যৌনতার আখ্যান ও একটি পারফর্মেন্স

শেষ বছরটা বদলে দিয়েছে অনেক কিছু। ঘর আর বাইরের জায়গার অদলবদল ঘটেছে, ঘরকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা গেছে, বোঝাপড়া বদলেছে। পরিবর্তন হয়েছে ঘরের মধ্যেকার কাজ বন্টনের হিসেবেও। বাড়ির বাইরে অভ্যস্ত পুরুষ এই সময়ে গৃহস্থ খুঁটিনাটি করছেন, তা প্রচার পাচ্ছে, কারণ সে কাজ তাঁদের করার কথা ছিল না সাধারণত। সবই সময়ের দাবি। এই ঘরের মধ্যে সারাক্ষণ জাপটে থাকতে থাকতে দুজন মানুষের মধ্যেকার ফাঁকা জায়গার অভাব ঘটেছে। সেখানে তো আর ‘সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং’ নেই। ফাঁকা বাড়ির একটুকরো চিলেকোঠার অবসর হারিয়ে গেছে অনেকের থেকে। যে সকল মানুষজনের বাড়ির কাজে সময় কাটে, বাড়ির বাকিরা বেরিয়ে যাওয়ার পরের যে একার রাজত্ব তা আর নেই। সেখানে ঘর-বাইরের ফারাক মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। 

এই সময়েই ইভ এন্সলারের ‘ভ্যাজাইনা মনোলগ’ নাটককে কেন্দ্র করে একটি পারফরমেন্স তৈরি করি। এটি বাংলা ও ইংরিজি দুটি ভাষায় তৈরি হওয়া একটি কাজ। আমরা যদি মূল নাটকটিকে জানি, তাহলে দেখব, সেখানে নানান মহিলা তাঁদের নিজেদের যোনি নিয়ে কথা বলছেন। সেখানে বিস্তারিত বর্ণনা আছে কে তার যোনিকে কেমন ভাবে দেখে, চেনে, জানে। যোনি যদি কথা বলতে পারত, তাহলে সে কী কী বলত, কেমনভাবে ডাকত ইত্যাদি নানা বিষয়। সেই মহিলাদের ভিন্ন বয়স, ভিন্ন শ্রেণি, তাঁদের সামাজিক অবস্থানের ফারাক আছে। আর সেই ফারাক ভেদে গল্পের ধরন বদলেছে, পাল্টেছে অভিজ্ঞতাও। 
আমার কাজটির নাম ‘সং অফ হুইস্পার’ আর এই স্ক্রিপ্টটি লেখার দায়িত্ব নিয়েছিলেন সমাজকর্মী সুমিতা বীথি। সুমিতাদি দীর্ঘদিন ধরে লিঙ্গ রাজনীতির একেবারে গভীরে গিয়ে কাজ করেন। কাজের শুরুতে তিনি বলছিলেন একেবারে নিচের স্তরে থাকা মেয়েদের সঙ্গে যৌনতা নিয়ে আলোচনা করার অভিজ্ঞতার কথা। এই ওয়ার্কশপের শেষে তারা অধিকাংশই বাথরুমে চলে যেত। আর, একেবারে শেষে তাদের প্রত্যেকের হাতে একটা করে আয়না দিয়ে আসা হত, যাতে তারা কখনও নিজের যোনিকে চাইলে দেখতে পারে।

এই অদেখা বস্তুটির সঙ্গে আমাদের এক অদ্ভুতরকমের সম্পর্ক। তাকে আমরা অনেকেই দেখি না, জানি না, চিনি না। আর যেটুকু জানা বা চেনা, তাও হয় অন্য কোন মানুষের মাধ্যমে। বলাই বাহুল্য, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা পুরুষের চোখ। তারা যেভাবে দেখে বা দেখতে শেখায়, একটি মেয়ের যোনির সঙ্গে বোঝাপড়া বা জানাশুনো সেখান থেকেই শুরু হয়। মনে রাখতে হবে, মেয়েদের হস্তমৈথুন আমাদের এই সমাজে একটি নিন্দনীয় বিষয়, এখনও। যৌনতার আনন্দের সব ভাগীদার করা হয় পুরুষকেই। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় এই দ্বিতীয় লিঙ্গ আনন্দপ্রদায়ী একটি যন্ত্র, যার নিজের দাবিদাওয়া খুব একটা থাকতে নেই।
“My vagina wants to travel and know more. It wants to get out more. My vagina wants love, hot liquid, deep kisses, gentle touch. It wants to scream. It doesn’t want to get annoyed. My vagina wants, it wants to want. Well, my vagina wants everything.”
এন্সলারের মূল নাটক থেকে এই অংশটি সরাসরি ব্যবহার করা হয়েছে এই প্রযোজনায়। এই পারফরমেন্সটি এই সময়ের ভারতবর্ষে নানা মেয়ের আখ্যান তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। কারোর বিয়ের প্রথম রাতের গল্প, কারোর বা বর পছন্দ করে না যোনির চারপাশের চুল। কোথাও কোন সদ্য কিশোরী তার যোনিকে আবিষ্কার করছে। সেখানে তার যোনি সমুদ্রের ঢেউয়ের মতন ছুটে চলে। সেখানে বাঁধ ভেঙে ফেলার গল্প। আবার, একটি অংশে একটি মেয়ে তার যৌনতার আনন্দ পেতে জানছে অন্য একটি মেয়ের মাধ্যমে, সেখানে বলছে, “You need to know all the possible ways to give yourself pleasure, so that you never need to depend on others.”
প্রযোজনাটি তৈরি মূলত কিছু মেয়ের গল্প আর বাড়ির সেই সমস্ত কাজ নিয়ে, যা মূলত মেয়েদের কাজ বলে পরিচিত। একটি মেয়ে অনেক মেয়ের কথা বলে সেখানে। সেখানে কেউ কাপড় কাচে, নিংড়ে মেলে দেয়, কেউ গাজর, মূলো ইত্যাদি সবজি খোসা ছাড়িয়ে ছুরি দিয়ে টুকরো করে কাটে। মঞ্চে থাকে চুল বাঁধার লাল ফিতে, চুলের ক্লিপ, আয়না, চুড়ি, নানা মাপের অন্তর্বাস, অনেক ধাঁচের চুল, খোঁপা, বিনুনি, মশারির জাল, সাবানের ফেনা, কখনও সালামি, কখনও ক্যান্ডি ফ্লস বা গোলাপি রঙের বুড়ির চুল, কখনও টক-ঝাল স্ন্যাক্স। সেখানে কাপড় কাচার সাবান বালতিতে জলের মধ্যে মিশিয়ে ফেনার স্তর গড়ে ওঠে। সেই স্তরের মধ্যে মধ্যে একটি মেয়ের নিজের যোনির সঙ্গে বোঝাপড়ার গল্প মিশে যায়। কারণ তার বর সেই যোনিকে অন্যভাবে দেখতে চায়, অথচ মেয়েটির চাওয়া ভিন্ন। সে এমন এক টানাপোড়েন, যেখানে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ঘটনাও আছে। এরপরে কাপড়গুলো অন্য বালতির জলে ধুয়ে, নিংড়ে মেলে দেওয়া হয় চারদিকে। সেখানে ঝোলে নানা রঙের, মাপের ব্রেসিয়ার, প্যান্টি, ওড়না। 

সারা পারফরমেন্সটি জুড়ে এই গৃহস্থালির কাজগুলি চলতে থাকে। সেগুলো শেষ হওয়ার কোন তাড়া নেই। কাপড় কাচতে বা সবজি কাটতে সাধারণভাবে যে সময় লাগে, এখানেও সেই সময় ধরেই কাজটা শেষ করা হয়। সেই কারণে এই পারফর্মেন্সের কোন নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই, কাজের ওপর নির্ভর করে থাকে আলাদা আলাদা শো। দর্শক বসেন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নানা জায়গায়। তাঁদের মধ্যে দিয়েই স্পেসের এধারে ওধারে এক-একটা কাজ হতে থাকে, এক-একটা গল্পের জন্য, এক-একটি মেয়ের জন্য আলাদা আলাদা জায়গা। এই সবের মধ্যে পারফর্মার (এক্ষেত্রে আমি) বসে, শোয়, ঊরু ফাঁক করে দেয়। দর্শকের জায়গায় বসে থাকা প্রতিটি চোখ থাকে একটি নারীশরীরের ওপর।

এই কাজটিতে দর্শক শুধুই বসে দেখেননা, তাঁরা সরাসরি যোগ দিয়ে নাটকের অংশ হয়ে ওঠেন। বলা যায়, কাজটির একটি বড় অংশ সরাসরি দর্শকের প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে আছে। একটি অংশে লিখতে বলা হয় দর্শককে, তাঁদের অনুভূতির কথা। পারফর্মেন্স শুরুর আগেই তাঁদের হাতে পেন্সিল আর চিরকুট দিয়ে দেওয়া হয়। কখনও তাঁরা আঁকেন, কখনও থাকে শুধু একটি শব্দ বা অনেকটা লেখা। ওই অংশে পৌঁছে তাঁরাও যেন কথা বলতে চান, যে কথা আগে বলা হয়ে ওঠেনি বা একসঙ্গে অনেকে মিলে বসে প্রকাশ্যে যে শব্দ বা প্রতিক্রিয়া তাঁরা কখনও ভাগ করে নেননি। আবার কখনও তাঁদের বুড়ির চুল বা স্ন্যাক্সের ভাগ দেওয়া হয়। পারফর্মার তাঁর শরীরের নানান স্থান থেকে সেই খাবার খুলে খুলে এগিয়ে দেন। এখানে পুরো অন্ধকার হয় না। তাঁরা সকলে একসঙ্গে উচ্চারণ করেন ‘ভ্যাজাইনা’ শব্দটি। প্রতি দর্শক তাঁর পাশের জনকে দেখতে পায়, স্পষ্ট। পারফর্মার দেখতে পায় প্রতিটি চোখ, প্রতিটি চাহনি। সেই চাহনির মধ্যে মিশে থাকে পিতৃতন্ত্রের অস্বস্তি। সেই অস্বস্তি প্রশ্ন করে, কেন গাজর কাটা হবে? সেই দ্বিধাই প্রশ্ন জাগায়, এই নাটকে তো মেয়েদের গোপন কথা বলা আছে, তাহলে পুরুষেরা এটা দেখবে কেন। 

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই সকল প্রশ্নকারীরা নারীমুক্তি, নারীনিগ্রহ ইত্যাদি সামাজিক বিষয় নিয়ে অত্যন্ত সরব, তাঁরা চান সেগুলো নিয়ে কাজ হোক। তাহলে তাঁদের এই কাজ নিয়ে আপত্তি থাকে কেন? বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে, এই ক্ষেত্রগুলোতে তাঁরা থাকেন উদ্ধারকর্তার ভূমিকায়। সেখানে তাঁরা নারীমুক্তির কাজে ব্রতী, সমাজসংস্কারক। কিন্তু এক্ষেত্রে, তাঁদের শুনতে হচ্ছে, মেয়েদের গোপন অঙ্গ নিয়ে কথা, যা আদতে পুরুষের ভাবনা দ্বারাই প্রভাবিত ছিল। এবারে এখানে এসে একটি মেয়ে যখন তার নিজের আকাঙ্ক্ষা, আনন্দ, যন্ত্রণার কথা বলছে, তখন আর তা তথাকথিত ভাবনার সঙ্গে মিলছে না। তখন সেই উদ্ধারকার্যের মন ব্যহত হচ্ছে বারবার। 

আদতে এই পারফর্মেন্স শিল্পী ও দর্শক- এই দুপক্ষের সরাসরি দেওয়ানেওয়ার ওপরে দাঁড়িয়ে। এখানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অনেকের ভাবনাচিন্তা নতুন করে জারিত হয়। ব্যক্তিগত ও বাইরের স্থানের মাঝখানে চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকে দুই পক্ষ।

শেয়ার করুন

1 thought on “যৌনতার আখ্যান ও একটি পারফর্মেন্স”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *