‘অঙ্ক কী কঠিন!’

অঙ্কের সাথে মানুষের খুব গভীর এবং অনেক পুরনো একটা সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ যখন গুহায় বাস করত, সদ্য সদ্য গুহার দেওয়ালে ছবি আঁকতো, তখন থেকেই কিন্তু খড়ি দিয়ে দাগ টেনে টেনে মানুষ সংখ্যা গুনতে শিখেছিল। হয়তো হাত পায়ের আঙুলের সমান সংখ্যাই গুনতো শুরুর দিকে, কিন্তু এই যে গণনা পদ্ধতি এটাই ক্রমে ক্রমে উন্নত থেকে উন্নততর হয়েছে, হরেক রকমের নাম্বার সিস্টেম তৈরী করেছে। যার মধ্যে কিছু নাম্বার সিস্টেম প্রায় হাজার চারেক বছর আগেই হয়ে গেছে তৈরী। আর সেসব সংখ্যার সাহায্যেই আজ আমরা যে কোনও বিষয়-বস্তু-শক্তি সব কিছুকে মাপতে পারি। ভাবো তো পরিমাপ যদি না করতে পারতাম আমরা, তাহলে কি এই সভ্যতা আজ যেমন দেখছি, সেরকম হত? তাই সভ্যতা গড়ে ওঠার মূলে যে শাস্ত্রটা আমাদের প্রভূত সাহায্য করেছে, নির্দ্বিধায় বলা যায়, তার নাম গণিত বা অঙ্ক।

সভ্যতা গড়তে যে মেধা-পরিশ্রম এর অবদান লাগে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই তা দিয়েছে। কিন্তু তবুও বিভিন্ন সামাজিক কারণে মেয়েদের বৌদ্ধিক অবদানকে প্রায় কোনও স্বীকৃতিই দেওয়া হয়নি একটা বড় সময় জুড়ে। যেমন ধরো, গ্রীক পন্ডিত পিথাগোরাসের নাম তো অনেকেই শুনেছো, কিন্তু তাঁর এক ছাত্রী ছিল, থিয়ানো, তাঁর নাম কেউ শুনেছো আগে? থিয়ানো ছিলেন বলা চলে একদম প্রথম যুগের গণিতজ্ঞ। গণিত মহলে বলা হয় golden ratio ওনারই আবিষ্কার। যদিও ইতিহাসে তাঁর চর্চা নেই, ফলে কালের স্রোতে হারিয়ে গিয়েছে তাঁর সব লেখাপত্র। না, শুধু থিয়ানোই নয়, এরকম অসংখ্য থিয়ানো, শুধু মেয়ে হয়ে জন্মানোর জন্যই স্বীকৃতি পায়নি অঙ্কের ইতিহাসে। অথচ অঙ্ক নিজে কী ভীষণ বৈষম্যহীন একটা বিষয়। কিরকম? ধরো আমি বললাম দুটো বিজোড় সংখ্যার (odd number) বিয়োগফল সবসময় জোড় সংখ্যা (even number) হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় 7-3=4, এটা কেন হয়? কারণ, যে কোনও দুটি ক্রমিক বিজোড় সংখ্যার (consecutive odd numbers) মধ্যে পার্থক্য 2। এবার দুটো দূরে দূরে থাকা বিজোড় সংখ্যা নিলেও ঐ 2 এর গুণিতকেই তৈরী হবে পার্থক্যটা, যেটা তোমরা স্কিপ কাউন্টিং করেও দেখতে পারো। তো আমার এই স্টেটমেন্টটা পৃথিবীর যে কোনও কোণায়, যে কোনও অবস্থায় ও অবস্থানে সত্য। স্থান কাল পাত্র নির্বিশেষে এই বক্তব্যটি প্রশ্নাতীত ভাবেই সত্য। ফলে বুঝতেই পারছো, যে যুক্তিনির্ভর এই শাস্ত্রের অন্তঃস্থলের কাঠামোটি খুবই বৈষম্যহীন বা বলা যায় সাম্যদর্শী। কিন্তু তার চর্চায় ও প্রয়োগে আমরা মানুষরা নানা সামাজিক বিধি নিষেধ আরোপ করে তাকে সরিয়ে দিয়েছি কত কত মানুষের কাছ থেকে, কখনও নারী-পুরুষের দোহাই দিয়ে তো কখনও বুদ্ধি-নির্বুদ্ধির দোহাই দিয়ে, কখনও বা র‍্যাশনালিটি -ইমোশনাল এইসব দোহাই দিয়ে। কিরকম? ধরো এই যে অঙ্ক শেখা বা করার মধ্যে আমরা বিভিন্ন ভেদাভেদের দেওয়াল তুলে দিয়েছি। যে বা যারা অঙ্কটা যুক্তিনির্ভরভাবে শিখে আয়ত্ত করতে পারে, তাদের আমরা ‘বুদ্ধিমান’ বলে দাগিয়ে দিই বা তাদেরকে ‘যুক্তিবাদ’এর পরাকাষ্ঠা বলে চিহ্নিত করি। ফলে তারা সমাজে সম্মানের নিরিখে একটু উঁচু স্থানে থাকে। আর যারা যুক্তিনির্ভরতাকে আশ্রয় করেনি বা স্রেফ হয়তো অঙ্ক ভালো লাগে না বলেই করতে পারে না, তাদের আমরা ‘নির্বোধ’ বা ‘আবেগপ্রবণ’, ‘যুক্তিহীন’ এসব বলি। এটা খুবই অন্যায়, অন্তত গণিত আমাদের এরকম কিছু শেখায় না। প্রবাদপ্রতিম গণিতজ্ঞ পিথাগোরাসও কিন্তু এই যুক্তি বনাম ইমোশন এর তত্ত্ব দিয়েছিলেন, যদিও পরবর্তীকালে সেটাকে খুব একটা মান্যতা দেওয়া হয়নি।

তো যা বলছিলাম, এই যে অঙ্ক এর মূলগত কাঠামোতে হয়তো বিভেদ বা বৈষম্য খুঁজে পাবে না তেমন ভাবে। কিন্তু অনেক সময় তার উপস্থাপনায় অনেক গলতি কিন্তু রয়ে যায়, যার দায় একান্তই সমাজের ব্যক্তি মানুষের, যে বা যারা সামাজিক কাঠামোর মোড়কে অঙ্কের সমস্যা বা গল্পগুলোকে সাজান। যেমন, ধরো একটু খেয়াল করলেই দেখবে অঙ্কের বইয়ে মহিলা শ্রমিকরা পুরুষদের চেয়ে কম কাজ করেন, কিংবা ‘বুল্টি’রা ‘বিল্টু’দের চেয়ে কম চকোলেট পায়, এমনকি অংশীদারী অঙ্কেও বাবার সম্পত্তি ছেলে ও মেয়ে সমান ভাগে পায় না। দেখো এগুলো কিন্তু অঙ্কের সমস্যা নয়, এগুলো সমাজের আরোপিত চিত্র যেগুলো অঙ্কের মত একটা বিষয়কে দূষিত করে। আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে এই ভাষাকে বদলাতে হবে নিজেদের তাগিদেই। শুধু ভাষাগত সমস্যাই নয়, অঙ্ক সংক্রান্ত যে যাবতীয় ‘মিথ’ আমরা শুনে থাকি সেই সবকটিকেই দাঁড় করাতে হবে চ্যালেঞ্জের মুখে। এই যে একটু আগেই বললাম বিভেদের গল্প, সেখান থেকেই জন্ম নিয়েছে বেশ কিছু মিথ। যেমন, ‘মেয়েরা অঙ্ক পারে না’, ‘বুদ্ধিমান ছাড়া অঙ্ক হয় না’ ইত্যাদি। এগুলো যে আপাদমস্তক মানুষের আরোপিত ভাবনার ফল, তা তো ব্যাখ্যা করলামই। কিন্তু এ দুইয়ের বাইরেও অঙ্ক নিয়ে সবচেয়ে বড় যে মিথটা কাজ করে, তা হল ‘অঙ্ক খুব কঠিন একটি বিষয়’। 

‘অঙ্ক কী কঠিন’ এই বাক্যবন্ধটা বলে বলে পৃথিবীর তাবত মানুষকে শিশু অবস্থা থেকেই ভয় দেখানো হয়। ঠিক যেমন করে মিথ্যে কল্পিত ভুতের গল্প বলে শিশুকে ভয় দেখানো হয়, এটাও অনেকটা একইরকম। অথচ কোনও বিষয়েরই এরকম ‘সহজ’ বা ‘কঠিন’ বলে কোনও মাপকাঠি হয় না। যা হয় তা হল ‘ভালো লাগা’ বা ‘না লাগা’। ছোটবেলায় স্কুলে আমরা অনেক অনেক বিষয় একসাথে পড়ি। এর মধ্যে কারওর অঙ্ক পড়তে ভালো লাগে, কারো বিজ্ঞান, কারও ইতিহাস জানতে ভালো লাগে তো কেউ সাহিত্যে আনন্দ খুঁজে পায়। এই সবগুলি বিষয়ই গভীরভাবে জানতে ও চর্চা করতে গেলে শ্রম লাগে, লাগে বিচারবোধ, উন্নততর ভাবনা। শুধু পড়াশুনো কেন, মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে যা যা মানুষ শিখেছে আয়ত্ত করেছে সেই সবের পিছনেই মানুষের নিরলস প্রচেষ্টা ও ভালোলাগা মিশে ছিল, তাই তো আমরা রঙ খুঁজে পেয়েছি, গান-বাজনা-নাচ সব পেয়েছি। যাক গে, যা বলছিলাম, তা অঙ্কও পৃথিবীর অন্য আর পাঁচটি বিষয়ের মতোই অত্যন্ত নিরীহ একটি বিষয়, তাকে অহেতুক জুজুর মত ভয় পাওয়ার কিচ্ছু নেই। একদম শুরুতেই লিখেছিলাম, অঙ্কের ভিত্তি বা কাঠামোটি হল যুক্তির। তাই অঙ্ক শিখতে গেলে বা আয়ত্তে আনতে গেলে আমাদেরকে যুক্তি নির্ভর হতে হবে। কোনও একটি সমাধান কেন সেই উপায়টি অবলম্বন করে হচ্ছে, সেটিকে খুঁজতে হবে। ‘এটা এভাবেই হয়’, বা ‘এটা করতে হয়’ এটা অঙ্কে বলা যায় না, ফলে এটা মেনেও নিতে নেই। আসলে আমরা মানুষরা বড় আনুগত্য পছন্দ করি। আমরা চাই আমি যা বলছি, তা প্রশ্নহীন উলটো পিঠের মানুষটি মেনে নিক বা উল্টোটা মানে, আমার চেয়ে বড় কেউ কিছু বলছে, তো সেটা আমি প্রশ্নহীন মেনে নিতে চাই। ঠিক এই ভাবনার অন্তরালে থেকেই আমরা অনেকসময় গণিত শেখাতে গিয়েও বা শিখতে গিয়েও ‘কেন’র উত্তরটিকে এড়িয়ে যাই। ফলে আমাদের অঙ্কের কাঠামোটা হয়ে যায় ফাঁপা।

একটা গল্প বলি তোমাদের অঙ্ক শাস্ত্রে ‘ফার্মাস লাস্ট থিওরেম’ (FLT) বলে বিখ্যাত একটা ধাঁধা তৈরী করেছিলেন পিয়ের দ্য ফার্মা বলে এক গণিতজ্ঞ, সালটা ছিল ১৬৩৭ খ্রীষ্টাব্দ। কি ছিল সেই ধাঁধাতে? উনি খুঁজছিলেন এমন কোনও integer number কেন পাওয়া যায় না, যেখানে দুটো নাম্বারের ঘণ (cube) এর যোগফল তৃতীয় আরেকটি নাম্বারের cube হবে। যেটা কিন্তু বর্গসংখ্যার ক্ষেত্রে পাওয়া যায় সহজেই। যেমন 4 এর বর্গ ও 3 এর বর্গের যোগফল 5 এর বর্গ। কিন্তু এই নিয়ম পারফেক্ট কিউব নাম্বারের বেলায় খাটে না। কিন্তু কেন খাটবে না, সেটার সদুত্তর কোনও গণিতজ্ঞ তখন দিতে পারেননি, তাঁরা শুধু উদাহারণ দিচ্ছিলেন, কিন্তু ইন্টিজারের তো কোনও শেষ নেই, তাই উদাহারণে তত্ত্ব প্রমাণ হয় না। তাই এই প্রশ্নটাও অঙ্কের ধাঁধা হিসেবেই রয়ে গেছে, কোনও থিওরি হয়ে উঠতে পারেনি। তো এই ধাঁধা বহু বছর ধরে তাবড় বিজ্ঞানীদের ভাবিয়েছে। শেষে অনেক পরে এর যুক্তিসম্মত উত্তর দিয়েছিলেন অ্যান্ড্রু ওয়েলস, ১৯৯৫ সালে। ধাঁধা জন্মানোর ঠিক ৩৫৮ বছর পরে। তাহলে বুঝতেই পারছো অঙ্কের একটা মাত্র তত্ত্ব যুক্তির ভিত্তিতে প্রমাণ করতে কত কত বছর কত শত মানুষ মেধা-শ্রম-সময় দিয়ে গেছেন। ফলে এখান থেকে বলার, যে যুক্তি ছাড়া কিছুই গ্রহণীয় না, আর যুক্তি খোঁজাও সময়সাপেক্ষ। অতিদ্রুত কোনও কিছুই আয়ত্ত করা সম্ভব নয়, অধৈর্য্য হয়ে তো কখনোই নয়। ফলে অঙ্ক শিখতে গেলে এবার থেকে প্রত্যেকে আমরা যুক্তিতে শান দেবো, প্রশ্ন করবো আর প্রচলিত যে মিথগুলো কানের পাশে ঘুরে বেড়ায় তাদেরকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবো।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *