মায়ার গল্প

টি১২। এটাই ভাল নাম মায়ার। মায়া অবশ্যই সকলের দেওয়া ডাকনাম। বলা ভাল, বনবিভাগই মায়া নামটা রেখেছিল ওর। পর্যটকরাও ওই নামেই চেনে ওকে। মায়াকে প্রথম যখন আমি দেখেছিলাম, তখন ২০১৫ সাল। জঙ্গলের বুক চিরে রানির মতো হেঁটে গিয়েছিল মায়া। একপাশে সার দিয়ে দাঁড়িয়েছিল টুরিস্ট জিপগুলো। সকলে মায়াকে দেখছিল একদৃষ্টে। মায়া কিন্তু মোটেও পাত্তা দিচ্ছিল না কাউকে। গাছের গন্ধ শুঁকে, চারপাশ দেখে মায়া একটু জরিপ করে নিচ্ছিল, ওর এলাকা ঠিক আছে কিনা।

মায়া আসলে বাঘিনী। মহারাষ্ট্রের তাড়োবা জঙ্গলের বেশ কিছুটা এলাকাজুড়ে তার বেশ দাপট। বলে রাখা ভাল, ভারতের বেশিরভাগ জঙ্গলেই কিন্তু বাঘ দেখা খুব সহজ নয়। ধরো, পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন। সুন্দরবনে সাফারি বা জঙ্গলে ঘোরার পথটা নদীপথ। যেমন, আমাজনের জঙ্গল, কেরলের পেরিয়ার জঙ্গল বা আমাদের বাংলার জলদাপাড়ার কাছে সিকিয়াঝোরার জঙ্গলে পর্যটকরা নদীতে থাকে, হয় স্টিমার নয়তো নৌকোর ওপর। দু’পাশের জঙ্গল তারা দেখতে দেখতে যায়, কিন্তু জঙ্গলের ভেতরে ঢুকতে পারে না। আবার অন্য বেশিরভাগ জঙ্গলেই কিন্তু জঙ্গলের ভেতরের রাস্তা দিয়ে ছুটে যায় জিপ। যাই হোক, সুন্দরবনের জঙ্গল নিয়ে একটা কথা চালু আছে। বাঘ সেখানে মানুষকে দেখে, কিন্তু বাঘকে সেখানে দেখা মুশকিল। তোমরা হয়তো জানো, সুন্দরবনের জঙ্গল ম্যানগ্রোভ অরণ্য। সেখানে বাঘ লুকিয়ে থাকতে পারে অন্য জঙ্গলের থেকে বেশি। অনেকদিন অবধি, সুন্দরবনে যারা বেড়াতে যেত, তারা সেভাবে বাঘ দেখতেই পেত না। শেষ কয়েক বছরে বাঘ একটু একটু করে দেখা যাচ্ছে। বাঘের সংখ্যা বাড়া একটা কারণ হতে পারে‌। আরেকটা কারণ হতে পারে, জঙ্গলের বাইরের দিকে বাঘ বেরিয়ে আসছে। সেকথা পরে বলছি। এছাড়াও, বক্সার জঙ্গলে খুব সম্প্রতি একটা বাঘ দেখা গেছে বলে খবর। বাঘ বক্সায় এককালে অনেক ছিল, যেজন্য উত্তরবঙ্গের এই জঙ্গলের পোশাকি নাম বক্সা টাইগার রিজার্ভ। কিন্তু এই জঙ্গলে এত চোরাশিকার হয়েছিল যে বাঘের চিহ্নই প্রায় মুছে গিয়েছিল। যেটুকু বাঘ আছে এই জঙ্গলে, তা ভুটান সীমান্ত ঘেঁষে আছে বলেই খবর। বক্সার জঙ্গলের চারদিকে পাহাড়, আর সেই সেই পাহাড়ের ওপারেই ভুটান। কিন্তু এবার বাঘ না কি দেখা গেছে একেবারে সমতলের দিকেই। এখানে আসামের মানস ও অন্যান্য জঙ্গল থেকে কিছু বাঘ এনে ছাড়া হবে, সেকথা অনেকদিন ধরেই বলা হচ্ছে। তবে তার আগেই, বহুদিন পর বক্সায় রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার দেখা যাওয়ার খবর বেশ আনন্দের, বলতেই হয়। এমন কিছু কিছু জঙ্গলে যেমন বাঘ থাকলেও দেখা প্রায় অসম্ভব, তেমন কিছু কিছু জঙ্গলে না কি আবার বাঘ দেখা যায়ই। যেমন, রাজস্থানের রণথম্ভোর, মধ্যপ্রদেশের বান্ধবগড়, মহারাষ্ট্রের পেঞ্চ, তাড়োবা।

মিথ্যে কথা বলব না, কিছুটা জঙ্গলে বাঘ দেখার লোভেই তাড়োবার জঙ্গলে গিয়েছিলাম ছ’বছর আগে। মায়াকে তখনই দেখা। জঙ্গলে সাফারি করতে গেলে তো অনেক ভোরে বেরতে হয়। তো সেদিন সাফারি শুরু হয়েছিল ভোর সাড়ে পাঁচটার সময়। চৌশিঙা, বারশিঙা, সম্বর, স্পটেড ডিয়ার, বার্কিং ডিয়ার… নানা রকমের হরিণ দেখলাম আমরা পথে। ইন্ডিয়ান স্পটেড ঈগল থেকে জাঙ্গল ব্যাবলার বা ছাতারে- নানা রকমের পাখি, মিষ্টি জলের কুমির থেকে ময়ূর, সকাল ন’টার মধ্যে সবই দেখা হয়ে গিয়েছিল, কেবল দর্শন পাইনি বাঘের। তারপর হঠাৎ শোনা গেল অ্যালার্ম কল। বাঘ কাছাকাছি এলে বার্কিং ডিয়ার, ময়ূর, বাঁদর এরা ডেকে ওঠে। সেটা বাঘ আসার সংকেত। জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে সেই সংকেত পেলেই বোঝা যায়, কোথাও না কোথাও বাঘ আছে কাছেপিঠেই‌। তাকেই বলে অ্যালার্ম কল! সেদিন সেই অ্যালার্ম কলই শুনতে পেলাম আমরা। আর সঙ্গে সঙ্গে ফরেস্ট গার্ডরা, যাঁরা সাফারি কারে থাকেন পর্যটকদের সাহায্য করার জন্য, তাঁরা আমাদের একটি নির্দিষ্ট রাস্তায় নিয়ে গেলেন। সেখানে ঢুকেই দেখা মিলল মায়ার। 

মায়া এত টুরিস্ট দেখেও রেগে যায়নি তখন। কারণ, ওর অভ্যেস ছিল টুরিস্টদের আনাগোনার। আর এত টুরিস্ট আসা সত্ত্বেও কিন্তু মায়ার অসুবিধে হয়নি, কারণ নিজের এলাকায় ওর গতিবিধি ছিল অবাধ। এখানে বলে রাখা দরকার, বাঘেদের এলাকা তারা নির্দিষ্ট করে রাখে। মায়াও তেমনটা করেছিল, আর সেখানে কেউ ওকে বিরক্ত করত না। মানুষের এলাকা দিয়ে রোজ যদি বাঘেরা যাতায়াত করে, মানুষের কি অসুবিধে হবে না? কিন্তু হ্যাঁ, এতে কারও বেঁচে থাকার অসুবিধে না হলেই মিটে গেল। মায়ার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা ছিল তেমন। কিন্তু মায়ার জীবনটা খুব দুঃখের। মায়ার বারোটি শাবক হয়েছিল‌। তার মধ্যে পাঁচটিকে মেরে ফেলে জঙ্গলের অন্যান্য পুরুষ বাঘ। অনেক সময়ই পুরুষ বাঘেরা এই জিনিসটা করে। বাঘিনীর সন্তানকে মেরে ফেলে। ডুয়ার্সের জঙ্গলে গিয়ে শুনেছিলাম, লেপার্ড বা চিতাবাঘরা যে মাঝেমধ্যেই বেরিয়ে আসে জঙ্গলের বাইরে, এর কারণ, চিতাবাঘের সন্তান হলেই পুরুষ চিতাবাঘের অভ্যেস, সেই বাচ্চাদের মেরে ফেলা। কারণ, এমনটা ক‍রলে বাঘিনীরা আবার বশ মানবে সেই পুরুষ বাঘের‌। আফ্রিকার জঙ্গলে সিংহ‍রা সিংহীদের সামনেই তার শাবকদের মারে এইজন্য। কিন্তু কোন মা চায় তার সন্তানের মৃত্যু? তাই বাঘিনীরা সবসময় চেষ্টা করে তার শাবকদের বাঁচানোর। মায়াও চেষ্টা করেছিল। পারেনি। তারপর থেকে মায়া একটু হিংস্র হয়ে উঠেছে। মানুষের ওপর আক্রমণ করে ফেলেছে সে বেশ কয়েকবার। এই তো দিনকয়েক আগেই তার আক্রমণে একজন ফরেস্ট গার্ড মারা গেল। মায়াকে ভিলেন না বানিয়ে এর কারণটা বরং জানতে হবে। এর কারণ, মায়ার আবার পাঁচটি শাবক হয়েছিল গতবছর। তার মধ্যে তিনটির খোঁজ নেই বেশ ক’দিন ধরে। তাছাড়া করোনার জন্য জঙ্গল কিছুদিন বন্ধ ছিল। তারপর জঙ্গল খুলতেই আবার টুরিস্টরা ভিড় করছে। মায়া তার শাবকদের হারিয়েছে, এই অবস্থায় হঠাৎ এত ভিড় তো তার ভাল নাও লাগতে পারে। 

যাক গে, মায়া বা টি১২ ভাল থাকুক। মহারাষ্ট্রের একটি জঙ্গলে অবনী নামে একটা বাঘিনীকে ‘মানুষখেকো’ বলে মেরে ফেলা হয়েছিল ২০১৮ সালে। বাঘ তো এমনি এমনি মানুষখেকো হয় না। অবনীও তখন দু’টি শাবকের জন্ম দিয়েছিল। শাবকদের নিরাপত্তার জন্য সে জঙ্গলের বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। কিন্তু বাড়ি ফিরতে পারছিল না, কারণ ফেরার পথে জঙ্গল খুঁড়ে খনি তৈরি হচ্ছিল। মানুষের দখলদারিই তো তাকে ওরকম হিংস্র করে তুলেছিল। জিম করবেট ছিলেন মস্ত বড় শিকারী, তিনি কুমায়ুনের একটি মানুষখেকো চিতাবাঘকে শিকার করেছিলেন, কিন্তু তার পেটের ভেতর যে তখন শাবক রয়েছে, তা করবেট জানতে পারেননি। জানতে পেরে তিনি শিকারই ছেড়ে দিলেন সারাজীবনের মতো। সব মানুষ করবেটের মতো হতে পারে না?

 

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *