ন্যায় বিচারের অপেক্ষায় তিলে তিলে মৃত কাঞ্চন ন্যানাওয়ার


রিমঝিম সিনহা

সোমা সেনের এই লেখাটি প্রথম ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয় দ্য লিফলেট-এ। মূল লেখাটি পড়া যাবে এখানে

সোমা সেন ভীমা কোরেগাঁও মামলায় বিচারাধীন ১৬ জন বন্দীদের মধ্যে একজন। যখন তাকে ৬ জুন ২০১৮-তে তার নাগপুরের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়, তখন তিনি নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের পদে ছিলেন।  অবসর গ্রহণের মাত্র দুই মাস বাকি ছিল তাঁর। তিনি নাগরিক অধিকার আন্দোলনের এক সুপরিচিত মুখ  এবং নারী অধিকার আন্দোলনের স্কলার ও কর্মী। তিনিও বেশ কিছু স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছেন এবং তিনি গ্লুকোমা, হাইপারটেনশন, ইরিটেবল বাওয়েল।

এই লেখাটিতে, সোমা ব্যাখ্যা করেছেন কিভাবে কাঞ্চন ন্যানাওয়ারের অস্ত্রোপচারের আগে, তার স্বামীর সাথে পরামর্শ বা সম্মতি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করা হয়নি, যদিও তিনি কাঞ্চনের সহ-অভিযুক্ত এবং একই ইয়ারওয়াড়া জেলের পুরুষ বিভাগে ছিলেন। সেই অস্ত্রোপচার শেষ পর্যন্ত মারনাত্মক হয়ে ওঠে। এই পর্যায় দাঁড়িয়ে, শুধুমাত্র বিচার বিভাগীয় তদন্তই নির্ধারণ করতে পারে যে তার চিকিৎসায় কোনো অবহেলা হয়েছিল কিনা। তবে একটি বিষয় জলের মতো পরিষ্কার: স্বামীকে না জানিয়ে, জেল কর্তৃপক্ষ আইন লঙ্ঘন করেছেন। বোম্বে হাইকোর্টে কাঞ্চনের স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত জামিনের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী গায়ত্রী সিং এবং অ্যাডভোকেট অঙ্কিত কুলকার্নি সহ, ট্রায়াল কোর্টে (পুনে স্পেশাল কোর্ট) অ্যাডভোকেট রোহান নাহার, রাহুল দেশমুখ এবং পার্থ শাহ আইনি লড়াই লড়েছিলেন।

যখন এলগার পরিষদ মামলাটি ব্যাপক এবং বিস্তারিত মিডিয়া কভারেজ পায় এবং এর ‘কাফকা’চিত অযৌক্তিকতায় হতবাক হয়ে যখন অনেকেই কলম ধরেন, সেই সময়ই পুনে কেন্দ্রীয় মহিলা জেলে একজন রাজনৈতিক বন্দী অসুস্থ হয়ে চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছিলেন। অবশেষে তিনি ফেব্রুয়ারির শুরুতে মারা যান।

কাঞ্চন কথা

কাঞ্চন ন্যানাওয়ারে ছিলেন অত্যন্ত সাহসী রাজনৈতিক কর্মীদের একজন।

আমি যখন ২০১৮ সালের জুন মাসে, নতুন ব্র্যান্ড নেম  “আরবান নকশাল” বা “শহুরে নকশাল” খেতাব নিয়ে পুনের ইয়ারওয়াড়া জেলে আসি, তখন অন্যান্য বন্দীদের থেকে জানতে পারি গত চার বছর ধরে কাঞ্চন নামে এক নকশাল আন্দোলনের কর্মী এখানে বন্দী রয়েছেন।

প্রথম দিকে তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের জন্য নির্ধারিত এলাকার একটি পৃথক সেলে অত্যন্ত কষ্টে দিন কাটাতেন । পরবর্তীকালে, জানলার বাইরে ডিডিটি স্প্রে হওয়ার ফলে তার তীব্র শ্বাসকষ্ট এবং কাশির সমস্যা শুরু হয়, যা তাকে দীর্ঘকাল হাসপাতালে ভর্তি থাকতে এবং ব্যারাকে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য করে। জেলের অন্যদের সাথে আস্তে আস্তে কথোপকথন শুরু করতেই কাঞ্চন হয়ে উঠেছিলেন সবচেয়ে জনপ্রিয় বন্দীদের মধ্যে একজন। নানান বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া থেকে শুরু করে আবেদনপত্র লেখার ক্ষেত্রে সহায়তা করা, তার দৈনন্দিন কাজের অংশ হয়ে গেছিল। জেলের কর্মী এবং অফিসাররাও তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠেছিলেন।

কাঞ্চনের সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিলো জলের কলের সামনে, জেলের বাইরে বা ভিতরে, নারীর পরিসর হিসেবেই যা দেখা হয়। এক রোগা, ছোটখাটো, ফর্সা মহিলা, চুল ছোট করে ছাঁটা, মুখে এক জোরালো, জিজ্ঞাসু অভিব্যক্তি। জেলার সাহেব আমাদের একে অপরের সাথে কথা বলতে নিষেধ করেছিলেন এবং সেই নিষেধ অবজ্ঞা করলে নানা রকম শাস্তিরও বিধান ছিল, তাই আমরা দুর্ভাগ্যবশত, কথোপকথনের খুবই ছোট কিছু মুহূর্তই চুরি করতে পেরেছিলাম।

কাঞ্চনের বয়স যখন ৭ বা ৮, তখন তার হৃদযন্ত্রে একটি ছিদ্র ধরা পড়েছিল। তবে, তা কখনই তাকে শিক্ষাবস্থায় থাকাকালীন এক রাজনৈতিক কর্মী হওয়ার থেকে বা মাওবাদীদের ভাষায় – এক পেশাদার বিপ্লবী  হওয়া থেকে আটকাতে পারেনি। কাঞ্চন মনা সম্প্রদায়ের ছিলেন, যারা আদিবাসী এবং গোয়ারীদের সঙ্গে তফসিলি উপজাতির শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য সংগ্রাম করে চলেছেন।

তাঁর বাবা সরকারি অফিসার হওয়ায় বল্লারশাহ আর চন্দ্রপুরে থাকাকালীন কাঞ্চন বেশ খানিকটা পড়াশোনা করতে পেরেছিলেন। টুকটাক ইংরেজিও বলতে পারতেন। শিক্ষার্থী জীবনেই আলাপ হয় রাজনৈতিক সহকর্মী অরুন ভেল্কের সঙ্গে। পরে তাকেই বিয়ে করেন। রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং লড়াইয়ের প্রতি প্রবল দায়বদ্ধতার পাশাপাশি, এই দম্পতির পরস্পরের প্রতি গভীর ভালোবাসাও কাঞ্চনকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল নিশ্চয়ই। 

কাঞ্চন আর অরুণকে পুনেতে সন্দেহভাজন মাওবাদী বা নকশাল হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে কিছু মিথ্যে পরিচয়পত্র ছাড়া আর কিছু উদ্ধার হয়নি। এর জন্য জালিয়াতির যে ধারাটি তাদের ওপর লাগু হয় তার সর্বোচ্চ শাস্তি চার বছর। বলা বাহুল্য, পরবর্তীতে ইউএপিএ এবং আইপিসির অধীনে অন্যান্য বিভিন্ন ধারা চাপিয়ে তাদের ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসবাদী আখ্যা দেওয়া হয় ।

তাঁরা সম্ভবত মিথ্যে পরিচয় নিয়ে বসবাস করছিলেন কারণ একটি পূর্ববর্তী মামলায় জামিনে ছাড়া পেয়ে তাঁরা পলাতক ছিলেন। এই মামলাটিতে চন্দ্রপুর ও আশেপাশের কিছু শিক্ষার্থী রাজনৈতিক কর্মীদের মাওবাদী বলে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা দেশভক্তি যুব মঞ্চ নামের এক জনপ্রিয় শিক্ষার্থী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যারা কৃষকদের আত্মহত্যার উপর পথনাটক করতেন, মারাঠি ভাষায় শিক্ষার্থীদের জন্য একটি পত্রিকা বের করতেন, এবং ন্যায্য অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার লড়াইয়ে শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করতেন।  যথেষ্ট সময় জেলে থাকার পর এই কর্মীরা যখন জামিন পান (যে সময়ে কাঞ্চনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল), তখন তাদের মধ্যে অনেকেই “স্বাভাবিক” জীবন যাপন করার চেষ্টা করেছিলেন: জীবিকা অর্জনের সংগ্রাম, পরিবারের সূচনা, এবং মা-বাবার আবেগগত চাহিদার মুল্য বোঝার সাথে সাথে রাজনৈতিক সক্রিয়তাকে ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা হয়ে উঠেছিল তাদের লক্ষ্য।

অসংখ্য রোগ এবং জটিলতা

কিন্তু কাঞ্চন, তাঁর ছিদৃত হৃদযন্ত্র ও অপারশনে ক্ষত বিক্ষত সাহসী বুক নিয়ে বেছে নেন এক অনিশ্চয়তার পথ, আত্মগোপন করেন পার্টনারের সঙ্গে।।

ইয়ারওয়াড়া কেন্দ্রীয় জেলে যখন কাঞ্চনের সাথে আমার দেখা হয়, ততদিনে তাঁর হার্টের দুবার অপারেশন হয়ে গিয়েছে। তিনি তখন ক্ষতিগ্রস্ত কিডনি, দুর্বল ফুসফুস এবং গুরুতর শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছেন। সারাদিনে তিনি নুন-মসলা ছাড়া খাবার এবং শুধুমাত্র দু বোতল জল খেতে পারতেন।

প্রথম দিকে, তাঁকে নির্জন কারাবাসে রাখা হয়েছিল মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামীর সাথে, যারা তাঁকে মানসিকভাবে নির্যাতন করত। কিছু ঘন্টা পর পর, তাদের এক এক করে সেল থেকে খানিকক্ষণের জন্য মুক্তি দেওয়া হতো যাতে তারা এক তালাবন্দী বারান্দায় একা বসে সময় কাটাতে পারেন। তারপর যদিও ব্যারাক জীবন খানিক আরামদায়ক হয় এবং মুলাকাত -এর অনুমতি মেলে, কাঞ্চনের সাথে বিশেষ কেউ কখনই দেখা করতে আসেনি।

দলিত সম্প্রদায়ের অরুণকে বিয়ে করায় তাঁর বাবা তাঁর অস্তিত্ব অস্বীকার করা শুরু করেন। ওদের প্রতি কাঞ্চনের বাবার বিরূপ মনোভাব আরও জোরালো  হয়ে ওঠে যখন মিডিয়া তাদের নকশাল বলে দাগিয়ে দেয়। তিনি তাঁর সমগ্র পরিবারের উপর চাপ সৃষ্টি করে কাঞ্চনকে একঘরে করে দেন কিন্তু তাঁর বাপেরবাড়ির দিককার শীতলতাকে পুষিয়ে দিয়েছিল তাঁর শ্বশুরবাড়ির উষ্ণ ভালবাসা । অরুণের পরিবারের সদস্যরা মাঝে মাঝেই বল্লারশাহ এবং পুনের মধ্যেকার দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করে দেখা করতে আসতেন। ইউএপিএ ধারায় কারাবন্দী ছিলেন বলে কাঞ্চনকে ফোনে কথা বলার অনুমতি দেওয়া হয়নি,  অন্য বন্দীদের অবশ্য পে-ফোন ব্যবহার করার সুবিধা ছিল।

দুঃসাহসী সঙ্কল্প

জেলের ছোট গ্রন্থাগারের এবং তার আইনজীবীদের এনে দেওয়া সমস্ত বই খুঁটিয়ে পড়তেন কাঞ্চন। তিনি দাবা খেলতেন, একটি সার্টিফিকেট কোর্সের জন্য পরীক্ষা দিয়েছিলেন, ৮ মার্চ অনুষ্ঠিত একটি পথনাটিকায় অংশ নিয়েছিলেন এবং বার বার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও  জেল জীবনে টিকে ছিলেন। প্রায়শই আমরা তাঁকে তাঁর ব্যারাকের বাইরে বিশাল গাছের নিচে বসে খবরের কাগজ পড়তে দেখতাম। কিন্তু আস্তে আস্তে তার শরীর খারাপ হতে  শুরু করলো। প্রথমে পা দুটো, তারপর পুরো শরীর ফুলে যেতে থাকলো। হাঁটা চলা, শুয়ে থাকা, এমনকি ঘুমোতেও অসুবিধা হত তাঁর। যখন ডাক্তাররা তাকে বালিশের স্তুপের সাহায্যে হেলান দিয়ে শুয়ে ঘুমোনোর নির্দেশ দেন, তখন তিনি জেল সুপারিনটেনডেন্ট ইউ. টি. পাওয়ার-এর থেকে বালিশ ব্যবহার করার অনুমতি চান। এর কিছুদিন পরেই, জেলের কারখানায় বালিশ তৈরি করা হয় এবং কাঞ্চনের অনুরোধে সমস্ত বন্দীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।

আমরা মুম্বইতে স্থানান্তরিত হওয়ার আগে, কাঞ্চনকে আমাদের আলাদা ইয়ার্ডের কাছে ছোট্ট ব্যারাক হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল। তাঁকে একটি বিছানা দেওয়া হয় ও তাঁর দেখভালের জন্য লোক নিয়োগ করা হয়। ততদিনে ডাক্তাররা তাঁকে বলে দিয়েছিলেন হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই, কিন্তু পুণের সাসুন হাসপাতালে এই অপারেশন করা সম্ভব ছিল না।

জেল জীবন, জামিন বিহীন

এর কিছুদিন আগে, পুণের বিশেষ আদালতে তাঁর জামিনের আবেদন করা হয়েছিল, সেই আবেদন খারিজ হয়। তাঁর বিচার প্রক্রিয়া চলছিল শামুকের গতিতে। এই সময়ে দীর্ঘদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকাকালীন, তাঁর সঙ্গী অরুণকে (যিনি ইয়ারওয়াড়া জেলে বন্দী ছিলেন) মাত্র একবার তাঁর সাথে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তাঁর শ্বশুরবাড়ির পরিজনরাও এসেছিলেন। নিজের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে, কাঞ্চন আমাদের বলেছিলেন, তিনি তাঁর বাবা-মাকে চিঠি পাঠিয়েছেন। লিখেছেন  যদি তারা তাঁর সাথে শেষবারের মতন দেখা করতে চান তবে যেন এখনই চলে আসেন। সেই চিঠির কোনো উত্তর আসেনি। আমরা কাঞ্চনকে এই করুণ অবস্থায় রেখে বাইকুল্লা জেলে চলে এলাম। তারপর করোনার মহামারী তার আঘাত হানলো এবং দীর্ঘদিন আমরা কাঞ্চনের কোন খবর পেলাম না।

একদিন কাগজে পড়লাম যে কাঞ্চনের জামিন নিয়ে বোম্বে হাইকোর্টে বিচার চলছে। তাঁর সঙ্কটজনক অবস্থার কারণে অবিলম্বে জামিন দেওয়ার পরিবর্তে, আদালতের তরফে জানতে চাওয়া হয়  কিভাবে তাঁর হৃদয় এবং ফুসফুস প্রতিস্থাপন করার প্রক্রিয়া শুরু করা যায়। হাইকোর্টে দীর্ঘ শুনানির পরও হৃদযন্ত্র ও ফুসফুস প্রতিস্থাপনের জন্য তাঁকে  পুণের সেনা হাসপাতালে পাঠানো হবে নাকি অন্য কোথাও – এই নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি।

আমরা পরে জানতে পারি যে এই বছরের ১২ জানুয়ারি কাঞ্চন ভয়ানক মাথাব্যথা ও শ্বাসকষ্টের অভিযোগ জানান। তাঁকে সাসুন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে তাঁর মস্তিষ্কে একটি লাম্প পাওয়া যায়। অরুণকে এই বিষয়ে জানানো হয়েছিল পাঁচ দিন পর, ১৯ জানুয়ারি। ১৯ এবং ২০ তারিখ, দুদিনই অরুণকে কাঞ্চনের সাথে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল। কিন্তু অরুণের সম্মতি ও সই ছাড়াই এবং তাঁকে তাঁর স্ত্রীর সাথে দেখা করার অনুমতি না দিয়েই, কাঞ্চনের মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচার করা হয়। ফলস্বরূপ, সাসুন হাসপাতালের আইসিইউতে মারা যান কাঞ্চন। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে।

কাঞ্চনের জামিন না পাওয়ার কারণ কী হতে পারে? এক শীর্ণ আদিবাসী মহিলা, যার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত ও জীর্ণ, তাঁকে যদি মুক্তি দেওয়া হতো তাহলে দেশের কি এমন ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল? রাষ্ট্র কেন এতটা সন্ত্রস্ত? কেন বারবার জামিন খারিজ করা হয়েছে জি. এন. সাইবাবার, যিনি ৯০% প্রতিবন্ধী এবং এছাড়াও যার আরও ১৯ ধরনের অসুস্থতা রয়েছে?

বন্দী থাকা মাওবাদী আসামীদের কথা তো দূরের ব্যাপার, আমি দেখেছি মেডিকেল কারণে জামিন পাওয়া, বিচারাধীন অন্যান্য বন্দীদের জন্যও কতটা কঠিন।

এনডিপিএস-এর ধারায় অভিযুক্ত একজন এক বছর ধরে গুরুতর স্ত্রীরোগ সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছিলেন। শেষ পর্যন্ত তার হিস্টেরেক্টমি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু জামিন দেওয়া হয়নি। আরেকজন বন্দীর মাঝে মাঝেই ফিট হত এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা আধাচেতন অবস্থায় এমনভাবে পড়ে থাকতেন যেন সেটি তার স্বাভাবিক ঘুমনোর এবং জেগে ওঠার ধরন – এই কারণে জেল থেকে তাকে নিয়মিত ওষুধ দেওয়া হয়েছে, তবু জামিন দেয়নি।

মহামারী চলাকালীন খুনের অভিযোগে অভিযুক্তদের অনেকেই যখন সহজেই অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পেয়েছিলেন, এই গুরুতর রোগে আক্রান্ত রোগীরা পরিত্রাণ পাননি, যেমন মুক্তি পাননি টিবি, এইচআইভি বা অন্যান্য কোমর্বিডিটিতে আক্রান্ত রোগীরা। গারদের ভিতরে থাকা বন্দীদের চোখে জামিন সম্পূর্ণভাবে জুয়া বা লটারির মতন। বিচারকদের বিষয়ভিত্তিকতা, বিভ্রান্তিকর তদন্ত প্রক্রিয়া, জট পাকানো চার্জশিট, টেবিলের নিচ দিয়ে দেওয়া বা না দেওয়া টাকা, এই সবই উপরুক্ত জুয়াতে বন্দীদের “ভাগ্য” নির্ধারণ করে। পরিবারের নিকটতম সদস্যরা মারা গেলেও বন্দীদের জানানো হয় না, বলা হয় “যদি তারা এতে কষ্ট পান”। আদালতের আদেশ ছাড়া, তাদের শেষকৃত্যের জন্যে (পুলিশের হেফাজতে) নিয়ে যাওয়া যায় না। তারা গারদের ভিতরে শেকল বাধা অবস্থায় ভাবতে থাকেন তাদের প্রিয়জনদের যন্ত্রণার কথা,  বারবার তাদের কল্পনায় ভিড় করে  না শুনতে পাওয়া কিছু আর্তনাদের আওয়াজ।

এক নিষ্ঠুর, অমানবিক বিচার ব্যবস্থা শুধু বসে বসে নিজের ক্ষমতার অপপ্রয়োগের পরিধি মাপে এবং সেই নিয়ে হাসি ঠাট্টায় মেতে থাকে।

Similar Posts:

    None Found

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *