কর্ণাটক হিজাব বিতর্ক: সাংবিধানিক অধিকারের ওপর শাসক গোষ্ঠীর আক্রমণ

স্বামীর মৃত্যুর পর ৬০ বছর বয়সে আমার দাদি প্রথম হিজাব পরতে শুরু করেন। তার আগে পর্যন্ত দাদার আধুনিক মুসলিম পরিবার হয়ে ওঠার বাসনার সাথে তাল মেলাতে, খানিক বাধ্য হয়েই দাদি শাড়ি পরতেন। কিন্তু দাদার মৃত্যুর পর দাদি আমাদের জানালেন যে তিনি এবার থেকে হিজাব পরবেন, এমনটাই তার ইচ্ছা। হিজাব পরা ‘আধুনিক’ নয়, এমনটা বলবার জন্য দাদা আর বেঁচে নেই। অন্যদিকে হিজাবের মাধ্যমে দাদি হয়তো বাবরি মসজিদ পরবর্তী ভারতবর্ষে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া তার ধর্মীয় পরিচয় পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করছিলেন, দৃশ্যমান হয়ে ওঠার চেষ্টা করছিলেন একজন মুসলমান হিসেবে। হয়তো বা তিনি নিজের দিন ধীর পায়ে শেষ হয়ে আসছে এই উপলব্ধিতে পৌঁছেই, নিজের যা ঠিক মনে হয় তা করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আমি তখন সবেমাত্র ১৩, খুব স্বাভাবিকভাবেই দাদির এই সিদ্ধান্ত আমায় চমকে দিয়েছিল। আমার দাদি তার স্বতন্ত্র ইচ্ছার জায়গা থেকে হিজাবকে বেছে নিচ্ছেন। আর সেই বয়সে আমার এটুকু বুদ্ধি হয়েছিল যে নিজের পছন্দ অপছন্দ স্পষ্টভাবে বলতে পারা, করতে পারার মধ্যেই নারীবাদের মূল বক্তব্য নিহিত রয়েছে। কিন্তু তার মানে কী আমার দাদা প্রগতিশীল মানুষ ছিলেন না? আমি ভুল ছিলাম তার বিষয়ে? এই প্রশ্ন আমাকে ভাবিয়েছে। ২০ বছর বয়সে এসে এই প্রশ্নের উত্তরটা মেনে নিতে পেরেছি। আরও অনেক বছর লেগেছে এটা বুঝতে যে আমার দাদা এবং তার মত ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তের, বিভিন্ন বর্ণের মুসলিমদের কাছে যা আধুনিকতার সংজ্ঞা হয়ে উঠেছিল তা আসলে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গী।

আজ কর্ণাটকে যা চলছে তা গোটা বিশ্বজুড়ে চলা ইসলামোফোবিয়ার নিম্নমানের প্রতিফলন মাত্র।

ভারতবর্ষ এমন একটা দেশ যা সব সময় ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংজ্ঞায়িত করে এসেছে ইতিবাচক দিক দিয়ে, যেমন সমস্ত ধর্ম আইনের সামনে সমান। নেতিবাচক ধর্মনিরপেক্ষতাকে নয়, যা ধর্মের ভিত্তিতে পৃথক দেশের দাবি করে। এই ইতিবাচক অবস্থান থেকেই ভারতীয় সংবিধান ব্যক্তির ধর্মাচারণের অধিকার এবং বিশ্বাসকে মান্যতা দেয়। হিজাব পড়লে কী এদেশে এক মুসলিম মেয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের অধিকার হারিয়ে ফেলে? একদমই নয়। কর্ণাটকের এক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বলেছেন মেয়েদের স্বেচ্ছায় হিজাব পরা তালিবানি মানসিকতার লক্ষণ। কিন্তু মজার বিষয় হল কর্ণাটক এখন সেই রাজ্য হয়ে উঠেছে, যেখানে তালিবানি রাজত্বের মত মেয়েদের শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। শিক্ষা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে এই মেরুকরণ কীকরে হোল? এর পরবর্তী আক্রমণ কীসের বা কাদের উপর নামবে? একজন হিজাব পরিহিতা শিক্ষক? এদেশে প্রত্যেক ব্যক্তির নিজের পছন্দমত পোশাক পরার স্বাধীনতা আছে। সে পছন্দের পিছনের কারণ যাই হয়ে থাক, কারো কাছে তার ধর্মীয় বিশ্বাস, কারো কাছে তার স্বাচ্ছন্দ্য বা অন্য যে কোন কারণ। নিজের পছন্দের পোশাক পরার অধিকার তার পরিবার হোক বা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানই তার থেকে সেই অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। যখন কোন শিক্ষার্থী তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চুড়িদার, পাগড়ি, ফ্রক, সন্নাসীর বেশে কিংবা তাবিজ, কবজ, মাদুলি পরে যায়- তখন সে ধর্মনিরপেক্ষ দেশের নাগরিক হিসেবে তার ধর্মীয় বিশ্বাস ধারণ করবার অধিকার প্রয়োগ করে। কিন্তু তাহলে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের থেকে তার ধর্মীয় চিহ্ন মুছে ফেলার প্রত্যাশা করা হবে?

বিজেপি নেতারাই এই বিতর্ক থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন যারা মুখে ‘অভিন্নতা’র বুলি আওড়ায় এবং সঙ্গে সেই সব অধ্যক্ষরা যারা এই বিতর্কের ফলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাবকে হেলায় উড়িয়ে দেন। ‘অভিন্নতা’ নিয়ে এই আলোচনা আদতে বিভ্রান্তি তৈরি করবার চেষ্টা। রাষ্ট্রীয় নীতি হিসাবে দেশের বিভিন্নপ্রান্তের প্রতিষ্ঠানগুলিতে ‘অভিন্নতার’ নামে জাতিবিদ্বেষের বিষ মিশিয়ে দেবার চেষ্টা। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ভজন গাওয়া হয় না? স্তোত্র পাঠ করা হয় না? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার ল্যাবে, বাসে, বিজ্ঞানের পরীক্ষাগারে কী যন্ত্রপাতির দেবতা আয়ুধা বা বিশ্বকর্মাকে পুজো করা হয় না? কিন্তু মুসলমানদের জন্য নিয়ম আলাদা। সামাজিক নিয়ম এবং আইনের চোখে বিভিন্ন নাগরিকদের ভিন্নভাবে দেখা জাতিবিদ্বেষের চরিত্র। বিজেপির বিধায়ক, কলেজের প্রিন্সিপাল, স্থানীয় সঙ্ঘীদের এবং লিবেরালদের ব্যক্তিগত মতামত, সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত ধর্মীয় বিশ্বাস এবং শিক্ষার অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ের সম্পূর্ণ বিপরীত এবং অপ্রাসঙ্গিক।   

মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ যে তারা আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে শতহস্ত দূরে থাকে। এই অভিযোগ আসলে দীর্ঘদিন ধরে জাতি বিদ্বেষের শিকার হয়ে আসা মুসলিম সম্প্রদায়ের বঞ্চনার ইতিহাস কে অস্বীকার করা, যা তাদের শিক্ষার আলো থেকে দূরে থাকতে বাধ্য করেছে। আজকের সময় দাঁড়িয়ে এই অভিযোগ একেবারেই ভিত্তিহীন। অল ইন্ডিয়া সার্ভে অন হায়ার এডুকেশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী উচ্চশিক্ষার মুসলিমদের নথিভুক্তিকরণের বৃদ্ধির হার ২০১০ সালে ২.৫৩ শতাংশ থেকে ২০১৯-২০ তে ৫.৪৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। তাহলে ভারত রাষ্ট্র কেনো সংবিধান লঙ্ঘন করে মুসলিমদের উপর এই আক্রমণ নামাচ্ছে, যেখানে মুসলিম সম্প্রদায়কে মূলস্রোতে নিয়ে আসার জন্য আরও বেশি করে ইতিবাচক পদক্ষেপ করা প্রয়োজন।   

এই বিজেপি সরকার ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে একটু বেশিই নড়বড়ে। ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলি যা জন পরিসর এবং জন সম্পদ ব্যবহার করে, ব্যক্তি স্বাধীনতার কথা বলে, এবং সরকারের নীতি এবং পদক্ষেপ নিয়ে দ্বিমত পোষণ করে- এসবে এই সরকার ঘাবড়ে যায়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন এবং  অন্ধের মত অনুসরণকারী হিংস্র উন্মত্ত জনতা এবং এই ভয়ঙ্কর নড়বড়ে  অবস্থান- রাস্তাঘাটে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, মাঠে ময়দানে, মননে যত্রতত্র আক্রমণের আকার ধারণ করে। উদুপির এই ছাত্রীটি কিংবা সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদানকারী মুসলিম মানুষজন, গরুর মাংসের ব্যবসার সাথে জড়িত মানুষজন থেকে বিদারে নাটক মঞ্চস্থ করতে উদ্যোগী শিক্ষার্থীরা, কিংবা মিথ্যা অভিযোগে  কৌতুক অভিনেতার হেনস্থা- বা ক্রিকেটারের খারাপ পারফর্মেন্স- নিঃসন্দেহে এই আক্রমণের শিকার সবচেয়ে বেশি হচ্ছে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষেরা। তবে তালিকা আরও দীর্ঘ- শিখ কৃষক, খ্রীস্টান ধর্মগুরু, গবেষক, সাংবাদিক, উকিল, কৌতুক অভিনেতা, শিল্পী বাদ যাচ্ছে না কেউই।

দীর্ঘ সময় ধরেই প্রান্তিকায়িত এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ধরনের আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা, সমাজের বৃহদাংশ থেকে কোন সহায়তা ছাড়াই। প্রতিবাদ করা তাদের একার দায় নয়। ময়দানে নেমে যারা লড়াইটা লড়ছে তারা প্রতিবাদ করতে করতে ক্লান্ত এবং বিধ্বস্ত, লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের সাহায্য এবং সমর্থন প্রয়োজন। আপনারা যারা উচ্চবর্ণ উচ্চবিত্ত হিন্দু, নিজের বাড়িতে স্বাচ্ছন্দ্যে বসে এ লেখা পড়ছেন এবং বহুত্বের নীতিতে বিশ্বাস করেন- যেই নীতির উপর ভিত্তি করে এই দেশ তৈরি হয়েছে, আপনাদের সাধ্যমত এই প্রতিবাদ প্রতিরোধে অংশ নিন। আপনার বিচরণের ক্ষেত্রগুলিতে পদক্ষেপ নিন, সাম্প্রদায়িক হিংসা যারা ছড়াচ্ছে তাদের মুখোমুখি হন- তিনি আপনার পরিবারের সদস্যই হোক বা আপনার প্রতিষ্ঠানের কেউ। জনপ্রতিনিধিকে চিঠি লিখুন, জন পরিসরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করুন, ব্যক্তিগত সম্পর্কে কিংবা জায়গায় ভিন্নতাকে স্বাগত জানান, ধর্মীয় বিশ্বাসের- জাতপাতের গন্ডী ভেঙ্গে বেরোন। ইতস্তত করবার সময় শেষ হয়ে গেছে অনেকদিন, সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক গোষ্ঠীর মানুষ যারা ইতিমধ্যেই অত্যাধিক পরিমাণে নিপীড়নের শিকার তাদের জীবন-পুঁজি-সম্মান সবকিছুই অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিকে উপেক্ষা করবার মত বিলাসিতা আর আপনাকে সাজে না।
ভাষান্তর: তৃষ্ণিকা ভৌমিক।

প্রবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় The News Minute পত্রিকায়। মূল প্রবন্ধটি পড়া যাবে এখানে

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published.