গাজা থেকে লিখছি

ফিলিস্তিনি লেখক ঘাসান কানাফানির Letter from Gaza-এর বাংলা অনুবাদ।

কানাফানি ছিলেন একজন উদ্বাস্তু, শিক্ষক, সাংবাদিক, সম্পাদক ও রাজনৈতিক কর্মী। তিনি ছিলেন ফিলিস্তিনের মার্ক্সবাদী সংগঠন,  পপ্যুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অফ প্যালেস্টাইন-এর মুখপাত্র। ১৯৭২ সালের জুলাই মাসে, ইসরায়েল-এর গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ, বেইরুট-এ তাঁর গাড়িতে বোমা রেখে তাঁকে হত্যা করে। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মৃত্যু হয় আধুনিক ফিলিস্তিনি সাহিত্যের অন্যতম সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ এই সাহিত্যিকের।  ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের সাহিত্যের অন্যতম অগ্রণী সৈনিক কানাফানি মনে করতেন, ফিলিস্তিনের সাহিত্য বৃহত্তর পৃথিবীর যাবতীয় নিপীড়ন বিরোধী লড়াইয়ের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কানাফানির কাছে সাহিত্য সৃষ্টি ছিল তাঁর বৃহত্তর রাজনৈতিক কাজেরই অংশ। সংক্ষিপ্ত জীবনে মেন ইন দ্য সান, উমম সাদ, রিটার্ন টু হাইফা সহ একাধিক কালজয়ী রচনা সৃষ্টি করেন ফিলিস্তনের এই বিপ্লবী সাহিত্যিক। 

প্রিয় মুস্তাফা,

     তোমার চিঠি পেয়েছি, লিখেছ আমার স্যাক্রামেন্টো গিয়ে তোমার সাথে থাকার সব বন্দোবস্ত তুমি পাকা করে ফেলেছ। ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট-এ যে আমি পড়ার সুযোগ পেয়েছি, সে খবরও আমার কাছে পৌঁছেছে। এই সবকিছুর জন্য তোমাকে অজস্র ধন্যবাদ। কিন্তু এখন যে খবর তোমাকে দেব, সেটা বোধহয় তোমার খানিক অদ্ভুতই ঠেকবে — এবং কোনও সন্দেহ রেখ না, এবিষয়ে আমার কোনওরকম দ্বিধা নেই, বস্তুত আমি খুবই নিশ্চিত এখন আমি সবকিছু যতটা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি তা আগে কখনও পাইনি। না, আমি মন বদলে ফেলেছি, আমি যাব না, “সবুজ, সজল আর সুন্দর মুখের দেশে”, যেমনটা তুমি লিখেছিলে। না, আমি এখানেই থাকব, আমি কোনওদিনও এদেশ ছেড়ে যাব না। 

     মুস্তাফা, এই যে আমাদের দুজনের জীবন আর এক খাতে বইবে না, আমার সত্যিই খুব মন খারাপ। আমি যেন শুনতে পাচ্ছি, আমাদের দুজনের এক সাথে পথ চলার প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছ তুমি। ঠিক যেমন আমরা এক সঙ্গে চিৎকার করে বলতাম: “আমরা বড়লোক হব!” কিন্তু, জানো, সত্যিই আমার কিছু করার নেই।  হ্যাঁ, আমার এখনো সেই দিনটা মনে আছে, যেদিন আমি কায়রো এয়ারপোর্টের ওই বড় হলটায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, তোমার হাতটা চেপে ধরে, ওই দানবীয় মোটরটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে, তোমার গোলাকৃতি মুখ, কোনও কথা নেই।   

     গাজার শাজিয়া কোয়ার্টার-এ বড় হওয়ার সময়ে তোমার মুখটা যেমন ছিল, তা এতটুকু বদলায়নি, শুধু ওই ক’টা বলিরেখা ছাড়া। আমরা এক সাথে বড় হয়েছি, দুজন দুজনকে পুরোটা বুঝেছি। কথা ছিল আমরা এভাবেই থাকব একসাথে, সারাটা জীবন। তেমনই কথা দিয়েছিলাম নিজেদের।  কিন্তু…

     “প্লেন ছাড়তে এখনও পৌনে এক ঘন্টা বাকি। ওভাবে শূন্যে তাকিয়ে থেকো না। শোন! পরের বছর তুমি কুয়েত যাবে, আর মাইনে থেকে টাকা বাঁচিয়ে জমাবে, যাতে এই গাজা থেকে নিজেকে উপড়ে ক্যালিফোর্নিয়াতে নিয়ে গিয়ে নিজের শিকড় গাড়তে পারো। আমরা শুরুটা এক সাথে করেছিলাম, বাকি পথটাও এক সাথেই চলব… ”

     সেই সময়ে আমি তোমার ঠোঁটের দ্রুত নড়াচড়া দেখছিলাম। তুমি সব সময়ে এই ভাবেই কথা বলো, দাঁড়ি কমা ছাড়া। কিন্তু আবছাভাবে আমি বুঝতে পারছিলাম এই যাওয়ায় তুমি পুরোপুরি খুশি নও। যাওয়ার তিনটে ঠিকঠাক কারণ তুমি দেখাতে পারোনি। এই যে ছেড়ে যাওয়া… কষ্ট আমারও হয়েছে, কিন্তু পরিষ্কার ধারণা ছিল: কেন আমরা গাজা ছেড়ে পালাব না? কেন যাব না? তোমার পরিস্থিতি অবশ্য তারপর ভাল হতে শুরু করে। কুয়েতের শিক্ষা মন্ত্রক তোমাকে কন্ট্র্যাক্ট দিয়েছিল, আমাকে যদিও দেয়নি। আমি পড়েছিলাম দুর্দশার গাড্ডায়, তুমি অল্প অল্প টাকা পাঠাতে। তুমি বলেছিলে ওগুলো ধার হিসেবে ধরতে। কারণ তোমার ভয় ছিল আমি অপমানিত হব, মনে করবো তুমি আমাকে খাটো করছ। তুমি আমার পরিবারের অবস্থা গোটাটাই জানতে; তুমি জানতে, আমার UNRWA স্কুলের সামান্য মাইনেতে আমার মা, দাদার বিধবা বউ আর ওদের চারটে বাচ্চার জীবন চালানো কঠিন।   

     “মন দিয়ে শোনো। প্রতিদিন আমাকে লিখবে… প্রতি ঘন্টায়… প্রতি মিনিটে! প্লেন ছাড়ছে। বিদায়! না, বলা ভাল, আসি,  দেখা হবে!”

     তোমার ঠান্ডা ঠৌঁট আমার গাল ছুঁয়ে গেল, তুমি আমার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে তাকালে প্লেন-এর দিকে, তারপর যখন আবার আমার দিকে তাকালে, তোমার চোখে জল দেখেছিলাম। 

     পরে কুয়েতের শিক্ষা মন্ত্রক আমাকেও কন্ট্র্যাক্ট দেয়। সেখানে আমার জীবন কেমন কেটেছে সেই বিষয়ে বিস্তারিত আবার নতুন করে বলার কিছু নেই। আমি সব সময়ে প্রতিটা জিনিসই তোমাকে লিখেছি। ওখানে আমার জীবন ছিল চ্যাটচ্যাটে, ফাঁকা; মনে হত আমি একটা ছোট ঝিনুক,  নিষ্ঠুর একাকীত্বে হারিয়ে গেছি, রাতের শুরুর মতো অন্ধকার এক ভবিষ্যৎ নিয়ে লড়ে যাচ্ছি, কুৎসিত এক দৈনন্দিনতায় ফেঁসে গেছি, সময়ের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছি। সবকিছু গরম আর ভ্যাপসা। আমার গোটা জীবনটাই যেন পিছল, সবই মাস শেষের আকাঙ্ক্ষায়।  

     বছরের মাঝামাঝি, সে বছর, ইহুদিরা সাভার কেন্দ্রীয় ডিস্ট্রিক্টে বোম ফেলে, আর গাজায় আক্রমণ হানে, আমাদের গাজায়, বোম আর ফ্লেম থ্রোয়ার নিয়ে। এই ঘটনা আমার রোজনামচায় কিছু বদল হয়তো এনেছিল, কিন্তু খুব মন দিয়ে লক্ষ্য করার মতো বিশেষ কিছু ছিল না; আমি তো এই গাজাকে ছেড়ে চলে যাব, ক্যালিফোর্নিয়া যাব, সেখানে নিজের জন্য বাঁচব, একদম নিজের জন্য, যে আমি এতদিন এত কষ্ট সহ্য করেছি। আমি গাজাকে ঘৃণা করতাম, আর এখানকার মানুষদের। এই পঙ্গু শহরের সবকিছু আমাকে একজন বিকৃত লোকের ধূসর রঙে আঁকা ব্যর্থ ছবির কথা মনে করাত। হ্যাঁ, মা, দাদার বিধবা বউ আর তার বাচ্চাদের জন্য আমি অল্প কিছু টাকা পাঠাব, কিন্তু বাকি শেষ বন্ধনটাও আমি ছিঁড়ে ফেলব, চলে যাব সবুজ ক্যালিফোর্নিয়ায়, গত সাত বছরে যে পরাজয়ের স্বাদ আমার রন্ধ্রে ঢুকে গেছে তার থেকে বহু দূরে। যে সহানুভূতির বোধ আমাকে আমার ভাইয়ের বাচ্চা, ওদের মা, আমার নিজের মায়ের সাথে বেঁধে রেখেছে, তার কোনটাই এই দুর্বিষহ জীবন বেছে নেওয়ার যথেষ্ট কারণ হতে পারে না। আমি ইতিমধ্যেই নিজেকে যতটা নীচে নিয়ে গেছি, তার থেকে আর নীচে নিজেকে টেনে নামাবো না। আমাকে পালাতেই হবে!         

     তুমি এই অনুভূতিগুলো জানো, মুস্তাফা, তুমি নিজেই এই সবগুলি অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেছ। আচ্ছা মুস্তাফা,  বলতো, গাজার সঙ্গে আমাদের এ কেমন অবোধ্য এক বন্ধন, যা আমাদের ছেড়ে যাওয়ার সব উৎসাহকেই কেমন ভোঁতা করে দেয়? এর একটা স্পষ্ট অর্থ খুঁজে পাওয়ার কোনও চেষ্টা করিনি কেন কোনওদিন আমরা? কেন সেভাবে বিশ্লেষণ করিনি বলতো? কেন আমরা এই হেরে যাওয়া ও তার ক্ষতগুলোকে পিছনে ফেলে একটা আলোর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাইনি, এমন এক ভবিষ্যত যা আমাদের গভীরতর সান্ত্বনা দিতে পারে? কারণটা আমরা কখনোই ঠিক জানতাম না।

     একটা মিঠে যাত্রার স্বপ্ন নিয়ে, জীবনের যা কিছু সুন্দর ও আলোকিত, সেই ছোট ছোট জিনিসগুলো পাওয়ার পথে এক পা এগনোর আকাঙ্ক্ষায়, নিজের যাবতীয় সঞ্চয় জড়ো করে যখন জুনের ছুটিতে গেলাম, দেখলাম গাজা ঠিক তেমনই রয়েছে যেমনটা আমি জেনে এসেছি, যেন কষাইখানার পাশে আঠালো বালিময় সমুদ্রের ধারে ঢেউয়ের এনে ফেলা মরচে ধরা শামুকের খোলের ভিতরের সেই পর্দা।

     ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের ভীষণ যন্ত্রণার থেকেও বেশি দমবন্ধ করা এই গাজা, সরু সরু রাস্তা আর বড় বড় বারান্দায় গিজগিজে গাজা…এই গাজা! কী সেই অস্পষ্ট কারণ যা মানুষকে তার পরিবার, তার বাড়ি, তার স্মৃতির দিকে টানে, যেমন বসন্ত টানে পাহাড়ি ছাগলের পালকে? আমার জানা নেই। আমি শুধু জানি, সেদিন সকালে আমি আমাদের বাড়িতে আমার মায়ের কাছে গেছিলাম। যখন পৌঁছলাম, আমার মৃত দাদার বৌ আমার সাথে দেখা করতে আসে; বলে, তার আহত মেয়ে নাদিয়া আমাকে একবার দেখতে চেয়েছে। জিগেস করে, আমি কী তাকে একবার দেখতে যেতে পারি গাজা হাসপাতালে? আমার মৃত দাদার বৌ কাঁদছিল। তুমি কী নাদিয়াকে চেনো, আমার দাদার তেরো বছরের ফুটফুটে মেয়ে নাদিয়া? 

     সেদিন বিকেলে আমি কেজি খানেক আপেল কিনে, নাদিয়াকে দেখতে হাসপাতালে যাই। আমি জানতাম, আমার মা আর বৌদি আমার থেকে কিছু লুকোচ্ছিল, কিছু একটা যা তাদের উচ্চারণ করতে বাধছিল, কিছু একটা অদ্ভুত যা আমি আন্দাজও করতে পারছিলাম না। অভ্যাসবশতই আমি নাদিয়াকে ভালবেসেছি, যে অভ্যাস থেকে আমি সেই প্রজন্মের সকলকে ভালবাসি, যাদের গোটা বেড়ে ওঠাটা এমনই পরাজয় আর উচ্ছেদের মাঝে, যে তাদের মনে হয় আনন্দের জীবন এক ধরনের সামাজিক বিচ্যুতি।  

     সেই মুহূর্তে কী হয়েছিল? আমি জানিনা। আমি সেই সাদা ঘরটায় ঢুকলাম, খুব শান্ত। অসুস্থ শিশুদের মধ্যে এক ধরনের পবিত্রতা থাকে, আরও বেশি, যদি সেই অসুস্থতার কারণ হয় নিষ্ঠুর, যন্ত্রণাদায়ক আঘাত। নাদিয়া তার বেড-এ শুয়ে ছিল, একটা বড় বালিশে ঠেসান দিয়ে মাথাটা উঁচু করা, বালিশের ওপর ওর চুলগুলি ছড়িয়ে রয়েছে, পশমের মতো। ওর বড় বড় চোখগুলোতে গাঢ় স্তব্ধতা। কালো চোখের মণির গভীরে সবসময়ে চিকচিক করছে জল। মুখটা শান্ত ও স্থির, অথচ জানো কী বাঙ্ময় সেই মুখ, হয়তো অত্যাচারিত নবীর মুখের মতোই! নাদিয়াতো শিশুই, কিন্তু ওকে শিশুর থেকে বেশি কিছু মনে হচ্ছিল, অনেক বেশি কিছু, আর শিশুর থেকে বয়স্ক লাগছিল, অনেক অনেক বয়স্ক।   

     “নাদিয়া!”

     আমার কোনও ধারণাই নেই এটা আমি বলেছিলাম নাকি আমার পেছন থেকে অন্য কেউ। নাদিয়া চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল, মনে হল গরম চায়ের কাপে চিনি দিলে যেমন মিশে যায়, ঠিক সেভাবেই ওই চোখ আমাকে গলিয়ে দিল। ওর ক্ষীণ হাসির সঙ্গেই ওর গলা শুনলাম। “কাকু! তুমি এখনই এলে কুয়েত থেকে?”

     ওর গলার স্বর ভেঙে গেল, হাতে ভর দিয়ে সোজা হয়ে বসে আমার দিকে ঘাড়টা বাড়িয়ে দিল। আমি ওর পিঠে চাপড় মেরে ওর কাছে বসলাম। 

     “নাদিয়া, কুয়েত থেকে তোর জন্য উপহার এনেছি, অনেক অনেক উপহার। তুই যতদিন না বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছিস, যতদিন না পুরো সুস্থ হয়ে যাচ্ছিস, সেরে উঠছিস, ততদিন আমি এখানেই থাকব। তারপর তুই আমার বাড়ি যাবি, সব কটা জিনিস নিয়ে আসবি। তুই যে সেই লাল রঙের পাজামাটা চেয়েছিলি, লিখেছিলি চিঠিতে। হ্যাঁ, নিয়ে এসেছি তোর জন্য। ”

     আমি মিথ্যে বলছিলাম, আবেগের উত্তেজনায় মুখে চলে আসা মিথ্যে, কিন্তু যে মুহূর্তে আমি এটা উচ্চারণ করলাম, মনে হল আমি প্রথমবারের জন্য সত্যি বলছি। নাদিয়া ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মতো কেঁপে উঠল, আর এক ভয়ানক স্তব্ধতায় মুখে নামিয়ে নিল। আমি বুঝতে পারছিলাম ওর চোখের জলে আমার হাত ভিজে যাচ্ছে। 

    “কী রে নাদিয়া, কথা বল! তোর লালা পাজামা চাইনা?” ও চোখ তুলে তাকালো, মনে হল কিছু বলবে, কিন্তু তারপর চুপ করে গেল, দাঁতে দাঁত ঘষল আর আমি আবার ওর গলার আওয়াজ শুনতে পেলাম, বহু দূর থেকে আসা আওয়াজ। 

     “কাকু!”

     ও হাতটা এগিয়ে দিল, আঙুল দিয়ে সাদা চাদরটা সরিয়ে পায়ের দিকে দেখাল, থাইয়ের ওপর থেকে কেটে বাদ দেওয়া পা।

     মুস্তাফা … আমি কোনওদিন নাদিয়ার পা-টা ভুলব না, থাইয়ের ওপর থেকে কেটে বাদ দেওয়া। ভুলব না ওর মুখটা, বিষাদ মিশে যাওয়া সেই মুখ, শোক যেন ওখানে স্থায়ী হয়েছে চিরদিনের মতো। আমি সেদিন গাজার সেই হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসি, নাদিয়ার জন্য যে কেজি খানেক আপেল নিয়ে গেছিলাম, আমার হাত সেটা আঁকড়ে ধরে নিঃশব্দ উপহাসে। গনগনে রোদ রাস্তাগুলিকে রক্তের রঙে ছেয়ে দিয়েছিল। আর গাজা তখন আমার কাছে একদম নতুন! আমি আর তুমি কোনওদিন গাজাকে এভাবে দেখিনি। শাজিয়া কোয়ার্টারে যেখানে আমরা থাকতাম, সেখানে ঢোকার মুখে জড়ো করে রাখা পাথরগুলোর ওখানে থাকার একটা কারণ আছে, মনে হচ্ছিল ওটা ওখানে রাখাই আছে সেই কারণটা ব্যাখ্যা করতে। গাজা, যেখানে আমরা থেকেছি, যেখানকার ভাল মানুষদের সঙ্গে আমরা পরাজয়ের সাতটা বছর কাটিয়েছি, সেই গাজা আমার কাছে নতুন হয়ে উঠল। আমার মনে হল এই সবে শুরু। আমি জানিনা কেন আমার মনে হল এটা সবে একটা শুরুয়াত। বাড়ি ফেরার সময়ে যে বড় রাস্তা ধরে আমি ফিরছিলাম, মনে হয় সেই রাস্তাকে আমি সাফাদ পৌঁছনোর লম্বা রাস্তার শুরু হিসেবে কল্পনা করেছিলাম। গাজার সবটুকু বিষণ্ণতায় চুবে রয়েছে, সে দুঃখ শুধু কান্নায় আটকে নেই। এটা একটা চ্যালেঞ্জ: বা তার থেকেও বেশি, বাদ যাওয়া পা ফিরে কেড়ে নেওয়ার মতো অদম্য কোনও জেদ!

     আমি গাজার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেরাই, চোখ অন্ধ করা রোদ ভরা রাস্তায়। জানতে পারি, বোমা আর আগুনের শিখার থাবা যখন ওদের বাড়িকে চেপে ধরে, নাদিয়া তার ছোট ভাইবোনদের বাঁচাতে তাদের গায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তাতেই সে পা হারায়। নাদিয়া নিজেকে বাঁচাতে পারত, ও ছুটে পালাতে পারত, নাদিয়া নিজের পা রক্ষা করতে পারত। কিন্তু ও করেনি। 

     কেন?

     না মুস্তাফা, আমি স্যাক্রামেন্টো আসব না, আমার কোনও আফসোস নেই। না, এবং ছোটবেলায় আমরা  একসাথে যা শুরু করেছিলাম সেটা শেষও করব না। গাজা ছেড়ে যাওয়ার সময়ে তোমার মনে যে অস্পষ্ট অনুভূতি ছিল, সেই ছোট অনুভূতিটা তোমার ভেতরে বিশাল ও গভীর হয়ে উঠবে। পরাজয়ের এই কদর্য ধ্বংসস্তুপের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পেতে তোমাকে সেই অনুভূতিটাকে বিস্তৃত করতেই হবে। 

     আমি তোমার কাছে আসব না। কিন্তু তুমি আমাদের কাছে ফিরে এস! থাইয়ের ওপর থেকে কাটা নাদিয়ার পায়ের থেকে শিখবে বলে এস, শিখবে জীবন কী এবং বেঁচে থাকার মূল্য কী। 

      ফিরে এস, মুস্তাফা! আমরা সবাই তোমার অপেক্ষায়। 

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *