ভালোবাসায়, বিদ্রোহে

৬ নং তিহার জেল থেকে দেবাঙ্গনা নাতাশার চিঠি

৬ নং তিহার জেল থেলে নাতাশা নারওয়াল আর দেবাঙ্গনা কালিতার লেখা কিছু চিঠির অনুবাদ 

নাগরিক পঞ্জি, নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের মাধ্যমে যখন দেশের এক বড় অংশের মানুশকে বেনাগরিক করে হিন্দু রাষ্ট্র বানাবার চক্রান্ত করে একের পর এক হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট সরকার, তখন রাস্তায় নেমেছিল হাজার হাজার মেয়েরা। শাহীনবাগে, সীলামপুরে, ঘন্টাঘরে, পার্ক সারকাসে। রাত জেগে, স্লোগান দিয়ে, রাজপথ দখল নিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল এই দেশে এখনও কিছু মুষ্টিবদ্ধ হাত আছে যারা এই ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের ঘুম কেড়ে নিতে পারে। রাষ্ট্রও সমস্ত শক্তি নামিয়েছিল দমন পীড়নের। দিল্লিতে সীলামপুর জাফরাবাদ এলাকা উজাড় করে দিয়েছিল। গ্রেপ্তার করেছিল নাতাশা, দেবাঙ্গনা, গুলফিশা, সাফুরা, ইশরাতের মতো লড়াকু মুখেদের। রাষ্ট্রদ্রোহিতার জন্য কারারুদ্ধ হয়েও থামাতে পারেনি সেই লড়াকু মেয়েদের গান, কবিতা, স্লোগান। ৬ নং তিহার জেলে বসে লেখা নাতাশা, দেবাঙ্গনার চিঠিতে তারই প্রতিচ্ছবি উঠে আসে। জেলের মেয়েদের গল্প, স্বপ্ন, লড়াই। জেলের বন্ধুত্ব, সংহতি। মেয়েদের একে অপরকে বেঁচে থাকার গল্প, একে অপরের হাত ধরে বেঁধে বেঁধে থাকার গল্প। Caravan পত্রিকায় প্রকাশিত সেই চিঠির সংকলন ‘Love and Rage’ এর কিছু চিঠির অনুবাদ রইল। মূল চিঠিগুলি পড়া যাবে এখানেঃ https://caravanmagazine.in/crime/love-and-rage-natasha-narwal-devangana-kalita-letters-tihar-jail

২৭/ ৯/ ২০২০

…জানো আমার মনে হয়, এই অবস্থায় হয়তো বাইরে থাকাটাই বেশি কঠিন। আমাদের এখানে অপেক্ষায় দিন কাটে, মাঝে মাঝে অসহনীয়, তবু খালি ওইটুকুই। তোমাদের অনেক বেশি চাপ, অনেক কিছু একসাথে সামলাতে হচ্ছে, অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে, পারিবারিক দায়-দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। আর তারই সাথে সমস্ত কিছু ভেঙে পড়তে দেখতে হচ্ছে। অশুভ শক্তি এত দ্রুত, এত ভয়াবহ ভাবে সমস্ত কিছু তছনছ করে দিচ্ছে, প্রতিদিন এক অন্য সকাল, এক অন্য দুনিয়ার আশা পিষে মারছে। এখানে এখন একমাত্র দিন বদলের গান, নতুন আশার গান গাইতে গেলেই কান্না পায়… এত আশা, এত স্বপ্ন যার হয়তো কোনো ভবিষ্যৎ নেই। “অন্ধকার সময়ও কি গান রবে?”

…আসলে আমরা সমাজের যে সমস্ত পরাধীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করি, কারাগার তারই যুক্তিযুক্ত পরিণতি। যে কোনো রকম স্বতন্ত্রতাকেই পিষে দিতে চায়। তবু আমি দেখেছি — এরকম একটি জায়গাতেও, যেখানে মানুষকে তার স্বতন্ত্রতা, মানবতাকে খন্ডন করে, মানুষকে জীবে পরিণত করে — সেখানেও মানুষ অলিতে গলিতে, লোকচক্ষুর আড়ালে কিছু থেকে গেছে… ওরা এখনও হাসে, কাঁদে, গান গায়, বন্ধুত্ব করে, এক অন্য দিনের স্বপ্ন দেখে। এই কদিনে উপলব্ধি করেছি আমাদের সবার মধ্যে কি অপরিসীম সৃজনশীলতা আছে… মর্যাদাপূর্ণ জীবনের তাগিদে যে কোনো জায়গা, জিনিস নিজের মতো করে গড়ে নিতে পারি, বদলে নিতে পারি।

…তোমরা কেউ ‘Women on the Edge of Time’ বইটা পড়েছ? না পড়ে থাকলে পড়ো। আমি দুবার পড়েছি, তাও আবার পড়তে ইচ্ছে করছে। এই সময় আরো বেশি করে নিজের সাথে মেলাতে পারি। তোমরাও বোধহয় পারবে। তখন হয়তো আমরা একে অপরের সাথে দেখা করতে পারব কনি আর লুসিয়েন্টের মতো সমস্ত বাধা, বেড়া সরিয়ে। এক অন্য পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতে পারব। আর তখন হয়তো কোনো একদিন আমরা সবাই নদীর পাড়ে বসে আবার গান গাইতে পারব ভলোবাসার, আশার, প্রতিরোধের, বন্ধুত্বের। 

… দেশজুড়ে কৃষকদের জান কবুল লড়াই আমাদের আরো দৃঢ় করছে। বিশেষ করে যখন জানছি অনেক জায়গায় মেয়েরা, ছাত্রছাত্রীরা এগিয়ে এসে এই লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে। আমরা উত্তেজিত হয়ে খবরের কাগজে হাতড়ে সেই সব ছবি খুঁজেছি… যদিও সমস্ত প্রতিবাদ, প্রতিরোধ উপেক্ষা করেই  কোনো রকম গণতান্ত্রিক নিয়মের তোয়াক্কা না করেই এই বিল পাশ হয়ে গেল। হয়তো এবার মানুষ বুঝতে পারবে এদের চরিত্র। এটা ভাবা হয়তো সরলতা, তবু আশা তো করতেই হয়।

… আরও একটা জীবন নৃশংস ভাবে বলি হলো এই ব্রাহ্মণ্যবাদী পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোয়। হাথরাসে। আমরাও বেদনার সাথে এই সব খবর দেখছি। কিভাবে সমস্ত রকম ক্ষমতার কাঠামো দিয়ে সেই মেয়েটিকে, মেয়েটির পরিবারকে বঞ্চিত করে চলেছে। মৃত্যুর পরেও মর্যাদার অধিকার যেন নেই তাদের। তবুও এত মানুষ প্রতিবাদ করছেন, কথা বলছেন, রাস্তায় নেমেছেন দেখে মন ভরে যাচ্ছে। মাঝে মধ্যেই ভাবি আমরা এই সময়ে কী কী করতাম। আমি নিশ্চিত তোমরা এখন সেই সব করছ, লেখালেখি করছ, পোস্টার বানাচ্ছ। আমি বোকার মতো সমস্ত প্রতিবাদের ছবিতে তোমাদের মুখ খুঁজতে থাকি। যাইহোক, এই বর্বরতার সময়েও কিছু মানুষ প্রতিবাদ করে, কিছু মানুষ এই নিষ্ঠুর শাসনকে মেনে না নিয়ে চ্যালেঞ্জ করে চলেছে দেখে আমাদের আশা জাগে, সান্ত্বনা পাই।

… আশা, সান্ত্বনা সবই এখানে দুষ্প্রাপ্য। মেয়েরা শক্তভাবে চেপে রাখে নিজেদের শরীরে, বেঁধে রাখে তাদের চুলে, ক্ষমতাশালীদের চোখের আড়ালে… যাতে কোনো ভাবেই তাদের থেকে ওইটুকু কেড়ে নিতে না পারে। কিন্তু নিজেদের মধ্যে খুব উদারভাবে লেনদেন চলে, একে অপরকে জড়িয়ে, একে অপরের চোখের জল মুছে, একে অপরের সাথে নিজেদের গল্প ভাগ করে। ওদের থেকেই প্রতিদিন শিখি — কীভাবে মর্যাদার সাথে বাঁচা যায়, কীভাবে কিছু কিছু দিন ভেঙে পড়লেও আবার উঠে দাঁড়াতে হয়, কিভাবে এই শাসনব্যবস্থা তোমাকে, তোমার সব কিছুকে পিষে মেরে ফেলতে চাইলেও, ঘুরে দাঁড়ানো যায়। একে অপরকে ভর করে বাঁচা যায়, নিজেকে, একে অপরকে আবার শক্তি দেওয়া যায়, আরো একদিন চলার জন্য। কত কত গল্প আটকে আছে এই দেওয়ালগুলোয়, কত কথা তালাবন্দী আছে। আমাদের ক্রোধ ফুটছে মনের মধ্যে, এতদিনের নিরবতা চিৎকারে ফেটে পড়তে প্রস্তুত। 

অফুরান ভালোবাসা,

নাতাশা।

***

২৮/৯/২০২০

এত এত চিঠি ভালোবাসায় ভরা, এত এত সুন্দর আন্তরিক কথা পেয়ে বিহ্বল লাগে। অনেক অনেক শক্তি জোগায়, ক্ষতগুলোতে মলম দেয়। পাওয়া মাত্রই পড়ে ফেলি, বারবার পড়ি, প্রতিদিন, অনেক বার… নিজের কাছে রাখি, খুব খুব কাছে… বিশেষ করে যে দিনগুলোয় খুব খারাপ থাকি, যখন সাহস টলে যায়, এইগুলোই অবলম্বন হয়। ভরসা জোগায় যে ঠিক পেরে যাব, টিকে যাব। আমরা সবাই একসঙ্গে বাঁচব, আমরা ভয় পাইনি, আমরা ভয় পাব না। আমরা আছি, একে অপরের সাথেই, এই দেওয়াল, এই গরাদ পেরিয়ে, হাতে হাত রেখে, বাঁচছি, ভাসছি। 

সামনের দিন অনিশ্চিত। এই অনিশ্চয়তাকেও আমাদের মেনে নিতে হবে। সবার সবটুকু সাহস দিয়ে নতুন করে শুরু করতে হবে, কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে। এই নতুন বাস্তবতার আচমকা, হুট করে চলে আসাটা খুবই ভয়ঙ্কর, খুবই ভীতিকর। তবু মেনে নিতে হবে, একসাথে একে পার করতে শিখতে হবে। এগিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কীই বা করার আছে। পৃথিবীর ইতিহাস, নিজেদের ইতিহাস থেকে শিখে নিজেদের সামলাতে হবে, আগামী দিনে যাই হোক, তার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। এটা খুব বড় দায়িত্ব। আমার কোনো সংশয় ছিল এমন নয়, যদিও আমি কখনওই সেটা স্পষ্ট করে বলে উঠতে পারিনি — এত মাস পরেও, অত দমন-পীড়ন সত্ত্বেও, আরও আশঙ্কা সত্ত্বেও, আমরা এখনও ভেঙে পড়িনি — আমাদের ছোট্ট নৌকাটা এখনও ডুবে যায়নি, আর এই টিকে থাকাই সাক্ষ্য দেয় আমাদের সম্মিলিত বেঁচে থাকার, সহ্য করার ক্ষমতার। এই গভীর সম্ভাবনার কথা আমাদের স্বীকার করতেই হবে। তোমাদের ভীষণ মিস করি, দিনের পর দিন রাত জেগে, এই নিষ্ঠুর বিচ্ছেদ সত্ত্বেও তোমরা লড়াইয়ে আছো, সেই বিশ্বাসেই আমরাও এখানে লড়ে যাচ্ছি। 

… মাঝে মাঝে মনে হয়, এই অন্ধকার সময়ে হয়ত ‘বাইরে’ থাকার থেকে ‘ভেতরে’ থাকা অনেক সহজ। ‘বাইরে’ থাকার দায়িত্ব অনেক, কিছু করার দায়িত্ব, কিছু করার বোঝা, যা এই সময়ে আগের চেয়েও অনেক বিশাল কাজ মনে হয়। তোমাদের জায়গায় আমি থাকলে কী করতাম, কীভাবে সামলাতাম, ভেবে পাই না। জেল আর সব ভাবে অচল করে দিলে, শুধু সহ্য করা আর অপেক্ষা করাই একটা রাজনৈতিক কাজ হয়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে এই অন্তহীন সংঘর্ষে নিজের মাথা ঠিক রাখাই একটা কাজ হয়ে যায়। শোষক যাতে কোনো ভাবেই আমাদের স্বপ্নগুলো কেড়ে নিতে না পারে, আমাদের প্রতিবাদী স্পৃহা ভেঙে না ফেলে, তা নিশ্চিত করা এবং শরীর-মনকে চাগিয়ে রাখাই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কর্তব্য হয়ে যায়। 

… দিন, মাস যেতে যেতে বুঝি জেল কোনো ব্যতিক্রমী জায়গা নয়। যত রকমের জুলুম এই নিষ্ঠুর দুনিয়া চালায়, জেলখানা তারই একটা অংশমাত্র। হয়ত অনেক বেশি তীব্র রূপে, সেটাও এখনও পুরোটা বুঝে উঠতে পারিনি। কারখানা, খেত, হোস্টেলের মতোই আরো একটা পরিসর যেখানে মেয়েদের, শ্রমজীবী মানুষদের কয়েদ রাখা হয়। 

… পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় মেয়েদের জীবন তো জেলে থাকার ট্রেনিং বৈ আর কিছু নয়। তাই জেলের কর্মীরা আমরা কোথায় যাব না যাব, কতদূর যেতে পারব নির্ধারণ করে দিলে অবাক লাগে না। মেয়েদের তো চিরকালই বলা হয়েছে এখানে না যেতে, ওখানে না যেতে। কখনো বাবা, কখনো স্বামী, কখনো প্রেমিক নির্দেশ দিয়েছে এখানে ওখানে না যেতে। জেলে অন্তত এই ক্ষমতা কাঠামো অনেক বেশি স্বচ্ছ, অনেক বেশি পরিষ্কার। পরিবারে, সমাজে তো একই জিনিস চলে কখনো ‘প্রেমের’ নামে, কখনো ‘ইজ্জতের’ নামে। 

… অবশ্য কোনো কোনো দিন এই কারাবাস আরো প্রকট হয়ে ওঠে। শুধু তোমার ব্যারাক, তোমার ওয়ার্ড, তোমার পার্ক। গণ্ডি কমতে থাকে। 

… এমন দিনে প্রতিরোধের গান শক্তি জোগায়। নিজেই গেয়ে উঠি। অসম্পূর্ণ লাইনগুলো যেটুকু মনে আসে বারবার গাইতে থাকি। লম্বা দিন-রাত জুড়ে গাই, কখনও ক্ষীণ স্বরে, কখনও দৃঢ় কন্ঠে, কখনও নিশুতি রাতে জোরে জোরে, কত কত স্মৃতি ভিড় করে, সাহস জোগায়, ভরসা দেয়। প্রতিটা শব্দের কত মানে, কত ইতিহাস ভরা… “নিডর আজাদ হো ও জায়েগি তো নয়া জমানা লায়েগি…” (নির্ভীক, আজাদ হয়ে যাবে যেই, নতুন যুগ আনবেই…)। 

… মেয়েদের সম্মিলিত বিদ্রোহই আমাদের ‘বাইরে’ বেঁচে থাকার রসদ জোগান দিত, এখন ‘ভেতরেও’ মেয়েদের প্রতিরোধই টিকে থাকতে সাহায্য করে। প্রতিদিন এখানে মেয়েদের প্রতিদিনের যাপন থেকে সাহস পাই… সেই সমস্ত মেয়েদের থেকে যারা বছরের পর বছর ধরে ‘ভেতরেই’ আছে, সেই মেয়েরা যারা শুধুই অপেক্ষা করে আছে এই অন্তহীন বিচার ব্যবস্থার, সেই সব মেয়েরা যারা দূর দেশ থেকে এসেছে, যারা ‘হিন্দি’ বা ‘ইংরেজি’ জানে না, যে মেয়েদের এখানেই সন্তান প্রসব করতে হয়, এখানেই সন্তান মানুষ করতে হয়, যে মেয়েদের উকিল নিযুক্ত করার সামর্থ নেই, ধৈর্য ধরে এই অসম্ভব ক্লান্তিকর সরকারি আইন সহায়তা ব্যবস্থার সাথে যুঝতে হয়, যে মেয়েরা মাসের পর মাস তাদের পরিবার পরিজনের সাথে কথা বলতে পারেনি, শুধুমাত্র কোনো যোগাযোগ নম্বর জোগাড় করে উঠতে পারেনি বলে, তাদের ‘বাড়ির’ চিঠিরও কোনো উত্তর আসেনি কখনও, সেই সব ‘অপরাধী’ মেয়েরা, যারা কাঠামোগত শোষণের বন্দী। আমি আমার সহবন্দীদের কথা চিঠিতে লিখতে পারবো না, কিন্তু এই কারাগারের একটা নাম দেওয়া যায়: ‘হম গুনেহগার আউরাতে’ (‘আমরা পাপী নারীরা’ – পাকিস্তানী কবি কিশওয়ার নাহিদের একটি বিখ্যাত কবিতার লাইন)। 

একদিন রাতে আমরা আমাদের ব্যারাকে সবাই মিলে ‘সুলতানার স্বপ্ন’ (১৯০৫ সালে প্রকাশিত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের একটি নারীবাদী গল্প) পড়েছিলাম।  ভীষণ অন্তরঙ্গ, ভীষণ চেনা, ভীষণ উষ্ণ এক অভিজ্ঞতা। তোমাদের খুব খুব মিস করি। 

অনেক ভালোবাসা, অনেক আদর,

দেবাঙ্গনা।

২৮/১০/২০২০

 

তোমাদের জন্য একটা কাজ আছে। বিভিন্ন নারী-সংগঠন, নারীবাদী প্রকাশকদের কি বলবে ৬ নং তিহার জেলে কিছু বই, প্যাম্ফলেট পাঠাতে? এখানকার লাইব্রেরির সংগ্রহ অনেক বৈচিত্র‍্যময় করা যায় তাহলে। যে মেয়েরা সবে পড়তে, লিখতে শিখছে তাদের জন্য কিছু বই, মেয়েদের অধিকার, মেয়েদের জীবন নিয়ে কিছু বই হলে খুব ভালো হয়। আর বাচ্চাদের জন্য কিছু রঙচঙে গল্পের বই! সাবিত্রীবাঈ ফুলে আর স্কুলের মেয়েদের সেই ছবিটা পাঠাতে পারবে? ‘সুলতানার স্বপ্ন’-এর সেই মেয়েরা একসাথে বসে পড়ছে ছবিটার একটা গোন্ড পেন্টিং করতে চাই আমরা। 

অবশেষে আগের মাসে পড়ায় কিছুটা মনোযোগ দিতে পেরেছি। আমি জেলের ভেতর কাজের জন্য আবেদন করিনি, ভেবেছি এই সময়ে পড়াশুনোয় মন দেব। কিন্তু সেটা খুবই কঠিন কাজ। ‘খুলি গিন্তির’ সময় (একমাত্র সময় যখন কয়েদীদের অন্যান্য ব্যারাকে যেতে দেওয়া হয়, জেলের খোলা এলাকায় যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়) আমাদের ব্যারাকটি বিভিন্ন রকম কার্যকলাপের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। বাচ্চারা আসে যায়, কখনও আনন্দ, কখনও নিরাশা নিয়ে, অন্যান্য বন্দীরা আসতে যেতে থাকে কোনো না কোনো কারণে — কারও কোনো আবেদনপত্র লিখতে হবে, কেউ লেখা পড়া শিখতে চায় (আমি কখনও এখানে হিন্দি পড়াই), কারও প্রেম পত্র লিখে দিতে হবে, কারোবা রোমান্টিক শায়েরি চাই, কারো আইনি ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন আছে, কারও নিজের কেস নিয়ে, বেল নিয়ে, উকিল নিয়ে, কেউ একটু কথা বলে মনের ভার হাল্কা করতে চায়, কেউ ই-মুলাকাত (বন্দীদের নথিভুক্ত কিছু পরিজনের সাথে ভিডিও কল করে কথা বলার অনুমতি থাকে) বুক করতে চায়, কেউ কোনো গল্প পড়ে শোনানোর দাবি করে, কেউ ক্যান্টিনের কিছু মুদির লিস্ট করে দিতে বলে, কেউ আসে তাদের ছেলেমেয়েরা আমাদের মতো কলেজে কিভাবে পড়তে পারবে জানতে। এই সূত্রেই অনেক নতুন পথ চলা হয়, অনেকের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা তৈরি হয়, অনেক জীবন ছুঁয়ে যাওয়া যায়, কত রকমের আলাপ, কত পথ চলা, কত স্বপ্ন, কত আকাঙ্ক্ষা কত নতুন বন্ধুত্ব, যৌথতা, গান, ইতিহাসের জন্ম দেয়। এই আলাপেই কত মানুষের দোয়া, আশীর্বাদ পেয়েছি — ‘আমাদের আগে তোমরা ছাড়া পাবে’। মেয়েরা চিরকালই তাদের আকুল ইচ্ছে, প্রার্থনায় অনেক উদার। 

দেবাঙ্গনা

২৯/১০/২০২০

 

এই ফৌজদারি আইন ব্যবস্থা যে কত জীবন ধবংস করে দেয়, কত জনের সঙ্গে অন্যায় করে! কত কত গরীব শ্রমজীবী মেয়েরা এখানে পড়ে আছে, মিথ্যে মামলায় ফেঁসে, ঘর, পরিবার, ভবিষ্যৎ সমস্ত ছিন্নভিন্ন হয়ে, তবুও কোনোভাবে তারা এখনও টিকে আছে, লড়ে যাচ্ছে — অদ্ভুতভাবে! এখানে মেয়েদের মধ্যে একটা কথা খুব প্রচলিত — ‘পুলিস রাসসি কো সাপ বানা সাকতি হ্যায়” (“পুলিশ একটা দড়িকেও সাপ বানিয়ে ফেলতে পারে”)। আমাদের হয়ত রাজনৈতিক বন্দীর সংজ্ঞাটা নতুন করে ভাবতে হবে। রাজনৈতিক বন্দীরা কোনো ব্যতিক্রম নয়। সমস্ত অপরাধী মেয়েরাই, কারারুদ্ধ, ক্ষতবিক্ষত, জীবন, সম্পর্ক সব তছনছ হয়ে যাওয়া, প্রান্তিকায়িত অবস্থান থেকে এক দুর্বোধ্য, অনধিগম্য আইন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত যুঝতে থাকে। আর নিরন্তর অপেক্ষা করে যায়। আসলে সবাই-ই রাজনৈতিক বন্দী!…

ভালোবাসায়, ক্রোধে,

দেবাঙ্গনা

১২/১১/২০২০

 

দুটো ঋতু পার হয়ে গেল আমাদের বিচ্ছেদের। প্যাচপ্যাচে গরম পার করে মনোরম শরতের সন্ধ্যে আর সুন্দর নীল আকাশ। 

… আম্মা গতকাল বেল পেলেন। একটা অদ্ভুত শূন্যতা রেখে চলে গেলেন। দু সপ্তাহ মতোই ছিলেন আমাদের সঙ্গে, তাতেই প্রায় এক জীবনের ভালোবাসা দিয়ে গেছেন। 

খুব মিষ্টি একটা হাসি ছিল ওঁর। আর অসাধারণ সব গল্প। ওঁর বাড়িতে দুটো ছাগল ছিল। তাই ওঁকে সারা উসমানপুরে (সীলামপুরের কাছেই এক জায়গা) সবাই ‘ছাগলওয়ালা আম্মা’ বলত। আমাদের কেসের কথা শুনে বলেছিলেন যখন সব জায়গায় দাঙ্গা হচ্ছিল, তখন ওঁর গলিতে মানুষ রুখে দাঁড়িয়ে আটকেছিল। উনি পরে বলেছিলেন ওঁর বাবা মা মিরাটের দাঙ্গায় প্রাণ হারান। আম্মা হিন্দু ছিলেন, কিন্তু ইসলাম ধর্মও পালন করতেন। গতকাল আমাদের ব্যারাকের আরেক বন্ধু, খালা, বললেন — আম্মা ওঁকে বলেছেন দ্বিতীয় বিয়ের জন্য আম্মা ধর্মান্তরিত হয়ে হিন্দু হয়েছিলেন। 

২৯/১১/২০২০

সময়ের পাহাড় এখানকার প্রাত্যহিক ছন্দ বিলীন করে দেয়… বাচ্চাদের সঙ্গে, অন্য বন্দীদের সঙ্গে সময় কাটানো, গল্প করা, বাইরের জীবনের স্মৃতি ভাগ করা, একে অপরের দুঃখ-হতাশা ভাগ করে নেওয়া… প্রাত্যহিক জীবন দিয়ে আইন-ব্যবস্থাকে একদম কাছ থেকে দেখা… জেল-জীবনের কত রকমের ‘জুগাড়’ শিখছি। মাঝে মাঝে আমরা মজা করি যে, এবার জেলযাপনের উপায় সম্পর্কে লিখতে পারব।

সাড়ে দশটা বাজে এবার ঘুমোতে যাবো। 

লাইব্রেরিতে পুরোনো খাতায় এক বন্দীর লেখা কবিতার কিছু লাইন রেখে দিচ্ছি তোমাদের জন্য:

খোলা আকাশের নিচে আমাদের যৌথতার রাতকে

যখন চাঁদকে খাঁচা বন্দী করা যাবে না। 

হম দেখেঙ্গে! (আমরাও সাক্ষী থাকবো)

ভালোবাসায়, বিদ্রোহে,

নাতাশা 

৭/১২/২০২১

বি: দ্র: এই শীতটাও আবার বিদ্রোহের শীত হয়ে উঠছে দেখে ভরসা পাচ্ছি। মানুষ আবার রাস্তায় নেমেছে প্রতিবাদে, প্রতিরোধে। কত স্মৃতি যে উস্কে দিচ্ছে বলে বোঝাতে পারবো না। 

এক তরুণীর কথা পড়লাম কাগজে। বাবা-মায়ের সঙ্গে প্রতিবাদে নেমেছে সেও নিজেকে কৃষক মনে করে বলে। রাতে প্রতিবাদ স্থলে যায়। মনে ভরে গেল পড়ে। চোখে জল এল। কখনও ওই মেয়েটির সঙ্গে আলাপ করতে চাইব। প্রতিদিন আমরা খবরের কাগজের জন্য অধীর আগ্রহে থাকি। প্রতিটা ছবি প্রায় দশ বার দেখি। 

২৩/২/২০২০

সময়ের দ্রুত গতিও এখানে আশ্বস্ত করে — এক বছর হয়ে গেল। সেই উত্তাল মুহুর্তের এক বছর, যে দিনগুলি আজ আমাদের এই অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে। কদিন আগেই আমরা আলোচনা করছিলাম কোনো ঐতিহাসিক মুহুর্তের সাক্ষী হওয়া, কোনো ঐতিহাসিক ঘটনায় অংশ নেওয়ার সময়ে মানুষের ঠিক কী অনুভূতি হয় — রাজতন্ত্রের পতন, উপনিবেশবাদের অবসান, দাসপ্রথা রদ, ফ্যাসিবাদের পরাজয়, এমার্জেন্সির শেষ — কী দেখেছি আমরা? তা কী তাৎপর্য বহন করবে আমাদের ভবিষ্যতে? 

… সেই বাজির (জাফরাবাদ অবস্থানের এক বয়স্ক নারী) কথা খুব মনে পরে, যিনি তাঁবু সামান্য সরাতে সরাতে হেসে বলেছিল, “যবে থেকে চোখ ফুটেছে, ঘরের চার দেওয়ালই আমার কাছে দিল্লি ছিল। এখন রাত ৩ টেয় রাস্তায় বসে আছি… যা যা কখনও কল্পনাও করিনি তাই করছি…।”

… এক সন্ধেয় অল্প মন খারাপ, মন ঠিক করতে আকাশে মেঘের কারসাজি দেখছি, এমন সময়ে একটি বাচ্চা আমার পাশে শুয়ে জিজ্ঞেস করলো, “দেবাঙ্গনা আকাশ কোথা থেকে আসে?” ওর পরের প্রশ্নটা আরো অবাক করেছিল, “আকাশ ঘর থেকে এসেছে কি?” ও এখানেই বড় হয়েছে, তাই ঘরের কথা ভাবলেই উত্তেজিত হয়ে পড়ে, ঘরের জন্য অধীর আগ্রহে থাকে, সেই ঘর যা অন্যরা ছেড়ে আসতে চায়। ও কাকাদের দেখলে ভয় পায়। কোনো পুরুষ পুলিশ কিংবা জেলের কর্মীকে দেখলেই লুকিয়ে পড়ে। ছেলেটি ফ্রক পরতে খুব ভালোবাসে, প্রায়ই ওকে মেয়ে ভাবা হয়। একদিন আমাকে এসে চুপি স্বরে বলল, “তুমিও আমার সঙ্গে বাইরে যাবে? আমার না খুব ভয় করে!” “কাকে?” ‘আঙ্কেলকে”। 

১৪/৩/২০২১

এক শান্ত রোববার। বসন্তের শুরুতে, আমাদের পার্কে জামা কাপড় টাঙ্গাবার তারে গা ঝুলিয়ে টুনটুনি পাখিরা বাসা বেঁধেছে। শহরের স্কাইস্ক্রেপার ভেদ করে নিশ্চই আগুন ফুল ফুটেছে? 

… এই মাসের শুরুটা খুব উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। ৬ নং জেল ডুবে ছিল ৮ মার্চ উদযাপনে। আমরা একটা আবেদন করেছিলাম ওই দিনটি উদযাপনের জন্য। ঠিক যেরকম চল ছিল। দিনটির আগের তোড়জোড় একটা অন্য সক্রিয়তা এনে দিয়েছিল সবার মধ্যে। যারা বহু বহু বছর ধরে কারাবন্দী, তাদের কাছে এটা অনেকটা স্বাভাবিকতায় ফেরার মতো। করোনার একঘেয়েমি কেটেছিল। সময় কাটানো সহজ করে দিয়েছিল। সাথীদের সঙ্গে এই দিনটির ইতিহাস, এই দিনটির তাৎপর্য ভাগ করে নেওয়া, একসঙ্গে অনুষ্ঠানের রিহার্সাল দেওয়া, এক এক জনের এক এক রূপ দেখা, বিভিন্ন চরিত্র তৈরি করা, বিভিন্ন চরিত্র হয়ে ওঠা, তোতলাতে তোতলাতে হোঁচট খেতে খেতে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসের সাথে ডায়েলগ বলা, একে অপরের সঙ্গে কাজ করা, একসঙ্গেনাটক করা, ‘তোড় তোড়কে…’ গানটার কথা মুখস্থ করার আনন্দ…

… নাটকের চিত্রনাট্য খুব সহজ ছিল। চরিত্র, সংলাপ সব ধীরে ধীরে একসঙ্গে তৈরি করা… এই এত মাসের গড়ে ওঠা সম্পর্ক, বন্ধুত্বের জোরেই কুড়িজন সহবন্দী মিলে একসাথে পরিবেশনা করা… 

… দিনশেষে সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়তাম। সে ক্লান্তি বছরের পর বছর কারারুদ্ধ হয়ে থাকার ক্লান্তি নয়। এ অনেক অনেক নতুন সম্ভাবনার সম্মুখীন হয়ে উত্তেজনা-উদ্দীপনায় টগবগ করার ক্লান্তি — খুব চেনা এক অনুভুতি — সারাদিনের প্রচারের শেষে, মিটিং-এ আলোচনা কিছু সম্ভাবনার দিকে পৌঁছলে, রাতব্যাপী প্রতিবাদ প্রতিরোধে যেরকমটা হত! এত মাস ধরে যা উপলব্ধি করছিলাম সেই ভাবনারই প্রকাশ হয়েছিল এবারের ৮ মার্চে — ওরা যাই করুক, ওরা যেখানেই ____ (শব্দটি জেল কর্তৃপক্ষ কেটে দিয়েছে), আমাদের কাজ, আমাদের স্বপ্ন কিছুতেই থামবে না। ওরা আমাদের গান গাওয়ার জন্য কয়েদ করেছে, কিন্তু যখন সেই গান জেলের ভেতরেও প্রতিধ্বনিত হবে? তখন কী করবে? কোথায় রাখবে আমাদের? ‘শোষণ দমন কো মিটায়েঙ্গি, ও তো নয়া জমানা লায়েগি…’ (দমন-পীড়ন খতম করবে, ওরাই তো নতুন যুগ আনবে)। 

… জনগণের দাবিতে নাতাতা (এখানে বাচ্চারা ওকে এই নামেই ডাকতে পছন্দ করে) ফাতিমা শেখ হয়েছিল। খুব মজা হয়েছিল, যদিও সবাইকে সময়ে রিহার্সালে আনতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল।

১৬/৩/২০২১

আমাদের নাটকের বেশিরভাগ অভিনেতাই জেলের ভিতর বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত ছিল। জেল কর্তৃপক্ষ আমাদের দাবি মেনে একটা ছোট ছাড় দিয়েছিল। রিহার্সালের জন্য কারও কাজ ফাঁকি হলে তাদের মাইনে কাটেনি। এতে খুবই সুবিধে হয়েছিল। অনেকেরই আশঙ্কা ছিল তাদের কাজ চলে যাবে! 

… এই ভালোবাসার চিঠিগুলো লিখতে থেকো। আমাদের খুব খুব কাছের এগুলো। জানো, এখানে এক বইতে পড়ছিলাম, ফিজির ভারতীয় চুক্তি-শ্রমিকরা ১৯১৪ সালে বা নামক এক জেলার কলোনিয়াল সেক্রেটারিকে দরখাস্ত করেছিল, পোস্ট অফিসে একজন ‘হিন্দুস্তানি’কে নিয়োগ করার দাবি করে যাতে তাদের পোস্টকার্ডে সঠিক ঠিকানা লেখা হয়… ইতিহাস জুড়েই চিঠি কী গুরুত্ব বহন করে… 

ভালোবাসায়, বিক্ষোভে,

দেবাঙ্গনা

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *