লকডাউন, কাজ এবং কিছু ঘরে-বাইরের কথা

এই নিবন্ধ যখন লিখছি তখন সাময়িক কিছুদিন আংশিক লকডাউনের পর পশ্চিমবঙ্গে আবার একটা (প্রায়) সম্পূর্ণ লকডাউন ঘোষণা হল। করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়তে পড়তেই সাধারণ মানুষের অনেকেই মনে করছিলেন একটা কমপ্লিট লকডাউন-এর আশু প্রয়োজন। এদিকে চারপাশে করোনা সংক্রমণের খবর বেড়ে যাচ্ছে। পরিবার, চেনা-জানা মানুষ থেকে শুরু করে কাছের বন্ধু, দূরের বন্ধু সবার মধ্যে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত এবং চেনা পরিসরে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে হু হু করে। এসবের মধ্যে আরও অস্থিরতা ছড়িয়ে দিল করোনার তৃতীয় ঢেউ-এর অবশ্যম্ভাবিতা। আশঙ্কা করা হচ্ছে, সেই দফার সংক্রমণের প্রভাব বেশি থাকবে শিশুদের মধ্যে। এগুলো পড়ে, শুনে এবং দেখে মানুষের মধ্যে প্রভূত নি-জার্ক রিঅ্যাকশন হচ্ছে এবং অনেকেই ভাবছেন বা ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন যে একটা ১৪ দিনের লকডাউন হলে হয়ত সংক্রমণের চেন ব্রেক করা সম্ভব হবে। চিন্তায় দিকভ্রান্ত মানুষের এই ভাবনা অবান্তর নয়। মৃত্যুর হাতছানি, স্বজনহারার সম্ভাবনা, এবং সংক্রমণের জেরে একা হয়ে যাওয়ার ভীতি, সব মিলিয়ে দুশ্চিন্তায় মানুষ জেরবার। এরকম সময়ে যে কোন পদ্ধতি যা কিছুটা হলেও অবস্থার উন্নতির প্রতিশ্রুতি দেয়, তা সে যতই কঠিন এবং জটিল হোক না কেন, মানুষের কাছে আশার সঞ্চার করে। এই নিবন্ধে তাই লকডাউন নিয়েই দু’চার কথা ভাবার চেষ্টা করছি। 

গত বছর যখন প্রথম অকস্মাৎ লকডাউনটা হল তখন ভীষণ আলোচনা হয়েছিল যে আদৌ পৃথিবীতে জীবিত মানুষদের মধ্যে এরকম সঙ্কটকালের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষ পাওয়া যাবে কিনা। সবকিছুতেই যেহেতু আমরা পরিসংখ্যান খুঁজতে ব্যস্ত থাকি এবং তুলনা টানতে ভালোবাসি, তাই খোঁজ শুরু হল শেষ কবে মানুষ এমন বাধ্যতামূলকভাবে গৃহবন্দী হয়েছিল? কেউ মনে করতে পারল না। মনে করতে পারল না যে নারীদের প্রতি পর্দানশিন, অসূর্যম্পশ্যা, অবগুণ্ঠিত ইত্যাদি শব্দ মাত্র একশ থেকে দেড়শ বছর আগেই ভারতবর্ষে ব্যবহৃত হত এবং এইসব শব্দের মাধ্যমে নারীর সহজাত এবং স্বভাবগত অবস্থান কী হওয়া উচিৎ তাও ঠিক করে দেওয়া হত। ২০২০ সালে দাঁড়িয়ে এমন জীবিত মানুষ চাইলেই খুঁজে পাওয়া যেত যাদের আগের প্রজন্মের যাপনে হয়ত শুধুই অন্দরমহলের অভিজ্ঞতা ছিল। কিন্তু মজার কথা হল, সেই অভিজ্ঞতার নিপীড়ন থেকে নিজেকে মুক্ত করে নারীর বাহির-এ পা রাখার সাহসও সেই একশ দেড়শ বছর থেকেই শুরু হয়। 

বাহির জগতে পুরুষের একচ্ছত্র অধিকার এবং সেই অধিকার কায়েমের প্রাগৈতিহাসিক অভ্যাসের সঙ্গে সঙ্গে মনুষ্যজাতি অর্থে পুরুষের দৈনন্দিনতাকে যাপনের ইতিহাসের কেন্দ্রে রাখার স্বাভাবিকরণের মধ্যে দিয়ে আমরা ভুলে যাই যে মানুষের বাহিরের সঙ্গে সম্পর্ক তার প্রান্তিকতার অবস্থানের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। আর সেকারণেই, লকডাউনের আগে পৃথিবী কেমন ছিল, অন্দর এবং বাহিরে থাকার অভিজ্ঞতা মানুষের কেমন ছিল, তার উত্তর মিলবে ব্যক্তিমানুষের লিঙ্গ, জাত, বর্ণ, বয়েস ইত্যাদির নিরিখে এবং সমষ্টিগত অবস্থানের অভিজ্ঞতায়। ঠিক যেমন লকডাউন পরবর্তী জীবনের আখ্যানও লেখা হবে সেই ব্যক্তি অথবা সমষ্টির অবস্থানের ওপর ভিত্তি করেই। 

যুগ যুগ ধরে চলে আসা অন্দর/বাহির দ্বৈততায় যেভাবে নারীকে অন্দরে আবিষ্ট করে রাখা হয়েছিল, সেখান থেকে অনেক লড়াই করে আমাদের অগ্রজ মহিলারা বাড়ির বাইরে পা রেখেছিলেন; শিক্ষার জন্য, চাকরীর জন্য, আনন্দের জন্য। ধীরে ধীরে তারা এই বাহির জগৎকে আপন করে নিয়েছেন, নিজের বলে দাবী করেছেন, সেখানে মতামত দিয়ে নিজের অস্তিত্ব জাহির করেছেন ইত্যাদি। আজ ২০২১ সালে যখন কোন নারীবাদী কথা বলার প্রয়োজন হয়, তখন ধরেই নেওয়া হয় যে কিছু কাজ ইতিমধ্যে হয়ে গেছে এবং আমাদের এখনকার কাজ হবে, যা যা অর্জন করা গেছে সেগুলোকে ধরে রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু সমস্যা হল এই লকডাউনের দরুন আবার কিছু পুরনো সমস্যা ফিরে এসেছে, তবে নতুন রূপে। সেই সমস্যা লিঙ্গভিত্তিক শ্রমের রাজনীতির। 

গতবছর বন্ধুদের কাছে শুনেছি যে বেশ কিছু সংস্থা, যেন স্বাভাবিকভাবেই, তাদের মহিলা কর্মচারীদেরই প্রথম বাড়ি থেকে কাজ করার অফার দেয়। ধরেই নেওয়া হচ্ছিল হয়ত যে সব মহিলা কর্মচারী এটাই চাইবেন। অনেক মহিলা হয়ত সত্যিই খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু তাও প্রশ্ন থেকে যায় যে বাড়ি থেকে বেরোনো, দৈনন্দিন যাতায়াত এবং অফিস স্পেসে নিজেকে মেলে ধরতে পারা এক নারী একইভাবে বাড়িতে (অন্য সদস্যদের উপস্থিতিতে) কিভাবে তার স্বকীয়তা বজায় রাখবে? তার সন্তানের যদি খিদে পায়, বাড়ির প্রবীণ সদস্যদের যদি কোন এমার্জেন্সি হয়, অথবা বাড়ির পুরুষ সদস্যটিরও একই সময়ে বাড়ি থেকে কাজ করার প্রয়োজন যদি এসে পড়ে, তাহলে নিজের অফিস আওয়ারে এই সব সদস্যদের দায়িত্ব নেওয়া থেকে একজন কর্মরতা মহিলা নিজেকে কিভাবে বিরত রাখবেন? যে পরিবার মেয়েদের চাকরি করায় শুরুতেই আপত্তি জানিয়েছিল সেই পরিবারের মহিলা বাড়ি থেকে কাজ করলে ঠিক কতটা পরিবারের সাহায্য পাবেন? যখন একই সময়ে পুরুষ সদস্যটির অনলাইন মিটিং থাকবে, ছোটদের অনলাইন ক্লাস থাকবে, তখন ঘরের অভাবে কার শ্রম নাকচ হবে? 

ওয়ার্ক ফ্রম হোম অথবা বাড়ি থেকে কাজ করা এই প্যান্ডেমিকের শুরুর সময় থেকেই হয়ে আসছে। বেশ কিছু স্কুল, কলেজ, অফিস ইত্যাদি খুব সহজেই এই রূপান্তর করে নিতে পেরেছে। এম.এন.সি অথবা কর্পোরেটে চাকুরীরত মানুষের হয়ত এই পদ্ধতিতে শিফট করতে সুবিধে হয়েছিল কারণ এভাবে কাজ করা তাদের অভ্যেসে ছিল। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য কিছু চাকরিক্ষেত্র, যেখানে অফিসে বসে কাজ করাটাই একমাত্র পদ্ধতি ছিল, এই পরিবর্তনের ঠ্যালা এখনও হয়ত পুরোপুরি সামলে উঠতে পারছে না। যেখানে ঘরের কাজকে শ্রম হিসেবে স্বীকৃতির দাবীতে নারীবাদীদের এখনো নাস্তানাবুদ হতে হচ্ছে সেখানে ওয়ার্ক ফ্রম হোম যে সেই কাজের চাপ আরও বাড়িয়ে দিল তা আর বলার প্রশ্ন রাখে না। 

ওদিকে স্বাস্থ্যের গুরুত্ব এখন সবার ওপরে। সত্যিই হয়ত একটা বড় লকডাউন সংক্রমণের চেন ব্রেক করতে পারে। অন্তত আমাদের মতো অতিমারী অ-বিশেষজ্ঞ মানুষদের অনেকেরই তাই মনে হচ্ছে। কিন্তু রোগ থেকে প্রাণে বাঁচার লড়াইয়ে যে লকডাউন, সেটা যে অন্যদিকে অনেক মানুষকে না খেতে দিয়ে মেরে ফেলবে সেটা বুঝতে অর্থনীতিবিদ হতে হয় না। গত বছর আমরা দেখেছি হঠাৎ লকডাউনের ফলে কাতারে কাতারে পরিযায়ী শ্রমিকরা অস্থির ঘরে ফেরার চেষ্টা করেছেন। রাস্তায় প্রাণ দিয়েছেন যানবাহন না পাওয়ায় বাড়ির দিকে পথচলতি শ্রমিকেরা, এদের মধ্যে শিশুও ছিল। যেসব ভাগ্যবতী শ্রমিকেরা বাড়ি ফিরতে পেরেছিলেন তারা ঘরে ফিরে এসে পড়লেন অর্থ এবং খাদ্যের সঙ্কটে। হকের রেশন ভিক্ষের মতো করে নিলেন এবং অনেকে প্রতিজ্ঞা করলেন যে আর কোন দিন ভিনদেশে তারা কাজ করতে যাবেন না। 

ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়। গত বছরের স্মৃতি নিয়ে এবছর যখন পয়লা মে আংশিক লকডাউনের ঘোষণা হল, আবার রাজ্য জুড়ে একই চিন্তা। দোসরা মে ভোটে জিতে সরকার গঠনের দিকে এগোতেই এরাজ্যে লোকাল ট্রেন বন্ধ করে দিল নতুন সরকার এবং ১৫ মে এক পক্ষকালের জন্য (প্রায়) সম্পূর্ণ লকডাউনের ঘোষণা হল। এর ফলে লোকাল ট্রেনের ভরসায় যে সকল জীবিকা, মূলত দিনমজুর, হকার, গৃহপরিচারিকা ইত্যাদি, তাদের রোজগারের ব্যবস্থা এবং আর্থিক অবস্থা যে আবারও এক ধাক্কার মুখে পড়ল সেটা আলাদা করে বলতে হয় না। একইসাথে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করা চাকুরীরতা মানুষেরাও।     

ঠিক যেমন টানা একবছরেরও ওপর বাড়ি থেকে অফিস করে, বাইরের সাথে প্রায় সমস্ত সম্পর্ক ঘুচিয়ে দিয়ে এতদিনের অর্জিত কর্তৃত্ব এবং নিজের এক ফোঁটা বাহির কে হারিয়ে বাড়িতে আটকে থাকার অভিজ্ঞতা মানুষে মানুষে আলাদা হয়ে যাচ্ছে, তেমনি কাজ শব্দটারই নতুন মূল্যায়নের দরকার পড়ে যাচ্ছে। 

গত বছর যখন মানুষ সবে লকডাউন, ঘরে থাকা ইত্যাদি নিয়ে অভ্যস্ত হচ্ছে, একটা কথা খুব চালু ছিল সামাজিক মাধ্যমে; প্রিভিলেজড মানুষদের ঘরে থাকা উচিৎ কারণ কিছু মানুষকে কাজের জন্য, জীবনধারণের জন্য রাস্তায় বেরোতেই হচ্ছে। কথাটা অবশ্যই সত্যি। কিন্তু অসুবিধা হতে থাকে এই ভেবে যে এখানে কাজ শব্দটির অর্থ কী? এবং সম্পূর্ণ লকডাউনে কোন মানুষই যেখানে ছাড় পাবে না সেখানে নিজের প্রিভিলেজকে সহজভাবে মেনে নিয়ে এই ঘরে থাকতে পারা বা না পারার ফারাকই বা তাহলে কেন তৈরি করা। কেন একজন মানুষের কাজ না করেও ভালোভাবে বেঁচে থাকার প্রিভিলেজ থাকবে এবং আরেক দল মানুষের (যে আবার আগের গোষ্ঠীটির চেয়ে বেশি ক্লান্ত এবং পরিশ্রান্ত) শুধু বেঁচে থাকাটাই প্রিভিলেজ? জানি, যে স্বপ্ন অথবা আকাঙ্ক্ষা থেকে এই প্রশ্ন পীড়ার কারণ হয়, সেটা ভীষণই ইউটোপিক এবং যুগ যুগ ধরে কিছু মানুষ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছে। কিন্তু যে প্রশ্নটা এর সঙ্গে এবং আমাদের এই সময়ে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে সেটা হল এই দুই শ্রেণির মানুষের কাছে কাজের সংজ্ঞা কী দাঁড়াচ্ছে তবে? 

এই নিবন্ধের শুরুতেই লিখেছি যে চেনাজানা অনেকেই বলছেন একটা লকডাউন হলে ভালোই হবে। এই উচ্চারণের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের ক্লাস প্রিভিলেজ (হয়ত সব সময়ে প্রচ্ছন্নভাবে নয়)। কাজ না করলেও চলবে, অথবা যানবাহনের সমস্যায় দুদিন দেরি করে গেলে, অথবা দুদিন অফিস না গেলে অসুবিধা হবে না এবং মাইনেতেও হাত পড়বে না এরকম গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে কাজ আসছে জীবনের পরে। আর অন্য গোষ্ঠীটির কাছে, অর্থাৎ যে কাজ না করলে ইনফেকশন ছাড়াই মরবে হয়ত, তার কাছে জীবনের আগেও কাজ জরুরি হয়ে উঠছে। আর আমরাও ভালমানুষটি সেজে এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বৈসাদৃশ্য বাড়িয়েই চলেছি; একজনকে আত্ম এবং আরেকজনকে অপর করে।   

যেহেতু মে মাসের একটি সংখ্যায় লিখছি তাই ছোটবেলা থেকে শুনে আসা মে দিবসের বহুপরিচিত স্লোগানটি আমার যুক্তির খাতিরে একটু নিজের মতো সাজিয়ে নিচ্ছি ৮ ঘণ্টা কাজের অধিকার, ৮ ঘণ্টা ঘুমের অধিকার এবং ৮ ঘণ্টা যা খুশি করার অধিকার, এই দিয়েই একজন শ্রমিকের পরিচয় নির্মিত হয়। এই শ্রমিক প্রান্তিক মানুষ এবং তার শ্রমের মাধ্যমে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা মানুষের ভিত নড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু কাজ শব্দটির অর্থই ক্ষেত্র বিশেষে আলাদা হয়ে যায় সেখানে এই শ্রমিকের ধারণাও পাল্টে যাবে বৈকি। সংগঠিত ক্ষেত্রে চাকুরীরতা মানুষ তার সংগঠনের জোরে এই তিনটে আট ঘণ্টা এমনভাবে উশুল করে নেয় যে অনেক ক্ষেত্রেই এইসব কর্মী এই প্রথম আট ঘন্টাকে অন্য দুই আট ঘন্টার পরে অগ্রাধিকার দেবার কথাও ভাবতে পারেন। ওদিকে অসংগঠিত শ্রমিকেরা এক দিন পেরোলে পরের দিন আবার আট ঘণ্টার কাজ পাবেন কিনা সেই নিয়ে চিন্তিত বেশি। সেই চিন্তায় তাদের ঘুম যায় এবং যা খুশি করতে পারার সঙ্গে যে অর্থ এবং কাজের প্রাপ্যতা জড়িয়ে আছে তা তাদের চেয়ে হয়ত ভালো কেউ জানে না। 

কোন দেশ অতিমারী মোকাবিলায় ওয়েলফেয়ার স্টেটের মডেলে কাজ না করলে সেই দেশের সরকারের নেওয়া লকডাউনের সিদ্ধান্তের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন জানানো সম্ভব নয়। শুধু র‍েশন, আর এককালীন কিছু টাকা (তাও যা সবার কাছে পৌঁছয় না) দিয়েও সমস্যার সমাধান হয় না। তদুপরি রয়েছে লকডাউনের আড়ালে বৈষম্যমূলক এবং নিপীড়ক রাষ্ট্রীয় নীতি। নয়া কৃষি আইন, নয়া শ্রম কোড, অত্যাবশ্যক পণ্য সংশোধনী বিল, নতুন শিক্ষা নীতি ইত্যাদি সহ কেন্দ্রীয় সরকার ২০২০র বাদল অধিবেশনে মোট ২৫টি আইন পাশ করিয়ে নেয়। তার মধ্যে বিরোধীশূন্য রাজ্যসভায় দুদিনের মধ্যে পাশ হয় ১৫টি বিল। যেখানে দেশের মানুষ, যারা কিনা একই সাথে এইসব আইন এবং নীতির অংশীদার, জরুরি অবস্থার মতো আইনি চাপে বাড়ি থেকে বের হতে পারছে না সেখানে একের পর এক আইন পাশ করিয়ে সরকার এই লকডাউনকে নিজের স্বেচ্ছাচারিতার জন্য ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে।

মানুষের বেঁচে থাকার চাহিদার মধ্যে সসম্মানে জীবনযাপনের চাহিদাও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই কঠোর শীতে, এমনকি করোনার হাতছানি থাকা সত্ত্বেও দিল্লীতে চলে কৃষক আন্দোলন। আমরা সেখান থেকে শিক্ষা নিই। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ যখন আছড়ে পড়েছে তখন আরেকটা লকডাউন যদি অপরিহার্য হয় তাহলে তার সঙ্গে থাকতে হবে কাজ না হারাবার এবং কাজ পাবার প্রতিশ্রুতি। আবার ঘর থেকে বেরোতে পারার, মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেবার কথা মনে রেখেই ঘরে ঢুকতে হবে কিছুক্ষণের জন্য। যদি লকডাউন সময়ের দাবী হয় তাহলে সেটাকে একটা আপৎকালীন জরুরি অবস্থা হিসেবেই দেখা উচিৎ আমাদের। একে প্রশ্ন করা যাবে না, যেন এটাই স্বাভাবিক সেই মোড থেকে বেরোতে হবে। লকডাউনের সমর্থনে রাখা এক একটি বাক্যের সাথে থাকা উচিৎ সরকারের দ্বারা জরুরি অবস্থার অপব্যবহারের সম্ভাবনার কথা। 

তারই সাথে মাথায় থাকুক, অনেক মহিলা বাড়ির অবসরে একা যে সময় কাটাতেন, তার সেই বিশ্রামের ৮ ঘণ্টাটি এখন কম্প্রোমাইজড। যে মেয়েটি কাজের জন্য এতদিন বাড়ির বাইরে বেরোতে পারত তার ৮ ঘণ্টা যা খুশি করার করতে পারার কর্তৃত্ব খর্ব হচ্ছে। লকডাউনে যাতায়াতের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ চলে আসায় অনেক মহিলা (পড়ুন গৃহশ্রমিক, হকার, দিনমজুর) ৮ ঘন্টা কাজের অধিকারও হারাচ্ছেন। নিজের প্রিভিলেজ চিহ্নিত করতে না পেরে এবং গর্বের সাথে শ্রমিক এবং প্রান্তিক মানুষদের থেকে নিজেকে আলাদা রেখে লকডাউনের ডিজায়ার আসলে পুরুষকেন্দ্রিক পৃথিবীর ডিজায়ার। একটা নিউ নর্মালের কথা ভাবা হচ্ছে যেখানে এই বিচ্ছিন্নতা এবং স্বার্থকেন্দ্রিকতাকে স্বাভাবিক করে তোলার চেষ্টা থাকবে। নারী হিসেবে, শ্রমিক হিসেবে, এবং যেকোন প্রান্তিক মানুষ হিসেবে এর বিরোধিতা করে যেতেই হবে যতক্ষণ না এই নব্য স্বাভাবিক সবার কথা বলছে, সবার কথা ভাবছে। 

রাষ্ট্র সবসময়ই উপকারসাধনের যুক্তি দিয়েই লকডাউন ঘোষণা করে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, যদি সত্যিই জনদরদী কারণে লকডাউন করা হয় তাহলে প্রত্যেকবার কয়েক ঘন্টা অথবা একদিনের নোটিসে এই ঘোষণা আসে কেন? এই অপ্রত্যাশিত খবরের অভিঘাত হালকা করতে, মানুষকে আশ্বস্ত করতে, সরকার তাদের জন্য কী করবে, কত টাকা ভাতা দেবে, সেসবের উল্লেখ অথবা ঘোষণা কখনোই থাকে না। 

সমস্ত শ্রেণির মানুষের কথা মাথায় রেখে লকডাউন করতে গেলে সরকারি সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে; যেমন নাগরিকদের ন্যূনতম মাসিক রোজগারের ব্যবস্থা, সকলের জন্য বিনামূল্যে টিকার অঙ্গীকার, রেশনের ব্যবস্থা ইত্যাদি। লকডাউনের সিদ্ধান্ত যখনই নেওয়া হবে (অতীতেও দেখেছি সেটা যেকোন সময়েই হতে পারে, এবারেও তাই হল) উল্লিখিত সহায়তাগুলি সেক্ষেত্রে নাগরিকদের জরুরি অবস্থার নিয়ম মেনে চলার অনুপ্রেরণা দেবে এবং সে নিজেকে নিরাপদ রাখারও তাগিদ অনুভব করবে। তা না হলে নিয়ম ভাঙ্গার কারণ বাড়ে আর তার সঙ্গে বাড়ে শাস্তির নামে পুলিশি সন্ত্রাস। সরকার সবসময়ে মূলধারার মানুষদের স্পন্দন মেপে চলে এবং সেই মানুষেরা বেশিরভাগই স্বভাবে পুরুষ, যাপনে নিরাপদ এবং ভাবনায় স্বার্থপর। তাই কোনকিছুর প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন জানাবার আগে আমাদের সজাগ থাকতে হয়।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *