“জিন-জিয়ন-আজাদি”

৯ বছর আগে, ১৯ জুলাই, রোজাভায় শুরু হয় একবিংশ শতকের বৃহত্তম (তর্কসাপেক্ষে) বিপ্লব।  এই বিপ্লব যে শুধুমাত্র বিশ্বকে পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ের আশায় অনুপ্রাণিত করেছিল তাই-ই নয়, পাশাপাশি জাতি-রাষ্ট্রের বিপরীতে সমাজতন্ত্রী-নারীবাদী বিকল্পের আলোর নিশানও হয়ে উঠেছে এই বিপ্লব। স্বদেশ খুঁজে পাওয়ার আকাঙক্ষায় বাস্তুচ্যুত কুর্দ বিপ্লবীরা একই সঙ্গে পুঁজিবাদ, ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে তাঁদের লড়াই গড়ে তুলেছেন, তৈরি করেছেন একটি স্বশাসিত, গণতান্ত্রিক, পরিবেশ-বান্ধব ও সাম্যের সমাজ। 

পশ্চিম এশিয়ার অগণতান্ত্রিক পিতৃতান্ত্রিক অঞ্চলের মাঝে কুর্দ মহিলাদের জনপ্রিয় স্লোগান “জিন, জিয়ন, আজাদী”-র আক্ষরিক অর্থ “নারী, জীবন, স্বাধীনতা”। যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী  কুর্দ আন্দোলনকারী দিলার দিরিক ২০১৬ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে বলেন, একটি দেশ ততক্ষণ স্বাধীন হতে পারে না যতক্ষণ না সেই দেশেরে মহিলারা স্বাধীন। কুর্দ মহিলারা যেন দিরিক-এর এই ভাবনাকেই মূর্ত করে তোলে। স্বায়ত্বশাসন প্রতিষ্ঠার দাবিতে সশস্ত্র বিপ্লবের নেতৃত্বে থাকা দুঃসাহসী মেয়ের দল একই সাথে লড়ছে ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া (ISIS)-র বিরুদ্ধে – সাম্প্রতিক অতীতে, সারা পৃথিবীর বামপন্থীদের ভাবনাকে আবিষ্ট করেছে এই ঘটনা। রোজাভা এলাকায় সমাজতন্ত্রী নারীবাদী স্বশাসিত এলাকা প্রতিষ্ঠা তাদের আগ্রহকে উস্কে দেয়। তবে, পশ্চিম এশিয়ার জটিল রাজনীতি ও তার সদাপরিবর্তনশীল রাজনৈতিক জোট ও নতুন নতুন ধাঁচের সাম্রাজ্যবাদ এটিকে একটি ভয়াবহ জটিল ইস্যুতে পরিণত করেছে। কুর্দ-দের লড়াই ও তার সমাজতন্ত্রী নারীবাদী পন্থাকে বুঝতে হলে এই এলাকার ও এখানকার মানুষদের ভূগোল ও ইতিহাসকে অনুধাবন করা প্রয়োজন।      

ইতিহাস

৩ কোটি মানুষের এথনিক গ্রুপ কুর্দরা বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্রহীন জাতি বলে স্বীকৃত। ইরান, ইরাক, তুরস্ক ও সিরিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চল নিয়ে তৈরি কুর্দিস্তান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ সালে ইরানের শহর মহাবাদে কুর্দিশ রাজ্য গঠনে সহায়তা করে সোভিয়েত ইউনিয়ন – ১৯৪৬ সালে, ইরান থেকে USSR-এর প্রত্যাহারের পর এই রাজ্যের পতন হয়। ১৯৭৯ সালে ইরানিয়ান বিপ্লবে সরাসরি অংশগ্রহণকারী কুর্দদের প্রতি নির্মম ছিলেন ইরানের তৎকালীন শাসক মহম্মদ রেজা পাহালভি। বিপ্লবের পর, সর্বোচ্চ পদে থাকা আয়োতোল্লাহ খোমেনির শাসনাধীন নবগঠিত ইসলামিক রিপাব্লিক ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাষার কারণে কুর্দদের বহিরাগত হিসেবে দেখে এবং দমন করতে শুরু করে। এর ফলেই শুরু হয় সশস্ত্র সংঘর্ষ। যদিও, ঐতিহাসিকভাবে ইরাকি কুর্দরা ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদীর মধ্যবর্তী এলাকার বাসিন্দা, কিন্তু পশ্চিম এশিয়াকে ভাগ করার জন্য ব্রিটিশ ও ফরাসীদের মধ্যে হওয়া এক ঔপনিবেশিক চুক্তির ফলে কুর্দদের উত্তর ইরাকে আশ্রয় নিতে হয়। ইরাকের সরকার ও কুর্দ শক্তিগুলোর মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে ১৯৭০ সালে স্বশাসিত ইরাকি কুর্দিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়, কিন্তু ১৯৭৪ সালে সেই চুক্তি ভেঙে গেলে শুরু হয় হিংসাত্মক লড়াই। এরপর, ২০০৩ সালের মার্কিনি আক্রমণ ও সাদ্দাম হোসেন-এর বাথিস্ট (আরব জাতীয়তাবাদী) সরকারের পতনের পর কুর্দরা স্বায়ত্বশাসনের অধিকার ফিরে পায়। বর্তমানে, কুর্দিশ রিজিওনাল গভর্নমেন্ট (KRG), ইরবিল শহর থেকে স্বাধীনভাবে স্বশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চল শাসন করে।

রোজাভা, কুর্দ ভাষায় “পশ্চিম”, অবস্থিত উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায়। এখানে ২ কোটি কুর্দ-এর বসবাস, সিরিয়ার বৃহত্তম সংখ্যালঘু গোষ্ঠী। রোজাভা তিনটি ক্যান্টন-এ বিভক্ত: পশ্চিমে আফ্রিন, কেন্দ্রে কোবেন আর পূর্বে সিজরে। ১৯৬৫-র সিরিয়ার  “আরব বেল্ট” প্রকল্প এই এলাকায় বড় আকারে ডেমোগ্রাফিক রদবদল ঘটায় এবং রোজাভার কৃষিজমির একটা বড় অংশ দখল করে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল কুর্দ-দের তাদের নিজেদের জমি থেকে উচ্ছেদ করে সেখানে আরব পরিবারদের বসতি স্থাপন করা। এই প্রকল্প লাগু হয় ১৯৭৪ সালে এবং ৭০০,০০০ একর জমি বাজেয়াপ্ত হয়। লক্ষ্য ছিল পদ্ধতিগতভাবে কুর্দ পরিচিতিকে মুছে ফেলা। এবং শেষ পর্যন্ত, সিরিয়া তাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করায় সেই এলাকার কুর্দ জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রহীন হয়ে দাঁড়ায়। ২০০৩ সালে, তুরস্কের কুর্দিস্তান ওয়ার্কারস্ পার্টি (PKK)-র সিরিয়ান সদস্যরা তৈরি করে দ্য ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন পার্টি (PYD)। PYD-কে শুধু সিরিয়ার বাহিনীর বিরুদ্ধেই লড়াই করতে হয়নি, তারা ISIS-এর বিরুদ্ধেও অস্ত্র তুলে নিয়েছিল। বিখ্যাত পিপলস্ প্রোটেকশন ইউনিটস (YPG) এবং উইমেনস প্রোটেকশন ইউনিটস (YPJ) হল PYD-র সশস্ত্র দল। শুধুমাত্র মহিলাদের নিয়ে গঠিত সশস্ত্র বাহিনী YPJ যুদ্ধক্ষেত্রে ISIS-এর বিরুদ্ধে তাদের সাহসিকতার জন্য প্রশংসিত হয় বিশ্বজুড়ে। শেষ অবধি ২০১২ সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময়ে, সিরিয়া কর্তৃপক্ষ রোজাভা থেকে বাহিনী প্রত্যাহার করে।

দক্ষিণ তুরস্কের বাকুর উত্তর কুর্দিস্তানে অবস্থিত। বিশ্বের সর্বোচ্চ কুর্দ জনগণের বাস এই দেশে – ২০ লক্ষেরও বেশি কুর্দ এখানে বাস করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির অটোমান সাম্রাজ্য ভাগ এবং ১৯১৬ সালে সাইকস্-পিকট চুক্তির আওতায় ফরাসী ও ব্রিটিশদের “influence zone” স্থাপনের ফলে কুর্দ জনগণ নতুন রাষ্ট্রের সীমানা বরাবর ভাগ হয়ে যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি অধিকৃত অটোমান সাম্রাজ্যকে ভাগ করতে সার্ভস চুক্তির খসড়া তৈরি করে। এই চুক্তিতে কুর্দদের নিজস্ব রাষ্ট্রের দাবির বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য গণভোটের অবকাশ রাখা হয়। নবগঠিত তুরস্ক এই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে। ১৯২৩ সালে মুস্তাফা কেমল আতাতার্ক তুরস্ককে মুক্ত করলে লাওসেন চুক্তি নামে একটি নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। লাওসেন চুক্তিতে কুর্দ এলাকার নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয় তুরস্ককে এবং গণভোটের শর্তটি বাতিল করা হয়। সেই থেকে তুরস্ক কুর্দদের জাতিগতভাবে মুছে দিতে তৎপর, তৎপর তাদের পরিচিতি নির্মূল করতে। তাদের কোনওরকম অধিকার সেখানে নেই, তাদের ভাষা নিষিদ্ধ। পরবর্তী বছরগুলিতে কুর্দ প্রতিরোধ তীব্রতর হয় এবং আবদুল্লা ওকালানের নেতৃত্বে গঠিত হয় সবথেকে বেশি প্রভাবশালী প্রতিরোধী দল PKK।      

ওকালান, PKK  ও জঙ্গী নারীবাদ

আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে মার্কসবাদী আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হন ওকালান, এবং নিজের জনগোষ্ঠীর মানুষের মুক্তির জন্য তৈরি করেন PKK। বিশ্বের ঔপনিবেশিকতা বিরোধী আন্দোলন ও তাদের বামপন্থী ঝোঁক-ও ওকালানের রাজনৈতিক ভাবনাকে আকার দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। ১৯৭০-এর দশকে, PKK তুরস্কের বিরুদ্ধে তাদের সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে কিন্তু দক্ষিণপন্থী মিলিটারি অভ্যুত্থান তাদের তুরস্ক থেকে লেবাননে পাঠিয়ে দেয়, সেখানে তারা প্যালেস্টিনিয়ান প্যপুলার লিবারেশন ফ্রন্ট (PELP)-এর সাথে মিলে লড়াই চালিয়ে যায়। PELP ১৯৮২ সালে লেবাননের ওপর ইস্রায়েলি হানার বিরুদ্ধে গঠিত বামপন্থী ও সব থেকে পুরনো প্যালেস্টিনিয় প্রতিরোধী দল। ১৯৯৯ সালে ওকালান কেনিয়াতে ধরা পড়েন ও তাঁর ফাঁসির হুকুম হয়। পরে, তুরস্কে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ হলে সাজা বদলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন ওকালান। কিন্তু তুরস্ক ও তার NATO জোটসঙ্গীরা PKK-কে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ঘোষণা করে। PKK-এর লক্ষ্য ছিল জনযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন সমাজতন্ত্রী কুর্দিশ রাষ্ট্র গঠন। যদিও, ১৯৯০ সালে, ওকালান ও PKK নেতৃত্ব তাদের পন্থার পুনর্মূল্যায়ন শুরু করে কিন্তু কুর্দদের জন্য একটি সমাজতন্ত্রী নারীবাদী স্বশাসিত এলাকা তৈরি-র ভাবনা সেখানে কেন্দ্রীয় অবস্থান নেয়। তিনি গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা ও কুর্দদের জন্য জাতিরাষ্ট্র গঠনের ধারণা থেকে ক্রমশ সরে এসে আরও বিকেন্দ্রীভূত একটি শাসন ব্যবস্থার দিকে ঝোঁকেন। তাঁর মনে হয় জাতি-রাষ্ট্রের কাঠামোয় ক্ষমতার অসাম্য রয়েছে, কুর্দদের জন্য একটি কনফেডারেশন তৈরি করতে হবে। তাদের নিজেদের পুঁজিবাদ বিরোধী ও রাষ্ট্র বিরোধী অর্থনৈতিক মডেল তৈরি করতে হবে যেখানে সিদ্ধান্তর নেওয়ার প্রশ্নে নীচ থেকে উপরে আসা সিদ্ধান্ত গ্রহণ পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। তাঁর পুঁজিবাদ বিরোধী ও রাষ্ট্র বিরোধী কনফেডারেশন গঠনের দর্শন গণতান্ত্রিক কনফেডেরালিজম নামে পরিচিত। এই দর্শনের কেন্দ্রে ছিল নারী মুক্তি ও লিঙ্গ সাম্য ।  

PKK ক্রমশ তাদের ধীরে ধীরে তাদের রণনীতি পরিবর্তন করে এবং স্বাধীনতার পরিবর্তে স্বশাসন ঘোষণা করে। কিন্তু তাদের কনফেডারেশন গঠনের লক্ষ্য রোজাভার তিনটি ক্যান্টনেই বাস্তবায়িত হয়। PYD, পিপলস্ কাউন্সিল অফ ওয়েস্ট কুর্দিস্তান (MGRK) গঠিত হয়, যারা কাউন্সিল, কমিশন ও কোঅর্ডিনেটিং বডি-গুলোতে কুর্দিশ সোসাইটি নির্মাণ করে। MGRK উল্টানো পিরামিড কাঠামোয়ে চারটি স্তরের স্বশাসিত ও স্ব-সংগঠিত কাউন্সিল নিয়ে তৈরি। এই স্ব-সংগঠিত ব্যবস্থা একটি বিকেন্দ্রীভূত অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে চলে। পাশাপাশি, এই পদ্ধতি লিঙ্গ-হায়ারার্কিকেও  চ্যালেঞ্জ জানায় এবং দ্বৈত নেতৃত্বকারী ব্যবস্থায় অনুসরণ করে। প্রতিটি কমিউন, কাউন্সিল, কমিশনে দুজন করে গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত নেতৃত্ব থাকেন এবং তার মধ্যে অন্তত একজন হন মহিলা। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে অন্তত ৪০ শতাংশ মহিলা থাকেন। এছাড়াও, প্রতিটি জেলায় আলাদা করে মহিলাদের কমিউন ও কাউন্সিল থাকে। বাল্য বিবাহ, অনার কিলিং, পণ, লিঙ্গভিত্তিক হিংসা, গৃহ হিংসা, ধর্ষণ ইত্যাদিকে অপরাধমূলক কাজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ও গর্ভপাতকে আইনি অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। রোজাভায় নারীবাদ নাগরিক সমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এবং অস্ত্র ধরার আগে নিরাপত্তাবাহিনীকে নারীবাদী আদর্শে প্রশিক্ষিত করা হয়। কুর্দ মহিলারা “jineology” নামক এক ভাবনার বিকাশ ঘটিয়েছে, যার অর্থ মহিলাদের বিজ্ঞান (science of women)। এই নির্দিষ্ট ধরনের কুর্দিশ নারীবাদ ইতিহাস ও বিজ্ঞান সংক্রান্ত লেখায় লিঙ্গ অসাম্যকে দূর করার লক্ষ্যে কাজ করে এবং পুংলিঙ্গকেন্দ্রিক (ফ্যালোসেন্ট্রিক) জ্ঞান-ব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা করে।     

YPJ-র কেন্দ্রেও রয়েছে “jineology”-র ধারণা। YPJ গঠিত হয় ২০১৩ সালে, এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করে; বিশেষত যৌন দাস হিসেবে বিক্রি হওয়া ইয়াজিদি মহিলাদের মুক্ত করার পর তাদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৪ সালে, সিঞ্জর পাহাড় থেকে সফলভাবে ইয়াজিদি-দের সরিয়ে নেওয়া ছিল তাদের প্রথম জয়, এরপরের সাফল্য ২০১৫ সালে ISIS-এর কবল থেকে কোবেন-দের মুক্ত করা। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি গোটা বিশ্বকে দখলদারির বিরুদ্ধে কুর্দদের এই শতাব্দী প্রাচীন লড়াইকে গুরুত্ব দিতে এবং অত্যাচারী ইসলামিক স্টেট-এর বিরুদ্ধে “ওরিয়েন্টাল” মহিলাদের লড়াইকে সেনশেনালাইজ করার প্রবণতা থেকে সরে আসতে বাধ্য করে। পশ্চিম এশিয়ার বহুস্তরীয় দ্বন্দ্ব এবং দখলদারির বিরুদ্ধে কুর্দিশ মহিলাদের লড়াই সামনে আসে। সংগ্রামের ঐতিহাসিক শিকড় ও কুর্দিশ আন্দোলনে সমাজতন্ত্রী নারীবাদী ইন্টারসেকশনাল পন্থার ভূমিকাকে অস্বীকার করে “মধ্যপ্রাচ্যে” “নারীর সশক্তিকরণের” যে পশ্চিমি উদারতাবাদী ডিসকোর্স গড়ে ওঠে, YPJ ও PKK-এর সঙ্গে যুক্ত আন্দোলনকারীরা তার তীব্র বিরোধিতা করে, শুধুমাত্র মেয়েদের নিয়ে তৈরি সশস্ত্র বাহিনী গঠনের অন্যতম কারণই ছিল এটা।  

প্রচলিত লিঙ্গ-ভূমিকা থেকে মেয়েদের মুক্ত করতে এবং শুধুমাত্র অস্ত্র দিয়ে নয় বরং নারীবাদী দর্শনের রাজনীতির মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায়নে গড়ে তোলা হয়েছিল YPJ তে। প্রত্যেক YPJ যোদ্ধা রাজনৈতিক আদর্শের কঠোর প্রশিক্ষণের মধ্যে দিয়ে যায়, যেখানে তারা মিলিটারি প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ওকালান-এর গণতান্ত্রিক কনফেডারালিজম ও নারীবাদী আদর্শের প্রশিক্ষণও নিয়ে থাকে। ISIS-এর বিরুদ্ধে তাদের জয়ের পর অন্যান্য জাতিগত পরিচয়ের মানুষরাও স্বেচ্ছায় তাদের সঙ্গে কাজ করতে আকৃষ্ট হয়। তাদের একটা বড় জয় ছিল সেই এলাকার মানুষদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানো। YPJ-র ইয়াজিদি যোদ্ধা বেরিভান আরিন দ্য মিডল ইস্ট আই-কে বলেন PKK সিঞ্জর-এ তাদের উদ্ধার করে রোজাভায় নিয়ে আসে, সেখানেই তিনি তাদের আদর্শের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন ও বাহিনীতে যোগ দেন। “ আমি আন্দোলনে যোগ দিয়েছি কারণ আমার নিজের মানুষদের যারা অত্যাচার করেছে শয়ে শয়ে খুন করে আমি সেই সব ক্রিমিনালদের বিরুদ্ধে লড়তে চাইতাম। কিন্তু আমি এই ব্যবস্থার থেকে মুক্ত হতেও চাইতাম, ইয়াজিদি ব্যবস্থা যার আমি অংশ যেখানে মেয়েদের ঘরে কয়েদ করে রাখা হয়, যেখানে মেয়েদের শুধু সন্তান বড় করা আর ঘরের দেখাশোনার কাজের যোগ্য মনে করা হয়,” তিনি বলেন। তুরস্কের কুর্দিস্তান থেকে আসা আরেক YPJ যোদ্ধা নওভ রাসাত-এর গল্পও একই রকম। কুর্দিশ স্বাধীনতা আন্দোলনে PKK-ই প্রথম সংগঠন যারা নারী মুক্তিকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দিয়েছে, এই আদর্শে আকৃষ্ট হয়েই তিনি গেরিলা ইউনিট-এ যোগ দেন।

YPJ প্রথম এই ধরনের সমাজতান্ত্রিক নারীবাদী সশস্ত্র দল হিসেবে প্রশংসিত হলেও এটাই কুর্দিস্তানের প্রথম সশস্ত্র নারী বাহিনী নয়। ১৯৯৫ সালে, নারী মুক্তির লক্ষ্যে  PKK তাদের প্রথম শুধুমাত্র মহিলাদের নিয়ে তৈরি গেরিলা ইউনিট তৈরি করে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ থেকে উঠে এলেও ১৯৯৫ সালের আগেও কুর্দ মহিলারা সশস্ত্র প্রতিরোধের অন্যতম মূল চালিকা শক্তি ছিল। “যেমন, ১৯ শতকের শেষ দিকে অটোমান সাম্রাজ্যে কারা ফাতমা ৭০০ জন পুরুষের একটি ব্যাটেলিয়নকে নেতৃত্ব দেয় এবং ৪৩ জন মহিলাকে সেনায় নিযুক্ত করতে সক্ষম হন – সেই সময়ের নিরিখে খুবই বিরল। ১৯৪৭ সালে কুর্দ ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য ২২ বছরের লায়লা কাসিম-কে হত্যা করে ইরাকের বাথ পার্টি,” দিরিক লেখেন। দিরিকের মতে এই সমাজতন্ত্রী নারীবাদী ব্যবস্থা শুধুমাত্র ওকালানের দর্শনেরই ফসল নয়, কুর্দদের দীর্ঘ প্রতিরোধের সংস্কৃতিরও এক্ষেত্রে ভূমিকা থেকেছে। দিরিক বলেন, কুর্দ মহিলাদের দলে দলে আন্দোলনে যোগ দেওয়া, “দশকের পর দশক যোদ্ধা, রাজনীতিবিদ, গণঅভ্যুত্থানে নেত্রী এবং শ্রান্তিবিহীন প্রতিবাদী  হিসেবে কুর্দ মহিলাদের প্রতিরোধের ঐতিহ্য ও অধিকারের প্রশ্নে কোনওরকম সমঝোতা না করার জেদ”-এরই ধারাবাহিকতা। 

পিতৃতন্ত্র ও পুঁজিবাদের সঙ্গে একসঙ্গে লড়াই সম্ভব?      

PKK-র সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে সরে আসা ও ISIS-এর বিরুদ্ধে জয়ের পরেও, YPJ ও তার জঙ্গী নারীবাদী আদর্শ আজও প্রাসঙ্গিক। উদ্বাস্তু মানুষে ভরা এই অঞ্চলে PKK উদ্বাস্তু সংক্রান্ত আলোচনার আঙ্গিকে বদল আনার লক্ষ্যে কাজ করছে এবং পাশাপাশি মহিলাদের প্রশিক্ষণের মধ্যে দিয়ে স্বশাসিত করা ও শিবিরে স্বশাসিত জোন তৈরির উদ্দেশ্যে কাজ চালাচ্ছে। যেমন, ইরাকের মাখমুর শিবিরে থাকা মূলতঃ তুর্কি কুর্দ উদ্বাস্তুদের মধ্যে গণতান্ত্রিক কনফেডারেলিজম, সোশ্যালিজম ও নারীবাদী আর্দশের প্রসার ঘটানোর কাজ চালাচ্ছেন PKK-এর গেরিলারা। উদ্বাস্তুরা তাদের নিজেদের স্বশাসিত ব্যবস্থা তৈরি করেছেন এবং মহিলা কাউন্সিলও তৈরি করেছেন। একইভাবে তারা, এই এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা একাধিক ইয়াজিদি উদ্বাস্তুদের মধ্যে কাজ করছেন। এর ফলে কুর্দিস্তানের সিরিয়ান অংশে মরুদ্যান হয়তো তৈরি হয়েছে কিন্তু অন্যান্য কুর্দিশ এলাকা এখনও পিতৃতান্ত্রিক ধ্যানধারণা ও এমন সব দলের কবলে রয়ে গেছে যারা সাধারণভাবে PKK-এর প্রতি শত্রুমনোভাবাপন্ন। আর তাই গেরিলা ইউনিট-এর স্লোগান “জিন, জিয়ন, আজাদি” মানুষের কানে পৌঁছনো প্রয়োজন এবং জোর গলায় উচ্চারণ করা প্রয়োজন!     

তিনটি স্বশাসিত সমাজতন্ত্রী নারীবাদী এনক্লেভ তৈরি করা PKK ও YPJ-র রোজাভা বিপ্লব, এবং পরবর্তীতে উদ্বাস্তু শিবিরে তাদের কাজ ও কুর্দদের জন্য গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী নারীবাদী কনফেডারেশন স্থাপনের লক্ষ্যে তাদের অঙ্গীকার সারা বিশ্বের বামপন্থী নারীবাদী কর্মীদের জন্য শিক্ষা হতে পারে। নয়া সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও পুঁজিবাদী শাসনের পৃথিবীতে রোজাভা বিকল্প পথ দেখায়। রোজাভা, পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে এমন এক লড়াইয়ের সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখায়, প্রান্তিকের মুক্তিতেই যার শিকড়। রোজাভা প্রমাণ করে পৃথিবীর সবথেকে লিঙ্গ অসাম্যের এলাকারগুলির একটিতেও মর্যাদা, গণতন্ত্র ও সাম্যের মরুদ্যান গড়ে তোলা সম্ভব। পৌরুষের অভিব্যক্তির কবল থেকে জঙ্গী লড়াইয়ের ধারণাকে মুক্ত করে, সকলের জন্য মুক্ত এক পৃথিবীর স্বপ্ন স্থাপন করে রোজাভা। বিপ্লবী লড়াইয়ের মধ্যেও ঐতিহাসিকভাবে মেয়েদের নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, কিন্তু রোজাভা পৃথিবীকে দেখায় বিকল্প মডেল সম্ভব – শুধুমাত্র জঙ্গী লড়াইয়ের ক্ষেত্রেই নয়, বিপ্লবী প্রকল্পের সঙ্গে সংহত নারীবাদী আদর্শের বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও। রোজাভা দেখায় পুঁজিবাদ ও পিতৃতন্ত্রকে একই সঙ্গে রুখে দেওয়া যায়।

তথ্যসূত্র:

https://newscoop.com/a-short-history-of-syrias-rojava-kurds/ 

https://www.dissentmagazine.org/online_articles/the-revolution-in-rojava

https://thekurdishproject.org/ 

https://www.historyextra.com/period/20th-century/kurds-iraq-iran-statehood-saddam-hussein/ 

https://www.telesurenglish.net/opinion/Forget-the-UN-Meet-the-Self-Determining-Refugees-in-Kurdistan-20151005-0021.html 

https://www.telesurenglish.net/analysis/A-History-of-the-Turkish-Kurdish-Conflict-20150728-0042.html 

https://www.e-ir.info/2021/05/10/rojavas-patriarchal-liberation-solving-the-feminist-anti-militarism-problem/ 

https://www.aljazeera.com/opinions/2014/10/29/western-fascination-with-badass-kurdish-women/ 

 চিত্রঋণঃ এএনএফ, রোজ উইমেন, রোর ম্যাগ, বেহ্যান্স, দ্য ইন্টারন্যাশনাল লেবর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফর্মেশন গ্রুপ, দ্য কুর্দিশ প্রোজেক্ট 

ভাষান্তর: সানন্দা দাসগুপ্ত।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *