অনলাইন ক্লাস, বৈষম্য ও মেয়েদের শিক্ষা

বিগত প্রায় দুই বছরে করোনা অতিমারির প্রবল ধাক্কায় লকডাউনের নামে বন্ধ হয়েছে স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি সহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যার ফলে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে তলিয়ে গেছে লক্ষ লক্ষ ছাত্র ছাত্রীর ভবিষ্যত। পশ্চিমবঙ্গসহ গোটা দেশে লকডাউনের ফলে শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি কাঠামো ভেঙে পড়ায় খাদ্য-স্বাস্থ্য-বাসস্থানের পাশাপাশি পঠন পাঠনের মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়েছে দেশের তরুণ প্রজন্ম। এ রাজ্যে প্রায় দুই বছর ধরে সমস্ত স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় একদিকে যেমন সুন্দরবন, নামখানা, ক্যানিং প্রভৃতি প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে শিশুশ্রমের আধিক্য দেখা দিয়েছে; পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বাল্যবিবাহ, অন্যদিকে তেমনই তৃতীয় বিশ্বের দেশ ভারতকে ‘ডিজিটাল’ বানানোর ভাওতায় চালু হয়েছে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা।

চার দেওয়ালের বদ্ধ ঘরে স্মার্টফোন বা ল্যাপটপের যন্ত্রনির্ভর শিক্ষালাভে সামিল হতে না পারায় দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জীবন আজ প্রশ্নচিহ্নের মুখোমুখি। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরে অনলাইন পড়াশোনার মাধ্যম স্মার্টফোন কিনতে অসমর্থ হওয়ায় কেরালা, আসামের মতো বহু জায়গায় পিতামাতা সমেত শিক্ষার্থীদের দুর্ভাগ্যজনক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বিগত দেড় বছরে। সম্প্রতি, ২০২১ সালের এক বিদ্যালয় সমীক্ষায় জানা গেছে যে, গ্রামাঞ্চলে মাত্র ৮% শিশু এই অনলাইন পরিষেবা পাচ্ছে, ৩৭% শিশুর পরিবার অনলাইন পড়াশোনার প্রয়োজনীয় যন্ত্র (অর্থাৎ অন্ততপক্ষে স্মার্টফোন) কিনতে অক্ষম এবং বাকি ৫৫% শিশু এখনো শিক্ষালাভের প্রাথমিক গণ্ডি অতিক্রম না করায় প্রায় অক্ষরজ্ঞানহীন। এই দীর্ঘ সময় লকডাউনের জেরে যেখানে গ্রাম, মফস্বলের অধিকাংশ মানুষই কাজ হারিয়ে ন্যূনতম রুটি-রুজির সন্ধানে চরম অর্থনৈতিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন, সেখানে দামি স্মার্টফোনে প্রতি মাসে নেট রিচার্জ করে অনলাইনে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া আকাশ-কুসুম কল্পনা বলেই সকল ছাত্রসমাজ এই ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করতে পারেনি। 

এই পিতৃতান্ত্রিক সমাজে করোনা পূর্ববর্তী সময়েও মেয়েদের শিক্ষার হার ছেলেদের তুলনায় কম ছিল, যা গত দেড়- দুই বছরে ক্রমশ স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ লকডাউন সময়ে বহু কৃষক, ভিনরাজ্যের শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কাজ হারান, ফলে বাড়ির গৃহবধূরা আয়া, গৃহপরিচারিকা, সবজি বিক্রি প্রভৃতি কাজে নিযুক্ত হওয়ায় সকল সাংসারিক দায়ভার এসে পড়ছে বাড়ির কন্যা সন্তানটির উপর। খুব স্বাভাবিক ভাবেই পড়াশোনা এগোতে না পারার কারণে বিয়ের বন্দোবস্তও হয়ে যাচ্ছে কিছুদিনের মধ্যে। একইভাবে অনলাইন মাধ্যমে পড়াশোনার ক্ষেত্রে খরচসাপেক্ষ একটি স্মার্টফোন কিনতে সমর্থ হলে তার অধিকারে প্রাধান্য পাচ্ছে বাড়ির পুত্রসন্তানটিই। অফলাইন সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এভাবেই দীর্ঘদিন কন্যা সন্তানদের শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে বোঝা নামানোর মতো একের পর এক বাল্যবিবাহ হয়ে চলেছে। শিশুশ্রমের ক্ষেত্রে একদিকে যেমন প্রাইমারি সরকারি স্কুলের ছোট ছোট শিশুরাও জীবন-জীবিকার লড়াইয়ে মাইলের পর মাইল পেরিয়ে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে, তেমনই স্কুল বন্ধ থাকায় ক্লাসঘরে শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যের অভাবে স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ হচ্ছে না তাদের। বিদ্যালয়গুলিতে শরীরচর্চা-ব্যায়াম চর্চা, অরণ্য সপ্তাহ পালন, পরিবেশ দিবস প্রভৃতির সচেতনতা গড়ে না ওঠায় বহু সামাজিক শিক্ষা থেকে একইভাবে বঞ্চিত হচ্ছে তারা। সরকারি প্রাইমারি স্কুলগুলিতে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীই মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের হওয়ায় স্কুল বন্ধের কারণে মিড ডে মিল না পাওয়ায় ধীরে ধীরে স্কুল বিমুখ হয়ে শিক্ষার প্রতি আরোই অনুৎসাহী হয়ে পড়ছে। বহু দুর্নীতির পর কিছু কিছু বিদ্যালয়ে প্রতি মাসে মিড-ডে মিলের কাঁচা মাল দেওয়ার ব্যবস্থা হলেও তা আদৌ সেই শিশুর পরিবারের কাছে পৌঁছাচ্ছে কিনা, তার কোনো নির্দিষ্ট ডেটা সেই বিদ্যালয়ের কাছে না থাকায় ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে অপুষ্টির সংখ্যাও। 

স্কুল কলেজ বন্ধ থাকায় অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থায় সবচেয়ে করুণ পরিণতির শিকার হয়েছেন সমাজের পিছিয়ে পড়া সংখ্যালঘু, দলিত ও আদিবাসী সম্প্রদায়। গ্রামাঞ্চলে বস্তি এলাকায় যেখানে শিক্ষালাভে অন্যান্য সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ১৫%, সেখানে দলিত আদিবাসী সম্প্রদায় মাত্র ৩%। করোনা পূর্ববর্তী সময়েও যেখানে কেন্দ্রে ফ্যাসিস্ট বিজেপি সরকারের শাসনে দলিত সংখ্যালঘু ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষদের শিক্ষালাভে ক্রমাগত বঞ্চনা ও উচ্চবর্ণের মানুষদের একচ্ছত্র অধিকার কায়েম রাখার ফলে বহু দলিত ছাত্রছাত্রীরা আত্মহত্যার পথ পর্যন্ত বেছে নিয়েছেন, সেই বঞ্চনা লকডাউন সময়ে আরো তীব্রতর হয়ে তারা একপ্রকার পড়াশোনা বন্ধ করতে বাধ্য  হয়েছে। কখনো স্কলারশিপের টাকা বন্ধ করে, কখনো ন্যূনতম স্টাডি মেটেরিয়াল-এর জোগান না দিয়ে আদতে তাদের শিরদাঁড়া ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অনেক দৃষ্টিহীন ছাত্রছাত্রী অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থায় বিধ্বস্ত হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। তাঁদের কাছে একজন সাহায্যকারী রাইটার পর্যন্ত নেই। বহু বাধা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত ছাত্রছাত্রীরা লকডাউনে পরিবারের উপার্জনশীল সদস্য কাজ হারানোয় কাঁধে তুলে নিয়েছে সাংসারিক দায়ভার; পদার্থবিদ্যায় পিএইচডি করা দলিত ছাত্রটিও বর্তমানে বাড়ির পাশে মুরগির দোকানে বসতে বাধ্য হয়েছে। আর  সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে, বিশেষত মেয়েরা, যেটুকু শিক্ষার অধিকার অর্জন করেছিল, অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা তা চিরতরে ধূলিসাৎ করেছে। বিশেষত এই পিছিয়ে পড়া আদিবাসী সম্প্রদায়ের ছোট ছোট শিশুকন্যাদের ব্যাপকভাবে দ্রুত বিবাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে গোটা লকডাউন জুড়ে। 

 এরই মধ্যে ডিজিট্যাল কর্পোরেটদের হাতে শিক্ষাকে পুরোপুরি বেচে দেওয়ার চক্রান্ত সফল করতে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার এনেছে New Education Policy ,2020 (NEP) যেখানে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে থেকে ছাত্রছাত্রীদের একটি বিরাট অংশই উচ্চ শিক্ষা লাভ থেকে বঞ্চিত হবে। মূলত এই ছাত্র ছাত্রীদের বেগার খাটিয়ে সস্তার শ্রমিকে পরিণত করার ঘৃণ্য পদক্ষেপ এই নতুন ডিজিট্যাল শিক্ষাব্যবস্থা আর কেন্দ্র সরকারের এই নীতিকে চুপিসারে স্বাগত জানিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার তালাবন্ধ করে রেখে দিয়েছে সকল স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটি। বর্তমানে দিল্লি পাঞ্জাব মধ্যপ্রদেশ প্রভৃতি কিছু রাজ্য কোভিড সতর্কতা মেনে স্কুল কলেজ চালু করলেও পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার স্কুল কলেজ সহ সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর সিদ্ধান্তে বারে বারে উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছে। যে দেশে এখনো অপুষ্টির কারণে শিশুমৃত্যু ঘটে এবং ৭০% মানুষ দারিদ্য সীমার নীচে বসবাস করে, সেখানে দামি স্মার্টফোন বা অন্যান্য ডিজিট্যাল ডিভাইসের মাধ্যমে পড়াশোনা কেবল ক্ষমতা প্রদর্শনের দম্ভ ছাড়া আর কিছুই নয়। 

দেশ জুড়ে নতুন সিলেবাসে একে একে বাদ গেছে রবি ঠাকুর, জয় গোস্বামীর “অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান”, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের “নদীর বিদ্রোহ”, মহাশ্বেতা দেবী, আর কে নারায়ণ , পি বি শেলীর মতো বিখ্যাত সাহিত্যিকদের থেকে শুরু করে ইতিহাসের পাতায় বিশ শতকের ভারতে কৃষক, শ্রমিক ও বামপন্থী আন্দোলন, দলিত আন্দোলন, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আন্দোলন সবকিছুই। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার পরিবর্তে আনা হয়েছে রামদেবের আয়ুর্বেদ চর্চা, যোগী আদিত্যনাথের কট্টর গোঁড়া হিন্দুত্ববাদী দর্শন। অর্থাৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবেই প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার সর্বত্র গৈরিকীকরনের ছাপ সুস্পষ্ট। সকল অন্যায় ও রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলনের চেতনাকে গোড়াতেই রুখে দিতে সিলেবাস থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে একের পর এক হক ছিনিয়ে আনা সংগ্রামের ইতিহাস। যে সকল রাজনৈতিক সচেতন শিক্ষার্থী এই গেরুয়ারাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সরব হয়েছে, তাদেরকে সিডিশন বা ইউপিএ এর মত দমনমূলক আইনের প্যাঁচে জেলবন্দি করে কণ্ঠস্বর রোধ করতে চাইছে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার। বিশেষত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হলে তাকে জেলেই পচিয়ে ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। বর্তমানে সার্জিল ইমাম, গুলফিশা খাতুন, উমর খালিদ সহ বহু ছাত্রছাত্রী রাজবন্দি হয়ে আছেন প্রায় এক বছরের উপর। সম্প্রতি রবি ঠাকুরের মুক্তাঙ্গন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফি মকুব, মুক্ত ক্যাম্পাসের দাবিতে ফ্যাসিস্ট বিজেপি উপাচার্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় দুজন অধ্যাপকসহ তিন প্রতিবাদী ছাত্রছাত্রীকে বহিস্কার করা হয়েছে। যদিও কেন্দ্র সরকারের খানিক বিরোধিতায় রাজ্য সরকারের নির্দেশে তা আপাতত স্থগিত আছে। কিন্তু লকডাউনের দীর্ঘ সময় জুড়ে দিল্লি, জে এন ইউ, জামিয়া মিলিয়া, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্বিকারভাবে নেমে এসেছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। বিশেষত শিক্ষাব্যবস্থাকে পুরোপুরি ডিজিট্যাল কর্পোরেটদের কাছে বেচে সাধারণ মানুষের ন্যুনতম প্রশ্ন করার অধিকার খর্ব করা হয়েছে। 

ভারতকে আদর্শ হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করার প্রয়াসে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধিতায় ভয়ংকর রোষের মুখে পড়েছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ, বিশেষত মেয়েরা। সম্প্রতি জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী নাবিয়া খানের ছবিসমেত ব্যক্তিগত তথ্য বিভিন্ন নিষিদ্ধ সাইটগুলিতে নিলামে বিক্রির ঘটনাও সামনে এসেছে। অর্থাৎ প্রতি পদে পদে সংখ্যালঘু আদিবাসী দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ, বিশেষত মেয়েদের, সকল রকম অধিকার থেকে বঞ্চিত করে এক প্রকার সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র বানিয়ে রাখতে চাইছে ব্রাহ্মণ্যবাদী ও পিতৃতান্ত্রিক কেন্দ্র সরকার। তাই  অবিলম্বে শিক্ষাকে কর্পোরেট পুঁজির হাতে বেচে দেওয়ার পূর্বে গৈরিকীকরন ও বেসরকারিকরনের চক্রান্ত ব্যর্থ করে সকল ছাত্রছাত্রীর শিক্ষার মৌলিক অধিকারকে মর্যাদা দিয়ে কলেজ ইউনিভার্সিটি সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

চিত্রঋণ- দ্য প্রিন্ট

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *