মে দিবসের গল্প

ও দেখেছে দাদুর হাতের আঙুলগুলো ছেঁচা মতন। ঝটপট সেদ্ধ আলুর খোসা ছাড়িয়ে হাতের উপরেই আলুর টুকরোটা ধরে দাদু ঝটাঝট ছুরি চালান। টুকরোটাকে আরও পিসপিসপিসপিস করে সেগুলো টিনের কৌটোয় ঢেলে দেন। দাদুর বুড়ো আঙুলে অসংখ্য ছোট ছোট চিরে যাওয়ার দাগ। আলুগুলো কাটতে গিয়ে দাদুর হাতের চামড়াও মিশে যায় নাকি? দিদিকে একবার একথা বলায় দিদি ভীষণ ক্ষেপে গেছিল। বলেছিল ও নাকি একটা নোংরা মেয়ে। ওর মুড়ি মাখা দেখতে দারুণ লাগে। প্রচণ্ড স্পীডে সব কিছু একসঙ্গে একটা বাটির মধ্যে ঢেলে ঘটাং ঘটাং আওয়াজ করে মেশাতে হবে। একবার ওইরকম করতে গিয়ে তো ঘরময় মুড়ি ছিটিয়ে একশা করেছিল ও। সে আরেক কেলেঙ্কারি। 

সেদিন স্কুল বাস থেকে নেমে দাদুর দোকানে দাঁড়িয়েছিল ও একাই। দাদুর বিশেষ বিক্রি-টিক্রি হয় না। প্রচুর কথাও বলছিল ও দাদুকে। দাদু তো সব কথা শুনেই বলে ‘হ্যাঁ’। ওর বিরক্ত লাগে। ও তাই প্রশ্ন করতে শুরু করে।  

‘তোমার বউ নেই?’ ও জিজ্ঞাসা করে।

– আছে তো। ছেলেও আছে।

– ছেলে কোন ক্লাসে পড়ে?

– পড়ে না, ওর পড়াশুনা হয়ে গেছে। 

-তাহলে সে করেটা কী?

– রঙ মিস্ত্রীর কাজ করে। 

দাদুকে ভীষণ অন্যমনস্ক দেখায়। ও বেশী করে লাল সস দিতে বলেই খেয়াল করে আকাশের রংটা সসের রঙের সাথে একদম সেম-সেম। বাড়ি ফেরার পথে মুড়িটা তাড়াতাড়ি করে খেয়ে নেয় ও। মা বলে ‘মুড়ি খাচ্ছ খাও অত সস নাও কেন? মুড়িগুলো মিইয়েও তো যায়‘। বাড়িতে ঢোকার মুখে ঠোঙাটা কুচিমুচি করে ফেলতে গিয়ে হঠাৎ একটা খবরে চোখ আটকে যায় ওর। হাত-পা ঝিমঝিম করে ওঠে। রঙ করতে গিয়ে পড়ে মৃত্যু এক শ্রমিকের। সাউদার্ন এভিনিউতে। ওদের স্কুল-বাসটা যে রাস্তা দিয়ে আসে সেইখানে। লাল সসে ঠোঙাটা নেতিয়ে মত গেছে, পুরোটা ঠিক করে পড়া যাচ্ছে না। এত ঝাল দিয়েছে দাদু যে চিড়বিড় করে চোখ জ্বলছে, ধুস!

ঘরে ঢুকে ও ঘোষণা করে ওর খুব পেটে ব্যথা তাছাড়া আজ ইস্কুলে কোন হোমওয়ার্ক দেয়নি, আজকের দিনটা অন্তত যেন ওকে দয়া করে একটু নিষ্কৃতি দেওয়া হয়। তারপর, ‘আমার মাথাতেও ব্যথা সর সর’ বলে, দিদির পাশে শুয়ে পড়ে মাথায় বেশি বেশি করে অমরুতাঞ্জন লাগিয়ে। 

দিন তিন-চারেক পরে অবশ্য ও আবার দাদুর দোকানে গিয়েছিল। দাদু ওকে বলেছিল যে ছেলে ভালোই আছে, শুধু তাই না ছেলের বিয়ে দেবে খুব শিগগিরই, ওর বয়সটা নেহাত কম নইলে হয়তো ওকেই ছেলে-বউ করে নিয়ে যেত। এত বিরক্তিকর যে বলার না। 

তুলো, মানে ওর পোষা বেড়ালছানাটাকে খুঁজতে খুঁজতে ও সোজা ঝর্ণা মাসিদের বস্তিটার ভেতর ঢুকে পড়ে। বাপরে বাপ কী সরু রাস্তা! হাজারটা গলিঘুঁজি।  আর রাস্তাগুলো আসলে রাস্তা নয় বাড়ির উঠোন। একটা বাড়ির গায়ে অন্য বাড়িগুলো হেলান দিয়ে ঝুঁকে এমনভাবে সার বেঁধে আছে দেখে ওর পিকনিকে সবাই মিলে গ্রুপ ফটো তোলার কথা মনে পড়ে। এর কাঁধে ওর মাথা, কোমরে হাত, মাথার পেছনে দুই আঙুল তুলে শিং করা। খানিক বাদে বাদেই রংবেরঙের ভেজা শাড়ি-জামাকাপড় টাঙানো। নীচু দরজার পাশে বাসনপত্র রাখা। খালি রঙের টিনে জল জমানো, উপরে কমলা রঙের গামলা চাপা দেওয়া। একটু উঁকি মারলেই ঘরের ভিতর খাটের তলায় আরো অনেক বাসন। বাইরে একটা অ্যাকোয়ারিয়ামে দুটো গাপ্পি মাছ, তার পাশে ভাঙা টবে গাছ। সব খুব ঘেঁষাঘেষি, ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে এ ওর। টালির চালের সমুদ্রের উপর একগাদা পাতা আর কদম ফুল থেঁতলে পড়ে আছে। তার ফাঁক দিয়ে ওর কুড়িয়ে পাওয়া রিবনটার মত বিকেলের আকাশ। 

মা যদিও বলে এদের রুচি ভালো নয়, ওর কিন্তু যথেষ্ট ভালো  লাগে। পূজাপার্বণের দিনে বাচ্চারা সবাই এত সুন্দর সাজে যে বলার নয়। কত কত ফ্রিল দেওয়া ফ্রক। কত কত জরি আর চুমকি বসানো ঘাগরা। আর ওদের সবার লিপস্টিক পরা অ্যালাউড! ভাবা যায়! এমনকি নেড়ুমুণ্ডী বাচ্চাগুলো কান অবধি কাজল, নাকে সিকনী আর মাথায় লাল নেটের ওড়না। ও একবার সিঁদুরের সঙ্গে পাউডার মিশিয়ে রুজ বানিয়েছিল। গালে অল্প করে লাগালে দারুণ ফরসা লাগে। ফরসা ছিল কমলা মাসি। কাজের মেয়ে বোঝাই যায় না। মা বলত। আরো বলত – কমলা মাসি বিপাকে পড়ে এইসব কাজ ধরেছে, আসলে ও ভালোঘরের মেয়ে। তবে ঝর্ণা মাসি সেরম না। ঝর্ণা মাসির পায়ে হাজা, অনেক জল ঘাঁটলে ওরম হয়। এক বাড়ির কাজই সামলে ওঠা যায় না আবার দশ বাড়ি, অসুখ তো করবেই। মা বলে। ঝর্ণা মাসি দুদিন হল আসছে কমলা মাসি কাজ ছেড়ে দেওয়ার পর। 

এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ও হঠাৎ খেয়াল করল যে, ও হারিয়ে গেছে। তুলোর লেজের ডগাটি অবধি নেই। একটা মোটা কানা হুলো বেড়াল এমনভাবে থাবা চাটছিল শুয়ে শুয়ে যে ওর ব্যাপারটা একটুও ভালো ঠেকল না। এমন সময় উঠোন-কাম-রাস্তার ধারে সিঁড়িতে বসে দুজন চুল আঁচড়াচ্ছিল, তারা ওকে হাত নেড়ে কাছে ডাকল। তারপর নানারকম প্রশ্ন করতে শুরু করল। ও প্রথমে ভেবেছিল তুলোর ব্যাপারটাই বলবে। কিন্তু তারপর বুদ্ধি করে বলল যে ঝর্ণা মাসির সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। ওমা! সব্বাই চেনে ঝর্ণা মাসিকে! শুধু ঝর্ণা মাসির আসল নাম নাকি ঝর্ণা নয়, ফাতিমা। সবাই ডাকাডাকি করতেই কে জানে কোত্থেকে মাসি এসে হাজির! এদিকে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। একি কাণ্ড করেছ! বাড়ি চল সবাই চিন্তা করবে তো! এই নাও বিস্কুট খাও বলে ঝর্ণা মাসি ওর হাতে দুটো মেরী বিস্কুট  গুঁজে দিল। তারপর ওর জামার হাতা ধরে টানতে টানতে বস্তির বাইরেটায় নিয়ে এল। আকাশে এত্ত বড় গোল্লা পাকানো চাঁদ। মাসি বলল – আমি তাকিয়ে আছি তুমি একছুটে বাড়িতে ঢুকে পড় তো গিয়ে। আমি দেখছি কিন্তু। পেছনে বস্তির ভেতর থেকে জোরে জোরে গান বাজছে ‘এই মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে এসো না গল্প করি / দেখ ওই ঝিলিমিলি চাঁদ সারারাত আকাশে সলমা জরি।’ বাড়ির গেট খুলতে খুলতে ও ভাবে ‘সলমা জরি’ শব্দটা খুব সুন্দর। পেছন ফিরে তাকায়। দেখে ঘন নীল সন্ধ্যা আরও ঘন হয়ে উঠছে আর খারাপ ঘরের মেয়ে ঝর্ণা নাকি ফাতিমা মাসি গায়েগায়ে লাগা বাড়িদের সামনে দাঁড়িয়ে  সেই নীল রঙে মিলে মিশে এক হয়ে ক্রমশ নেই হয়ে যাচ্ছে।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *