দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পঞ্চাশের মন্বন্তর ও কমিউনিস্ট মেয়েরা (প্রথম কিস্তি)

চল্লিশের দশকের গোড়ার দিকে বিশ্বজোড়া মহাযুদ্ধের ছায়া ভারতেও পড়েছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উপনিবেশ হওয়ার দরুণ, ভারতের জনগণ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ্ভাবে জড়িয়ে পড়েছিল এই যুদ্ধে। শুধু বৃটিশ সেনার অংশ হিসেবে অসংখ্য ভারতবাসীর আত্মত্যাগই নয়, এই বৃটিশ উপনিবেশকে মূল্য চোকাতে হয়েছিল এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মধ্যে দিয়ে।

জাপানের যুদ্ধে যোগদান, ভারতের বৃটিশরাজের কাছে এক গভীর চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ভারতের মত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপনিবেশ হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে তারা চটজলদি বিভিন্ন রক্ষণাত্মক পরিকল্পনা শুরু করে দেয়। আসন্ন জাপানি আক্রমণের আশঙ্কায় তারা ভারতের উপকূলবর্তী অঞ্চলে সব ধরনের কৃষিকাজের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এই পরিস্থিতিতে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের যোগান কমতে শুরু করে, এবং অতিমুনাফার আশায় শুরু হয় ব্যাপক পরিমাণে মজুতদারি ও অপপণন। তৈরী হয় এক কৃত্রিম খাদ্য সংকট। অচিরেই তা প্রবল হয়ে ওঠে এবং ভয়াবহ এক মন্বন্তরের চেহারা নেয়। এই মন্বন্তরের প্রেক্ষিতে চল্লিশের দশকে নারীর ভূমিকা এই প্রবন্ধের কেন্দ্রীয় আলোচ্য।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমন করার পর, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির যুদ্ধ নিয়ে অবস্থানে একটা পরিবর্তন আসে। তারা যে যুদ্ধকে এতদিন সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ হিসেবে দেখত, সেই যুদ্ধকেই তারা ফ্যাসিবাদবিরোধী জনযুদ্ধ আখ্যা দেয় এবং বৃটিশ যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে সাহায্য করা শুরু করে। এ হেন সময়ে বামপন্থী নারীদের নিয়ে কলকাতায় গড়ে ওঠে “মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি”।

সত্যি কথা বলতে, পুরনচাঁদ যোশির “Foreword to Freedom” প্রবন্ধের মাধ্যমে তৎকালীন সিপিআই বৃটিশ যুদ্ধ প্রচেষ্টার সমর্থন ও কংগ্রেসের ডাকা বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের বিরোধিতা করলেও তাদের বিভিন্ন গণ সংগঠন এবং সদ্য প্রতিষ্ঠিত নারী সংগঠন কংগ্রেস কর্মীদের জেল থেকে মুক্তি  সহ বিভিন্ন দাবীতে সোচ্চার ছিল। সদ্য প্রতিষ্ঠিত মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে প্রায় ৩০০০ সই সংগ্রহ করেছিল তাদের জাতীয় সরকারের গুরুত্ব সংক্রান্ত প্রচারাভিযানের সময়ে।

বস্তুত, এই মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির ইতিহাসের শুরুটা হয় ১৯৩৯ সাল নাগাদ। সেই বছর গড়ে উঠেছিল ছাত্রী সঙ্ঘ। এই ছাত্রী সঙ্ঘ ছিল ভবিষ্যতে কমিউনিস্ট পার্টির বহু নারী সদস্যদের বামপন্থী রাজনীতিতে হাতেখড়ির জায়গা। সোভিয়েত নারীদের ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের অনুপ্রেরণায় কলকাতার বামপন্থী নারীরা এক ফ্যাসিবাদবিরোধী গনতান্ত্রিক ঐক্য গড়ে তোলার কাজে লেগে পড়েছিলেন। অবশেষে ১৯৪২ সালের ১৩ই এপ্রিল কলকাতার কমিউনিস্ট নারীদের উদ্যোগে গড়ে ওঠে “কলকাতা মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি”। এই সমিতির প্রথম আহ্বায়ক ছিলেন এলা রিড, এবং সংগঠক কমিটিতে ছিলেন মনিকুন্তলা সেন, জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলী, শাকিনা বেগম প্রমুখ।

যুদ্ধের প্রেক্ষিতে, জাপানী আগ্রাসন বিরোধী প্রচার, ফ্যাসিবাদ বিরোধী প্রচার ইত্যাদি কাজের পাশাপাশি, মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি পঞ্চাশের মন্বন্তরের সময়ে গড়ে ওঠা বিরাট খাদ্য আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বস্তুত, এই মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির লাগাতার প্রচেষ্টাই ভারতের প্রগতিশীল বামপন্থী নারী আন্দোলনে শ্রমজীবী নারীদের অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করেছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন বাংলায় শুরু হয়েছিল ভয়াবহ পঞ্চাশের মন্বন্তর। ব্যাপক মজুতদারী জন্ম দেয় এক কৃত্রিম খাদ্য সংকটের। কলকাতাসহ বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে খাদ্যের জন্য ব্যাপক হাহাকার শুরু হয়। সেই সময়ে প্রাথমিকভাবে ক্যান্টিনের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে খাবার বিলি করা শুরু করে বিভিন্ন বামপন্থী গণ সংগঠন। কিন্তু অচিরেই তারা বুঝতে পারে যে রেশন দোকান না খুললে আর চালের দাম নিয়ন্ত্রিত না হলে এই অবস্থাকে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। এই অবস্থার বিরুদ্ধে প্রস্তুত হতে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির সদস্যেরা বিভিন্ন বস্তি ও পাড়ায় মিটিং ও কমিটি গঠন প্রক্রিয়া শুরু করেন। অচিরেই সংগঠনের সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় চার হাজার। একটি এগারো সদস্যের কার্য্যনির্বাহী কমিটি তৈরী হয়। এই কমিটির সভানেত্রী হন লীলা মজুমদার, সম্পাদক নিযুক্ত হন অনিলা দেবী।

প্রথমদিকে তারা বস্তি এলাকাগুলিতে রেশন দোকান খোলার দাবীতে বিভিন্ন জায়গায় ডেপুটেশন দেওয়া শুরু করেন, তাতে আশানুরূপ ফল না পেলেও বস্তি এলাকাগুলিতে তাঁদের কাজের পরিসর এবং সদস্যসংখ্যা বাড়তে থাকে। অবশেষে ২৪শে জানুয়ারি ১৯৪৩, পার্ক সার্কাস, এন্টালিসহ বিভিন্ন এলাকার বস্তির মহিলারা কলকাতার টাউন হলে জমায়েত করেন খাদ্যের দাবীতে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই মহিলারাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে রেশন ব্যবস্থা চালু করার দাবী তোলেন।

মহিলা আত্মরক্ষা কমিটি জমায়েত, ক্যান্টিন চালানো বা ডেপুটেশন দেওয়াতেই থেমে থাকেনি। ১৯৪৩ সালের ১৭ই মার্চ, তারা কলকাতায় প্রথম খাদ্যের দাবীতে বাংলার বিধানসভা অভিযানের ডাক দেয়। প্রায় ৫ হাজার বস্তিবাসী নারী এই অভিযানে অংশ নেন। মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির নেতৃত্বে এই অভিযানে বাংলার নারী আন্দোলনের ভাষা বদলে যায়। প্রথমত, শ্রমজীবী মহিলাদের এক বড় অংশ বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নারী আন্দোলনের কর্মীদের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার সুযোগ পায়। দ্বিতীয়ত, এই অভিযান ছিল গণস্তরে বাংলার নারী আন্দোলনের প্রথম জঙ্গী অভিব্যক্তি। এই ধরনের কার্যকলাপের মাধ্যমে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি এতোদিনের মধ্যবিত্তনির্ভর বামপন্থী নারী আন্দোলন শ্রমজীবী ও গ্রামাঞ্চলের মহিলাদের মধ্যে পৌঁছে দেয়।

শুধু বিক্ষোভ অভিযানই নয়, তার পাশাপাশি মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি রেশন দোকান খোলার পর খাদ্যপণ্য বন্টনের সময়ে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা শুরু করে। লাইন নিয়ন্ত্রণ এবং লাইনে উপস্থিত মহিলাদের যাতে হেনস্থার স্বীকার না হতে হয়, সেই দিকে নজর রাখা ছিল তাদের প্রধান কাজ। এই ধরনের কাজকর্ম অচিরেই মহিলা আত্মরক্ষা সমিতিকে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তোলে। ১৯৪৩ সালে তাদের প্রথম সম্মেলনের সময়ে তাদের সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২২০০০। শুধু খাদ্য আন্দোলনের সাপেক্ষ্যই নয়, আরো বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে তারা প্রচার অভিযান শুরু করে। সামগ্রিকভাবে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির এই উত্থান বাংলার প্রগতিশীল নারী আন্দোলনের উপর এক বিপুল প্রভাব রেখেছিল। মনিকুন্তলা সেন, জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলী প্রমুখের পাশাপাশি অসংখ্য নাম না জানা শ্রমজীবী নারী এক নতুন ইতিহাসের রচনা করেন। এই সংগঠনের গণতান্ত্রিক চরিত্র শুধুমাত্র কমিউনিস্ট নয়, ইন্দিরা দেবীর মত অ-কমিউনিস্ট গনতান্ত্রিক নারীদেরও এই আন্দোলনে টেনে আনে। বিশ্বযুদ্ধকালীন দুর্ভিক্ষের পরেও তাঁরা তাদের কার্যকলাপ জারি রাখেন এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে সম্প্রীতি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।                                                                                                                        [চলবে]

ছবি- চিত্তপ্রসাদ

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *