কলকাতায় ২০১৪

একটা ঘর। ঠিক করে বললে তিন নম্বর ঘর। সবুজ দরজা। একটা মরচে-পড়া তালা ঝুলছে। চৌকাঠের দুই পাশে ছোট ছোট গুঁড়োকাঠের ঢিপি। ঘুণপোকায় খেয়ে ফেলে রেখেছে। পোস্ত কিংবা সুজির মতন। কিংবা বালি। ভিজা পায়ে লেগে গেলে সেঁটে যায়। তখন পাপোষে ডলে-ডলে তুলতে হয় নয়তো অস্বস্তি করে। ঘরের ভেতর একটা নির্বিষ সাপ নেতিয়ে পড়ে থাকে এককোণে। সারি সারি বয়াম ঝুল-জমা তাকের উপর সাজানো। ছোট ছোট ধূসর ফিনফিনে মাকড়শারা ছাদ থেকে মেঝে পর্যন্ত ট্রাপিজের খেলা দেখায়, কেউ দেখে না। জানলার পাল্লার ফাঁক দিয়ে অকর্মণ্য হলদে আলো তাদের বুকে জমে তারপর ধীরেধীরে তারা আলোর তাপটুকু শুষে নেয়। ঘরটা খোলা হয় না বহুদিন হল। একসময়ে নাকি খোলা হত।  

রাতের বেলা প্রতিদিনের মত লীলা বাইরের বারান্দায় আওয়াজ পায়। পা টিপে টিপে টিপে উঠতে গিয়ে টুলের উপর রাখা আধ-খাওয়া জলের গেলাসটা উল্টে খানিক ভিজিয়ে ফেলে পাজামাটা যথারীতি। বারান্দায় বেরিয়ে আলোটা যেই জ্বালতে যাবে, দেখে তিন নম্বর ঘরের দরজাটা সামান্য খোলা। প্রথমে একটু উঁকি মারে তারপর সামান্য ইতস্তত করে ভেতরে ঢুকে পড়ে সে। ধোঁয়ার মৃদু গন্ধ ঢোকে নাকে। অথচ আগুন নেই কোত্থাও। গন্ধটা চেনা-চেনা। ঘরটাও। ঘর তো না, জায়গা। একটা বড়রাস্তার মোড়। তাকে এক্ষুণি একটা ওষুধ কিনতে হবে। তলপেটে মোচড় মেরে ব্যথা করছে। সারি সারি গাড়ি হু-হু করে বেরিয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে দিয়ে। অনেকগুলো দোকানই ঘোরা হয়ে গেছে। ওষুধটা না নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে না সে কোনওমতেই। তার নিজের জন্য না। কিটোজুতোর মধ্যে কাদাজল ঢুকে হাফ শুকিয়েছে। পায়ের তলায় গুঁড়ো-গুঁড়ো চটচটে। অসম্ভব বিরক্তিতে সে প্যান্টের পেছনে গোড়ালিটা ঘষে নেয়। গাড়িগুলো থামার নাম নেই। সিগনাল পড়ছে না কেন আজ কে জানে। পনেরো মিনিটের উপর সে দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু কিছুতেই পার হতে পারছে না। তার উপর বৃষ্টি শুরু হল আবার টিপটিপ করে। মাথার তালুতে পড়ছে নারকেল তেলের মত চ্যাটচ্যাটে গন্ধযুক্ত জল। সে তেল মাখে না। কাউকে একটা ফোন করবে বলে একটা ঝোলাব্যাগের ভেতর সে হাতড়াতে থাকে। একজন একবার বলেছিল টাইট করে বাঁধা চুলে জল পড়লে টাক দেখা যায়, তখন তাকে দেখতে অখাদ্য লাগে। সেই তাকেই একটা ফোন করা যাক। বেড়াতে গেছে সে এবং তার বন্ধুরা, কাউকেই  ডাকাডাকি করে লাভ নেই। তাও গলা শুনিয়ে খানিক ফালতু অভিমান দেখানো আর কী। ব্যাগের ভেতর থেকে কিছুতেই ফোনটা বেরোচ্ছে না। একটা লিফলেট, একটা ভাঙা সিগারেট, একটা যত্ন করে জমিয়ে রাখা নাটকের শোয়ের টিকিট, ভিজে ধেবড়ে সব তালগোল পাকিয়ে একাকার। একসাথে গোল্লা পাকিয়ে সে ছুঁড়ে ফেলে রাস্তার দিকে। যদি এটা একটা বোম হত। দু’মিনিটে দাঁড়িয়ে যেত সব গাড়ি আর সেও রাস্তাটা পার হয়ে যেত। তাকে কেউ সন্দেহই করত না, তার মুখটাই এরকম। আধঘন্টা হয়ে গেছে। গাড়ির ঢল থামছে না। রাত বাড়ছে। গা-বমি-বমি করছে নাকি মাথা ঘুরছে সে বুঝতে পারে না। পাগলের মত ব্যাগ হাতড়াতে থাকে ফোনটার জন্য। পুরোনো র‍্যান্টাকের রাংতায় আঙুল কেটে যায়। বার করে মুখে পুরে নেয় সে। তার কাউকে ফোন করার নেই। ধোঁয়ার গন্ধে নাক জ্বলে যেতে থাকে। এত গাড়ি শালা। গাড়ি নাকি উনুন। এত্ত ধোঁয়া। নাকি অন্যকিছু। কাউকে চেনো না তুমি তোমাকে চেনে না কেউ… বাকিটুকু মনে পড়ছে না। এর আগে জানি কী ছিল? এর পরে? এটাই বরং ফোন করে জিজ্ঞেস করা যাক। কিন্তু কাকে? ফোনের কললিস্টে খালি কাস্টমার সার্ভিসের নম্বর। সেখানেই বরং ফোন করা যাক। একটু মদের খোঁজ পেলে বেশ হয়। এমন আবগারি ওয়েদার। তাছাড়া মদ খেলে বেশ নির্লজ্জের মত হাউহাউ করে কাঁদা যায়। কেউ জিজ্ঞাসাও করে না কিছু। সবাই জানে মদ খেয়েছে তো তাই। কেউ প্রশ্নটশ্ন না করে ঘুমিয়ে পড়তে বলে। আর সঙ্গে পুরুষমানুষ থাকলে তো পোয়াবারো। না না অন্যের পুরুষমানুষের সাথে সে শোয় না। ওইসব ল্যাঠা নেই যাদের। খুব ভয় করে যদিও। খালি মনে হয় যদি মাঝপথে হ্যাঁ না বলার আগেই উত্তেজনায় গলা টিপে ধরে? যদি চড় মারতে চায় গায়ে লাল লাল দাগড়া দেখতে ভাল লাগে বলে? যদি নখ বসিয়ে দেয়? যদি পরেরদিন উঠে দ্বিতীয় সুযোগ না পেয়ে সবাইকে বলে দেয়? এমনিতে তো তার মুখ দেখে কেউ এসব সন্দেহ করে না, তার মুখটাই এরকম। সে একবার মদ খেয়ে এমন উথালপাথাল ডুকরেছিল, তাকে বাড়ি থেকে মাঝরাতে বার করে দিয়েছিল একজন একটা ট্যাক্সি করে। তার সঙ্গে শোয়াটা আর হয়নি। বাড়ি ফিরে সে খাটের উপর শুয়ে দেখেছিল পাশে হসপিটালের স্যালাইন দেওয়ার স্ট্যান্ড রাখা। চেক-চেক চাদর, চেক-চেক বালিশ। সে ডগি পোজিশানে বসে র‍্যাবিস-আক্রান্ত কুত্তীর মত মুখের থেকে অ্যাসিড-লাল ফেলে ফেলে দু’ঘন্টায় বালিশ চাদরের সমস্ত চেকদাগগুলো উবিয়ে ধবধবে সাদা করে ফেলে। তারপর কী-একটা সন্দেহে চাদরটা তুলে দেখে তলায় সারি সারি স্তুপাকৃতি গাছের ডাল। চিতাকাঠের গন্ধে নাকি বন্ধ করতে ভুলে যাওয়া গ্যাস নাকি ঝুম কাল্টিভেশনের গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসে আর সে গড়িয়ে পড়ে যায়। তলায় তার চামড়ার মত মাটি, শুকনো অমসৃণ ডেলা ডেলা ঢিপি ঢিপি অল্প অল্প খাপছাড়া ঘাস। “বাঁকানো সিঁড়ির পথ সেখানে নেমে আসে চাঁদের আলো / কাউকে চেনো না তুমি তোমাকে চেনে না কেউ সেই তো ভালো”।  মনে পড়ে যায় তার। বাঁকানো সিঁড়ির ধারে রজনীগন্ধার স্টিকের উপর চাঁদের আলো, সাদা চাদর মুড়ি দিয়ে আদ্যিকালের পেত্নী ঘুম পাড়ানিয়া গানের সুরে ‘আয় আয়’ বলে ডাকছে, তার মুখে শ্বেতীর নাকি আগুনে পুড়ে যাওয়া ছোপ-ছোপ, তার চোখ দুটো বপ্পীর মতন। সে বোধহয় ময়দানের মাঠে শুয়ে আছে। মহীনের কটা ঘোড়া রে বাবা। তার হাসি পায়। ঘোড়ার খুরের জঙ্গল তার চারদিকে। ঘোড়াগুলোর মুখগুলো অতিরিক্ত লম্বাটে, গালগুলো যেন কেউ নির্মম ভাবে টিনের ক্যান চেপার মত চিপে চিপে তুবড়ে দিয়েছে। তাদের চোখ চাঁদের মত সাদা ও গোল, মাঝে মণির বদলে কলঙ্কের অন্ধ ছোপ-ছোপ। কিংবা ধূসর পাতলা ফিনফিনে সব মাকড়সা চোখের মধ্যে বাসা বেঁধেছে। মাথার কেশরগুলি মাকড়শার জালের মতন। একটা নির্বিষ সাপ, আয়তনে একটা বড়রাস্তার মত। গায়ে চাকা-চাকা গাড়িমার্কা ছোপ। তাকে আস্তে আস্তে পেঁচিয়ে ধরছে। জড়িয়ে ধরছে বলা ঠিক। প্রেমিকের সঙ্গমের মত ধীরে যত্নে একটু একটু করে পা থেকে মাথার দিকে এগোচ্ছে, ক্যান্সারের মত একটু একটু করে শীত ছড়িয়ে দিচ্ছে এক প্রত্যঙ্গ থেকে অন্য প্রত্যঙ্গে।

পরদিন সকালে সে তার নিজের শবের সৎকার করবে। নাভীটা নিয়ে এসে জমিয়ে রাখবে ফরমালিন ভরা বয়ামের ভিতর। তারপর তৃতীয় দরজার তালা চেক করে সে চলে যাবে ইস্কুলের মাঠে। সেখানে একটা হাস্যকর কাকতাড়ুয়ার মত দুই দিকে দুই হাত আর মাটিতে এক পা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। পুপাই রুপাই টুপাই কুপাই নামের পাখিরা তাকে এসে বলবে আন্টি খিদে পেয়েছে। সে তার চুল এলো করে দেবে। আর ওরা সন্তর্পণে উকুন বাছার ভঙ্গিতে খুঁটে-খুঁটে বেছে নেবে তার ঘাড় থেকে, চুল থেকে, সোনা-সোনা ধানের বীজ।

শেয়ার করুন

1 thought on “কলকাতায় ২০১৪”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *