দাস মেয়ের জীবন, চতুর্থ কিস্তি

আমেরিকার স্লেভ ন্যারেটিভ-এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হ্যারিয়েট জেকব-এর  আত্মজীবনী Incidents in the Life of a Slave Girl । হ্যারিয়েট জেকব-এর জন্ম দাস পরিবারে। পরবর্তীতে মালিক পরিবারের কবল থেকে পালিয়ে নিজের ও নিজের সন্তানদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেন হ্যারিয়েট। তাঁর আত্মজীবনীতে এক দিকে যেমন উঠে এসেছে দাস জীবনের বঞ্চনা ও নিপীড়নের কথা, পাশাপাশিই জায়গা পেয়েছে তাঁদের প্রতিরোধ ও দ্রোহের আখ্যানও। বইটি তিনি লেখেন লিন্ডা ব্রেন্ট ছদ্মনামে। বামা-য় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে এই  আত্মজীবনী, এবারের সংখ্যায় রইল চতুর্থ কিস্তি।

আমার দুশ্চরিত্র লম্পট মালিক দিন-রাত অস্থির হয়ে প্রবল আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ঘুরে বেড়াত, এই যেন কাকে গিলে খাবে। সে সবে আমাকে ছেড়ে গেছিল, হুল ফোটানো কথাবার্তা বলে কান-মাথা জ্বালিয়ে দিয়ে। আমি কী প্রচন্ড ঘৃণা যে করতাম ওই লোকটাকে! আমি ভাবতাম, একদিন যদি হঠাৎ মাটি ফাঁক হয়ে গিয়ে লোকটাকে গিলে নেয়, পৃথিবীর রোগমুক্তি ঘটে!

লোকটা যেদিন আমাকে বলেছিল আমি তৈরিই হয়েছি তার ব্যবহারের জন্য, তৈরি হয়েছি প্রতিটা বিষয়ে তার হুকুম মানার জন্য; আমি কেবল মাত্র একজন দাসী, আমার সব ইচ্ছে আকাঙ্ক্ষাই তার পা-এ সমর্পণ করা উচিত এবং সেটাই করতে আমি বাধ্য, সেই দিনের আগে কখনও আমার পুচকে হাতদুটোকে অত শক্তিশালী মনে হয়নি আমার।    

আমি পরে এটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে এতটাই ডুবে গেছিলাম যে বুঝতেই পারিনি কখন উইলিয়ম ঘরে ঢুকেছে। হঠাৎ-ই কানের খুব কাছে শুনতে পেলাম, “লিন্ডা, কী হয়েছে, মন খারাপ? আমি তো তোকে ভালবাসি, দুনিয়াটা খুব খারাপ, না? সবাইকেই কেমন দুঃখী মনে হয়, মনে হয় সবাই-ই কেমন কষ্টে রয়েছে। বাবা যখন মরে গেল, তখনই আমিও যদি মরে যেতাম ভাল হত। ” 

আমি বললাম সবাই-ই দুঃখে নেই। যাদের একটা হাসিখুশি বাড়ি রয়েছে, নরম মনের বন্ধু রয়েছে, যাদের বন্ধুরা তাদের ভালবাসতে পিছপা হয় না, তারা আনন্দে থাকে। কিন্তু আমরা যারা ক্রীতদাসের সন্তান, যাদের মা-বাবা নেই, তারা আর আনন্দের আশা করে কী করে! আমাদের ভাল হতে হবে, তাহলেই হয়তো জীবনে পরিতৃপ্ত হতে পারব।

“হ্যাঁ” উইলিয়ম বলল, “আমি তো ভাল হওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু লাভ কী? ওরা সারাক্ষণ আমাকে ঝামেলায় ফেলে।” মালিক নিকোলাস-এর ছোটভাই সেদিন তাকে কীভাবে উত্যক্ত করেছে বলে চলে উইলিয়ম। জানা গেল, সেই ভাই উইলিয়মের নামে মিথ্যে গল্প বানিয়ে নিকোলাস-কে জানিয়েছে। নিকোলাস তাতে বলেছে উইলিয়ম-কে চাবুক মারা দরকার ও সে নিজেই তা করবে। মালিক কাজে বেরিয়ে গেলে, ছোট মালিকের সঙ্গে উইলিয়মের হাতাহাতি শুরু হয়। কিছুতেই উইলিয়মকে বাগে না পেয়ে, সে উইলিয়ম-এর হাত পিছমোড়া করে বেঁধে দেয় কিন্তু তাতেও বিশেষ সুবিধা করতে পারে না। লাথি ঘুষি মেরে উইলিয়ম বেরিয়ে আসে। উইলিয়ম-এর গায়ে কটা আঁচড় পড়া ছাড়া আর কিছুই হয়নি। 

ছোট মালিকের অমানবিকতার বিষয়ে বলে যেতে থাকে উইলিয়ম। বলে কীভাবে সে ছোট ছোট ছেলেদের চাবুক মারে, কিন্তু নিজের বয়সী সাদা ছেলেদের সঙ্গে মারপিট বাধতেই ভয়ে গর্তে লুকোয়। উইলিয়ম-এর আরও অভিযোগ ছিল। বলে কীভাবে ছোট মালিক, তার এক পয়সাগুলোর ওপর চকচকে পারদ ঘষে সেগুলি চার-আনা বলে চালিয়ে দেয় বুড়ো ফলওয়ালার কাছে। উইলিয়মকে মাঝে-সাঝেই ওই বুড়োর কাছে ফল কিনতে পাঠানো হয়। উইলিয়ম জানতে চায় এই পরিস্থিতিতে তার কী করা উচিত। আমি বলি, সেই বুড়ো মানুষটাকে ঠকানো একেবারেই অনুচিত। উইলিয়ম-এর দায়িত্ব, তাকে সত্যিটা জানান, তাকে বলা ছোট মালিক কীভাবে তাকে ঠকাচ্ছে। উইলিয়ম-কে আমি আশ্বস্ত করি, সেই বুড়ো ফলওয়ালা খুব সহজেই বুঝে যাবে ব্যাপারটা কী ঘটছে, আর এটা বন্ধ হবে। উইলিয়ম বলে সেই বুড়োর সঙ্গে হয়তো এটা আর হবে না, কিন্তু উইলিয়ম-এর সঙ্গে এটা চলবেই। উইলিয়ম বলে চাবুকের আঘাতকে সে ভয় পায় না, কিন্তু তাকে চাবুক মারা হচ্ছে এই ভাবনাটাই তাকে যন্ত্রণা দেয়।     

আমি যখন ওকে ভাল হতে বলছিলাম, বলছিলাম ক্ষমা করে দিতে, আমি জানতাম আমার চোখ জ্বলছে। আমি আমার নিজের অক্ষমতার কথা জানতাম আর তাই চাইতাম, যদি সম্ভব হয়, আমার ভাই-এর ভগবান প্রদত্ত স্বভাবের কিছু ফুলকি অন্তত যদি বাঁচিয়ে রাখতে পারি। চোদ্দ বছরের ক্রীতদাসের জীবন আমি এমনি এমনি কাটাইনি। আমি অনেককিছু দেখেছি, শুনেছি, বুঝতে শিখেছি এবং তা আমার চারপাশের মানুষের চরিত্র বোঝা, তাদের উদ্দেশ্যকে প্রশ্ন করার জন্য যথেষ্ট। আমার জীবনের যুদ্ধ সবে শুরু হয়েছিল, এবং ভগবানের তৈরি সবথেকে অকিঞ্চিতকর জীব হওয়া সত্ত্বেও আমি ঠিক করেছিলাম আমি কখনই হারব না। কী দুর্ভাগ্য! 

জানতাম, আমার জন্য যদি কোনও একমাত্র বিশুদ্ধ রোদ ঝলমলে কোণা থেকে থাকে, তা হল বেঞ্জামিনের মনটা, আর আরেকজনের হৃদয়, যাকে একটি মেয়ের প্রথম প্রেমের আকুলতা দিয়ে আমি ভালবেসেছি। আমার মালিক সেটা জানত, আর যতরকম ভাবে সম্ভব আমাকে যন্ত্রণা দিতে তারা তৎপর ছিল। মারধর আমাকে করত না, কিন্তু মানুষ যতটা নীচ হতে পারে, যত রকম নির্মমতা দেখাতে পারে, সবকিছুই চলত আমার ওপর। 

প্রথমবার যেদিন শাস্তি পেয়েছিলাম আমার মনে আছে। ফেব্রুয়ারি মাস। আমার দিদা আমার পুরনো জুতোজোড়া বদলে নতুন একজোড়া জুতো এনে দিয়েছিল। নতুন জুতোটা আমার দরকার ছিল। বরফের ওপর বরফ পড়ে কয়েক ইঞ্চি পুরু হয়ে গেছিল, তাও বরফ পড়া থামে না। মিসেস ফ্লিন্ট-এর ঘর দিয়ে যাওয়ার সময়ে জুতোয় আওয়াজ হয়, তাতে তার পরিশীলিত মননে আঁচড় লাগে। আমাকে ডেকে জানতে চায়, এমন ভয়ানক বিচ্ছিরি আওয়াজ হচ্ছে কেন, আমি কী করছি! আমি বলি আমার নতুন জুতোর শব্দ। “খুলে ফেল”, মিসেস ফ্লিন্ট বলে, “ফের যদি এটা কোনওদিন পরেছিস, ওটা আমি ছুঁড়ে আগুনে ফেলে দেব।” আমি জুতো খুলে ফেলি, স্টকিংটাও খুলি। তারপর সে আমাকে অনেক দূরে একটা কাজে পাঠায়। বরফের ওপর দিয়ে যেতে দিয়ে আমার খালি পা শিরশির করে ওঠে। সেদিন রাতে আমার মনমেজার খিঁচড়ে ছিল। বিছানায় শুয়ে ভাবি পরদিন আমি অসুস্থ হব, মরেও যেতে পারি। কী দুঃখ, পরদিন দেখি আমি শরীর বেশ ভালই।

আমি ভেবেছিলাম আমি যদি মরে যাই, বা কিছুদিনের জন্য শয্যা নিই, মালকিনের হয়তো একটু অনুশোচনা হবে। ভাবছিলাম, “ক্ষুদে শয়তান”-কে এতটা ঘেন্না করার জন্য খানিক অনুতপ্ত হবে। আমাকে ওই নামেই ডাকত মালকিন। এটা ভাবা অবশ্য আমারই বোকামি।

ড.ফ্লিন্ট-এর কাছে কখনও কখনও প্রস্তাব আসত আমাকে চড়া দামে বেচার। আর সে সবসময়ই বলত, “ও তো আমার সম্পত্তি নয়, আমার মেয়ের সম্পত্তি। আমার ওকে বেচার কোনও অধিকারই নেই।” কী ভাল আর সৎ মানুষ! আমার ছোট্ট মালকিন তখনও শিশু, আমাকে রক্ষা করার কোনও ক্ষমতাই তার ছিল না। আমি তাকে ভালবাসতাম, সেও আমাকে। একদিন তার বাবা কথা প্রসঙ্গে আমার প্রতি বাচ্চাটার টানের কথা বলে, সঙ্গে সঙ্গে তার বউ বলে ওঠে ওটা ভালবাসা নয় ভয়। এর থেকে আমার মাথায় একটা সন্দেহ ঢোকে। তাহলে কী বাচ্চাটা শুধুই ভান করছে, আসলে কোনও ভালবাসাই নেই? নাকি আমাকে ভালবাসায় তার মায়ের হিংসা হচ্ছে? আমি ভেবে দেখলাম দ্বিতীয়টাই নিশ্চয়ই সত্যি। আমি নিজেকে বললাম, “ছোট শিশুরাই নিশ্চয়ই সত্য।”

একদিনে বিকেল বসে সেলাই করছিলাম, মন ভারী হয়ে ছিল। মালকিন আমাকে কিছু একটার জন্য দোষারোপ করেছিল। আমি বলেছিলাম আমি কখনই সেটা করিনি, আমি নিরাপরাধ। কিন্তু মালকিনের বাঁকা ঠোঁট দেখে বুঝেছিলমা, সে বিশ্বাস করছে যে আমি মিথ্যে বলছি।

ভাবছিলাম কিসের জন্য ভগবান আমাকে এমন পীড়ার মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, আরও অন্ধকার দিন কি আমার জন্য অপেক্ষা করছে। এসব আবোলতাবোল ভাবছি, এমন সময়ে আলতো হাতে দরজা খুলে উইলিয়ম ঢুকল। “ভাই, তুই!” আমি বললাম, “আবার কী হল?”

“লিন্ডা, বেন আর তার মালিকের মধ্যে ভয়ানক ঝামেল হয়েছে!” ও বলল।

প্রথমেই আমার মাথায় এল বেন নিশ্চয়ই খুন হয়েছে। “ঘাবরিও না,” উইলিয়ম বলল, “আমি বলছি তোমাকে সবটা।”

বেঞ্জামিনের মালিক ওকে ডেকে পাঠিয়েছিল, ও সঙ্গে সঙ্গে যায়নি। ও যতক্ষণে গেছে, মালিক ততক্ষণে ক্ষেপে গেছে। যাওয়ার সাথে সাথে ওকে বেত মারতে শুরু করেছে। বেন বাধা দেয়। মালিক ও দাসের লড়াই হয়, শেষ পর্যন্ত মালিককে ছুঁড়ে ফেলে বেন। বেঞ্জামিনের ভয় পাওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল। ও ওর মালিককে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলেছে– শহরের সবথেকে বড়লোকদের মধ্যে একজনকে। আমি উদ্বিগ্ব হয়ে ফলাফলের অপেক্ষা করছিলাম।

সেই রাতে আমি লুকিয়েৃচুরিয়ে আমার দিদার বাড়ি যাই। বেঞ্জামিনও মালিকে লুকিয়ে সেখানে আসে। দিদা তখন গ্রামের দিকে এক বন্ধুর বাড়ি গেছে দিন দুয়েক কাটিয়ে আসতে।

বেঞ্জামিন বলে, “আমি তোমাকে বিদায় জানাতে এসেছি। আমি চলে যাচ্ছি।”

আমি জানতে চাইলাম কোথায়।

“উত্তরে,” ও জানায়।

আমি ওর দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলাম ও সত্যিই চলে যাচ্ছে কি না। ওর কঠিন চোয়াল দেখে বুঝলাম ও মন ঠিক করে ফেলেছে। অনুরোধ করলাম না যেতে, কিন্তু ও আমার কথায় পাত্তা দিল না। বলল, ও আর ছোট ছেলেটি নেই, এই দাসত্বের জোয়াল টানা ওর কাছে রোজ আরেকটু করে কঠিন হয়ে উঠছে। ও ওর মালিকের গায়ে হাত তুলেছে, এর জন্য জন সমক্ষে ওকে চাবুক মারা হবে। আমি বললাম, ওখানে অচেনা অজানা লোকের মধ্যে চরম দারিদ্র্য আর কষ্টে ওকে দিন কাটাতে হবে। বললাম, ও যদি ধরা পড়ে ওকে ফিরিয়ে আনা হবে, আর তারপর যে কী হতে পারে সে কথা ভাবতেও ভয় করে। 

বেঞ্জামিন বিরক্ত হয়, বলে, দারিদ্র্য ও কষ্টের সঙ্গে যদি স্বাধীনতা পাওয়া যায়, তা আমাদের এই দাসত্বের জীবনের থেকে ভাল নয় কী! “লিন্ডা” বেন বলে চলে, “আমরা এখানে কুকুর, পায়ে খেলার বল, গরু-ছাগল, যা কিছু হীন। না, আমি থাকব। ফিরিয়ে আনুক আমায়। মরব তো একবারই।”

ঠিকই বলছিল। কিন্তু ওকে যেতে দিতে মন চাইলছিল না। “যাও”, আমি বললাম, “মায়ের মনে দুঃখ দাও।” 

কথাটা আমার মুখ থেকে বেরনোর সাথে সাথে অনুতাপ হল।  

“লিন্ডা,” সেদিন বিকেলে এই গলায় ওকে আর কথা বলতে শুনিনি, “এটা কী করে বললে তুমি? বেচারা মা! মা-কে ভাল রেখ, নিজেও ভাল থেকো। ফ্যানিকেও।”

ফ্যানি একজন বন্ধু যে কিছু বছর আমাদের সঙ্গে ছিল। 

দুজন দুজকে বিদায় জানালাম। সেই উজ্জ্বল কোমল মনের ছেলেটা, যে আমাদের জীবন ভালবাসায় ভরিয়ে রেখেছিল, আমাদের চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল।

ও কীভাবে পালিয়েছিল সে কথা আর বলার দরকার নেই। এটুকু বলাই যথেষ্ট, ও যখন নিউ ইয়র্ক-এর পথে, তখন এক বিরাট ঝড় আসে। জাহাজের ক্যাপ্টেন বলে সবচেয়ে কাছের বন্দরে ওকে নেমে যেতে হবে। বেঞ্জামিন জানত, বাড়ির কাছাকাছি সবকটা বন্দরে ওর নামে বিজ্ঞাপন পড়েছে নিশ্চয়ই। ক্যাপ্টেন ওর অস্বস্তি টের পায়। ওরা যে বন্দরে গেছিল সেখানে বিজ্ঞাপন ক্যাপ্টেন-এর চোখে পড়ে। বিজ্ঞাপনেক বিবরণের সঙ্গে বেঞ্জামিনের চেহারা পুরোপুরি মিলে যাওয়ায়, ক্যাপ্টেন ওকে ধরে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখে। ঝড় থামলে জাহাজ নিউ ইয়র্কের দিকে যায়। বন্দরে পৌঁছনোর আগে বেঞ্জামিন তার শিকল খুলে সেগুলো জলে ফেলে দেয়। জাহাজ থেকে বেঞ্জামিন পালায়। কিন্তু ওকে ধাওয়া করা হয়। বন্দী করে মালিকের কাছে ফিরিয়ে আনা হয়।  

দিদা বাড়ি ফিরে যখন জানতে পারে তার সবথেকে ছোট ছেলে পালিয়ে গেছে, তার কষ্টের শেষ ছিল না। কিন্তু তার স্বভাবজাত ধর্মনিষ্ঠায় দিদা বলে, “ভগবান যা চাইবে তাই হবে।” প্রতিদিন সকালে দিদা খোঁজ নিত ছেলের কোনও খবর এসেছে কিনা। খবর এসেছিল। মালিক একটা চিঠিতে আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করেছিল সে তার সম্পত্তি পুনরূদ্ধার করেছে।

আমার সবটা এত স্পষ্ট মনে আছে যে মনে হয় যেন গতকালের ঘটনা। দেখলাম ওরে শিকল পড়িয়ে রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জেলে। ওর মুখ চোখ বিবর্ণ, অথচ সেখানে দৃঢ় প্রত্যয়। একজন নাবিকের হাতে পায়ে ধরে ও বলেছিল ওর মাকে খবর দিতে যাতে সে ওর সাথে দেখা না করে। বলেছিল, মায়ের যন্ত্রণা দেখলে ও আত্মনিয়ন্ত্রণ হারাবে। ছেলেকে দেখার জন্য দিদা আকুল হয়ে উঠেছিল, তাই গেছিল, কিন্তু ভীড়ের মধ্যে লুকিয়ে ছিল, কারণ ছেলে যা বলেছে তা সত্যিই হতে পারে।  

আমাদের বেন-এর সাথে দেখা করার অনুমতি ছিল না। কিন্তু আমরা জেলারকে বহু বছর চিনতাম। তার মনটা নরম। মাঝরাতে আমার আর দিদার জন্য জেলের দরজা খুলে দেয় জেলার। আমরা ছদ্মবেশে ঢুকি। ঢোকার সময়ে আমরা টু শব্দটি করিনি। “বেঞ্জামি! বেঞ্জামিন!” দিদা ফিসফিস করে ডাকে। কোনও উত্তর নেই। “বেঞ্জামিন!” দিদা খানিক আমতা-আমতা করে। শিকলের ঝনঝনানি শোনা যায়। সবে চাঁদ উঠেছে, জানলার গরাদ দিয়ে কাঁপা কাঁপা আলো এসে পড়েছে। হাঁটু গেড়ে বসে বেঞ্জামিনের ঠান্ডা হাতটা আমাদের হাতে তুলে নিই। আমরা কথা বলছিলাম না। ফোঁপানির শব্দ শোনা যায়, বেঞ্জামিনের ঠোঁটটা অল্প খোলা; ওর মা ওর কাঁধের ওপর কাঁদছে। সেই দুঃখের রাতটার স্মৃতি আজও কত স্পষ্ট! মা ও ছেলে একসাথে কথা বলে। বেঞ্জামিন মায়ের কাছে ক্ষমা চায় তাকে এই কষ্টের মধ্যে ফেলার জন্য। দিদা বলে ক্ষমা করার কিছুই নেই, স্বাধীনতার আকঙ্ক্ষাকে তো দোষ দেওয়া যায় না। বেঞ্জামিন বলে ধরা পড়ার পর সে হাত ছাড়িয়ে পালিয়েছিল, নদীতে ঝাঁপ দিতে গেছিল, কিন্তু তখনই তার মায়ের কথা মনে পড়ে, নিজেকে আটকায়।  

দিদা জিগেস করে ভগবানের কথাও কি তার মনে পড়েনি! আমার কল্পনায় আমি দেখতে পাই চাঁদের আলোয়ে বেঞ্জামিনের মুখটা কঠোর হয়ে ওঠে। সে উত্তর দেয়, “না, ভগবানের কথা আমার মনে হয়নি। একজন মানুষ যাকে বন্য জন্তুর মতো তাড়া করা হচ্ছে, সে ভুলে যায় যে ভগবান আছে, স্বর্গ আছে। রক্তখেকোদের হাত থেকে বাঁচাই তখন তার একমাত্র লক্ষ্য, আর কিছুই তার মাথায় থাকে না। ”  

“এভাবে বলে না বেঞ্জামিন”, দিদা বলে। “ভগবানের ওপর বিশ্বাস রাখ। নরম হ সোনা আমার, মালিক তোকে ক্ষমা করে দেবে।” 

“কিসের জন্য ক্ষমা মা? আমার সাথে কুত্তার মতো ব্যবহার করতে বাধা দেওয়ার জন্য? না! আমি কোনওদিন ওই লোকটার কাছে নত হব না। আমি শুধু শুধু সারাটা জীবন ওর জন্য কাজ করে গেছি, বদলে পেয়েছি চাবুকের বাড়ি আর জেলের গরাদ। আমি মরে যাওয়া অবধি এখানে থাকব, অথবা যতদিন না আমাকে বিক্রি করে দিতে পারছে।  ”

ওর কথা শুনে বেচারী তার মা কেঁপে ওঠে। মনে হল বেঞ্জামিনও বুঝেছে, কারণ ওর গলা শান্ত হয়ে এল। “আমার জন্য অস্থির হয়ো না মা, আমি তার যোগ্য নই।” সে বলে। “তোমার কিছু গুণ যদি আমি পেতাম মা। তুমি সব কিছু ধৈর্য্য ধরে সহ্য কর, যেন তুমি মেনেই নিয়েছ যা হয়েছে ঠিকই হয়েছে। আমিও যদি তা পারতাম।”

দিদা বলে সেও চিরদিনই এরকম ছিলনা। একদিন সেও বেঞ্জামিনের মতোই ছিল; কিন্তু যখন তাকে কঠিন সমস্যার মধ্যে পড়তে, দগদগে ঘা তৈরি করে যে সমস্যা, তখন তার কেউ ছিল না যার কাছে সে যেতে পারে, সান্ত্বনা খুঁজতে পারে, তখনই সে ভগবানকে ডাকতে শেখে, ভগবান তার ভার লাঘব করে। বেঞ্জামিনকেও তাই-ই করতে বলে দিদা।

আমাদের ধার্য সময়ে শেষ হয়ে গেছিল, তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে আসি আমরা।

                                                                                                                    (চলবে) 

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published.