মে দিবসের কবিতা

মানুষের শ্রমের বিন্যাস বহুমুখী; শ্রেণিবৈষম্য, লিঙ্গবৈষম্যের সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তি বিশেষে শ্রমের সংজ্ঞা পালটায়, পালটায় শ্রমের ধরন। শ্রমজীবী ও প্রান্তিক মানুষের উপর নিপীড়ণ চলমান সারা পৃথিবীতেই, বিভিন্ন আঙ্গিকে। শ্রমের এই বিভিন্ন রূপ, এবং তার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তুলে ধরতেই রইল ইউরোপ আর আমেরিকার এই সাতটি কবিতা। বের্টোল্ট ব্রেখট জার্মানির ফ্যাসিবিরোধী বিপ্লবী কবি-নাট্যকার-আন্দোলনকর্মী, তাঁর কাজে বারবার উঠে এসেছে শ্রমজীবী মানুষের কথা; ফিলিপ লেভিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কবি, যিনি ডেট্রয়েটের শ্রমিকশ্রেণির জীবন নিয়ে দীর্ঘদিন কবিতা লিখেছেন; মায়া এঞ্জেল্যু নারীবাদী মার্কিন কবি, লেখিকা ও অধিকার আন্দোলন কর্মী; জুলিয়া আলভারেজ ডমিনিকান-মার্কিনী কবি ও লেখিকা, তাঁর লেখায় বারবার উঠে এসেছে উদ্বাস্তু এবং নারী সমস্যার কথা; জুন জর্ডান জামাইকান-মার্কিনী কবি ও লেখিকা, যিনি আজীবন পুরুষতন্ত্র, বর্ণবিদ্বেষের বিরোধিতা করেছেন তাঁর লেখায়। 

I

To the Students of the Workers’ and Peasants’ Faculty/ Bertolt Brecht

শ্রমিক কৃষক বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে/ বার্টোল্ট ব্রেখট

তোমরা এখানে বসে থাকো।

ঠিক কতটা রক্ত ঝরার পর তোমরা এখানে বসে থাকো –

সেসব গল্প তোমাদের কাছে ক্লান্তিকর ঠেকে?

তোমাদের আগে যারা এখানে বসতে পেরেছিল,

পরে তারাই  জনসাধারণের ধরাছোঁয়ার উর্ধ্বে চলে গেছে,

সেকথা মনে রেখো।

তোমার বুদ্ধি যদি মানুষের মুক্তির কাজে না লাগে,

তবে  তোমার বিজ্ঞান মূল্যহীন,

তোমার আকর্ষক শিক্ষা নিষ্ফল।

ভুলোনা, তুমি যাতে এখানে বসতে পারো, তার জন্য ওরা নয়,

ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন  তোমার-আমার মতো মানুষ।

এখন তুমি চোখ ফিরিয়ো না, ছেড়ে যেয়ো না,

বরং শেখার চেষ্টা করো, কীসের জন্য,

শেখার চেষ্টা করো।

II

Questions from a Worker Who Reads/ Bertolt Brecht

পড়তে পারে এমন এক শ্রমিকের থেকে কিছু প্রশ্ন/ বার্টোল্ট ব্রেখট

থিবসের সাত দরজা কারা বানিয়েছিল জিজ্ঞাসা করলে

ইতিহাস বই তোমাকে জানাবে রাজা-রাজড়াদের নাম।

কোন সম্রাটের পিঠে চাপানো হয়েছিল তার পাথর?

ব্যবিলন যতবার ভেঙে পড়েছিল, প্রতিবার কে তুলেছিল সব ইমারত?

সোনায় মোড়া লিমা নগরের কোন ঘরে ঠাঁই পেয়েছিল তার সব কারিগর?

যে সন্ধ্যায় সম্পূর্ণ হয় চীনের দীর্ঘ প্রাচীর, তার স্থপতিরা কোথায় ফিরেছিলেন?

রোম শহরের সব সুবিশাল মহার্ঘ্য প্রাসাদ- কারা সাজিয়েছিলেন তার ইঁট-কাঠ?

কাদের দেহের উপর সীজারের উত্থান?

লোকগীতির আশ্চর্য সে বাইজেন্টাইন নগরী – সেখানে  কি শুধুই সার সার ইমারত?

রূপকথার আটলান্টিস সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়ার মুহূর্তেও

তার নাগরিকরা শুধুই আর্তনাদ করে ডাকছিলেন তাদের নিজস্ব ক্রীতদাস।

যুবক আলেকজান্ডারের ভারতবর্ষ বিজয় – সে যুদ্ধে কি তিনি একাই সেনানী?

সীজারের গলদেশ অধিগ্রহণ,  তাঁর শিবিরে কি একজনও রাঁধুনি ছিলেন?

তাঁর যুদ্ধজাহাজ ডুবে গেছে শুনে খুব কেঁদেছিলেন স্পেনের ফিলিপ,

সে কান্নার দাবীদার কি তিনি একাই?

দ্বিতীয় ফ্রেডরিক সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধজয়ের পর ঘরে ফেরেন,

তাঁর সাথে কাদের অধিকার সে বিজয়ে?

প্রত্যেক পাতায় পাতায় এক বিজয়ের ইতিহাস।

বিজয়ীদের জন্য রান্না করেছিলেন কারা?

প্রত্যেক দশ বছর অন্তর এক বিজয়ীর জন্ম হয়।

সেই বিজয়ীকে কর দেন কারা?

অজস্র  নথি,

আর অসংখ্য  প্রশ্ন।

III

All of Us or None/ Bertolt Brecht

হয় আমরা সবাই, অথবা কেউ নয়/ বার্টোল্ট ব্রেখট

তোমার শিকল কে ভাঙবে, ক্রীতদাস?

নিঃঝুম অন্ধকারের মধ্যেও যারা বেঁচে আছে,

কমরেড, শুধু তারাই তোমাকে দেখতে পায়,

শুধু তারাই তোমার কান্না শুনতে পায়,

কমরেড, শুধু দাসেরাই তোমায় মুক্তি দেবে।

হয় সারা পৃথিবী, অথবা কোথাও নয়,

হয় আমাদের সবার, অথবা কারোর নয়।

মানবমুক্তি একাকী অসম্ভব,

হয় বন্দুক ওঠাও, অথবা শিকল।

হয় সারা পৃথিবী, অথবা কোথাও নয়,

হয় আমাদের সবার, অথবা কারোর নয়।

তুমি  ক্ষুধিত, কে তোমার রুটির জোগান দেবে?

রুটি থেকে খুঁটে খেতে চাও,

আমাদের সাথে এসো, আমরাও ক্ষুধিত।

আমাদের সাথে এসো, আমরা এগিয়ে যাব,

শুধু ক্ষুধিতরাই তোমায় খাবার দেবে।

হয় সারা পৃথিবী, অথবা কোথাও নয়,

হয় আমাদের সবার, অথবা কারোর নয়।

মানবমুক্তি একাকী অসম্ভব,

হয় বন্দুক ওঠাও, অথবা শিকল।

হয় সারা পৃথিবী, অথবা কোথাও নয়,

হয় আমাদের সবার, অথবা কারোর নয়।

তুমি নিপীড়িত, কে তার প্রতিশোধ নেবে?

তোমার ওপর নিরন্তর আঘাত নামে রোজ,

কান পাতো, তোমার আহত সাথীরা তোমায় ডাকছে।

IV

What Work Is/ Philip Levine

কাজ কাকে বলে/ ফিলিপ লেভিন

বৃষ্টির মধ্যে ফোর্ড হাইল্যান্ড পার্কের সামনে 

লম্বা লাইনে আমরা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি। কাজের জন্য।

কাজ কী তুমি জানো- এই কবিতাটা পড়েফেলার মতো বয়স তোমার হয়ে থাকলে,

কাজ না করলেও তুমি জানো কাজ কী।

চুলোয় যাক। এটা আসলে অপেক্ষার কবিতা।

এক পা থেকে আরেক পায়ে ভর দেওয়ার কবিতা।

এই মৃদুমন্দ বৃষ্টি তোমার চুলের ওপর শিশিরের

মতো ঝরে পড়ছে। তোমার চোখ বৃষ্টিতে ঝাপসা,

কিন্তু হঠাত তোমার মনে হয়, তোমার নিজের ভাই

তোমার ঠিক দশজন আগে একই লাইনে দাঁড়িয়ে।

আঙুল ঘষে চশমা পরিষ্কার করতেই তুমি বোঝো

সে আসলে অন্য কারুর ভাই – তোমার কাঁধ ওর থেকে

বেশি চওড়া হলেও তোমার মতই ঝুঁকে রয়েছে।

হাসিতে জেদের স্পষ্ট ছবি। যেন কিছুতেই বৃষ্টির কাছে

হার মানবেনা। যেন এই ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে

সময় নষ্ট হচ্ছেনা। যেন তুমি আসলে জানোনা যে লাইনের

মাথায় একজন দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে তোমার, যে তোমায়

যা খুশি একটা কারণ জানাবে, আর বলবে,

“না, আজকে আমরা আর লোক নিচ্ছিনা।”

তুমি তোমার ভাইকে ভালোবাসো। কিন্তু এখন হঠাৎ

ভাইয়ের প্রতি দরদ উথলে ওঠায় তোমার নিজেকেই 

অসহ্য লাগে। ভাই তোমার আগে, পিছে, পাশে কোথাও নেই

কারণ ও অসম্ভব ক্লান্তিকর নাইট শিফটের পরে ঘরে এসে ঘুমিয়ে 

পড়েছে। ঘরে না, তোমাদের গাড়ির মধ্যে, যাতে দুপুরের

জার্মান ক্লাস ভুলে না যায়। ও রাতে আট ঘণ্টা ডিউটি করে

যাতে বাড়ি এসে ওয়াগনার গাইতে পারে। অসহ্য লাগে তোমার

ওয়াগনারের অপেরা- পৃথিবীর সবথেকে খারাপ সুরগুলো

যেন সেখানেই। কতদিন যেন হলো ভাইকে জড়িয়ে

তুমি বলেছ ভাইকে তুমি কতো ভালোবাসো,

ওর কাঁধে হাত দিয়ে, বড় বড় চোখে তাকিয়ে

ঠিক এই কথাগুলো উচ্চারণ করেছ?

গালে হালকা চুমু খেয়েছ হয়তো? তুমি কখনই

ঠিক এত সাধারণ, এত প্রকট কিছু করোনি।

এই কারণে নয় যে তুমি খুবই তরুণ, বা খুব বোকা,

বা খুবই হিংসুটে, বা ইতর, বা অন্য কারোর সামনে

তুমি কাঁদতে পারোনা। তা নয়।

শুধুমাত্র এই জন্য, যে কাজ কাকে বলে

তুমি আসলে জানতে পারোনি।

V

Women Work/ Maya Angelou

নারী শ্রম/ মায়া এঞ্জেল্যু

বাচ্চার দেখাশোনা,

সেলাই আর উলবোনা,

ঘর ধুয়ে বাজার দোকান,

রান্নার আয়োজন, বাচ্চার স্নান,

একান্নবর্তী খাদ্য-আহার,

জঞ্জাল সাফ করে ফুলের বাহার,

চিকনাই শার্ট, বাচ্চার স্কার্ট,

কৌটোর ঢাকা খোলা,

ঝাড়মোছ তিনতলা,

রোগীর ওষুধ, তুলো, কাশির আওয়াজ

ভোর যায়, রাত আসে, আমার এই কাজ।

আমাকে রৌদ্র দাও, সূর্যের উত্তাপ,

বৃষ্টির তৃপ্তি দাও, বর্ষাবাহার

শিশিরের শান্তি দাও, ইলশেগুঁড়ি

আমার কপাল করো স্নিগ্ধ আবার।

আমাকে ভাসাও তুমি ঝড়ের আবেশ,

অবাধ বিক্ষোভে পাগলপারা,

ঝঞ্ঝার শেষে যদি থামে সে উড়ান,

বিরাম অটুট হোক সেদিন আমার।

অজান্তে ঝরে পড়ো তুষার কণা,

সফেদ সুতোয় বুনে নিশি-আস্তরণ,

বরফের শিরশিরে চুমুর আড়ালে

সযত্নে সাজিয়ে দিও ঘুমের কাফন।

অরণ্য পাথর নদী নীলাকাশ,

সূর্য সমুদ্রঢেউ প্রান্তর পাহাড়,

অবাধ রোদ্দুর দিও, চাঁদ দিও মায়া

তোমরাই এজীবনে স্বজন আমার।

VI

Women’s Work/ Julia Alvarez

নারীদের শ্রম/ জুলিয়া আলভারেজ

কে বলে শিল্প নয় নারীদের শ্রম?

বাথরুম টাইল মুছে প্রতিবাদী স্বর

জানাবে তোমাকে ঠিক, বাড়িঘর

কীভাবে আগলে রাখে, হৃদয়ের মতো।

পুরোটা দোতলা আগে, তারপর সিঁড়ি

যখনি শুনতে পাবে বন্ধুসমাগম,

আড়ালে দীর্ঘশ্বাস, সম্মুখে শ্রম

একাজ করতে পারা দক্ষ শিল্প।

ঘরের মেঝেতে যদি রৌদ্র না আসে —

দিনরাত এক করে ঘর মুছে রাখি,

মালকিন খুশি হলে আয়নাতে দেখি,

আমিই কয়েদী তার ঘরবন্দী মনে।

মালকিন চামচ মোছে, চেকনাই তার!

সযত্ন আঙুল গড়ে নকশীপিঠা,

ঘষে ঘষে সাফ করা জানলাদরজা

চারুশিল্পের থেকে কম কিছু নয়।

আমি, সে শিল্পীর মুখ্য কীর্তি

ঘষে মেজে আমাকেও একই ছাঁচে ঢেলে

বকায়, প্রশংসায় — মালকিন-আদলে

আমিও আগলে রাখি গার্হস্থ্য-মন।

প্রতিবাদ প্রতিরোধ, সমস্ত শেষে

মালকিন পালিয়ে আমি মায়ের বাসাতে,

ঘরের কোটরে মার শিল্পসন্ধান

কাগজে আগলে রেখে হৃদয়ের কুচি,

আয়নাতে মুখ —  আমি মায়ের সন্তান।

VII

Financial Planning/ June Jordan

অর্থনৈতিক পরিকল্পনা/ জুন জর্ডান

এক ঘণ্টায় আর পঞ্চাশ পয়সা রোজগার করতে পারলে

শহরতলিতে একটা ছোট ঘর তুলতে পারবো —

বন্ধুরা হাসতে হাসতে আমার কুকুরের পিছনে দৌড়বে,

ডেকে তুলে বলবে, টেবিলে খাবার,

একজন প্রেমিক হবে আদিঅন্তহীন

আমার এই রোজকার শ্রমের রুটিন,

ক্লান্তিকর দিন আমি পালটে দেব।

এক বছরে আর দশ হাজার টাকা রোজগার করতে পারলে

বেশ সমস্যায় পড়বো।

সেই বাড়িতে আরও ঘর তুলতে হবে —

বাড়ি থেকে বেরলেই ছোট্ট মারুতি,

পড়শির সাথে টেনিসের আড্ডা,

কিস্তিতে কিস্তিতে টাকা জমিয়ে বেড়াতে যাব,

কুকুরটাকে সর্বোচ্চ পরিষেবা ঘরে রেখে,

এই বাড়ি বেচে দিয়ে শহরে বাঁচবো।

এক বছরে আর পঞ্চাশ হাজার টাকা রোজগার করতে পারলে

আরও সমস্যায় পড়ব, আমি নিশ্চিত।

যেমন, এই কবিতাটা আমায় বদলে দিতে হবে,

আমি জানিনা

কীভাবে।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *