ঝুমুরঃ রাঢ়বঙ্গের শ্রমসঙ্গীত

মানুষের শ্রমের সঙ্গে যেমন অবসরের সম্পর্ক,   সভ্যতা আর সংস্কৃতির সঙ্গে তার সম্পর্কও তেমনই নিবিড়; অর্থাৎ শ্রম ব্যতিরেকে অবসর যেমন অর্থহীন তেমনি শ্রম ও অবসর এই দুইয়ের সামঞ্জস্য না থাকলে  মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটতে পারেনা। বানর থেকে মানুষ হবার প্রক্রিয়ায় এবং মানব সভ্যতার বিকাশে শ্রমের ভূমিকা যে কতদূর তা ইতিমধ্যেই এঙ্গেলসের লেখা থেকে আমরা সকলেই কমবেশি জানি। সেই আলোচনার সূত্র ধরে এ কথা বুঝতেও  আমাদের অসুবিধে হয়না যে, মানুষ তার শ্রমের অভিজ্ঞতা থেকে যেমন শিখেছে, তেমনই উৎপাদন ব্যবস্থার বিকাশের এক স্তরে সে ক্রমশ শ্রমের সঙ্গে সঙ্গে অবসর উপভোগ করতেও জেনেছে। এবং সেদিন থেকেই  মানুষের  কল্পনাশক্তির জয়যাত্রার শুরু। শুধু নিরন্তর শিকার করে আলতামিরার ছবি আঁকা যায়না, সেজন্য দুদণ্ড অবসর লাগে। তাই মানব জীবন আর মননের বিকাশে যুগপৎ শ্রম এবং বিরামের অসীম গুরুত্ব স্বীকার না করলে অনেক রহস্যই অমীমাংসিত থেকে যায়। কায়িক শ্রম এবং অবসরের তারতম্য অবশ্য নির্ভর করছে উৎপাদিকা শক্তির অবস্থার ওপর। উৎপাদিকা শক্তির উন্নতি স্বভাবতই অবসরের সময় বাড়িয়েছে, আবার সেই অবসরজাত কল্পনা উৎপাদিকা শক্তির বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে।  

একথা বলাই বাহুল্য, সঙ্গীত মানুষের ব্যাপকতর সাংস্কৃতিক বোধের এক নির্দিষ্ট প্রকাশ এবং সঙ্গীতই সম্ভবত কল্পনাপ্রবণ, সৃজনশীল মানুষের একমাত্র আদিমতম সৃষ্টি  যা একই সঙ্গে তার শ্রম ও অবসরের নিত্যসঙ্গী। শুধু নিত্যসঙ্গী বললেও কম বলা হয়; মানুষের শ্রম, অবসর ও সঙ্গীত এক নিরলস ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে একে অন্যকে রূপ দিয়েছে, একে অন্যের রূপান্তর ঘটিয়েছে। সঙ্গীত বলতে এখানে গীত, বাদ্য ও নৃত্য – এই তিন ধারাকেই বোঝানো হচ্ছে। সাধারণভাবে শ্রমসঙ্গীত হিসেবে সুবিদিত গানের ধারাকে বাদ দিয়েও পৃথিবীর প্রায় সব জনগোষ্ঠির লোকসঙ্গীতের উৎস ও বিবর্তনের সাধারণ গতি প্রকৃতি বিচার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মাটির মানুষের নাচ, গান, বাজনা, হয় প্রত্যক্ষ নাহয় পরোক্ষভাবে, তার শ্রম ও অবসরের প্রকৃতি, বা এককথায় বলতে গেলে, তার উৎপাদন ব্যবস্থা ও সম্পর্কের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। তবে এ এক বেশ জটিল, বহুমাত্রিক প্রক্রিয়ার সরলীকরণ মাত্র। আর বিষয়টি যে সততই একমুখী এমনটাও ধরে নেবার কারণ নেই। মানুষ প্রকৃতির অংশ হিসেবেই তার কাছ থেকে শব্দ, সুর, ছন্দ গতিময়তার পাঠ নিয়েছে কিন্তু সেই পাঠ সে আত্মস্থ করে সৃজনশীল হয়ে উঠতে পেরেছে কারণ মানুষ কল্পনাপ্রবণ, বিমূর্তভাবে চিন্তা করতে সক্ষম। উৎপাদন শক্তির বিকাশের সঙ্গে মানব চেতনার ক্রমোন্নয়ন মানুষকে ক্রমশ বিমূর্ততার দিকে নিয়ে চলেছে। বস্তু জগত এবং নির্দিষ্ট উৎপাদিকা শক্তির স্তরে থাকা মানুষের অনুভূতি ও চেতনা থেকে প্রকৃতির যে দৃশ্য বা শ্রাব্যচিত্র তৈরি হয় তা এই বিমূর্ততার কারণেই প্রকৃতিজাত হওয়া সত্ত্বেও নিছক প্রকৃতিরূপী নয়। কিন্তু মজার কথা, প্রকৃতিজাত অথচ প্রকৃতিরূপী নয় – এজাতীয় আর সব ‘রিপ্রেসেন্টেশন’ যেখানে বার বার অবসরের প্রয়োজনীয়তা দাবি করছে, সেখানে সঙ্গীত শুধুমাত্র অবসরের আওতায় আটকে না থেকে সরাসরি শ্রম সাধনের প্রক্রিয়ার সঙ্গেও একাত্ম হয়ে উঠছে। উজান গাঙে নৌকা বেয়ে চলা মাঝি যেমন প্রকৃতি থেকে ভাটিয়ালি সৃষ্টির রসদ সংগ্রহ করে, তেমনি উজান গাঙে ঢেউ ভাঙতে সেই ভাটিয়ালি মাঝির সহায় হয়, অর্থাৎ, তার কাজের অংশ হয়ে ওঠে। তাই মানুষের বস্তুগত অবস্থাই শুধু একমুখীভাবে তার ভাবজগতকে নির্মাণ করে, আর তার ভাবজগত নেহাত নিষ্ক্রিয় থেকে যায় এমন কথা যান্ত্রিক বস্তুবাদ ছাড়া আর কিছুই নয়। এই জটিল প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারে চর্চার প্রয়োজন এবং মানব সংগীতের বিকাশ নিয়ে যেকোনো আলোচনা এই মৌলিক প্রেক্ষিত ছাড়া সম্পূর্ণ হতেই পারে না।  কিন্তু, আপাতত এই লেখার সীমিত পরিসরে খুব বিশদে এ নিয়ে কথা বলার অবকাশ নেই। তার চেয়ে বরং এই সাধারণ তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যেই বিশেষভাবে রাঢ়বঙ্গের আদিবাসী ও মূলনিবাসী মানুষ অধ্যুষিত অঞ্চলের নিজস্ব লোকসঙ্গীত ঝুমুরের অল্প কিছু উদাহরণ দিয়ে শ্রমের সঙ্গে সঙ্গীতের সম্পর্ক আলোচনা করা যেতে পারে।  

ঝুমুর অত্যন্ত ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত এক পরিভাষা, যার মধ্যে করম-জাওয়া, টুসু, ভাদু এসবও পড়ে। ঝুমুরের উৎপত্তি আর ব্যুৎপত্তি নিয়েও বিতর্কের শেষ নেই। অনেকের মতে ঝুমুর উপরোক্ত অঞ্চলের আদিবাসী জনজাতির বিশিষ্ট প্রেমসঙ্গীত। প্রেম তার দৈহিক ও মানসিক সামগ্রিকতায় ঝুমুর গানের অন্যতম মূল বিষয় বটে, কিন্তু এ কথাও মানতে হয় যে প্রেম কখনওই ঝুমুর গানের একমাত্র বিষয়বস্তু নয়। ঝুমুর আদতে এই মানুষদের গোটা জীবন ও জীবিকার দলিল। বিশিষ্ট লোকসঙ্গীত গবেষক নরনারায়ণ চট্টোপাধ্যায় খুব জোর দিয়ে বলেছেন ‘ঝুমুর’ নামের উৎপত্তি নাকি ঝুম চাষ থেকে1; অথচ পশ্চিম মেদিনীপুরের মাহাত সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে প্রচলিত ঝুমুর নিয়ে কাজ করার সময়ে সেখানকার দিকপাল সব ঝুমুর শিল্পী ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি মাহাতরা এই ঝুম চাষ থেকে ঝুমুর গানের উৎপত্তির তত্ত্ব আদৌ মানেন না। সে যাই হোক, এই সমস্ত বিতর্কের একেবারে গভীরে না ঢুকেও এ কথা বলাই যায় যে ঝুমুর পূর্ব ও পূর্ব-মধ্য ভারতের আদিবাসী মানুষের জীবনসঙ্গীত; অঞ্চল ও সম্প্রদায়ভেদে এর কিছু বিভিন্নতা দেখা গেলেও বিকাশের নানা স্তরে ঝুমুর অরণ্যজীবী কৃষিজীবী জনগোষ্ঠীসমূহের নিজেদের গান হয়ে উঠেছে। আর ঝুম চাষের সঙ্গে ঝুমুরের কোনও সম্পর্ক থাকুক বা না থাকুক সাধারণভাবে ঝুমুর এক বৃহত্তর অনার্য মানবগোষ্ঠীর কৃষিকেন্দ্রিক আচার-অনুষ্ঠানের (ritualistic tradition) সঙ্গে ওতোপ্রত এবং সেই কারণেই ঝুমুর আদিতে মেয়েদের গান। মেয়েরাই যে এ গানের প্রাথমিক উদগাতা একথা জোর দিয়ে বলতে পারার প্রথম ও প্রধান কারণ মেয়েরাই কৃষিবিদ্যার স্রষ্টা; ছেলেরা বেশ পরে ক্রমে ক্রমে কৃষিকাজে যুক্ত হন।2

একইভাবে, আমরা ঝুমুরের শ্রেণিবিভাগের দিকে তাকালে দেখব ঝুমুর গবেষকরা মূলত দুভাবে এই লোকসঙ্গীতের বর্গীকরণ করেছেন – ১) বিষয়ভিত্তিক ও ২) বিকাশের স্তরভিত্তিক। আশুতোষ ভট্টাচার্যের মতে ঝুমুর মূলত পাঁচ রকম – ক) কৃষ্ণলীলা ঝুমুর, খ) রামলীলা ঝুমুর, গ) লৌকিক ঝুমুর, ঘ) সাঁওতালি ঝুমুর ও ঙ) টপ্পা ঝুমুর।3 অন্যদিকে নরনারায়ণ চট্টোপাধ্যায় বিবর্তনের স্তর অনুয়ায়ী ঝুমুরকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন – ক) ঝুমুর হাঁকা, খ) ঝুমুর গাহা, আর গ) ঝুমুর বাঁধা। তিনি আমাদের আরও জানাচ্ছেন ঝুমুর হাঁকার প্রাথমিক পর্যায়ে এই গানের না ছিল কোন নির্দিষ্ট সাঙ্গিতিক কাঠামো না ছিল কোন সাঙ্গিতিক ব্যাকরণ। এই পর্বে বানিহার অর্থাৎ মহিলা কৃষি শ্রমিকেরা ঝুমুর গানের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে নিজেদের কাজ সম্পর্কিত কথা চালাচালি করতেন এবং নিজেরদের আবেগ অনুভূতিও প্রকাশ করতেন।4 এই ধরণের গানগুলি খুবই ছোট, বড়জোর এক বা দু কলির। এর মধ্যে কিছু গান আবার কথোপকথনের ঢঙ্গে; আর এর সুর প্রধানত টানা, অনেকক্ষেত্রে করুণ। এই রকম দুটি গান – 

            ১) হাওয়াই দোলে ফরফরিয়া হে

            ধানের গাছি লকলক্যা হে 

            ২) জল ঝরে পরহান ঝরে হে, 

            মাইয়ার জরম বেরে দুখের হে

প্রথম গানটির দিকে তাকালেই বোঝা যায় আক্ষরিক স্তরে এ গান একেবারেই কচি ধানের চারার ছবি হলেও সেই চারার লকলকিয়ে বেড়ে ওঠার মধ্যে কোথাও যৌনতার ইঙ্গিতও রয়েছে। কায়িক শ্রম, বিশেষত জমিতে ফসল ফলানোর মত কাজ এতটাই শারীরিক (physical) এবং তা নারী শরীর ও তার জন্ম দেবার ক্ষমতার এতটাই কাছাকাছি যে মানুষ, এবং খুব সম্ভবত মেয়ে মানুষের এই মূর্ত অভিজ্ঞতা তার বিমূর্ত চেতনের স্তরে উর্বর জমির ফলন ও নারীর যৌনতা ও পুনরুৎপাদনের (reproduction) ক্ষমতাকে  এক সূত্রে বেঁধেছে। দ্বিতীয় গানটিতে কিন্তু কৃষিকাজের তাৎক্ষণিক প্রসঙ্গে সমাজ সমকালের এমন এক উচ্চারণ আমরা পাচ্ছি যেখানে ইতিমধ্যেই নারী আর সেই পূর্বতন কর্তৃত্বের জায়গায় নেই। 

মেয়েদের জমিতে দুভাবেই কাজ করতে হতো – ধানের কচি চারা পোঁতার সময়ে বা ফসল কাটার সময়ে মেয়েরা একসাথে দল বেঁধে কাজ করতেন। এই সময়কার দল বেঁধে গাওয়ার গানকে বলা হয় আবাইদা। আর মেয়েরা চাষের জমি দেখভাল করার সময়ে একলা যে গান করতেন তার নাম গরাইঞা। এবার আরেকবার ওপরের গান দুটির দিকে ফিরে তাকানো যাক। কৌম মানুষের সম্মিলিত শ্রম যতই ক্লান্তিকর হোক, একসাথে কাজ করার মধ্যে আনন্দ, উদ্দীপনা আছে; কাজ করতে করতে একে অন্যের সঙ্গে ঠাট্টা তামাশাও চলে। একে অপরের প্রতি যৌন ইঙ্গিতবহ মন্তব্য ছুঁড়ে দেওয়াও খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। তাই একসাথে কাজ করতে গিয়ে কচি ধানের সতেজ চারা খুব সহজেই কোন নারী বানিহারের যৌন উচ্ছ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, একক মানুষ সবসময়েই অনেকবেশি অন্তর্মুখী, চিন্তাশীল, উদাস। তাই একক মানুষের গান আধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপেক্ষাকৃত ভাবগম্ভীর। এই  কারণেই সারি গান, জারি গানের থেকে ভাটিয়ালির ভাব ও ভঙ্গী আলাদা।    

এখন মেয়েদের মত ছেলেরাও জমি চষার সময়ে বা মাঠে বাদাড়ে গবাদি পশু চরানোর সময়ে কাজে ছন্দ আনতে অথবা ক্লান্তি বা একাকিত্ব দূর করতে গান গাইতেন। কিন্তু সে গান একা গাওয়ার গান। ছেলেদের কাজের একক চরিত্রের কারণেই তাদের গানের ধরন এমন। পুরুষদের এই একক গান আবার চার রকম – ক) টাইড়, খ) উদধা, গ) ছুট আর ঘ) বাগাইলা। মনে রাখতে হবে লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্য মেনে এই গানগুলি কিন্তু একেবারেই তাৎক্ষণিকভাবে মুখে মুখে গাওয়া হত; লেখা জোকার বালাই ছিল না।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চাষের ক্ষেতে শ্রমরত মানুষ মানুষীর গান লোকাচারের গান হয়ে বাস্তুভূমির আঙিনায় এল। বাস্তুভূমির প্রধান অনুষ্ঠান করম জাওয়া, টুসু আর ভাদু। কিন্তু এসব অনুষ্ঠানে না লাগে কোনও পুরুত, না লাগে কোনও শাস্ত্র। মেয়েরাই  নাচ গানের মাধ্যমে সব আচার পালন করেন। ছেলেদের এখানে কোন ভূমিকা নেই বললেই চলে। মেয়েরা বাখাইল অর্থাৎ বাস্তুভিটের চৌহদ্দির মধ্যে নানা রকম গান গেয়ে উর্বরতা ও কৃষিকাজ সম্পর্কিত নানা আচার পালন করেন। ছেলেদের এক্ষেত্রে কিছু সহায়ক ভূমিকা থাকলেও তাদের কাজের পরিসর আলাদা – ছেলেরা কাজ করতে করতে গানও গান, কিন্তু সেই গান তারা গান বাখাইলের বাইরে। পুরুষদের এই গানকে বলে বাটগীত বা বাগাইলা গীত। ঝুমুর গানের বিকাশের এই পর্যায়ই হল ‘ঝুমুর গাহা’। এই ধরনের গান থেকেই পরবর্তীতে অন্যান্য ঝুমুর গানের উৎপত্তি বলে মনে করা হয়, যেমন – ডালধরা বা দাইড়শালিয়া ঝুমুরের জন্ম করম জাওয়া থেকে, ভাদরিয়া ঝুমুরের জন্ম ভাদু থেকে। এইসব ঝুমুর গান থেকে আবার আরও পরে দাইড় নাচ, বুলবুলি নাচ, করম নাচ, নাচনি নাচের মত বেশ পরিশীলিত নাচের জন্ম হয়।

প্রাচীন ও মধ্য পর্যায় অতিক্রম করে ঝুমুর বাঁধার স্তরে এসে ঝুমুর আধুনিক যুগে প্রবেশ করে। ঝুমুর বাঁধা এই নাম থেকেই স্পষ্ট যে এই সময় থেকেই আনুষ্ঠানিকভবে গান বাঁধা ও তার সৃষ্টিকর্তার নাম যোগ করার রেওয়াজ চালু হয়। এই পর্বের প্রাচীনতম গানগুলিও আঠার শতকের বেশি পুরোন নয়। এই পর্যায়ে একদিকে যেমন স্থানীয় জমিদারের এলিট রুচির উপযোগী দরবারি ঝুমুরের জন্ম হয়, তেমনই এই পৃষ্ঠপোষকদের  আমোদের জন্য নাচনিশালিয়া ঝুমুরেরও প্রচলন ঘটে। তবে, এই একই সময়ে স্থানীয় অভিজাত সমাজের বাইরে ঝুমুরের আরেক সমান্তরাল ধারাও বয়ে চলে যেখানে কৌম মানুষের রোজকার সুখ দুঃখ, এমনকি সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা বিষয়ও উঠে আসে। সম্ভবত এই পর্বেই ঝুমুর গানে বৈষ্ণব ভাবধারার প্রভাব বিস্তার লাভ করতে শুরু করে। 

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ঝুমুর গান ঐতিহাসিকভাবেই তথাকথিত অশ্লীলতার দায়ে নিন্দিত। বিশেষ করে ঝুমুর হাঁকা পর্বের গানগুলিকে সবচেয়ে অশ্লীল মনে করা হয় কারণ এই গানগুলিতে একেবারে খোলাখুলি ও সোচ্চারে নারী পুরুষ উভয়ই নিজেদের কামনা বাসনার কথা বলেন। ঝুমুর গানের যৌনতা সংক্রান্ত এই ছুতমার্গের জন্য একদিকে যেমন দায়ী বাঙালী ভদ্রলোকের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন তেমনি ভবতোষ সতপতির মত অসম্ভব প্রতিভাবান, শক্তিশালী ও মূলত শহুরে ঝুমুর স্রষ্টা ও শিল্পীদের ভূমিকা। গত শতকের সাত ও আটের দশক থেকে এই অঞ্চলের মানুষদের জীবনে রাজনীতি, বিশেষ করে বাম রাজনীতি এক প্রবল আলোড়নের সৃষ্টি করে এবং ভবতোষ সতপতির মত শিক্ষিত মানুষজন ঝুমুর গানের বিপুল সম্ভাবনা উপলব্ধি করে একে কৌমের বাইরে এক বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে নিয়ে আসেন। এর ফলে ঝুমুর গান যে এক ব্যাপকতর ক্ষেত্রে নিজেকে তুলে ধরতে পারে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু তা করতে গিয়ে সমাজ ও রাজনীতি সচেতন ঝুমুর বাঁধিয়েরা ঝুমুরকে শ্লীল ও শোভন করে তোলার এক অতিরিক্ত উদ্যোগ নিয়ে ফেলেন। সম্প্রতি পশ্চিম মেদিনীপুরের  লালগড় আন্দোলনের সময় তৈরি হওয়া ঝুমুর শিল্পীদের গানেও এই একই প্রবণতা দেখা যায়। রাজনৈতিক লড়াই, সংগ্রাম, মানুষের সাধারণ দুঃখ দুর্দশা বা গণ আন্দোলনের দলিল এই সব গানে কিন্তু কোথাও ‘অশ্লীলতার’ লেশমাত্র নেই। কিন্তু ঝুমুরের পটভূমির দিকে তাকালেই আমরা দেখতে পাব যে এই গান মূলগতভাবে কায়িক শ্রমরত একাকী বা সম্মিলিত নারী পুরুষের গান, যে গান কখনই ঘর গেরস্থালীর পারিবারিক কাঠামোয় আবদ্ধ নয়। সেখানে কৃষি উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনের ধারণা একে অন্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং নারী শরীর ও ভূমি সততই উর্বরতার দ্যোতক। তাছাড়া, মেয়েরা একযোগে গান গাইতে গাইতে মাঠে কাজ করার সময়ে নিজেদের নিয়ে কোন স্বতন্ত্র পরিসর নির্মাণ করে থাকতেও পারেন যেখানে তারা নির্দ্বিধায় শুধুমাত্র এই গানের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে এমন এক মৌখিক যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেন যা সামাজিক শৃঙ্খলার বাইরে। তার চেয়েও বড় কথা, বিমূর্ত চিন্তায় সক্ষম হয়েও এই সব শ্রমজীবী মানুষ মানুষী কায়িক শ্রমের কারণেই নিজেদের জলজ্যান্ত শারীরিক অস্তিত্ব সম্পর্কে উদাসিন হন না। তাই তাদের শরীর বার বার তাদের গানে ফিরে ফিরে আসে। এরকম অন্তত দুটি গানের উল্লেখ করা যায় – 

            ১) ছাইরে দে সকাল হইল হে

            ভুরকা তারা দুয়ারে আইল হে 

            ২) পান খেয়ে ঠোঁটটি লাল

            মরি হায় লো, কতক্ষণ রাত হয় লো,

            বঁধুর গায়ের সরু চাদর মেশামিশি হয় গো। 

ঠিক একইভাবে টুসু গানও অশ্লীল বলে ভাবা হয় কারণ টুসু পরবের আচার পালনের সময়ও মেয়েরা যেসব গান গায় তাতে অনেকক্ষেত্রেই কোন রাখঢাক ছাড়াই যৌন তৃপ্তি অতৃপ্তি ও দেহসুখের কথা থাকে। টুসু এই অঞ্চলের এক অতি প্রাচীন কৃষি উৎসব। সমস্ত কৃষি পার্বণের মত টুসুতেও চিরাচরিতভাবেই কৌমের মেয়েরা এক বিশেষ গুরুত্ব ও কর্তৃত্ব উপভোগ করে থাকেন। এই উৎসবে মেয়েরা নাকি সম্পূর্ণ অপরিচিত পুরুষদের উদ্যেশেও গানের মাধ্যমে টিকা টিপ্পনী কেটে থাকেন এবং তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যৌন ইঙ্গিতবাহী। এ যেমন একদিকে নারীর নিজের শরীর মনের উদযাপন, তা সে যত সাময়িকই হোক না কেন, তেমনই অন্যদিকে তা সভ্যতা ও উৎপাদন কাঠামোর এক বিশেষ স্তরকে সূচিত করে। কাজেই, ঝুমুর গানকে প্রাধান্যকারী সংস্কৃতির ক্ষমতা বিন্যাসের অনুসারী যুক্তিকাঠামোর ভিত্তিতে কোনও অভ্যন্তরীণ এবং/ অথবা বাহ্য ‘শুদ্ধিকরণের’ মধ্যে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস বা একে কৌম মানুষের ঘেরাটোপ থেকে মুক্ত করে এক শীলিত রাজনৈতিক ভাষ্যরূপ দেবার চেষ্টা কোথাও একধরনের কর্তৃত্ববাদের কাছেই নতি স্বীকার করা নয় তো? এ প্রক্রিয়া কি আদৌ ঐতিহাসিক? নাকি দেহবাদের মূল দর্শনকে সরিয়ে রেখে রবীন্দ্রনাথের বাউল গানের উদযাপনকে যেমন, তেমনই গোটা কায়িক প্রেক্ষিতকে (physicality) অগ্রাহ্য করে ঝুমুর গানের ‘শুদ্ধিকরণের’ এই প্রক্রিয়াকেও মূল্যমান নিরপেক্ষভাবে তলিয়ে দেখার সময় এসেছে?

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *