লেসবিয়ানস অ্যান্ড গে-স্ সাপোর্ট মাইনার্স

১৯৭৪-এর ইংল্যান্ড। খনি শ্রমিকদের ইউনিয়নের দাপটে টোরি সরকার জর্জরিত। প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হেলথ গণভোটের ডাক দিলেন। প্রশ্ন ছিলঃ কে শাসন করবে তিনি না খনি শ্রমিকরা? ইংল্যান্ডের জনগণ হেলথকেই বিদায় দিলেন। এই অপমানের বদলা নিতেই নিকোলাস রিডলে ট্রেড ইউনিয়নদের বাগে আনবার পরিকল্পনা করলেন যা পরিচিত হয় রিডলে প্ল্যান বা রিডলে রিপোর্ট নামে। কয়লা খনি ব্রিটিশ পুঁজির একদম কেন্দ্রে থাকায় এই প্ল্যানের মূলে ছিল খনি শ্রমিকদের পরাজয়ের নীলনকশা। ১৯৮৪-এ থ্যাচার সরকার ২০টি খনি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রায় ২০,০০০ শ্রমিক কাজ হারান। প্রতিবাদে ন্যাশনাল ইউনিউন অফ মাইনার্স ধর্মঘটের ডাক দিল। 

১৯৬৭ সালেই ইংল্যান্ডে সমকামীতা আইনসিদ্ধ হলেও সমাজ তা মেনে নেয়নি। টোরিদের রক্ষণশীল মনোভাব বারংবার শাসকের রোষানলে ফেলেছে সমকামী মানুষদের। সমাজের চোখ রাঙানি, শাসকের লাঠি, বঞ্চনা, অপমান বুকে নিয়ে আসতে আসতে জোট বাঁধতে শিখছিলেন প্রান্তিক যৌনতার মানুষেরাও। ১৯৭৭-এ তৈরি হয়েছিল নর্থ স্টাফস গে সুইচবোর্ড। শ্রমজীবী সমকামী মানুষদের সাপোর্ট সিস্টেম। কেউ মিল শ্রমিক ঘরের, কেউ কয়লা শ্রমিক ঘরের থেকে আসা, কেউ বা শ্রমিক আন্দোলনের কর্মী। ১৯৮৪-এ খনি শ্রমিকদের ধর্মঘট শুরু হলে তাদের সংহতিতে মার্ক এশটনের নেতৃত্বে তৈরি হয় লেসবিয়ান্স এন্ড গেস সাপোর্ট দ্য মাইনার্স (এলজিএসএম)। তার সাথে সাথেই তৈরি হয়েছিল লেসবিয়ান্স এগেইনস্ট পিট ক্লোসার্স। সমাজের অবজ্ঞা, ঘৃণা, রাষ্ট্রের রক্তচক্ষু সইতে সইতে তারা বুঝেছিল শোষণের মানে। সেখান থেকেই উঠে এসেছিল সংহতির তাড়না। প্রান্তিক মানুষদের সংহতি। লড়াই, সংগ্রামের সংহতি। 

তবে এই পথটা মোটেই মসৃণ ছিল না। সমাজ লালিত বিদ্বেষ, রক্ষণশীলতা, গোঁড়ামি জমাট বেঁধে ছিল সবার মধ্যেই। তাই খনি শ্রমিকদের পক্ষেও এই সমাজ বহিষ্কৃত মানুষদের থেকে আসা বন্ধুত্বের হাত গ্রহণ করা খুব সহজ ছিল না। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যেই ছিল একে অপরের মধ্যেকার তারতম্য নিয়ে সন্দেহ, উদ্বেগ, আশঙ্কা, অবিশ্বাস, আর অনাস্থা। এলজিএসএমের সদস্য ক্লাইভ ব্র্যাডলির বয়ানে, “আমরা অনেকেই বুঝেছিলাম আমাদের অধিকার, আমাদের মুক্তি জড়িয়ে ছিল সমাজের অন্যান্য মানুষদের মুক্তির সাথে, বিশেষ করে শ্রমিক আন্দোলনের সাথে। তাই আমাদের যাপনে আপাতভাবে পার্থক্য যাই থাক, তার থেকেও অনেক বেশি ভাবে আমরা আন্দোলনরত খনি শ্রমিকদের সাথে একাত্ম বোধ করেছিলাম”।  আর এই একাত্মতা থেকেই তৈরি হলো এক নতুন ইতিহাস। 

শ্রমিক ধর্মঘটের সমর্থনে এলজিএসএম-এর কর্মীরা চাঁদা তোলা শুরু করলো। বিভিন্ন দিকে পোস্টার, প্ল্যাকার্ড হাতে প্রচার শুরু করলো খনি শ্রমিকদের সমর্থনে। কিন্তু শুধু অর্থ সংগ্রহ করেই নয়, আন্দোলনের পাশে দাঁড়াতে একটা প্রতিনিধি দল চলে গেল দুলায়েস উপত্যকার শ্রমিক মহল্লায়। এলজিএসএম-এর আরেক সদস্য, ল্যাঙ্কাশায়ারের মিল শ্রমিক পরিবার থেকে আসা, মাইক জ্যাকসন লিখেছিলেন, “প্রথম অনল্যিন মাইনার্স ওয়েলফেয়ার হলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা জীবনেও ভুলবো না। সত্যিই মনে হয়েছিল ঘরে ফিরলাম। ভৌগলিক কিংবা পারিবারিক সুত্রে ঘর না, রাজনৈতিক ভাবে, সামাজিক ভাবে, আবেগগত ভাবে মনে হয়েছিল ঘরে ফিরেছি… আমাদের ব্যানার ওদের ব্যানারের সাথেই টাঙানো ছিল। আমাদের বক্তব্য রাখতে বললে আমরা অ্যান্ডিকে তুলে দিয়েছিলাম। ২০ বছরের অ্যান্ডি প্রায় ২০০-৩০০ শ্রমিকের সামনে কাঁপতে কাঁপতে বক্তব্য রাখতে উঠেছিল… শ্রমিক শ্রেণির সংহতির কথা বলেছিল। ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের কথা বলেছিল। গোটা হল হাততালিতে ফেটে পড়েছিল। আমরা প্রথম থেকেই আমাদের যৌন পরিচয়ের ব্যাপারে সোচ্চার ছিলাম… একসাথে সবাই মিলে নেচেছিলাম, গেয়েছিলাম, কবিতা বলেছিলাম, কয়লা খাদানে ঘুরেছিলাম… একসাথে থাকা, খাওয়া… ওদের বাড়িতেই ছিলাম, ওদের বাচ্চাদের সাথে খেলতাম… কিভাবে নিজের যৌন পছন্দ প্রকাশ করবো ভাবতে হয়নি। সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম, লেসবিয়ান গে মুক্তির লড়াই, শ্রমিক শ্রেণির দৈনন্দিন জীবন সংগ্রাম সব একসাথে জুড়ে গেছিল। তাই মনে হয়েছিল ঘরে ফিরলাম”। বিভিন্ন রকম ভাবে প্রান্তিকায়িত মানুষদের সেই বন্ধুত্ব, সেই আলাপ আসতে আসতে মুছে দিয়েছিল অন্যান্য বিভাজন। 

লন্ডনে শ্রমিক ধর্মঘটের সমর্থনে পিটস অ্যান্ড পার্ভার্টস নামে ফান্ড রেইসিং-এ দুলায়েস ভ্যালি মাইনার্স ইউনিয়নের  তরফ থেকে বক্তব্য রাখতে উঠে ডেভিড ডনোভন বলেন, “তোমরা আমাদের Coal Not Dole (দান নয়, অধিকার চাই) ব্যাজ পড়েছো, তোমরা তোমাদের জীবন দিয়ে বুঝেছ হেনস্থা কী, শোষণ কী। ঠিক যেমন আমরা বুঝেছি। তাই আমরাও তোমাদের লড়াইয়ে পাশে থাকবো। রাতারাতি হয়তো কিছু বদলাবে না। কিন্তু এখন চল্লিশ হাজার খনি শ্রমিক সমকামী মানুষদের, কালো মানুষদের সংগ্রামের কথা জানে, তারা পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের কথাও বলছে। আমরা কেউই আর আগের মতো নই… এর আগে আমরা হয়তো কেউ কেউ তোমাদের প্রতি সমব্যাথী ছিলাম, কিন্তু আমাদের লড়াইটা যে এক তা আগে বুঝিনি। এখন রাষ্ট্রযন্ত্রের আক্রমণে, পুলিশি সন্ত্রাসের সামনে বুক পেতে, মিডিয়ার হেনস্থার সামনে দাঁড়িয়ে তা অনুধাবন করতে পারছি। রাষ্ট্র নিপীড়নের মুখে পড়লেই অন্য নিপীড়িত মানুষদের সহমর্মী হওয়া যায়”। 

লড়াইয়ের ময়দানই হয়ে উঠেছিল শিক্ষাক্ষেত্র। শিখছিল সবাই। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কাঁধে কাঁধে রেখে লড়াই গড়ে তুলছিল মেহনতি মানুষের সংহতি। হারওয়ার্থে যখন পুলিশ গোটা গ্রাম দখল করেছিল, রুখে দাঁড়িয়েছিল সেখানকার মেয়েরা। যখন থ্যাচার সরকার আন্দোলনরত শ্রমিকদের ‘অভ্যন্তরীণ শত্রু’ হিসেবে দাগিয়ে দিচ্ছিল, তখন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনই বুঝিয়ে দিচ্ছিল আসল শত্রু পুলিশ, টোরি সরকার, এবং এই রাষ্ট্র ব্যবস্থা। কিন্তু শ্রমিকদের পক্ষে এক বছরের বেশি এই আপোষহীন ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ মাইনার্স-এর মধ্যেও হরতাল নিয়ে দ্বিমত শুরু হয়েছিল। আদালত মারফত খনি শ্রমিকদের হরতালকে নিষিদ্ধ করে, পিকেটিং লাইনে পুলিশ মোতায়েন করে, শ্রমিকদের বিনা মাইনেতে নিঃস্ব করে তাদের কাজে ফেরত যেতে বাধ্য করেছিল থ্যাচার সরকার। 

আন্দোলন পরাজিত হলেও ততদিনে ব্রিটেনের বুকে এক অন্য ইতিহাসের সূচনা হয়ে গেছে। বামপন্থী আন্দোলনের বুকে নতুন জোয়ার এনে সেই বছর প্রাইড মার্চে এলজিএসএম-এর সমর্থনে পায়ে পা মিলিয়েছিলেন খনি শ্রমিকেরা। নিজেদের ইউনিয়নের পতাকা, ব্যানার নিয়েই। কিছু বছর পর তাই থ্যাচার সরকার, সমকামীতার বিরুদ্ধে এক নতুন আইন পাশ করলো। ‘সেকশন ২৮’। এই আইনের প্রতিবাদে দিকে দিকে বিরোধিতা ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষোভে সামিল হন খনি শ্রমিকেরাও। যদিও সেই আইন রোধ করা যায়নি কিন্তু এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন এই আইনকে সমস্ত দাঁত নখ নিয়ে কার্যকরী হতে দেয়নি। বদল এসেছিল ক্যুয়ার আন্দোলনের মধ্যেও। মধ্যবিত্তের নেতৃত্ব থেকে একটু একটু করে আন্দোলনের রাশ শ্রমজীবী মানুষদের হাতে যাচ্ছিল। ১৯৮৫-এ লেবর পার্টির সম্মেলনে ন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ মাইনার্স-এর ব্লক ভোটে এলজিবিটি মানুষদের অধিকারের পাশে থাকার পক্ষে রেজোলিউশন পাশ হয়েছিল। সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে আরো অনেক অনেক মুষ্টিবদ্ধ হাত এক করে, আরো অনেক লড়াকু মানুষের স্বপ্ন বুকে নিয়ে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছিল পৃথিবীর বুকে। মেহনতি মানুষের বন্ধুত্বের, সংগ্রামের, লড়াইয়ের। 

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *