ট্রেন কাহন

এ বছর ৫ই মে, রাজ্য সরকার সর্বসাধারণের জন্য ট্রেন চলাচল বন্ধ করল। আগের বছর, ২০২০ তে, ২১শে মার্চ থেকে শুরু করে এবছরের প্রায় জানুয়ারী অবধি এ রাজ্যে লোকাল ট্রেন বন্ধ ছিল। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। দূর পাল্লার ট্রেনও বন্ধ ছিল বহুদিন। এবং সর্বত্র সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে করোনা (কোভিড ১৯) মোকাবিলা করার জন্য গণপরিবহন বন্ধ রাখা একটি অত্যন্ত জরুরি পদক্ষেপ।  

অথচ হাজার হাজার মানুষের প্রাণ ভোমরা এই লোকাল ট্রেন। ট্রেনে মানুষ শুধু যাতায়াত করে না, অনেক মানুষের জীবনটাই ট্রেন। নামখানার যেই সুমিত্রা দিদি ভোর চারটেয় ট্রেন ধরে মাছ বেচতে যায়, বা লালগোলার হাসিনা, যার ২৪ ঘণ্টার ১০ ঘণ্টাই কাটে ট্রেনে, কয়টা সব্জি বেচে রোজগার করবে বলে, তারা ট্রেন ছাড়া জীবন নির্বাহ করবে কিভাবে? যাদের ব্যবসা রেলগাড়িতেই, তাদেরই বা কী উপায়? মনে পড়ে যায়, আমার এক অবস্থাপন্ন পরিচিত বলেছিলেন যে রিলায়েন্স বা স্পেন্সার বা বিগ বাজারের সাথে এদের ‘টাই-আপ’ করিয়ে দিলেই নাকি কেল্লা ফতে! আমরা অনেকেই এরকম ভেবে আলপটকা বলে ফেলি, ভাবি না যে বহুজাতিকরা মাল দালালদের থেকে কেনে, ছোট ব্যাবসায়ীদের সাথে কাজ করতে তাদের বয়ে গেছে। কিন্তু খেটে খাওয়া মানুষেরা জানে যে আজকে যে বেগুন সে ১০ টাকায় শিয়ালদহ তে বিক্রি করে, কাল বহুজাতিকের জাঁতাকলে পড়লে সেই একই বেগুনের জন্য সে দাম পাবে সাকুল্যে ৫ টাকা বা হয়ত আরও কম। তা বাবু বিবিরা বলবে, এই বাজারে তাই বা দেয় কে? অথচ, সাউথ সিটি মলে গিয়ে, সেই একই বেগুন ৫০ টাকায় কিনতে তাদের বাধে না। সেটা যে ‘হাইজিনিক’ এবং ‘ফ্রেশ’! ট্রেনের মাসিদের মতো নোংরা না!  

কী নিগূঢ় বর্ণবিদ্বেষ লুকিয়ে থাকে এই কথা গুলোর মধ্যে! আমাদের মূল্যবোধগুলো যে আসলে কতটা ফাঁপা, এই করোনা  অতিমারির বন্ধ ট্রেনকাল চোখে আঙ্গুল দিয়ে তা বুঝিয়ে দেয়। যে গৃহশ্রমিকরা, ট্রেনে করে কলকাতা শহরে এসে, আমার আপনার বাড়ি পরিষ্কার করে, গুছিয়ে দিয়ে যায়, রান্না করে, তাদের রোজগারের উপায় আজকে বন্ধ। ট্রেন না চালানোর এই অবিমৃশ্যকারী সিদ্ধান্ত, তাদের পেটে লাথির কম নয়। আগেরবারের  লকডাউনের গৃহশ্রমিকদের স্মৃতিচারণাতেই শোনা যায় কাজের বাড়ির মালিকদের হাতে মানসিক অত্যাচারের কথা। কেউ তাদের বহুতল বাড়িতে লিফটে উঠতে দেয়নি, কেউ ঘরে ঢোকার আগে স্নান করতে বাধ্য করেছে (স্নানের সামগ্রী অবশ্যই মালিক দেয়নি), আবার কেউ কেউ ট্রেনে যাতায়াত করছে বলে কাজ থেকেই ছাড়িয়ে দিয়েছে। লকডাউন হয়েছে বলে মাইনে পাননি বহু গৃহশ্রমিক। আমাদের ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’-এর দুনিয়া ভাবেই না তাদের কথা যারা হোমে বসে থাকলে কোন ওয়ার্কই থাকবে না।

ট্রেন বন্ধ না করলে নাকি করোনাকে বাগে আনা যেত না/ যাচ্ছিল না। অথচ করোনা মোকাবিলার যে মূল স্তম্ভ, সেগুলো জোরদার করতে নারাজ সরকার। না ছিল পর্যাপ্ত অক্সিজেন, না ছিল হাসপাতালে বেড, পর্যাপ্ত আপতকালীন ওষুধ বা ভ্যাকসিনও ছিল না প্রায়। দেশের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো যে কী আবস্থায় আছে, তা প্রতিদিন প্রতিনিয়ত আরও নগ্ন হচ্ছে। সাথেই জুড়েছে স্বাস্থ্য নিয়ে টাকার খেলা।  কিন্তু বাবু-বিবিদের তাতে কী? ১০০ জন ট্রেন চালকের করোনা হয়ে গেল এপ্রিল মাসে। তাদের জন্য না ছিল ভ্যাকসিন না চিকিৎসার সুব্যবস্থা। আসলে যেই জিনিসগুলির দরকার ছিল, ভ্যাকসিন ও পোক্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, সেগুলির অভাব ও সরকারি অক্ষমতা ধামা চাপা দিতেই ট্রেন বন্ধ করা হলো। মসৃণ করে দেওয়া হলো রেল বেসরকারিকরণের রাস্তা। হাজার হাজার শ্রমিকদের পায়ে হেঁটে কয়েকশো মাইল অতিক্রম করে বাড়ি ফিরতে হয়েছিল। খেটে খাওয়া মানুষ রাস্তায়, অভুক্ত অবস্থায়, মাল গাড়িতে পিষে মারা গেল রেল ট্র্যাকে। দায় নিল না সরকার। মানুষের কাছে পৌঁছে দিল না রেশন, উলটে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের তালিকা থেকে বাদ দিল অতি-আবশ্যক সামগ্রী। 

কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ উপেক্ষা করে নির্বাচন চলল। নির্বাচনের জন্য যেভাবে করোনা সংক্রমণ বাড়ল তার দায় নিল সরকার? মাশুল দিতে হচ্ছে স্টেশন চত্বরে কাজ করা মানুষগুলোকে, দিন আনি দিন খাওয়া, ট্রেনের ব্যবসায়ীদের। এ দেশে কুম্ভ মেলা হয়। ভ্যাকসিন খোলা বাজারে বিক্রি হয়। অক্সিজেন বিক্রি করে দেওয়া হয় প্রথম বিশ্বে। পার্ক, মাঠ শ্মশান হয়। গঙ্গায় ভাসতে থাকে দেশবাসীর লাশ। আর খেটে খাওয়া মানুষ মরতে থাকে খিদেয়, বাড়ি ফেরার পথে, রেল লাইনে।

সরকার নিদান দেয়ঃ  সবাই বাড়িতে থাক, সুস্থ থাক। 

কিন্তু যারা বাড়িতে সুস্থ থাকতে পারছে না তারা? যারা দিনের পর দিন গার্হস্থ্য হিংসার শিকার হচ্ছে, এই লকডাউনের জন্য, তারা কোথায় যাবে? ২০১৭ সালে, আমার নিজের এক রিসার্চের কাজে আমি লেডিস কামরার অনেক মহিলাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। তাদের অনেকের জীবনে ট্রেন এবং এই লেডিজ কামরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক দিদি বলেছিলেন, বাড়িতে যখন মারধর করে, ট্রেনে করে পালিয়ে যাই। বাড়িতে সব শান্ত হলে ননদ ফোন করে, তারপর বাড়ি যাই। এখন বাড়িতে মারধর করলে, কী করেন সেই দিদি? কৃষ্ণনগরের এক মাসিমা বলেছিলেন, ওনার যত বন্ধু আছে, সবাই এই ট্রেন থেকেই পাওয়া। সেই সময়ে মাসিমার কোন ফোন ছিলো না, বন্ধুদের সাথে রোজ দেখা হত বলেই হয়ত আর কিনে ওঠেননি। আজকে আবারও ট্রেন বন্ধ, সেই মাসিমা কি বন্ধুদের সান্নিধ্য ফিরে পেয়েছিলেন? ফোন কি উনি অবশেষে কিনলেন? জানার উপায় নেই…  

একজন পিএইচডি ছাত্রী, তার বাড়ি হুগলীতে, আমায় বলেছিল যে ট্রেন তাকে শুধু উচ্চশিক্ষার কাছে পৌঁছে দিয়েছে এটা ভাবলে ভুল ভাবা হবে। ট্রেনের এই রোজকার সফর, জীবনের বহু মূল্যবান জিনিস তাকে শিখিয়েছে। বিভিন্ন ধরনের মানুষের সাথে কিভাবে তাল মিলিয়ে চলতে হয়, এটা ও ট্রেন থেকেই শিখেছে।  বাড়িতে শেখা, ‘কাজের মাসিরা চোর, গরীব লোকেরা নোংরা’ কথাগুলো যে আদতে মিথ্যে ও বর্ণবিদ্বেষী, সেটাও ও প্রথম শহরে পড়তে এসে ট্রেনেই শেখে। আজকে যখন বাড়িতে বসেই এম-এ পাশ করা যাচ্ছে, এই জীবন শৈলী শিক্ষার অন্যতম রাস্তাটাও যেন বন্ধ হয়ে গেল। ভাবতে ভয় হয় যে নারী স্বাধীনতার লড়াইয়ের অনেক কষ্টে পাওয়া অধিকার – বাড়ির বাইরে বেরনোর, কলেজ যাওয়ার, পড়তে যাওয়ার, ঘুরতে যাওয়ার তাতে লোকাল ট্রেন, ট্রেনের লেডিজ কামরার ভূমিকা অন্যতম। এই বাড়িতে থাকার, বাড়িতে রাখার অজুহাতে সেই অধিকারগুলোও খর্ব না হয়ে যায়! করোনা তো আসবে, যাবে। দেশে করোনার থেকে টিবিতে বেশি লোক মারা যায়, কিন্তু তার জন্য ট্রেন আটকে থাকে না, তার জন্য চিকিৎসা হয়। করোনা আটকাতে গিয়ে মানুষের রুটি রুজির চরম সর্বনাশ করে কার হাত শক্ত করা হচ্ছে? সর্বসাধারণের বিনামূল্যে টিকাকরন আর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নত না করলে কোনদিনই সম্পূর্ণভাবে করোনা মোকাবিলা করা যাবে না। কতদিন আর বাড়িতে বসে থাকবেন? মধ্যবিত্ত বাঙালি আমরা, ঘুরতে গেলেও সেই ট্রেনে চেপেই যেতে হবে।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *