিত্ব একটা আপাত স্বীকৃতি পেলেও তাঁরা যে আসলে একটি রাজনৈতিক শ্রেণিও বটে – তার কোনও স্বীকৃতি ছিল না। একদম শুরুতে যখন এমডব্ল্যুএসএন তৈরি হচ্ছিল, তখন থেকেই আমরা আমাদের কাজের অভিমুখ এভাবে রাখতে চেয়েছি যাতে পরিযায়ী শ্রমিকদের শুধু দয়ার চোখে না দেখা হয়, বা যাতে তাঁদের শুধুমাত্র ত্রাণ দেওয়া-নেওয়ার বাইনারিতে ফেলে না দেওয়া হয়। তাই ত্রাণের কাজের পাশাপাশি মূলত সামাজিক পরিসরে পরিযায়ী শ্রমিকদের রাজনৈতিক অবস্থান, সামাজিক অবস্থান, কর্মক্ষেত্রে তাঁদের অধিকারের প্রশ্ন, তাঁদের নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন – এইসমস্ত প্রশ্নকে আমরা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে চেয়েছি এমডব্ল্যুএসএন-এর কাজের মধ্য দিয়ে। পরিযায়ী শ্রমিক আসলে যে আন্দোলনেরও অংশ, প্রতিরোধেরও অংশ – তাঁরা যে আসলে একটা জীবন্ত ক্যাটেগরি, লাইনে দাঁড়িয়ে চালডাল বা বাসের টিকিট চাওয়ার বাইরেও যে তাঁদের অস্তিত্ব আছে, সে কথা আমরা জোরের সাথে বলতে চেয়েছি। ফলে এইসব ভাবনা ইত্যাদি নিয়েই এমডব্ল্যুএসএন তৈরি হয়। 

এই বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্ন নিয়ে তোমায় আরও অনেক প্রশ্ন করার আছে, কিন্তু তার আগে একটু এখনকার প্রত্যক্ষ বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাই তোমার কাছে। তোমরা কি এই লকডাউনের সময়ে মূলত দিল্লি বা সংলগ্ন অঞ্চলেই কাজ করেছো, নাকি অন্যান্য রাজ্যেও কাজে যুক্ত ছিলে? 

গতবছর যখন আমরা শুরু করি তখন প্রাথমিকভাবে বারোটা ভাষায় আমরা হেল্পলাইন দিই, কারণ পরিযায়ী শ্রমিকরা মূলত বিভিন্ন ভাষাভাষী রাজ্য থেকে আসেন, এবং যে শহরে তাঁরা কাজ করেন সেখানে ভাষার সমস্যা এঁদের মধ্যে একটা বড় সমস্যা। লকডাউন ঘোষণার পর আমরা এই হেল্পলাইন নম্বরগুলো যত সংখ্যায় পারা যায় ছড়ানোর চেষ্টা করেছিলাম, এবং প্রায় দু’মাস ধরে আমাদের কাছে নিয়মিত ফোন আসে সাহায্যের জন্য। আমরা আমাদের তরফ থেকে বাংলা, তামিল, কন্নড় ইত্যাদি বারোটা ভাষায় হেল্পলাইন নম্বর রাখতে পেরেছিলাম, যার মাধ্যমে আমরা মূলত ত্রাণের কাজ চালিয়েছি। এমন কোনও ভাষা ছিল না যে ভাষায় আমাদের সাথে যোগাযোগ করা হয়নি। বাংলা এবং বিহার হেল্পলাইন গুলোতেই মূলত সাহায্যের জন্য সবথেকে বেশি ফোন এসেছে। ফলে আমরা মোটামুটি জাতীয় স্তরেই কাজ করেছি। 

গত বছর ত্রাণের ক্ষেত্রে বিশেষত যেখান থেকে যেমনভাবে ফোন আসছিল, সেখানে সেভাবে হস্তক্ষেপ করে সাহায্য করার চেষ্টা করছিলাম। সেই এলাকায় সরাসরি যারা কাজ করছিল তাদের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া, অঞ্চলগত ভাবে রেশন ইত্যাদির ব্যবস্থা করা ইত্যাদি। পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমরা চেষ্টা করেছি সরাসরি আর্থিক সাহায্য তুলনায় কম করার, বরং, বিভিন্ন এলাকায় যারা ত্রাণের কাজ করছিলেন তাদের জন্য আমরা চাঁদা তোলা, টাকা পাঠানো, রেশন ও অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রী পাঠানো ইত্যাদি কাজ করেছি। ফলে বিভিন্ন রাজ্যের বিভিন্ন সংগঠনের সাথে এক ধরনের যোগাযোগ রেখে যৌথভাবেই কাজটা করা হয়। 

অগাস্ট-সেপ্টেম্বর নাগাদ যখন এই প্রাথমিক ধাক্কার আঘাত একটু কমেছে, তখন আমরা মূলত দিল্লি, দিল্লি সংলগ্ন অঞ্চল, ব্যাঙ্গালোর, পশ্চিমবঙ্গ ইত্যাদি জায়গায় পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করেছি। এইবছরে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময়ে আমরা দিল্লি থেকেই শুরু করি, যেহেতু দিল্লি এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চলেই প্রথম লকডাউন চালু হয়। তবে এই মুহূর্তে দিল্লি ছাড়াও কর্ণাটক, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গ ইত্যাদি সমস্ত জায়গা থেকেই আমাদের যোগাযোগ করা হচ্ছে, এবং এখানে আমরা কাজ করার চেষ্টা করছি।

তুমি একটু আগে বলছিলে, যে পরিযায়ী শ্রমিকদের একটা বিশেষ গোষ্ঠী, বা শ্রমিক শ্রেণির একটা বিশেষ অংশ হিসাবে দেখবার প্রয়োজন আছে। সেই সূত্রে জিজ্ঞাসা করছি, সাধারণভাবে সংগঠিত এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের তুলনায় পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর লকডাউন এবং করোনা পরিস্থিতির অভিঘাত কীভাবে আলাদা থেকেছে? তোমাদের অভিজ্ঞতা কী বলছে? 

করোনা এবং লকডাউনের পরিস্থিতি সংগঠিত এবং অসংগঠিত এই দুই ক্ষেত্রের শ্রমিকশ্রেণির উপরেই তীব্র প্রভাব ফেলেছে। একটা নির্দিষ্ট আয়ের নীচে থাকা শ্রমজীবী মানুষ সামগ্রিকভাবে  কাজ হারিয়েছেন, চাকরি হারিয়েছেন, সর্বস্বান্ত হয়ে গেছেন। বিশেষ করে কাজ হারিয়েছেন কন্ট্রাকচুয়াল বা সাময়িকভাবে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকরা। পরিযায়ী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে আমি বলবো যে এই পরিস্থিতির প্রভাব – তার ধরন এবং তীব্রতা দুই-ই একটু আলাদাভাবে পড়েছে। 

আমাদের দেশে বিগত পনেরো-কুড়ি বছরে দেখা গেছে যে পরিযায়ী শ্রমিকরা যেসব শহরে কাজের আশায় গেছেন, সেইসব শহরে কিন্তু তাদের কোনও সামাজিক বা সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি হয়নি। শ্রমের ইতিহাসে দেখা যায় যে এর আগে যখন জামশেদপুর, বোকারো ইত্যাদি শিল্প শহরগুলো গড়ে উঠছিল, তখনো প্রচুর মানুষ পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে সংস্থানের খোঁজে সেখানে যান। কিন্তু সেখানে তারা একভাবে বসতি স্থাপন করতে পেরেছিলেন। এই শহরগুলোর পরিকল্পনার মধ্যেও শ্রমজীবী মানুষের বসবাসের জন্য, জীবন নির্বাহের জন্য এক ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। সে ব্যবস্থা কখনোই পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না ঠিকই, কিন্তু পরিযায়ী শ্রমিকদের ভাবনায় রেখে কিছু আর্থ-সামাজিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল শহরগুলোর পত্তনের সময় থেকেই। 

এই গত কয়েক দশক ধরে যে মাইগ্রেশন হয়েছে, সেগুলো মূলত হয়েছে ব্যাঙ্গালোর, সুরাট, আহমেদাবাদ, দিল্লি, গুরগাঁও, তিরুপুর ইত্যাদি বড় বড় এলাকায়। এই সমস্ত জায়গার শহরের পরিকল্পনায় শ্রমজীবী মানুষকে কোনও স্থান দেওয়া হয়নি। ফলে এই সমস্ত জায়গায় পরিযায়ী শ্রমিকদের কোনও সামাজিকীকরণ হয়নি। এইসব অঞ্চলের আঞ্চলিক বাসিন্দাদের সাথে পরিযায়ী শ্রমিকদের যে কোনও আদানপ্রদানই নেই তা-ই শুধু নয়, বরং তীব্র আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ভাষাগত, জাতিগত পার্থক্য আছে। ফলে এই শিকড়হীন এক ধরনের অবস্থান তাঁদের অসহায়তা আরও বাড়িয়েছে। ফলে লকডাউন যখন শুরু হচ্ছে, তখন পরিযায়ী শ্রমিকদের কাছে তাঁদের পরিবার, গ্রাম, কর্মক্ষেত্র, প্রতিবেশী, সমাজ – কোনও ধরনের কাঠামোই নেই যার উপর তাঁরা নির্ভর করতে পারেন। 

সার্বিকভাবে এইসমস্ত শহরের গঠনকাঠামোই এমনভাবে তৈরি হয়েছে যাতে পরিযায়ী শ্রমিকরা চিরস্থায়ীভাবে পরিযায়ী শ্রমিক হয়েই থাকবেন। তাঁরা যখন অনেক স্বপ্ন নিয়ে এই নতুন শহরগুলোতে যাচ্ছেন, বছরের পর বছর সেখানে থাকা সত্ত্বেও তাঁরা নিজেদের জন্য কোনও সামাজিক পরিসর তৈরি করতে পারছেন না। সমস্ত শহরে আবাসন, পার্ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইত্যাদি সমস্ত পরিকল্পনার মধ্যেই পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রশ্নকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা হয়েছে। এইসমস্ত কাঠামো এমনভাবেই বানানো হয়েছে যাতে নির্ধারিতভাবে শ্রমজীবী মানুষের জন্য কোনও জায়গা না থাকে, এবং এই ব্যবস্থার চরমতম ভুক্তভোগী হয়েছেন পরিযায়ী শ্রমিকরা। ফলে, বিশেষত পরিযায়ী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে লকডাউনের সমস্ত অভিঘাতের বাইরেও এই সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা থেকে উদ্ভূত এক ধরনের অসহায়তাও খুবই গভীর ছাপ ফেলেছে। 

আচ্ছা এই সরকারী বিভিন্ন পরিকল্পনার সাপেক্ষে আরেকটা প্রশ্ন মনে হচ্ছে। বেশ দেরিতে হলেও এই যে বিভিন্ন রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে বিভিন্ন প্যাকেজ, ত্রাণ, রেশন, স্বাস্থ্যসেবা বা পরিবহন চালু করা হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবের মাটিতে পরিযায়ী শ্রমিকদের ঠিক কতটা সাহায্য করতে সক্ষম হয়েছে? 

সাধারণভাবে যদি জিজ্ঞেস করিস, তাহলে বলবো কিছু কিছু রাজ্যে সরকারের ত্রাণ বেশি পৌঁছেছে, কিছু কম। কিন্তু যদি প্রকৃত বাস্তবতা জিজ্ঞেস করিস, তাহলে বলতে হয় যেটুকু পৌঁছেছে তার পরিমাণ যা প্রয়োজন ছিল তার পাঁচ শতাংশও নয় বলে আমার ধারণা। এবার এইটুকুর মধ্যে সময়বিশেষে এবং ক্ষেত্রবিশেষে সাহায্য পৌঁছেছে। যেমন দিল্লি সরকার লকডাউনের একদম শুরুর দিকে খুব তাড়াতাড়িই একটা ই-কুপন-এর ব্যবস্থা, এবং হাঙ্গার রিলিফ নামে রেশন ব্যবস্থা চালু করে দিয়েছিল, তামিলনাড়ুতে আম্মা ক্যান্টিন ইত্যাদি ধরনের রেশন ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। বাংলায় স্নেহের পরশ বলে একটা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছিল, যেটা পেয়েছেন কিছু মানুষ; মহারাষ্ট্রে, কর্ণাটকে কিছু ত্রাণ মানুষ পেয়েছেন। কেন্দ্রীয় সরকার জনধন যোজনায় পাঁচশো টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিল মহিলাদের অ্যাকাউন্টে, সেটাও কিছু মানুষ পেয়েছেন। এগুলো যে সব মানুষের কাছে পৌঁছতে পেরেছে তা একেবারেই নয়, কিন্তু এর ফলে কিছু মানুষের সাহায্য হয়েছে বটেই। আমি একদম নির্দিষ্টভাবে পরিসংখ্যান দিতে পারবো না। কিন্তু আপাতভাবে শুধুই ত্রাণ কতজন পেয়েছেন তার সংখ্যা দেখলে মনে হতে পারে অনেক লোক, কিন্তু মোট যত মানুষের ত্রাণের প্রয়োজন ছিল, মোট যত সংখ্যায় পরিযায়ী শ্রমিক আছেন ভারতবর্ষে, এই সংখ্যাটা তার তুলনায় খুবই নগণ্য। 

তবে ত্রাণ আদপে কতটা দেওয়া হচ্ছে সেটা ছাড়াও, ত্রাণ পাওয়ার মধ্যে নানান বিষয় কাজ করেছে। কতজন শ্রমিকের ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট আছে সেটা আর্থিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটা বড় প্রশ্ন। এছাড়া এই আর্থিক সাহায্য, বা রেশন সমস্ত ব্যবস্থাই ভীষণভাবে আঞ্চলিক ক্ষেত্রে ক্ষমতার বিভিন্ন টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হয়েছে। ধরো তোমার গ্রামে পঞ্চায়েত প্রধান বা মোড়ল রেশনের জন্য একটা লিস্ট বানাচ্ছেন, সেই তালিকায় তোমার নাম যদি ঢোকাতে পারো, তবেই তোমার ত্রাণের আশা আছে। এই তালিকায় নাম ঢোকার প্রক্রিয়ার বেশিরভাগটাই স্থির হয়েছে তোমার সামাজিক অবস্থান কেমন, গ্রামে তোমার ক্ষমতা কতটা, তোমার বা তোমার পরিবার-বন্ধুবান্ধবের প্রধানের বা তার সাকরেদ-দের সাথে ওঠাবসা আছে কিনা ইত্যাদি বিভিন্ন কিছু দিয়ে। আমরা নিজেরাই বুঝতে পারছিলাম যে কারা ত্রাণ পেয়েছে কারা পায়নি এটা ভীষণভাবে তাঁদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ, তাঁরা কোন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আছেন বা নেই, গ্রামে তাঁদের যোগাযোগ এবং সামাজিক অবস্থান – এই সমস্ত কিছুর মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হয়েছে। এই সামান্য ত্রাণের জোগানের মধ্যেও কাজ করেছে এক ধরনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব।

যদিও এই ধরনের সঙ্কটের মুহূর্তে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা খুবই মুশকিল, কিন্তু আরেকটা বিষয়ে তোমাদের অভিজ্ঞতা, বিশ্লেষণ জানতে চাইছি, সেটা হলো নারী প্রশ্ন। পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্যে যাঁরা মহিলা – সেটা বৈবাহিক সূত্রেই হোক, বা যাঁরা সরাসরি কাজ করছেন কারখানায় বা অন্যত্র, বা যাঁরা গৃহশ্রমে নিযুক্ত, তাঁদের মধ্যে এই পরিস্থিতির অভিঘাত কিভাবে পড়েছে? মানে কাজ বিশেষে, অবস্থান বিশেষে, বা তাঁদের লিঙ্গ অবস্থানের দরুন কী তাঁদের সমস্যার ধরন বা তীব্রতা আলাদা মাত্রা পাচ্ছে? 

একটা জিনিস আমার সবসময়েই মনে হয়েছে যে আমাদের দেশে সেনসাস বা জনগণনা যেভাবে হয়, তাতে ‘পরিযায়ী কারা’ – এই পরিসংখ্যানের ভয়ানক অভাব আছে। কিন্তু তার মধ্যেও যেটুকু জানা যায়, তাতে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে যাওয়াটাকে মোটামুটি দুটো ভাগে ভাগ করা হয়েছে – তুমি কাজের জন্য যাচ্ছ, নাকি পারিবারিক কারণে যাচ্ছ। মহিলাদের ক্ষেত্রে, গণনা বলছে, বেশিরভাগ লেখেন “বৈবাহিক কারণে” তাঁরা মাইগ্রেট করছেন। ফলে পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে যাঁরা পরিগণিত হচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই পুরুষ। এবার এই প্রসঙ্গে লিঙ্গবৈষম্য সংক্রান্ত আরও অনেক কথা বলার আছে, কিন্তু মূল জায়গায় ফিরি। এই বৈবাহিক কারণ দর্শিয়ে যেসব মহিলারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাচ্ছেন, তাঁরাও কিন্তু এই নতুন জায়গায় এসে বিভিন্ন কাজে যুক্ত হচ্ছেন। অথচ, খাতায় কলমে তাঁদের ‘শ্রমিক’ হিসাবে কোনও স্বীকৃতি থাকছে না। ফলে তিনি বিবাহিত মহিলা হিসাবেই পরিগণিত হচ্ছেন, মহিলা শ্রমিক হিসাবে না। আমাদের দেশে ক’জন পরিযায়ী শ্রমিক আছেন, সেই পরিসংখ্যান এমনিতেই যথেষ্ট অস্বচ্ছ; এর মধ্যে মহিলাদের পরিসংখ্যানের এই প্রক্রিয়ার ফলে মোট কতজন পরিযায়ী মহিলা শ্রমিক আছেন, সেই তথ্য পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। 

ফলে নির্মাণকাজ বা অন্যান্য কাজের ক্ষেত্রে (সেটা খুব কম হলেও) যেটুকু শ্রমিকদের নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলে, তাতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুরুষরাই কাজ পান। মহিলা পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্যে যারা মানুষের বাড়িতে গৃহশ্রমের কাজ করতেন, বিরাট মাত্রায় তাঁদের সবার কাজ গেছে। গতবছর থেকেই মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত মানুষের আবাসনে, বাড়িতে এরকম একটা ধারণা খুবই মান্যতা পেয়েছে যে, বাড়িতে যিনি কাজ করতে আসেন, একমাত্র তিনিই যেন রোগটাকে ছড়িয়ে দেবেন। ঘটনাচক্রে দেখা গেল, বস্তিতে থাকা মানুষের থেকে এই সমস্ত আবাসনে থাকা মানুষের মধ্যেই রোগ সবথেকে বেশি ছড়াল। বাড়ির কাজের মহিলাদের উপর স্প্রে করা, আবাসনে ঢোকার আগে খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে তাঁদের নিজেদের পোশাক বদলাতে বাধ্য করা, আবাসন কমিটির তরফ থেকে নোটিশ লাগিয়ে এঁদের আসার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা, ইত্যাদি বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছে এই সময়ে। ফলে লকডাউনের সময়ে মহিলা শ্রমিকদের প্রশ্ন আর্থিক প্রশ্নের বাইরেও, আত্মমর্যাদার প্রশ্ন। 

এছাড়া লকডাউন হওয়ার ফলে, শুধু শ্রমিক কেন প্রায় সমস্ত মহিলাদের উপরেই গৃহশ্রমের ভার অনেকগুণ বেড়ে গেছে। স্পষ্টতই, একটা আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে আয়সীমার নীচের স্তরে থাকা পরিযায়ী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে তার প্রভাব ভয়ঙ্করভাবে পড়েছে। যার কাছে থাকার জায়গা বলতে শুধু একটা কামরা আছে, স্বামী স্ত্রী দুজনেরই কাজ চলে গেছে, এবং লকডাউনের মধ্যে বাচ্চারা স্কুলে যাচ্ছে না, উপরন্তু পরিবারের আরও অনেক মানুষ বাড়িতে এসে থাকছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে তো গৃহশ্রমের ভার বিপুলভাবে বেড়েছে। আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজে কিছু কাজের দায়িত্ব মহিলাদের কাজ হিসাবে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়, সে কারণে বাচ্চা সামলানো, রান্না, বাড়ির লোকের দেখভালের কাজ, এই ভয়াবহ আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে ঘর চালানোর দায়িত্ব ইত্যাদি সবকিছুই মহিলাদের উপর বর্তেছে। এর সাথে রেশনের পরিমাণ যেহেতু বাঁধাধরা, নির্দিষ্ট, ফলে বাড়িতে বেশি লোক থাকার ফলে সেই খাবারও ভাগ করতে হয়েছে। মহিলাদের অবস্থানের কারণে খাবার পর্যাপ্ত না থাকলে অবশিষ্ট খাবার, ফ্যানাভাত তাঁদেরকেই খেতে হয়েছে। ফলে লকডাউনে মহিলা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যেরও ভয়ানক অবনতি ঘটেছে। 

এবারও, এই করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময়েও আমরা আনন্দ বিহারে, আরও অন্যান্য জায়গায় দেখেছি পরিযায়ী শ্রমিকদের ঠিক একই ছবি। প্রথম লকডাউনের থেকে কি আলাদা কিছু দেখছো দ্বিতীয় লকডাউনে? 

আমি বলবো, প্রথম থেকে দ্বিতীয় ঢেউয়ে যেটা পাল্টেছে সেটা হলো, সরকার শিক্ষা নিয়েছে – এটা আমি শিক্ষার নেতিবাচক অর্থেই বলছি। গতবছর যা হয়েছিল, রাত্রি আটটার সময় ঘোষণা করে রাত্রি বারোটা থেকে সবকিছু বন্ধের মতো বিশাল আকারের চটজলদি লকডাউন এবার সরকার ঘোষণা করেনি। ফলে গতবছর যাতায়াত বা পরিবহনের ক্ষেত্রে যে বাধা ছিল, এবছর আপাতভাবে দেখলে মনে হবে সেটা নেই। ফলে এবছর সরকার বলছে, আমরা কারোর গতিবিধি আটকাচ্ছি না, কেউ থাকতে চাইলে থাকতে পারে, যেতে চাইলে যেতে পারে। এর ফলে, আমাদের ধারণা অনুযায়ী, এই পুরো সঙ্কটের একটা ব্যক্তিকরণ (individualisation) হয়েছে, একটা বেসরকারীকরণ হয়েছে। এবছর সরকার সম্পূর্ণ দায় ঝেড়ে ফেলেছে – পুরো সঙ্কটের দায় নিতে হচ্ছে ব্যক্তি শ্রমিকদের। গতবছর তাও একটা দাবি তোলা গেছিল যে চারঘন্টার মধ্যে লকডাউনের ফলে সরকারকে ভাতা দিতে হবে, রেশন, পরিবহন দিতে হবে। এবছর যা দেখা যাচ্ছে, তা সরকারের নয়া-উদারবাদী নীতির নির্ভুল প্রতিফলন। 

দিল্লিতে এবছর লকডাউন শুরু হওয়ার ঠিক পরেই আমাদের কাছে সবচেয়ে বেশি যে ফোন এসেছে, সেটা হলো পরিবহনের ব্যবস্থা করার জন্য। সবাই-ই বললেন যে তাঁরা মনে করছেন, লকডাউন শুরু হলে তাঁরা এই শহরে টিকে থাকতে পারবেন না, ফলে তাঁরা ফিরে যেতে চান। এবার ধর এখান থেকে যিনি পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, বা বিহারের আরারিয়া-তে ফিরবেন, সাধারণ পরিস্থিতিতে তাঁর বাসের টিকিট হয় ১৩০০ থেকে ১৪০০ টাকা। দিল্লীতে লকডাউন ঘোষণার সাত দিনের মধ্যে সেটা ১৮০০ থেকে ২০০০-এ পৌঁছে যায়। আমরা যখন দ্বিতীয় সপ্তাহে শ্রমিকদের জন্য টিকিট কাটছি, আমি নিজে বলতে পারি আমি ২২০০ টাকার টিকিট কেটেছি। ফলে এরকম ব্যাপক হারে কালোবাজারি হয়েছে। এবছর কোনও শ্রমিক ট্রেন ঘোষণা করা হয়নি, সরকারী বাসের সংখ্যা বেড়েছে এরকমটাও হয়নি, ফলে এইবছরে বিশেষত শ্রমিকদের সম্পূর্ণ একা, ব্যক্তিগত স্তরে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়েছে। 

আরও একটা জিনিস বুঝতে হবে যে, দ্বিতীয় লকডাউনের সময় মানুষের আর্থিক অবস্থা গত বছরের থেকেও অনেক খারাপ। পরিযায়ী শ্রমিকরা কাজে ফিরেছেন মাত্র অগাস্ট বা সেপ্টেম্বর থেকে, ফলে গতবছর এপ্রিল মাসে একজন শ্রমিকের যা সঞ্চয় ছিল, এবছর এপ্রিলে সেই সঞ্চয় তার অনেক কম। এবার সরকার পুরোপুরি হাত তুলে নেওয়ার ফলে সেই পুঁজির মধ্য থেকেও পরিবহনের ব্যবস্থা করার জন্য তাকে বিভিন্ন ঠিকেদার, দালাল ইত্যাদি বিভিন্ন লোককে টাকা দিতে হয়েছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অবস্থা এতটাই খারাপ হয়েছে যে মূলধারার লেখালিখি, বা মিডিয়াতেও পরিযায়ী শ্রমিকদের সমস্যা আর সেভাবে তুলে ধরা হচ্ছে না। ফলে শুধু লকডাউনের কথা ভাবলে আপাতভাবে আগের বছরের তুলনায় এবারের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে ভাল মনে হলেও, আসলে এবছর পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য সঙ্কট বাস্তবে অনেক বেশি ব্যাপকমাত্রার। 

একটা জিনিসই এর মধ্যে হয়েছে, সেটা হলো যে, একমাস যাবৎ পরিযায়ী শ্রমিকদের সঙ্কট সম্পর্কে যত তথ্য কোর্টে জমা পড়েছে, তা পর্যবেক্ষণ করে সুপ্রীম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছেন যে দিল্লি, হরিয়ানা এবং উত্তরপ্রদেশের সরকারকে পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য রেশন এবং পরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে এই নির্দেশ কীভাবে পালন করবে এই সরকারগুলো, সে সম্পর্কে কোনও স্বচ্ছতা নেই। দিল্লী সরকার কয়েক ঘণ্টা আগে (১৮ই মে) নির্দেশিকা জারি করেছে যে তাঁরা পরিযায়ী শ্রমিকদের সহযোগিতার ব্যবস্থা করবে, বাকি সরকারগুলো সেটাও করেনি এখনও অবধি। ফলে এই নির্দেশের বাস্তবক্ষেত্রে কতটা প্রতিফলন ঘটবে সে নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে।

ছবি এঁকেছেন – আনখ সমুদ্দুর, ছবিটি  People’s Archive of Rural India-তে প্রথম প্রকাশিত। 

শেষ কিস্তি পড়ুন এখানে। 

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *