কাগজের ছবি

এর আগে ছোটদের জন্য আঁকিনি। ছোটবেলা পেরিয়ে বড়দের সাথে টেক্কা দেওয়ার কঠিন চেষ্টায় বড় হয়ে আমি এতদিনে বুঝি কিছুটা হাঁপিয়ে উঠেছি। হয়তো তাই আজকাল খুব ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। হয়তো তাই আজকাল ছোটদের জন্য কিছু আঁকতে ইচ্ছে করে। ছোটরা আমার কাজ দেখে যেন আকাশছোঁয়া স্বপ্ন দেখবার ভরসা পায়, এমনটা ভেবেই কাজগুলো করি।

কিছুদিন বাবদ আমি বিখ্যাত শিল্পীদের শিল্পের ঘরানা খুঁজতে গিয়ে কিছু অসামান্য কাজ এর সাথে পরিচিত হয়েছি। রংবেরঙ্গি কাগজ কেটে কোলাজ-এর কাজ। পশ্চিমের শিল্পী হেনরি মাতিস এবং শান্তিনিকেতনের বিনোদবিহারী মুখার্জীর করা অনেক অনেক কোলাজ। মাতিস আর পিকাসো একই সময়ের শিল্পী। দুজনেই নিজেদের শিল্পের ঘরানায় আকাশছোঁয়া স্বপ্ন দেখেছিলেন। দুজনেই নতুন নতুন পরীক্ষানিরীক্ষা করেন তাঁদের শিল্পে। এইসমস্ত আকাশপাতাল উল্টে দেওয়া কৌশলের ফলে ইউরোপের শিল্পে বিশাল পরিবর্তন আসে। অন্যদিকে শান্তিনিকেতনে রামকিঙ্কর, নন্দলাল বোসের সাথে বিনোদবিহারী ভারতীয় শিল্পে নতুন ধারার আধুনিকতা এনে দেন। এনাদের সব অসামান্য কাজ দেখতে দেখতে আমি হঠাৎ করেই মাতিস এবং বিনোদবিহারীর শেষ বয়েসের কিছু কাজের মধ্যে এক অদ্ভুত মিল দেখতে পাইI 

মাতিসের কথায় আসি। জীবনের শেষের দিকে মাতিস শারীরিক অসুস্থতার কারণে হুইলচেয়ার-বন্দী হয়ে পড়েন, এবং ক্যানভাসে কাজ করার মতো প্রয়োজনীয় ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। তখন তিনি তুলি-ক্যানভাস ছেড়ে সাদা কাগজ, গুয়াশে রং এবং কাঁচিকেই নিজের শিল্পের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন। এই সামান্য কিছু জিনিস দিয়েই শুরু হয় নতুন ধরনের এক অদ্ভুত শিল্পচর্চা যা তখনো পশ্চিমী শিল্পে বহুদূরের ভাবনা! সাদা কাগজকে নানা রঙে রাঙিয়ে, সেখান থেকে নানা আকৃতি কেটে নিয়ে সাজিয়ে তৈরি হয় ছবি। মাতিস রং করা কাগজগুলি থেকে ঠিক একটি বাচ্চার মতোই কেটে নিতেন নিজের পছন্দের নকশা, এবং তাঁর সহকারীরা সেই নকশা স্টুডিওর দেওয়ালে সাজিয়ে দিত। ঠিক যেন একটি শিশু যে সব কথা তখনো শেখেনি, অথচ কথা বলার অদম্য ইচ্ছায় অন্যের থেকে এটা কী, ওটা কী জেনে নিয়ে তার মন মতো তার স্বপ্ন সাজিয়ে নিচ্ছে। এ যেন নিজেকে প্রকাশের এক নতুন ক্ষমতা, যা প্রথাগত শিল্পের গণ্ডীর বাইরের এক অনুশীলন। এ যেন এক নতুন মাতিস আমাদের চোখের সামনে ধরা পড়ছে। 

অন্যদিকে বিনোদবিহারী। ১৯৬৭ সালের কথা। অপারেশন-এর জটিলতার কারণে দৃষ্টি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাওয়ার ফলে বিনোদবিহারী অত্যন্ত ভেঙে পড়েন। বিনোদবিহারীর সমসাময়িক শিল্পী দিনকর কৌশিক-এর স্ত্রী পুষ্প নিজেও একজন শিল্পী ছিলেন। সেই সময় বিনোদবিহারীকে পেপার-কাট করতে উদ্বুদ্ধ করেন পুষ্প, এবং নিজের হাতে সবরকমের সাহায্য করেন। পরে, বিনোদবিহারী পুষ্পকে কাজগুলি ভালোবেসে উপহার দেন। এই কাজগুলিতেও এক অবাধ শিশুর উচ্ছ্বাস ধরা পড়ে। 

দুজনেই শেষ বয়েসে শারীরিক অক্ষমতার কবলে পড়েন এবং তার প্রভাব পড়ে তাঁদের শিল্পে।  দুজনেই তাঁদের নিজস্ব ধারা থেকে সরে গিয়ে নতুন নতুন ধারার খোঁজ করতে থাকেন। দুজনেই এক নতুন মাধ্যম অনুসরণ করেন – শুরু করেন কাগজ কেটে কোলাজের কাজ। এই কাজগুলোর যে অদ্ভুত অপ্রত্যাশিত সৌন্দর্য, তার সম্মোহন উপেক্ষা করে যুক্তিসহ বিশ্লেষণ করার সাধ্য আমার নেই। তবুও কাজগুলি দেখে ছোটদের কথা মনে পড়া ছাড়া উপায় দেখিনা। 

বার্ধক্যপীড়িত, অসুস্থ দুই শিল্পীর এই কাজগুলিতে যেন তাদের শৈশবকালের হাজারো অনুভূতি ফিরে এসেছে। বা ভেবে নেওয়া যায়, তারা আবার শিশু হয়ে গেছেন। পরিপক্ক শৈল্পিক হাতের তুলির টান নেই, কঠিন প্রশিক্ষিত প্রকাশ কৌশলের চাপ নেই, রয়েছে মৌলিক সৌন্দর্যবোধের প্রবল বিস্তার এবং শিশুসুলভ অকৃত্রিম আনন্দের প্রতিচ্ছায়া। এই কাজগুলির সাথে শিশুসুলভ মন এবং ছোটদের বিভিন্ন কাজের এতটাই সাদৃশ্য রয়েছে যে দেখে অবাক হতে হয়। কাজগুলো দেখলে নিজের ভাইপো ভাইঝি পাশের বাড়ির ন্যাওটা বাচ্চা – এদের ছবির কথা মনে পড়তে বাধ্য।

বড় বড় শিল্পীদের ছোট হয়ে যেতে দেখে তবে কি আমরা ছোটদের শিল্পকে উৎসাহ দেবোনা? গুরুত্ব দিয়ে দেখবো না? আসলে, উত্তরটা উলটো। মাতিস আর বিনোদবিহারী ছোটদের যে জগত খুঁজতে বেরিয়েছিলেন, সেই জগতের সবচেয়ে বড় হকদার ছোটরাই। বড়দের সমাজের জটিলতা থেকে অনেক আলোকবর্ষ দূরের কোনো এক অনাবিষ্কৃত জগৎ আছে, যার চাবিকাঠি ছোটদের কাছে। তাতে বড়দের প্রবেশ নিষিদ্ধ। ছোট থেকে বড় হওয়ার সাথে সাথে বড়রা সেই পৃথিবীর চাবি ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে। ছোটবেলায় সেই জগৎ ছেড়ে একবার যে বাইরে পা দেয়, চিরকালের মতো তার আর সেই পথে ফেরত যাওয়ার উপায় থাকেনা। তখন কেবলমাত্র পুরনো কথা ভাবতে থাকা ছাড়া একজন বড়র কোনও উপায় থাকেনা। মাতিস আর বিনোদবিহারীর এই কাগজের কাজগুলো দেখলে ছোটদের সেই লুকানো জগতের খানিকটা খোঁজ পাওয়া যায়। তোমার কথা জানিনা, অন্তত আমার বেলায় তাই হয়েছে। 

আমার ছোটবেলার হারিয়ে যাওয়া জগতটার কাছে আমি একান্তই কৃতজ্ঞ। রোজ চেষ্টা করি সেই জগতটার চাবিকাঠি খুঁজে পাওয়ার। আসলে তোমাদের মতো অনেক ক্ষুদের মধ্যে আমার ছোটবেলার ঝলক দেখতে পাই আমি। ছোটবেলার অকৃত্রিম আনন্দ আমার কাজে আছে একথা বলার সাহস আমার নেই, কিন্তু, মাতিস আর বিনোদবিহারীর যে আনন্দের অভিজ্ঞতা হয়েছে, সেই আনন্দ হয়তো আমিও ছুঁতে পারবো এই ভেবে ঝপাঝপ আমি কোলাজ করতে শুরু করলাম। তাই আমি আমার এই চারটে কাজ আমার হারিয়ে যাওয়া “ছোট-আমি” কে উপহার দিলাম। আসলে, ক্ষুদে ক্ষুদে তোমাদেরকেই দিলাম। 

তোমাদের আমি বলতে চাই, প্রথমত, তোমরা অবশ্যই মাতিস আর বিনোদবিহারীর সব কাজ প্রাণভরে দেখো। শুধু এঁদের কাজ কেন, পৃথিবীর সব কিছু মন প্রাণ জুড়ে ভালো করে দেখে রেখো। দেখার যে অনুভূতি, সেই কিন্তু তোমাকে তোমার জগতের চাবিকাঠি পৌঁছে দেবে। আর অনেক অনেক বছর পরে যখন তোমরা বড় হবে, তখন এই দেখাগুলো তোমাদের কাছে আবার ছোটবেলার কথা নিয়ে ফিরে আসবে। যেমন আজকে আমার এই কাজগুলো কতবছর পর আমার ছেলেবেলা থেকে আবার আমার কাছেই ফেরত এলো। এরকম হতেই পারে, জীবন বিশাল মাপের এক কল্পবিজ্ঞানের গল্প।আজ তুমি যা যা মন ভ’রে দেখে রাখবে, সেসবকিছুই অনেক বছর বাদে টাইম-ট্রাভেল করে, অসংখ্য সময় পার করে তোমার বড়বেলায় তোমার কাছে নতুন ভাবে ফিরে আসবে। তোমার দেখার চোখই হবে তোমার চাবিকাঠি। তোমরাই হবে জীবন নামের এই দুর্ধর্ষ সিনেমার প্রধান নায়ক-নায়িকা। 

গল্প ১ - দুর্ধর্ষ সোনাই
গল্প ২ - মায়ের কোলে দুর্ধর্ষ সোনাই
গল্প ৩ - মায়ের সাথে বসে দুর্ধর্ষ সোনাই স্বপ্নলোক ঘুরছে
গল্প ৪ - মাতিস ও তার দুর্ধর্ষ দিদিমণি
শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *