হিজড়ে বলে ডাকতেন যে কাকিমা, তিনিই বেড চাইতে এলেন

সামনের সারির করোনা যোদ্ধা। মানে ডাক্তার, নার্স বা অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা, যাঁরা রাষ্ট্রের অব্যবস্থার গরল কণ্ঠে ধারণ করতে বাধ্য হচ্ছেন। সেই স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে কেউ আবার যদি হন ট্রান্স-মানবী, তবে তিনি ইতোমধ্যেই ধারণ করে বসে আছেন সামাজিক অপমানের গরল। করোনা তাতে বাড়তি যন্ত্রণা যোগ করে মাত্র। তেমনই একজন অয়ন। কলকাতার একটি নামী বেসরকারি হাসপাতালের ল্যাবে কাজ করেন তিনি। কেমন কাটছে অয়নের দিন-রাত? এই মৃত্যুমিছিলের মধ্যে দাঁড়িয়ে কীভাবে পুরুষ থেকে ক্রমে পূর্ণাঙ্গ নারী ওঠার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছেন তিনি?

অয়নের সঙ্গে কথা বললেন শতাব্দী।

অয়ন, তুমি শহরের ট্রান্সজেন্ডার স্বাস্থ্যকর্মীদের অন্যতম। একদিকে আছে তোমার একটি বিশেষ লিঙ্গপরিচয়, অন্যদিকে তুমি আজকের কোভিড পরিস্থিতিতে যাকে বলে ফ্রন্ট লাইন ওয়ার্কার। অদ্ভুত লাগে না এই ভেবে যে যারা এতদিন তোমাকে হেয় করত, হয়ত তাদের জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে তোমারও কিছু অবদান থেকে যাচ্ছে?

আমার বড় হয়ে ওঠা নদীয়া জেলার এক ছোট্ট শহর রাণাঘাটে। ছোট্ট বেলা থেকেই বহু প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। আমার বেশ মনে আছে পাড়ার কাকিমা আমার মা-কে বলেছিলেন “তোমার ছেলে কি হিজড়ে হয়ে যাচ্ছে, নাকি জন্ম থেকেই এরকম?” 

সেদিন আমার মা-কে আমি সামলাতে পারিনি! মা রাগে দুঃখে ফেটে পড়েছিল৷ অথচ আশ্চর্য ব্যাপার হল, ক’দিন আগেই সেই কাকিমা আমার বাড়িতে আসেন। আমার হাত দু’টো ধরে মিনতি করেন, কাকুর জন্যে কোথাও বেড পাচ্ছেন না…  পিয়ারলেসে একটা বেডের যদি ব্যবস্থা করে দেওয়া যায়… নইলে কাকুকে বাঁচানো যাবে না !

আজ সেই কাকু পিয়ারলেস থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এটাই আমার কাছে প্রাপ্তি। এইসব ঘিরেই ভালো লাগা বলতে পারো। 

আচ্ছা, পরিবারেও তো তোমার আইডেন্টিটি নিয়ে নিশ্চয় শুরু থেকে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে? সেসব কথা যদি বলো…

পরিবার বলতে আমার বাবা, মা আর ঠাকুমা। মা সবটাই জানে। যদিও কোনো দিন সেই রকম করে কিছুই বলা হয়ে ওঠেনি। আমাদের মতো যারা, তাদের বাবা-মা কি ছোটবেলা থেকে বোঝে না? তা নয়। বরং উল্টোটা। বাবার তীব্র আপত্তি আছে সেটা বুঝতাম। হয়তো ওরা সমাজের মুখোমুখি হতে ভয় পায়, দোষ দিতে পারি না। কোনো এক দিন হয়ত সব ঠিক হয়ে যাবে। বাবা মা ভুল বুঝবে না। এই আশায় আছি।

তোমার প্রোফাইলে দেখলাম তুমি অভিনয় করতে ভালোবাসো। সেই অভিজ্ঞতা বলো। নাটকের দলে যুক্ত ছিলে?

অভিনয় বলতে, আমি ছোটোবেলা থেকেই নাটক থিয়েটার করতাম। তবে প্যারা মেডিকেল পড়ার পর আর তেমন ভাবে সময় হয়ে ওঠে না। নাটকের দলের বন্ধুদের সঙ্গে আমার এখনও যোগাযোগ আছে। মনে হত, ওরা যেন বোঝে আমায়। সমাজের বাকিদের মতো অতটা বাঁকা চোখে দেখে না। 

তারপর স্বাস্থ্যক্ষেত্রে ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে ওঠা। কিভাবে এই পেশা বাছলে? 

হ্যাঁ, আমি একজন মেডিকেল ল্যাব টেকনোলজিস্ট। পিয়ারলেস হাসপাতালে চাকরি করছি এখন। জয়েন্ট এন্ট্রান্স এর মাধ্যমে সরকারি মেডিকেল কলেজে প্যারা মেডিকেল পড়ার সুযোগ পাই। পাশ করি। তবে সেখানেও, হোস্টেলে আমার থাকা নিয়ে নানান সমস্যা হয়। আমার লিঙ্গপরিচিতির জন্য অনেক কটূ কথা শুনেছি। যাইহোক, ২০১৭ সালে পিয়ারলেসে আসি, পাশ করার পর। 

ইন্টারভিউতে কী প্রতিক্রিয়া পেলে?

পিয়ারলেস কর্তৃপক্ষ সবটাই মেনে নিয়েছিল সেই সময়ে। ইন্টারভিউতে সমস্যা হয়েছিল বরং বিভিন্ন সরকারি ইন্টারভিউতে। আমার জেন্ডার আইডেন্টিটির জন্য আমার সব রকমের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বাদ পড়তে হয়। অদ্ভুত সব প্রশ্ন করা হত, যেমন – ‘আমরা তো তৃতীয় লিঙ্গের কর্মী চাইনি’। অথচ কোনো লিঙ্গ যে দরখাস্ত করতে পারবে না, তা বলা হয়নি। হয়ত আমাদের দেখলেই লোকে ধরে নেয়, এদের তো ট্রাফিকেই দাঁড়ানোর কথা। 

কর্মক্ষেত্রেই বা ট্রান্স মানুষ হিসেবে কী প্রতিক্রিয়া পাও?

পিয়ারলেসে প্রথম প্রথম প্রথম আমি গুটিয়ে থাকতাম। নিজেকে লুকিয়ে রাখতাম। ছেলেদের মতোন পোশাক পরেই যেতাম। নিজের ইচ্ছেটাকে চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে রাখতাম। মাঝে মাঝে আমার দমবন্ধ লাগত। 

তারপর একটু একটু করে আমি নিজেকে মেলে  ধরলাম। ওখানকার ডক্টর শুভ্রজ্যোতি ভৌমিক স্যার আমায় অনেক সাহস দিয়েছেন নিজের মতন করে বাঁচার। বিভিন্ন স্টাফ-দের সাথে কথা বলে তাঁদের বিষয়টা বোঝানোর চেষ্টা করলাম। ওরা ধীরে ধীরে বুঝল। একদিনে হয়নি। পরে ওরাও আমায় মেনে নিয়েছে। এখন আমার সব রকমের লড়াইতে ওদের পাশে পাই। 

তুমি থাকো রাণাঘাটে৷ সেখান থেকে রোজ পিয়ারলেসে আসা। নিশ্চয় ট্রেনে আসো৷ রোজকার যাতায়াতের পথে গণপরিবহণে কী ব্যবহার পেতে?

আমাদের মতো মানুষের জন্মগত নারী না হওয়ার কারণে ট্রেনের লেডিস কম্পার্টমেন্টে আমাকে উঠতে দেওয়া হয়না। লকডাউনের আগে পর্যন্ত সাড়ে তিন বছর আমি ট্রেনেই যাতায়াত করতাম। জেনারেল কম্পার্টমেন্টে অস্বস্তি হয়। টিটকিরি শুনতে হয়। ইভনিং শিফট থাকলে রাণাঘাট ফিরতে রাত সাড়ে বারোটা বেজে যেত। প্রতি মুহূর্তে ভয় পেতাম, মনে হতো এইবার আমাকে ছেড়ে দিতে হবে কাজ। কিন্তু মা বলতো “হেরে যাওয়ার জন্যে তুমি জন্মাওনি… “। সেখান থেকে আস্তে আস্তে এমন জায়গায় পৌঁছলাম যে কম্পার্টমেন্টে আমার জন্মদিনও পালন হল। লেডিজ কম্পার্টমেন্টেই। ওরাও একটু একটু করে আমায় বুঝতে শুরু করল। 

তারপর তো ট্রেন বন্ধ হয়ে গেল। তখন কী হল?  কীভাবে হাসপাতালে আসতে? নাকি হাসপাতালের কাছেই থাকতে হল?

ট্রেন বন্ধ হওয়ার পরের দিন থেকেই জীবনটা বদলে গেলো। শুধু কাজ আর কাজ, আর নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা। ২৪ ঘণ্টা  ডিউটি পড়তো টানা, বাড়ি যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। মাঝে মাঝে চারদিকে অন্ধকার দেখতাম। মনে হত, কবে এই দিন শেষ হবে? অবশ্য ছুটি পেলেও বাড়িতে আসতে ভয় পেতাম। অন্যদের সংক্রমণের কারণ হব না তো? এটা অবশ্য লিঙ্গ নির্বিশেষে সব কর্মীরই মনে হত। মা’র জন্যে খুব মন খারাপ করত। কিন্তু এটাও মনে হত যে আমার থেকে যত দূরত্বে ওরা থাকবে, ততই ভালো থাকবে। আমি হাসপাতালের কাছেই ঘর ভাড়া নিয়ে থাকলাম।

ট্রান্স মানুষের বাড়ি পেতে অসুবিধে হয় না? ভাড়াবাড়িতে থাকতেই বা কী কী সমস্যায় পড়লে? 

এই বিষয়ে আমি সৌভাগ্যবান৷ ওই যে বললাম, কাজ করতে করতে পিয়ারলেসের কর্মীদের সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ওরাই আমায় ঘর ঠিক করে দিয়েছে। আমার তেমন একটা অসুবিধে হয়নি।

তোমার নিজের কি কোভিড হয়েছিল? তখনকার পরিস্থিতিটা বল৷ 

হ্যাঁ, আমার গতবছর সেপ্টেম্বর এ কোভিড হয়। প্রচন্ড জ্বর আসে। আমার হাসপাতালের বন্ধুরাই আমার প্রয়োজনীয় জিনিস দরজার বাইরে রেখে যেত। বাকিটা নিজেকেই সামলাতে হত। জানতাম, হাসপাতালে ভর্তি হতে পারব না। কারণ তখন কোনো বেড ছিল না। এভাবে ফ্রন্টলাইন কর্মীরা নিজেরাই বেড পান না অনেক সময়৷  

বর্তমানে ট্রান্স মানুষ (সরকারি ভাষায় তৃতীয় লিঙ্গ)-দের জন্য কি আলাদা সরকারি বেড আছে? কোথায় কোথায় আছে? বেসরকারি হাসপাতালে তাঁদের জন্য বেড আছে? কোভিড পরিস্থিতিতে তাঁরা চিকিৎসার ক্ষেত্রে কী কী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন? 

ট্রান্সজেন্ডারদের জন্যে আমাদের রাজ্য সরকারের উদ্যোগে বাঙুর হাসপাতালে আটটি বেডের ব্যবস্থা করা হয়। আগে যেহেতু এটুকুও ছিল না, তাই এটাকেই অনেক মনে হয়। সেই জন্যে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীকে অনেক ধন্যবাদ। অবশ্য তার জন্য রঞ্জিতাদি ও অন্যদের, মানে আমাদের সমাজের যারা অ্যাক্টিভিস্ট তাঁদের অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। আর বেসরকারি হাসপাতাল? ওখানে বেড থাকলেও আমাদের মতো মানুষের ওখানে চিকিৎসার খরচ জোগাড় করার মতো সামর্থ্য নেই। ট্রান্সমানুষরাও তো বেশির ভাগই সধারণ রোজগেরে, খেটে খাওয়া মানুষ। তাই সরকারি হাসপাতালই একমাত্র ভরসা। 

আচ্ছা, তোমার বাড়ি ছেড়ে থাকতে বাধ্য হওয়ায়, একা নিজের শুশ্রূষা করতে হওয়ায় নানা অসুবিধেয় পড়তে হয়েছে ঠিকই। কিন্তু আবার লকডাউনে অনেক ট্রান্স মানুষ তো পরিবারে থাকতে বাধ্য হওয়ার কারণেও  নির্যাতনেরও শিকার হচ্ছেন, তাই না? 

একদম। যে মানুষেরা তার আইডেন্টিটি কোনোদিন মেনে নেয়নি, তাদের সঙ্গে চব্বিশ ঘণ্টা থাকতে বাধ্য হওয়া, এটা তো প্রবল চাপের বটেই ৷বহু ভাইবোনেরা আছে, তারা পরিবারের সমর্থন পায়না। এমনকি শারীরিক নির্যাতন করা হয়। বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে হয়। পড়ারই কোনো সুযোগ পায়না, চাকরি তো অলীক কল্পনা। লকডাউনে এরা তো আরও বিপদে পড়বে, সেটাই স্বাভাবিক। কত ট্রান্স মেয়ের যে চুল কেটে দেওয়া হল! ছেলেদের মতো করে চুল কেটে দেওয়াটা নির্যাতনের একটা নিত্যনৈমিত্তিক উপায়। ফলে তাঁদের নানান সমস্যার মুখে নিশ্চয়ই পড়তে হয়, তবে তাঁদের জন্যে কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে হোমের ব্যবস্থা করা হয়েছে এখন। এর জন্যও আমি রঞ্জিতাদিকে অনেক ধন্যবাদ জানাই। তিনি যেভাবে কমিউনিটিকে আগলে রাখেন…খুব কম মানুষই তেমনটা পারেন।

তোমার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী? ভবিষ্যতকে কী ভাবে দেখতে পাও? সে কোভিডের দিক থেকেও বলতে পারো, সামাজিক বদলের দিক থেকেও বলতে পারো, আবার নিজের কাম্য শারীরিক বদলের ইচ্ছার কথাও বলতে পারো।

ভবিষ্যতে আমার কমিউনিটি ভাইবোনদের জন্য আরও কাজ করতে চাই। ওরা যাতে শিক্ষিত হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, একটা সম্মানজনক কাজ করতে পারে সেটাই আমার লক্ষ্য। এর সাথে নিজেকেও আরও প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। এছাড়া যা চিরকালীন স্বপ্ন, তা তো আছেই । সার্বিক ভাবে একজন নারী হয়ে উঠতে চাই ধীরে ধীরে। কোভিড একসময় কেটে যাবে৷ এই লড়াইগুলো তখনও থেকে যাবে।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *