পিতৃতন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে আফগান নারীর সংগ্রাম

‘আফগানিস্তানে নারীরা কয়েক দশক ধরে যুদ্ধবিধ্বস্ত। দেশ-দখলের খেলায় তারা আক্রান্ত। এদিকে আফগান নারীদের দুর্দশাকে প্রায়শই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এই অঞ্চলে তাদের যুদ্ধ নীতিকে ন্যায্যতা ও বৈধতা দেওয়ার জন্য ব্যবহার করেছে। যাইহোক, দেখা যাচ্ছে, নারীরা অনৈতিক সাম্রাজ্যবাদী এবং মৌলবাদী উভয় শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামনের সারিতে রয়েছে।’

কুর্দি মহিলা আন্দোলনের কর্মীরা RAWA-র  (RAWA আফগানিস্তানের নারীদের বিপ্লবী সংগঠন) এক কর্মী, সামিয়া ওয়ালিদের এই সাক্ষাৎকার প্রথম বার জার্মান ভাষায় ‘কুর্দিস্তান রিপোর্ট’-এ প্রকাশিত হয়েছিল। সাক্ষাৎকারটি বাংলায় তর্জমা করেছেন শতাব্দী দাশ 

প্রশ্ন: রাওয়া-এর ইতিহাস এবং উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিশদে বলতে পারেন? আপনাদের সংগঠন যখন প্রথম গঠিত হয়েছিল তখন আফগান মহিলাদের অবস্থা কীরকম ছিল? আফগান সমাজে আপনাদের ভূমিকা কী? আপনারা কীভাবে মেয়েদের সংগঠিত করেন?

উত্তর: রেভোলিউশনারি অ্যাসোসিয়েশন অফ দ্য উইমেন অফ আফগানিস্তান (RAWA) আফগানিস্তানের প্রাচীনতম নারী সংগঠন যারা স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায় এবং ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য লড়াই শুরু করে। রাওয়া প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মীনা। ১৯৭৭ সালে, অল্প বয়সে কাবুলে কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের সহায়তায় তিনি এই গোষ্ঠী তৈরি করেছিলেন। গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের রক্তপিপাসু মৌলবাদী গ্যাং-এর সহায়তায় KHAD (KGB- এর আফগানিস্তান শাখা) -এর এজেন্টরা ১৯৮৭ সালে পাকিস্তানে কোয়েটায় মীনাকে হত্যা করে। তাঁর বয়স ছিল মাত্র ত্রিশ বছর। রাওয়া একটি রাজনৈতিক সংগঠন, এটাই অন্যান্য সমিতি থেকে আমাদের আলাদা করে দেয়। রাওয়া যখন গঠিত হয়, তখন আফগানিস্তান ইউএসএসআর পুতুল সরকারের অধীনে ছিল, পরে তা সোভিয়েত রাশিয়ার আক্রমণের সম্মুখীন হয়। মীনা অনুভব করেছিলেন যে স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের সংগ্রাম নারীর অধিকারের লড়াইয়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। মীনার শাহাদাতের পর, রাওয়া আজ অবধি আফগান ইসলামি মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে এবং তাদের আন্তর্জাতিক সমর্থকদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

রাওয়া এখনও আফগানিস্তানের বেশিরভাগ অঞ্চলে গোপনে কাজ করে, কিন্তু বিপুল সমস্যার সম্মুখীনও হয়। ভয়াবহ অপরাধ করার রক্তাক্ত অতীত আছে যাদের, সেইসব যুদ্ধবাজ জিহাদি নেতারা বর্তমান সরকার এবং পার্লামেন্টেকে নিয়ন্ত্রণে করছে এবং আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের আলাদা আলাদা রাজত্ব রয়েছে (তখনও তালেবানদের দ্বিতীয় অভ্যুত্থান হয়নি, তাই জাতীয় স্তরে নর্দান অ্যালায়েন্সের কথাও বলা হচ্ছে)। যেসব জিহাদি নেতারা শোরাই নিজারের অপরাধী চক্রের অন্তর্ভুক্ত, আফগানিস্তানের সিইও আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ নিজেই তাদের মধ্যে একজন। এসব আমাদের জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করছে, কারণ এই ঠগগুলো আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু, আমাদের কাজে বাধা দিতে এবং আমাদের ক্ষতি করতে যারা দ্বিধা করে না। আফগানিস্তানের অন্যান্য অংশে যেখানে তালেবান মৌলবাদীদের নিয়ন্ত্রণ আছে, সেখানে রাওয়া একই নিপীড়নের মুখোমুখি হয়। আমাদের সকল সদস্য সুরক্ষার জন্য ছদ্মনাম ব্যবহার করে এবং আমরা কখনই আমাদের কাজ প্রকাশ্যে করতে পারি না। এই প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও, স্থানীয়দের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ এবং এই অপরাধীদের প্রতি তাদের বিদ্বেষ আমাদের সমর্থনে রূপান্তরিত হওয়ার কারণে, আমরা এখনও দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে আমাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছি।

আমাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে আছে আমাদের পত্রিকা ও নিবন্ধ প্রকাশ করা, সংগ্রামী চেতনায় মেয়েদের উদ্বুদ্ধ করা, আমাদের সংগ্রামে যোগদানের জন্য মহিলাদের একত্রিত করা। আমরা আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই যুদ্ধবাজদের হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, লুটপাট, চাঁদাবাজি এবং অন্যান্য অপরাধের খতিয়ান নথিভুক্ত করি। সামাজিক কার্যক্রমের মধ্যে রাওয়া নারীদের শিক্ষা প্রদান করছে (শুধু সাক্ষরতার প্রসার নয়, বরং তাদের কী কী অধিকার তা বোঝানো এবং সেগুলো কীভাবে অর্জন করা যায় সে বিষয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি করা), তাদের জরুরি সহায়তা প্রদান করছে, অনাথালয় তৈরি করছে এবং স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

প্রশ্ন: পিতৃতন্ত্র নিয়ে আপনার বিশ্লেষণ কী? কীভাবে এটি রাষ্ট্র, সাম্রাজ্যবাদ এবং পুঁজিবাদের সাথে যুক্ত?

উত্তর: সমাজে, বিশেষ করে রাজনীতিতে, নারীর ভূমিকা মুছে ফেলার জন্য সারা বিশ্বে প্রতিক্রিয়াশীল সামন্ততান্ত্রিক বা পুঁজিবাদী তথা সাম্রাজ্যবাদী সরকার দ্বারা পিতৃতন্ত্র ক্রমাগত সমর্থিত এবং লালিত হয়। সব রকমের সরকারের জন্যেই একথা সত্যি। সামন্তবাদী আফগান সরকারের মতো তাদের সঙ্গে যদি আবার সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিকদের গাঁটছড়া বাঁধা থাকে, তাহলে তারা নারীদের শক্তি ও চেতনাকে তাদের আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে মারাত্মক হুমকি হিসেবেই দেখে। মেয়েদের শক্তিবৃদ্ধি ও চেতনার প্রসার বন্ধ করতে বিভিন্ন উপায় তারা অবলম্বন করে। এই ধরনের সরকারকে স্বভাবতই রাওয়া গণবিরোধী মনে করে। কারণ জনগণ এবং তাদের সংগ্রাম দমন করেই এরা টিকে থাকতে পারে, নারীদের দমন তাদের প্রধান লক্ষ্য। সামন্ততান্ত্রিক কুসংস্কার এবং সামন্ততান্ত্রিক সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে তারা নারীকে তার সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত করে এবং এইভাবে অর্ধেক সমাজকে পঙ্গু করে দেয়। এহেন সমাজ কোনো সংগ্রাম ও প্রতিরোধের আশ্বাস দেয় না। এই সরকারগুলি কখনওই নারীর মুক্তির জন্য কোন পদক্ষেপ নেয় না, বরং তারা নারীদের চারপাশে শৃঙ্খল পোক্ত করে। আজ আফগান নারীদের অবস্থা আগের চেয়ে অনেক খারাপ। আমেরিকা ‘নারীর অধিকার’-এর অজুহাতে আফগানিস্তান আক্রমণ করেছিল, কিন্তু বিগত আঠারো বছরে আমাদের নারীদের ক্ষেত্রে তারা যা বাস্তবায়িত করেছে তা হল হিংসা, হত্যা, যৌন আক্রমণ, আত্মহত্যায় বাধ্য করা অথবা অন্যান্য দুর্ভোগ। আমেরিকা আফগান নারীদের সবচেয়ে ঘৃণ্য শত্রু, এরাই ইসলামী মৌলবাদীদের ক্ষমতায় এনেছিল এবং আমাদের ভুক্তভোগী নারীদের বিরুদ্ধে অমার্জনীয় বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। গত চার দশক ধরেই এটি তার কৌশল। জিহাদি, তালেবান এবং আইসিসকে লালন করে যারা, যাবতীয় ইসলামী মৌলবাদী উপাদান যারা বাড়িয়ে তোলে, তারা শুধু  হত্যাকারী নয়, বরং মিথ্যাবাদীও। আমেরিকা আমাদের নারীদের উপর অত্যাচার করেছে।

প্রশ্ন: কীভাবে নারীমুক্তির লড়াইকে দেশ-দখলদারির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত করেন আপনারা?

উত্তর: আমরা সাম্রাজ্যবাদী-উপনিবেশবাদী, ইসলামী মৌলবাদী এবং পুতুল সরকার- সবার থেকে আফগান নারীদের মুক্তি দেখতে চাই। নারীর পরাধীনতাই তাদের যন্ত্রণা ও দুর্ভাগ্যের প্রত্যক্ষ ও মূল কারণ। দখলদার এবং তাদের অভ্যন্তরীণ সাথীদের বিরুদ্ধে নারীর প্রতিরোধ তাই বিপ্লবী সংগ্রামের সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবে জড়িত। আমরা বিশ্বাস করি, হত্যা, লুটপাট এবং অন্যান্য অপরাধ ও বিশ্বাসঘাতকতার সঙ্গে জড়িত এইসব মৌলবাদীদের, এই দুর্নীতিগ্রস্ত গোষ্ঠীর, বিদেশি শক্তি ছাড়া কোনো সমর্থন ও সহায়তার উৎস নেই। ওদের ছাড়া এরা একটি দিনও বাঁচবে না। নারীদের রাজনৈতিক চেতনা জাগিয়ে, তাদের দুর্ভাগ্যের মূল কারণ যে এই দুই দল- সে ব্যাপারে তাদের সচেতন করে, আমরা বিরুদ্ধ-সংগ্রামে মহিলাদের সংগঠিত করতে চাই।  

প্রশ্ন: আফগান মহিলাদের অধিকারের প্রশ্ন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আফগানিস্তান আক্রমণকে বৈধতা দিয়েছে। কীভাবে এই ভাষ্য আপনাদের মাটির কাছাকাছি গড়ে ওঠা নারী-সংগ্রামকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে?

উত্তর: জনগণ, বিশেষ করে নারীদের, বিপ্লবী ও রাজনৈতিক সংগ্রামে বিমুখ করার ক্ষেত্রে মার্কিনরা বেজায় পারদর্শী। গত আঠারো বছরে পুরো আফগানিস্তান জুড়ে সবচেয়ে নারী-বিরোধী উপাদানগুলিকে তারা সমর্থন করেছে। এই উপাদানগুলিকে তারা ছুঁয়েও দেখেনি, বদল ঘটানো দূরস্থান। পাশাপাশি, আমেরিকার সরকার এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান মিলে এনজিও, সুশীল সমাজ এবং শিক্ষিত মহিলাদের একটি ধারা চালু করেছে। এই নেটওয়ার্ক-এর একটি দ্বৈত উদ্দেশ্য আছে। প্রথমত, এটি এই শিক্ষিত মহিলাদের ব্যবহার করে সংখ্যাগুরু আফগান মহিলাদের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে বিশ্বকে ধোঁকা দিচ্ছে। তাদের ক্লান্তিকর যুদ্ধে এই কয়েকজন মাত্র মহিলাকে তারা নিজেদের ‘অর্জন’ হিসেবে উপস্থাপন করছে। দ্বিতীয়ত, এই ধরনের শিক্ষিত মহিলাদেরকে তারা নিজেদের ছত্রছায়ার অধীনে নিয়ে এসে তাদের বিপ্লবে যোগদান থেকে বিরত থাকা নিশ্চিত করছে। এইভাবে মানবসমাজকে তারা সার্বিক নারী-আন্দোলন থেকে বঞ্চিত করে। সম্প্রতি, ‘উইমেনস নেটওয়ার্ক’ থেকে বিক্রিত, ক্ষমতাবান, লোভী  মহিলাদের একটি দল আফগান মহিলাদের ‘প্রতিনিধি’ হিসেবে গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের সাথে দেখা করে। গুলবুদ্দিন অন্যতম রক্তপিপাসু মিথ্যাবাদী অপরাধী, তার যৌবনে মহিলাদের মুখে অ্যাসিড নিক্ষেপ করার জন্য সে সুপরিচিত ছিল। এই মহিলারা খ্যাতি, ক্ষমতা এবং অর্থের জন্য মিথ্যাবাদী ইসলামি একটি দলকে আজ নিষ্কলুষ প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে তার সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। ফওজিয়া কূফি, হাবিবা সারাবি, সিমা সমর এবং অন্যান্যরা জিহাদি এবং তালেবান অপরাধীদের সঙ্গে অর্থ ও ক্ষমতার বিনিময়ে একসাথে ওঠাবসা করে এবং বিশ্বাসঘাতকের মতো নিজেদেরকে আফগানিস্তানের নিপীড়িত মহিলাদের ‘প্রতিনিধি’ হিসেবে পরিচয় দেয়। এই মহিলারা তালেবানদের দ্বারা নারীদের বেত্রাঘাত ও পাথর ছুড়ে মারার ঘটনাগুলোকে উপেক্ষা করে। সরকারে যোগ দিয়ে মহিলাদের জন্য সরকারের ‘ভালো’ কর্মসূচির দিকে তারা ইঙ্গিত করে! এই নারীরা ক্ষমতাসীন শক্তির পাশে দাঁড়িয়েছে, এরা আমাদের ভুক্তভোগী নারীদের প্রতি বিশ্বাসঘাতক। আফগানিস্তানের নারীদের সঙ্গে তাদের কোনো বন্ধন নেই, তাদের প্রতি কোনো সহানুভূতিও নেই।

প্রশ্ন: রাওয়া তার কার্যক্রম ইউরোপ/ পশ্চিমা দেশগুলিতে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে আফগানিস্তানেই থাকার সিদ্ধান্ত নিল কেন? পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় আফগানিস্তান এবং গ্লোবাল সাউথের অন্যান্য দেশে ক্রমবর্ধমান এনজিও-করণ প্রবণতা সম্পর্কে আপনার কী মত?

উত্তর: রাওয়া বিশ্বাস করে যে তারা শুধুমাত্র জনগণের সমর্থন নিয়ে একটি শক্তিশালী আন্দোলনে পরিণত হতে পারে। এই সমর্থন আফগানিস্তানেই বসবাস এবং কাজ করার মাধ্যমেই আসবে, এমনকি আফগানিস্তানের পরিস্থিতি নারকীয় হলেও। মানুষ শুধুমাত্র সেই বিপ্লবী সংগঠনগুলিকে বিশ্বাস করে যারা তাদের অনুশীলনে, তাদের কাজে মানুষের পাশে থাকে এবং দেশের অভ্যন্তরেই সক্রিয় থাকে। আমাদের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, যেসব সংগঠন আফগানিস্তান থেকে শিকড় ছিন্ন করে ইউরোপ এবং অন্যান্য দেশে চলে গেছে, তারা লজ্জাজনকভাবে বিলীন হয়ে গেছে। রাওয়া-র দীর্ঘদিন ধরে বেঁচে থাকার এবং সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হল, রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতি সত্ত্বেও আমরা আফগানিস্তানে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

এনজিও আমাদের দেশে সাম্রাজ্যবাদের মেরুদণ্ড। এনজিও-করণ, আমরা বিশ্বাস করি, আফগানিস্তানে পুতুল সরকার গঠনের মতোই বিপজ্জনক। আফগানিস্তানে গঠিত এনজিওগুলো প্রায় সবই যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পশ্চিমা শক্তির অর্থায়নের মাধ্যমে চলে। তারা আফগানিস্তানের ভবিষ্যতের পুতুল সরকার গঠনের জন্য তরুণদের নিয়োগ করার এক একটি কেন্দ্র- বহিরঙ্গে যেখানে একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক সরকারের চেহারা থাকবে, কিন্তু যাদের প্রধানদের মস্তিষ্ক প্রক্ষালিত হয়েছে সাম্রাজ্যবাদের অনুগত দালালদের দ্বারা। এনজিওগুলি আমাদের যুবকদের মাথা থেকে জাতীয়তাবাদ এবং বিপ্লবী সংগ্রামের প্রবণতা শুষে নিচ্ছে। এ কথা আজ সুপ্রতিষ্ঠিত যে এই এনজিওগুলির কেউই জনগণ এবং মহিলাদের সেবা করে না। শুধু তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন করার জন্য কিছু ‘পুনর্গঠন’ এবং ‘মানুষের জন্য সাহায্য’ সংক্রান্ত স্লোগান আওড়ায়।

আফগানিস্তানে গত কয়েক দশক ধরে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আক্রমণ, শোষণ চলছে। দেশ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যদিও রাওয়া তালেবানের নিয়মতান্ত্রিক যৌন হিংসার বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের জন্য প্রচারাভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছে, তবু আমরা দেখেছি যে মিথ্যাবাদী দুর্নীতিবাজরা মার্কিন সমর্থন পেয়ে উচ্চ রাজনৈতিক পদে আসীন হয়েছে।

প্রশ্ন: আপনারা যুদ্ধে যৌন হিংসাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? আফগানিস্তানে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে কোন উপায়ে এবং কাদের মদতে যৌন হিংসা ব্যবহার করা হয়েছে? আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে আফগান মহিলাদের জন্য ন্যায়বিচার কেমন বা কী?

উত্তর: ইতিহাসের অধিকাংশ সংঘর্ষের মতো আফগানিস্তানের যুদ্ধ ও সংঘাতে নারী ও শিশুরাই প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। তারাই তিন দশক ধরে আমাদের জাতিকে ধ্বংসকারী মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলির প্রধান টার্গেট হয়েছে। ১৯৯২ সালে সোভিয়েতদের পরাজয়ের পর আমেরিকা, সৌদি আরব এবং পাকিস্তান কর্তৃক সৃষ্ট, লালিত ও সমর্থিত জিহাদিরা ধর্ষণ ও অন্যান্য ধরনের যৌন হিংসার রাজত্ব কায়েম করে। গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার, বুরহানউদ্দিন রব্বানি, আব্দুল রব রসুল সায়াফ, করিম খলিলি, আহমদ শাহ মাসুদ এবং আবদুল রশিদ দস্তুমের নেতৃত্বে জাতিসত্তার ধারায় বিভক্ত জিহাদি যুদ্ধবাজদের বিভিন্ন দল কাবুলবাসীর ঘরে ঘরে লুটপাট ও ধর্ষণ করেছে। মহিলাদের অপহরণ করে বেসমেন্ট এবং খালি বাড়িগুলোতে রাখা হয়েছে। বারবার ধর্ষণ ও নির্যাতন করা হয়েছে। ওইসব গোষ্ঠীর সদস্যরা নির্দিষ্ট এলাকাগুলি ত্যাগ করার পর বেশিরভাগ মেয়েদের বিকৃত লাশ পাওয়া যেত। এই মহিলাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার বর্ণনা ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের গল্প সব।

ইসলামি মৌলবাদী উপাদান এবং মার্কিনদের কাছে বিক্রিত বর্তমান সরকারের সম্পূর্ণ ধ্বংসের মাধ্যমেই নারীদের জন্য ন্যায়বিচার অর্জন করা সম্ভব। যুদ্ধাপরাধ, বিশেষ করে মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত ইসলামি মৌলবাদী দলের নেতাদের দ্বারা অপরাধের বিচার ও শাস্তি হওয়া দরকার। একবার আমাদের নারীরা এই কাজটি সম্পন্ন করতে পারলে, তখন আমরা বলতে পারি যে ন্যায়বিচার হয়েছে।

প্রশ্ন: যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতে যুদ্ধ এবং শান্তির সময়ে নারীরা প্রায়ই নিপীড়নের শিকার হয় এবং চুপ থাকে। মনে হয় যেন তাদের ইচ্ছা, ইচ্ছা শক্তি এবং রাজনৈতিক দাবিগুলি সংঘাতের সব পর্যায়ে, এমনকি শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাতেও উহ্য রাখা হয়েছে। নারীদের প্রায় টোকেনিস্টিক পদ্ধতিতে ক্রন্দনরত অসহায়,  অবলা,ভুক্তভোগী হিসেবে দেখানো হয়। শান্তি ও ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে আফগান নারীদের ভূমিকা কী?

উত্তর: আফগান নারীদের জন্য শান্তি কেবল ন্যায়বিচার দ্বারা অর্জন করা সম্ভব। আফগানিস্তানকে বিদেশী দখল এবং ইসলামি মৌলবাদ থেকে মুক্ত করেই ন্যায়বিচার অর্জন করা যায়। এই বিশ্বাসঘাতক ও হত্যাকারীদের ক্ষমতা থেকে অপসারণ এবং তাদের শাস্তি হলো নারীর শান্তি। সমৃদ্ধি এবং প্রকৃত গণতন্ত্রের জন্য ন্যায়বিচার চাইছে নারীরা। এবং সচেতন নারীদের সংগঠিত সংগ্রামের মাধ্যমে এটি অর্জন করা সম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্র, তালেবান এবং বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট আফগান ব্যক্তি,  যাদের মধ্যে নারীরাও আছেন, তাদের মধ্যে যে শান্তি আলোচনা চলছে, তা আমাদের সাধারণ নারীদের ক্ষত-কোণে লবণের মতো। নারীদের প্রতিনিধিত্বের দাবি করা এই মিথ্যাবাদী নারীরা তাদের শত্রু। তারা নারীদের সবচেয়ে বিপজ্জনক শত্রুদের সঙ্গে আলোচনায় বসছে, যাতে এই নারীহন্তারা ইতোমধ্যে যে ক্ষমতা এবং অর্থ বাগিয়েছে, তার চেয়েও বেশি তারা পায়।

প্রশ্ন: আপনারা কোন ধরনের সমাজের জন্য সংগ্রাম করছেন? আজ এই মুহূর্তে আপনাদের ইউটোপিয়াগুলি বাস্তবায়িত করার জন্য আপনারা কী কী ভাবে চেষ্টা করছেন?

উত্তর: আমরা একটি স্বাধীন, মুক্ত ও গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য সংগ্রাম করছি যা সামাজিক ন্যায়ের স্তম্ভগুলি দ্বারা পরিচালিত হয়, যেখানে নারী এবং পুরুষ প্রতিটি ক্ষেত্রে সমান। এটি একটি দীর্ঘ এবং কঠিন পথ। এটি এক বিশাল আন্দোলন। মহিলাদের সংঘবদ্ধ ও সংগঠিত করা একটি বিশাল কাজ, কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি যে এই লক্ষ্যগুলি অর্জনের অন্য কোন বিকল্প নেই।

প্রশ্ন: নারী-স্বাধীনতা আপনার এবং আপনাদের আন্দোলনের কাছে ঠিক কী?

উত্তর: আমাদের কাছে নারীর স্বাধীনতা হচ্ছে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের উপর নির্মিত সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের অংশগ্রহণ। প্রতিটি দিক থেকে পুরুষদের সঙ্গে আমাদের সম্পূর্ণ সমতা। এই স্বাধীনতা এবং সমতা সরাসরি রাজনীতি এবং সমাজের সঙ্গে জড়িত। শুধুমাত্র দখলমুক্ত সমাজ, মৌলবাদী-নারীবিদ্বেষের ভাইরাস মুক্ত সমাজ, যেখানে গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায় বাস্তবায়িত হয়েছে, তা-ই নারীর বিরুদ্ধে হিংসার শৃঙ্খল ভেঙে দিতে পারে। তা নারীর সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ও অধিকারের সমন্বয় ঘটাতে পারে।

প্রশ্ন: কুর্দি নারী আন্দোলনকারী হিসাবে আমরা জানি যে রাওয়া আন্তর্জাতিকতাকে প্রতিরোধ ও মুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে চিহ্নিত করে। রোজাভায় নারী বিপ্লবের সমর্থনে আফগানিস্তানের নারীরা রাস্তায় নেমে এসেছে। রোজাভা বা কুর্দিস্তানে মহিলাদের সংগ্রাম সম্পর্কে আপনার মতামত কী? আমরা একে অপরের থেকে কী শিখতে পারি?

উত্তর: কুর্দিস্তানের সিংহীদের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা এবং শক্তির উৎস। আইসিস এবং অন্যান্য মধ্যযুগীয় অপরাধীদের বিরুদ্ধে তাদের লড়াই আমাদের পরম শিক্ষা দিয়েছে। আমরা আজ জেনেছি যে, পৃথিবীর কোনো শক্তিই, সে আইসিস হোক বা তার সমর্থক, জনগণের সত্যিকারের প্রতিরোধের মুখে দাঁড়াতে পারে না। আমরা দৃঢ়ভাবে বুঝেছি যে, নারীদের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো সংগ্রাম সফল হতে পারে না। আমাদের স্বপ্নের সমাজ অর্জনের জন্য যে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হবে, তা-ও আমরা বুঝতে পেরেছি। যখন আমরা আফগানিস্তানে বসে আইসিসের নাম শুনি, তখন আমরা প্রথমেই কুর্দিস্তানের দৃঢ়চেতা এবং সাহসী নারীদের স্মরণ করি, এমনকি আমাদের দেশে যে সন্ত্রাস চলছে তার কথাও আগে মনে আসে না। আমরা বিশ্বাস করি আইসিস পরাজিত হবে৷ সত্যিকারের নারীদের আন্দোলনের মুখে দাঁড়ালে তারা জয়ের কোন সুযোগ পাবে না। আমরা এই পথে পা রেখেছি, তাই দৃঢ়ভাবে এই বিষয়গুলোতে বিশ্বাস করতে আমরা বাধ্য, তবু অন্যদিকে এটাও সত্যি যে আমাদের সংগ্রামই আমাদের বিশ্বাসের একটি উজ্জ্বল প্রমাণ।

প্রশ্ন: স্বাধীনতার জন্য নারীদের বিশ্বব্যাপী সংগ্রামের ক্ষেত্রে, আপনি কি মনে করেন যে পিতৃতন্ত্র, হিংসা এবং নিপীড়নের অন্যান্য ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সাধারণ লড়াইয়ে আমাদের একসাথে কাজ করার উপায় আছে? থাকলে কীভাবে?

উত্তর: রাওয়া আমাদের অভ্যন্তরীণ সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে সমস্ত স্বাধীনতা-কামী, স্বাধীনতা-সংগ্রামী, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল সংগঠন এবং দলগুলির মধ্যে আন্তর্জাতিক সংহতিতে বিশ্বাস করে। আমাদের সংগ্রাম কুর্দি জনগণের সংগ্রামের সঙ্গে এক সুরে মিলিত হয়েছে কারণ আমাদের অধিকাংশরই শত্রুর প্রকৃতি একই রকম। আমরা সাম্রাজ্যবাদ এবং তাদের মৌলবাদী ভাড়াটেদের বিরুদ্ধে লড়াই করছি। এই মুহুর্তে, আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা এবং পাঠগুলি ভাগ করে নিতে হবে, যাতে আমরা আরও কঠিন সংগ্রামের মোকাবিলা করতে পারি।

শেয়ার করুন

1 thought on “পিতৃতন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে আফগান নারীর সংগ্রাম”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *