লকডাউন ও ঋতুস্রাব – ঋতুস্রাব স্বাস্থ্য মাসে ফিরে দেখা

২৮/৫। অর্থাৎ মে মাসের ২৮ তারিখ। তা স্বীকৃত হয়েছে বিশ্ব ঋতুস্রাব স্বাস্থ্য সচেতনতা দিবস হিসেবে৷জার্মানীর WASH UNITED ২০১৩ সালে এই দিবস পালন শুরু করে। ২৮/৫ কে বেছে নেওয়ার কারণ, সচরাচর মাসিক ঋতুস্রাব ঘটে পাঁচ দিন ধরে ও সচরাচর তা ২৮ দিনের চক্র। অর্থাৎ প্রতি আটাশ দিনের মাথায় তা ফিরে আসে। অবশ্য স্থায়ীত্ব আর দুটি ঋতুস্রাবের মধ্যের ব্যবধান, দুই-ই বদলাতে পারে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে। কারও ঋতুস্রাব হতে পারে ৩৫ দিনের মাথায়, আবার ৩ থেকে সাত দিনের মধ্যের যে কোনো সময়কাল ধরেই তা চলতে পারে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যেহেতু ২৮ আর ৫ এর হিসাবটির দেখা মেলে, তাই এই দিন নির্বাচন। লক্ষ্য ছিল ঋতুস্রাব নিয়ে নীরবতা ভাঙা, সচেতনতা বাড়ানো, তা নিয়ে বৈষম্যমূলক সামাজিক আচরণবিধির বদল ঘটানো, ঋতুস্রাবের সম্মুখীন যাতে স্বাস্থ্যকর উপায়ে হওয়া যায়, যাতে পরিচ্ছন্ন জল, স্যানিটারি ন্যাপকিন ইত্যাদি অন্তত নারী ও কিশোরীদের কাছে সহজলভ্য হয়, সেসব সুনিশ্চিত করা। 

এগারো থেকে চোদ্দর মধ্যে ঋতুস্রাব শুরু হওয়া স্তনের বিকাশ, যৌনকেশ ও বাহুমূলে কেশের আগমন ইত্যাদির  মতোই বয়ঃসন্ধিকালীন মেয়েবেলার একটি স্বাভাবিক  ঘটনা৷ ঋতুস্রাব বলতে সহজ কথায় বোঝায় নারীসুলভ হরমোনগুলির তৎপরতায় ডিম্বাশয় থেকে নির্গত একটি পরিণত ডিম্বাণুর  জরায়ুতে এসে পড়া এবং পুরুষের শুক্রাণুর সাথে মিলিত হতে না পেরে জরায়ুপর্দা বা এন্ডোমেট্রিয়ন ফেটে রক্তক্ষরণ সহ বেরিয়ে আসা, যা কমবেশি ২৮-২৯ দিন অন্তর চক্রাকারে চলে। এর মধ্যে রক্তক্ষরণে কাটে ৩-৭ দিন। ইংরেজি ‘মেন্সট্রুয়েশন’ কথাটি ‘মুন’ থেকে এসেছে মনে হয়।  লাতিনে ‘মেনসিস’ মানে মাস, যে কথাটিও আবার গ্রিক ‘মেনে’ (চাঁদ) শব্দ থেকেই এসেছে৷ অর্থাৎ এই জৈবিক প্রক্রিয়া যে নিয়ম মেনে প্রতি মাসে ঘটে এবং প্রতি মাসে চাঁদের বাড়া-কমার মতোই যে অমোঘ ও স্বাভাবিক এই ঋতুস্রাব – তা সুদূর অতীতেও মানুষের চোখ এড়ায়নি৷দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার কিছু দেশে আজও রজঃস্রাবকালে মেয়েরা পারবারিক টয়লেট ব্যবহার করে না, শরীর ও ব্যবহৃত কাপড় ধোওয়ার জন্য পরিষ্কার জলও ব্যবহার করতে পারেনা, রক্ত আটকাতে প্যাডের বদলে কাপড় ব্যবহার করলেও সেই কাপড় ধুয়ে খোলা জায়গায় মেলতে পারে না। ‘ওয়াটার এইড’ ও ‘ইউনিসেফ’-এর যৌথ সমীক্ষা এই সব তথ্য তুলে এনেছে। এ সময়ে আমিষ খাওয়া, রান্না করা, রান্নাঘরে যাওয়া, পুরুষদের স্পর্শ করা, স্বামী বা পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে একই বিছানায় শোওয়া, এমনকি একই ঘরে থাকা, ধর্মীয় উপাসনালয় তথা সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ – অনেককিছুই বন্ধ হয়ে যায় তাদের।

অথচ একটি ছেলের শরীরেও বয়ঃসন্ধিকালে নানা বদল ঘটে – কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন, দাঁড়ি গোঁফ ওঠা, বীর্যপাত। শেষটি নিয়ে আছে কিছু ভ্রান্ত ধারণা ও অজ্ঞতা। কিন্তু যে অস্পৃশ্যতা, শুচিবায়ুতা, লোক-লজ্জা ও বিধিনিষেধ মেয়েদের ঋতুস্রাবের জন্য বরাদ্দ, তার সঙ্গে কিছুই তুলনীয় নয়। ঋতুস্রাব নিয়ে ট্যাবু যেহেতু সরাসরি প্রভাব ফ্যালে শিক্ষার অধিকারে, স্বাস্থ্যের অধিকারে, আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচার অধিকারে, সুতরাং তাদের প্রত্যক্ষভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী বলাই যায়। 

ছেলে আর মেয়েদের কথাই যখন উঠল, তখন পরিষ্কার করা ভাল যে পিরিয়ড শুধু নারীদের বিষয়, এ খানিক অতিসরলীকরণও বটে। যে রূপান্তরিত পুরুষ আগে নারী ছিলেন, তাঁরও হরমোনের এদিক-ওদিক হলে মাঝে মাঝে ঋতুস্রাব হতে পারে, যদিও তাঁর বর্তমান শরীর পুরুষের। বর্তমানে তাই ঋতুমতীকে আবশ্যিক ভাবে ‘নারী’ না বলে বলা হয় ‘মেন্সট্রুয়েটর’।

এই সহজ ও সাধারণ জৈবিক প্রক্রিয়া যে কীভাবে বিভিন্ন যুগে, বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ধর্মে  ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রতীকী গুরুত্ব পেয়েছে, তা নৃতত্ত্ববিদদের অবাক করতে পারে। অসাধারণত্ব আরোপিত হয়েছে মূলত দুটি মাত্রায়। এক, ঋতুস্রাব অশুচি। দুই, ঋতুস্রাব পবিত্র, অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন। যেমন ভারতবর্ষের মধ্যেই, ছত্তিশগড়ে জনসাধারণের বিশ্বাস হল, রক্তভেজা ন্যাকড়া, বিশেষত প্রথম ঋতুস্রাবের পর, পুড়িয়ে ফেলা ভালো, নাহলে তা কালো-যাদুতে ব্যবহার করা হতে পারে। আবার মণিপুরে মেয়ে রজঃস্বলা হলে প্রথম রক্তাক্ত কাপড়ের খণ্ডটি সংরক্ষণ করা হয় ও সেই মেয়েটিরই বিয়ের সময় তুলে দেওয়া হয় তার হাতে; তা নাকি তাকে ও তার পরিবারকে বাঁচাবে অশুভ শক্তির প্রকোপ থেকে। পিতৃতন্ত্র যুগে যুগে নারীকে দেবী-শয়তানীর বাইনারিতে মেপেছে। ঋতুস্রাবের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিও তার ব্যতিক্রম নয়। নারীর প্রজননক্ষমতা সম্ভবত যে শ্রদ্ধামিশ্রিত বিস্ময় ও ভীতির সৃষ্টি করেছিল অ-নারীকূলে, তারই প্রতিফলন এই বাইনারিতে। ঋতুস্রাবকে ঘিরেই শবরীমালা বিতর্ক। ঋতুমতী নারীদের মন্দির-মসজিদ-দরগায় যাওয়ার জন্য বারবার নাড়তে হয়েছে আদালতের কড়া, ধর্ম ও পিতৃতন্ত্র এতটাই ‘না-পাক’ হিসেবে দেখে ঋতুরক্তকে। আবার এই ভারতেই আছে কামাখ্যা মন্দির যেখানে বর্ষার জল লালমাটি ধুয়ে মন্দিরের দরজার তকা দিয়ে বইতে শুরু করতে বলা হয় ‘দেবী ঋতুমতী হলেন’ এবং শুরু হয়ে যায় বার্ষিক মহোৎসব যা প্রাচীন কৃষিসভ্যতার পরম্পরাকে মনে করায়। বাইনারি এখানেও। 

গ্লোরিয়া স্টেইনেম বহুপূর্বেই বলেছিলেন, ক্ষমতাবানের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি বৈশিষ্ট্য-চিহ্নই ক্ষমতার প্রতীক হয়ে ওঠে, আর ক্ষমতাহীনের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত সবকিছুকেই অশুভ, মন্দ, দুর্বল দেগে দেওয়া হয়। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে তাই মেয়েরা ঋতুমতী হয় বলেই ঋতুচক্র নিয়ে এত লুকোছাপা, এত নিন্দে-মন্দ। তার বদলে ছেলেরা রক্ত ঝরালে তা-ই হয়ে উঠত শৌর্যের প্রতীক। ‘If Men Could Menstruate’’ প্রবন্ধে স্টেইনেমের সকৌতুক কল্পনা:

‘So what would happen if suddenly, magically, men could menstruate and women could not?
Clearly, menstruation would become an enviable, worthy, masculine event.
Men would brag about how long and how much.

…. Young boys would talk about it as the envied beginning of manhood. Gifts, religious ceremonies, family dinners, and stag parties would mark the day….Sanitary supplies would be federally funded and free.’
কৌতুকের আড়ালে যে ক্ষমতাতন্ত্র ও রাজনীতির ইঙ্গিত তিনি দিচ্ছেন, তা না থাকলে ঋতুরক্ত উদযাপনেরও প্রয়োজন হত না। প্রয়োজন হত না এই দিবস পালনের।

নারীবাদী লেখিকাদের কলমেও তাই ঋতুরক্ত ‘বিশেষ’ হয়ে ওঠে। জেনেট উইন্টারসন ‘Written on the Body’ তে লিখছেনঃ

‘When she bleeds the smells I know change colour. There is iron in her soul on those days. She smells like a gun’. 

*****

স্বাভাবিক ভাবেই ২০২০ সালে এই দিবস পালন কালে উঠেছিল অতিমারী প্রসঙ্গ। আর আজ ২০২১ সালেও অতিমারীর কবল থেকে মুক্তি ঘটেনি। ইউনিসেফ ২০২০ সালেই জানিয়েছিল ভারতের মতো দেশে, বা পুরো দক্ষিণ এশিয়াতেই, যেখানে লকডাউন মানুষের প্রাথমিক রুজিরুটিই কেড়ে নিয়েছে, যেখানে গরীব গরীবতর হয়েছে, সেখানে স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনার সামর্থ্য তারা হারিয়েছে। যারা হয়ত আগে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যাবহার করতেন, তারাও ফিরে গেছেন কাপড়ে। বিশেষত গ্রামাঞ্চলে ও শহরের বস্তি অঞ্চলে এই সমস্যা ঘোরতর। ২০১৬-১৭ সালের জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষাই জানিয়েছিল মাত্র ৫৭.৬% নারী প্যাড ব্যবহার করেন, বাকিরা কাপড়ে কাজ সারেন। ২০২০-২১ সালে সে সংখ্যা যে এক ধাক্কায় অনেকটাই নেমেছে তা বলাই বাহুল্য। পশ্চিমবঙ্গে গরীব মানুষ চাল ডালের জন্য ফুড কুপন পেয়েছেন, কখনও পেয়েছেন মাস্ক-স্যানিটাইজার। একই সঙ্গে কিন্তু স্যানিটারি ন্যাপকিনও দেওয়া সরকারের কর্তব্য ছিল।

পরিযায়ী শ্রমিকদের পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরার করুণ চিত্রকল্পটি আমাদের মাথায় গেঁথে গেছে। কিন্তু আমরা কি কখনও ভেবেছি পরিযায়ী নারী শ্রমিক সেই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার সময় রজঃস্বলা হয়েছিলেন কিনা? নিশ্চয় হয়েছিলেন অনেকে। কীভাবে পরিস্থিতি সামলে ছিলেন তাঁরা? স্যানিটারি ন্যাপকিন দূরস্থান, কাপড়ই বা পেয়েছিলেন কোথায়? সেই কাপড়ের প্যাড পাল্টেছিলেন কীভাবে ও কোথায়? আড়াল পেয়েছিলেন কি? গরম ছিল কাঠফাটা, ছিল উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা। তদুপরি এই রক্তক্ষরণ। ঋতুস্রাবের রক্তক্ষরণের সময় মাইলের পর মাইল হাঁটতে তাঁদের কষ্ট হয়নি? নিশ্চয় এমন অনেক দিন গেছে যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁরা কাপড় বদলাতে পারেননি। হয়ত গণ শৌচাগার পেয়েছেন কোথাও। কোথাও হয়ত ঝোপে-ঝাড়েই আড়াল খুঁজতে হয়েছে। নিশ্চয় সহ-পথিকদের সে কথা মুখ ফুটে বলতেও পারেননি। ঝাড়খণ্ডের এক মহিলা শ্রমিকের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল যে দিল্লি থেকে মালবাহী ট্রাকে করে ফিরেছিল সপরিবার নিজের রাজ্যে। সে বলেছিল, ‘রক্তে ভেজা কাপড় বদলাব, এই বলে তো আর ট্রাক থামাতে পারি না৷ যখন থামত, তখনই বদলাতাম ঝোপে-ঝাড়ে’। সে আরও বলেছিল, ট্রাকে মহিলারা পানীয় জল খেত না প্রায়। কারণ প্রস্রাব করার জন্য পুরুষকে ট্রাক থামাতে বলাটা ভারি লজ্জার। এই সূত্রে মনে পড়ে মহারাষ্ট্রের বিড় জেলার মেয়েদের কথা, ২০১৯ সালে যাদের নিয়ে হঠাৎ সংবাদমাধ্যমে শোরগোল পড়েছিল, কারণ তাদের বেশির ভাগেরই জরায়ুচ্ছেদ হয়েছে। একটা গোটা গাঁয়ের (হাজিপুরের) মেয়েদের নাকি জরায়ু নেই, কারণ তারা আখের সময়ে আখ কাটার কাজ নেয় এবং কনট্রাকটার চান না, তাদের ঋতুস্রাব জনিত কারণে কাজে কোনো বিচ্যুতি হোক। অর্থাৎ নারীর জন্য স্যানিটারি সামগ্রী ও শৌচালয় নির্মাণকে মালিক পক্ষ তার দায়িত্ব ভাবে না, বরং নারীই নিজের শরীরকে কেটেছেঁটে অঋতুমতী হয়ে যায় কাজ পাওয়ায় জন্য। আরও মনে পড়ছে অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি ‘শিক্ষিত’ রাজ্য কেরালার কোচিতেও ‘আসমা রাবার ফ্যাক্টরি’-তে টয়লেটে একটি ব্যবহৃত ন্যাপকিন পাওয়া গেছিল বলে প্রায় পঁয়তাল্লিশ জন নারী কর্মীর নগ্ন তল্লাশি করে দেখা হয়েছিল, তারা কেউ সেই ঋতুমতী কিনা। যদিও তার জন্য সারা দেশ থেকে অনেক ব্যবহৃত-অব্যহৃত স্যানিটারি ন্যাপকিন পাঠানো হয়েছিল ওই কারখানায়, ‘রেড অ্যালার্ট ক্যাম্পেইন’-এর নামে, কিন্তু তাতে ঋতুরক্ত ঘিরে দেশের সামগ্রিক সামাজিক ট্যাবু কেটেছিল কিনা, তা বলা মুশকিল।

কিছু এনজিও, যারা পথে পরিযায়ী শ্রমিকদের ওআরএস, শুকনো খাবার বিলোচ্ছিল, তারা স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবস্থা রেখেছিল। কিন্তু তা অপ্রতুল। বহু রাজ্যে স্কুলের ছাত্রীদের বিনা পয়সায় স্যানিটারি ন্যাপকিন দেওয়া হয়। স্কুল বন্ধ মানে তাদের কাছে শুধু মিড-ডে মিলের জোগান বন্ধ হওয়া নয় শুধু, স্যানিটারি ন্যাপকিনের জোগানও বন্ধ হওয়া। তাদের যে মাসিক মিড-ডে মিলের র‍্যাশনের সঙ্গে স্যানিটারি ন্যাপকিনও দেওয়া কর্তব্য ছিল, তা সরকারের মাথায় আসেনি। এমনিতেই ভারতে ২৩% মেয়ে ঋতুস্রাব শুরু হলেই স্কুলছুট হয় (“Dignity for Her”, a report by DASRA, Mumbai, 2019)। বাকিরা গড়ে তিন থেকে পাঁচ দিন স্কুল কামাই করে ‘সেইসব দিনে’। তার উপর লকডাউন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করল। এই মেয়েদের আবার অনেকের বাড়িতে পিরিয়ড সংক্রান্ত প্রাথমিক শিক্ষাও দেওয়া হয় না। বরং হয়ত স্কুলেই তারা শিক্ষিকাদের থেকে কখনও কখনও জানতে পারে, ঋতুস্রাব কী ও কেন? যে মেয়েরা লকডাউনের মধ্যেই প্রথমবার রজঃস্বলা হল, তাদের শারীরিক পরিবর্তন প্রস্তুতিহীন ভাবে এল। একবিংশ শতকেও প্রথম ঋতুস্রাবের আগে ভারতের শতকরা ৪৫ ভাগ কিশোরী তা সম্পর্কে থাকে অন্ধকারে। এদিকে, তাদের মধ্যে শতকরা ৭৮ ভাগই কিন্তু জানে এ’সময়ে কী কী সামাজিক ট্যাবু মেনে চলতে হয়। শতকরা ৫৮ ভাগ মনে করে এ হল দূষিত রক্ত; শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়াই ভাল। ফলত, তারা এ-ও বিশ্বাস করে যে পিরিয়ডের সময় তাদের নিজেদের শরীর অপবিত্র থাকে (NCBI Report, 2019)। এসব ভুল ধারণা দূর হওয়ার আর উপায় রইল না স্কুল খোলা না থাকায়। এমন নয় যে স্কুলেও ভীষণ স্বচ্ছন্দ আলোচনা হয় এসব নিয়ে। কিন্তু অন্তত প্যাড দেওয়া-নেওয়ার প্রসঙ্গে কিছুটা তো হত!  

বস্তির দরিদ্র পরিবারে এক কি দুটি কুঠুরিতে বিশাল পরিবারের বাস। লকডাউনে পুরুষেরা সারাক্ষণই ঘরে। এমতাবস্থায় ‘কাপড় ব্যবহার করলেও লুকোবো কোথায়, শুকাতে দেব কোথায়, তাও এক চিন্তার ব্যাপার,’ বলেছিল পঞ্চাননতলা বস্তির এক কিশোরী। অথচ কাপড় যদি ব্যবহার করতে হয়, তবে তা পরিষ্কার জলে ধুয়ে সূর্যের আলোয় শোকানো দরকার। এইসব প্রাথমিক স্বাস্থ্যবিধি না মানলে ইউরিনারি ট্র‍্যাক্ট ইনফেকশন ও আরও নানাবিধ অসুখ অবশ্যম্ভাবী। অথচ কোভিড পরিস্থিতিতে যে কোনো অন্য স্বাস্থ্য সমস্যায় চিকিৎসা পাওয়াও দুরূহ।  

কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সস্তায় স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরি করত নিজেরা মেশিন বসিয়ে। লকডাউন হতে সেই ছোট কারখানাগুলির কর্মীরা বাড়ি ফিরে গেল। তাই সস্তার স্যানিটারি ন্যাপকিনের আকাল পড়ল। শুধু ব্র্যান্ডেড জিনিসই পাওয়া গেল। এই সস্তার ন্যাপকিনের ক্রেতা ছিল গ্রাম ও বস্তি অঞ্চলের মেয়েরা। আরও মাথায় রাখতে হবে, কেন্দ্রীয় সরকার কিন্তু লকডাউন শুরু করার সময় বলেছিল যে শুধু অত্যাবশ্যক পণ্যের উৎপাদন চলবে এবং প্রাথমিক ভাবে স্যানিটারি ন্যাপকিনকে অত্যাবশ্যক পণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। সে কারণেও ছোট কারখানাগুলি বন্ধ হয়ে গেছিল। জোগান কমেছিল। ওষুধের দোকান বা মুদির দোকানে পাওয়া যাচ্ছিল না স্যানিটারি প্যাড। পরে অবশ্য সে ঘোষণা সংশোধন করা হয়েছিল।

ঋতুরক্ত ঘিরে আরও দু রকমের সমস্যা বর্তমান লেখকের চোখে পড়েছিল লকডাউন কালে। এক, অনেক মহিলারই ঋতুস্রাবের সময় বদলে যাচ্ছিল। দীর্ঘায়িত হচ্ছিল গ্যাপ। কারণ লকডাউন, মানসিক অবসাদ, কোভিড ঘিরে ভয়। দ্বিতীয় বিষয়টি এই ‘দেরি’-র সঙ্গেই সম্পর্কিত। অল্পবয়সী অবিবাহিত মেয়েরা, যাদের ছিল কোনো না কোনো স্বেচ্ছার যৌন সম্পর্ক, তারা পিরিয়ডে দেরি হলেই ভয় পাচ্ছিল, সে কি গর্ভবতী? তার চেয়েও বড় কথা, সত্যি গর্ভবতী হলে সে অ্যাবর্শন করাবে কী করে লকডাউনে? বা বাবা-মা জানতে পারলে লকডাউনে সেই তিরস্কারে বদ্ধ জীবন কতটা দুর্বিষহ হয়ে উঠবে? ঋতুরক্তের মতোই নারীর যৌনতা নিয়ে সমাজের বড় লুকোচুরি। নারী যে যৌনতায় রত হয়, সে যে যৌনবস্তু মাত্র নয়, ঋতুরক্তের মতোই সেটাও ভুলে থাকাতেই স্বস্তি।

ঋতুরক্তকে ঘিরে যে গোপনীয়তা, তা ঋতুমতীর জন্য নিয়ে আসে অপরিচ্ছন্নতা, অসুখ ও অস্বস্তি। সেই বাস্তবতাই আরও প্রকট হয়েছে লকডাউনে। আমরা জানি, শহর কলকাতায় আজও স্যানিটারি প্যাড বিক্রি হয় কালো মোড়কে।  বিজ্ঞাপনে নীল ঋতুরক্ত ঝরে স্যানিটারি প্যাডে। যে মহিলা আথলেট পিরিয়ড চলাকালীন স্যানিটারি প্যাড না পরেই প্রতীকী দৌড় দৌড়েছিলেন, তাঁর শারীরিক ভাবে কষ্ট হয়েছিল নিশ্চয়৷ কিন্তু গিমিক বলে উড়িয়ে না দিয়ে আমরা এটিকে দেখতে পারি ঋতুরক্তকে দৃশ্যমান করার এক রাজনৈতিক আজেন্ডা হিসেবে। এই যেখানে শহুরে মধ্যবিত্ত বাস্তবতা, সেখানে পরিযায়ী শ্রমিক নারী, বস্তিবাসী ছাত্রীটির লকডাউনে দুর্ভোগ অনুমান করা কি খুব কঠিন? 

বিশ্ব ঋতুস্রাব স্বাস্থ্য দিবসে একটা কথা বোঝা সবার আগে দরকার। ঋতুরক্ত এবং তার কারণে ঘটা শারীরিক অসুবিধেকে আমরা যদি মানুষের (পড়ুন পুরুষের) পঞ্চেন্দ্রিয়র আড়ালে রাখতেই তৎপর হই, তাকে যদি না আসতে দিই চোখ-কান-স্পর্শের আওতায়, তাহলে বিমূর্ত ভাবনার ভিত্তিতে কোনো লড়াই যথেষ্ট অভিঘাত সৃষ্টি করবে না। ঋতুস্রাব স্বাভাবিক, কিন্তু সমাজের ঋতুরক্তকে স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করতে শেখা এখনও বাকি। নিজেরা গ্রহণ করতে পারলে, তবেই তো শ্রেণি নির্বিশেষে নারীর ক্ষেত্রে স্যানিটারি ন্যাপকিন ও অন্যান্য সামগ্রীর প্রয়োজনীয়তা, এক-দুই কিলোমিটার দূরে দূরে লেডিজ টয়লেটের প্রয়োজনীয়তা রাষ্ট্রকে বোঝানো যাবে। দ্বিতীয় পর্যায়ের কোভিড ঢেউ এবার আছড়ে পড়েছে দেশে। এই পর্বে নাগরিক ও রাষ্ট্র কি সচেতন হবে এই ‘অদৃশ্য’ সমস্যা নিয়ে? 

শেয়ার করুন

4 thoughts on “লকডাউন ও ঋতুস্রাব – ঋতুস্রাব স্বাস্থ্য মাসে ফিরে দেখা”

  1. খুব ভাল লিখেছো। আর সরকারী স্কুল শুধু নয়, আমাদের এত শিক্ষিত বন্ধুদের মধ্যে টাবু আছে প্রচুর। যত বোঝাই এটা কোনো ‘শরীর খারাপ’ না, আমাদের শরীরের বেড়ে ওঠার লক্ষণ, বোঝে না। ক্লাস এইট নাইনই আদর্শ সময় ছিল ওদের বুঝানোর, তা আর হল কই?

  2. এই রকম আর কী। ওদেরকে menstrupedia দেব ভেবেছিলাম, অনেক ভাল হত ওদের বোঝার ক্ষেত্রে।

  3. Manisha Tikader

    খুবই ভালো লাগলো লেখাটা💗। 28/5 এর কারনটা জানতাম না।

  4. Indira Chakravorty

    অসাধারণ লেখা! এজ ইউজুয়াল! শেয়ার করতে চাই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *