রক্তচোষা

সত্তরের জেল ডাইরি। জেল জীবনের দেখা গল্প। জেল জীবনে সংস্পর্শে আসা বিভিন্ন মানুষের কথা। মেয়েদের জেল যাপনের বয়ান। তবে এই গল্প শুধু সত্তরের নয়। জেল থেকে বদলে সংশোধনাগার হলেও যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা জেল বানায় তা তো বদলায় না। যে রাজনীতি থেকে জেলের ভাবনা তৈরি সেই রাষ্ট্রের চোখে ‘অপরাধী’, সমাজের চোখে ‘বাতিল’, ‘পাগল’, ‘অসুস্থ’ মানুষদের সমাজ বিচ্ছিন্ন করে সমাজকে অপরাধ মুক্ত করার ধারণার তো বদল হয় না। তাই জেলের ভেতর জেলের গল্পও সব সময়েরই হয়ে যায়। হয়তো এই সমাজ, রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলার স্বপ্ন দেখেছিলেন বলেই সেই সব বাতিল, পাগল, অপরাধী, নেই মানুষদের দেখতে পেয়েছিলেন, তাদের কথা রেখে যেতে পেরেছিলেন আমাদের জন্য। যে কথা, যে গল্প ঘুম কেড়ে নেয়, কে গল্প ধাক্কা দেয়, হোঁচট খেতে বাধ্য করে… যে গল্প আরো ভীষণ ভাবে নগ্ন করে দেয় আমাদের সমাজকে, এই রাষ্ট্রকে।

এন. সি. এল (N. C. L) আসগরির ঠিক পাশের সেলেই ছিলো সি. এল. (C. L) ক্ষীরোদা। সি. এল অর্থাৎ ক্রিমিনাল লুনাটিক। কোনো না কোনোক্রাইমকরার অপরাধে সে অভিযুক্ত। কিন্তু পাগল। তাই বিচার হয়নি। সাজা পেয়ে সে জেল খাটছে না। জেল খাটছে বিচারাধীন বন্দী হিসেবে। রয়েছে জেলের পাগলা গারদে। কোর্টের আদেশ অনুসারে চিকিৎসাধীনে, সেরে ওঠার অপেক্ষায়। 

তা এই চিকিৎসাধীনেই ক্ষীরোদা ছিল আসগরির পাশের সেলটিতে। সেই ডিগ্রীঘরসেই একই রকম অন্ধকারস্যাঁতস্যাঁতে, আদিম মানুষের ঘুপচি। কেবল তফাৎ এই যে, ইচ্ছে হলেই সেখান থেকে বেরিয়ে আসা যায় নাগুহাবাসীরা যা করতে পারতো। আমাদের সঙ্গে কথা বলার অপরাধে শাস্তি পেয়ে আসগরি ওখানে বন্ধ হয়ে থাকতো। আর ক্ষীরোদা কোনো শাস্তি নাপেয়েই চব্বিশ ঘন্টা ওখানে বন্ধ থাকতো। ফলে সে বাস করতো পেচ্ছাপপায়খানার এক স্তূপের মধ্যে। এই নোংরার মধ্যে কাপ়ড় পরে লাভ নেইহয়তো সে ভাবত। হয়তো পাগলামির ঝোঁকে তার লাজলজ্জার বোধও ছিল নাতাই পরনের একমাত্র কাপড়খানাকে দলামোচড়া করে ফেলে রাখতো এক কোণে। থাকতো সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে। শীতে, গ্রীষ্মে, সারাটা দিন চিৎকার করতো জন্তুর মতো দুর্বোধ্য ভাষায়, ভাঙাভাঙা বিকট গলায়। পৌষের হিমেল রাতে সে চিৎকার আর্তনাদের মতো শোনাতো

সে যখন অন্যদিকে তাকিয়ে থাকতো, গরাদের ফাঁক দিয়ে ভাতের থালাটা কোনোমতে ঢুকিয়ে দিত কোনো এক বন্দিনী। তারপর পড়ি কি মরি করে দৌড়ে পালাত সেখান থেকে। 

একহাতা ভাতডালঘ্যাঁটের সে মিশ্রণ, কোনোদিন ক্ষীরোদা খেতো, কোনোদিন খেতো না। ছুড়ে ছুড়ে ফেলত, গায়ে মাখত, হাসত হোহো করে। কখনো কাঁদত, কখনো চ্যাঁচাত আমানুষের মতো। এই ছিল উন্মাদিনী ক্ষীরোদা। 

কোর্টের আদেশে, চিকিৎসাধীনে জেলে ছিল ক্ষীরোদা। বোধ করি, হাতে পায়ে লোহার হ্যান্ডক্যাপ বেঁধে লোহার গরাদের সঙ্গে আটকে রেখে পেচ্ছাপ পায়খানার মধ্যে ফেলে রাখাটা উন্মাদেরচিকিৎসারক্ষেত্রে উৎকৃষ্টশকথেরাপীবলে আবিষ্কৃত হয়ে থাকবে। উন্মাদপাগলদের চিকিৎসার জন্য এটিই জেলে সর্বাধিক চালু ব্যবস্থা। কোনো কোনো ওয়ার্ডার তো বেশ গর্বের সঙ্গে বলত    :

  -বুঝলে মাসীরা, এইভাবে রাখে বলেই অনেকের পাগলামি একদম সেরে যায়। আদর-আদর করে রাখলে আর সারতে হতো না। 

সে অবশ্য উল্লেখমাত্র করত না যে পাগলদের চিকিৎসার জন্য যেটুকু ডাক্তারী ব্যবস্থা সরকারি ভাবেই আছেতা কেনই বা অনুসরণ করা হয় না? কেনই বা ডাক্তারের লিখিত ব্যবস্থআ অনুযায়ী পাগলদের জন্য যেটুকু পথ্য এবং ওষুধপত্র আসে তার সিংহভাগও বাইরে পাচার হয়ে যায়

জেলখানায় ক্ষীরোদাই ছিল আমাদের অতি নিকট প্রতিবেশী। সে থাকত সেলবাড়ির একতলার ডিগ্রীটিতে। আমরা তখন থাকতাম সেই সেলবাড়িরই দোতলায়। বাইরের জগতে এই একটি মাত্র তলার দূরত্ব সামান্য কয়েকটি সিঁড়ি মাত্র। কিন্তু জেলের বেলায় এই দূরত্ব ছিলো অনেক বেশী। আমাদের জন্যই বিশেষ করে এই দূরত্ব কঠিন ভাবে বজায় রাখা হত। 

সেই কারণেই, নিকট প্রতিবেশী হলেও ক্ষীরোদাকে একবারের বেশী দুবার দেখেছি বলে মনে পড়ে না। একদিন দুপুরবেলা, তাও বেশ দূর থেকে, সেলের আধোঅন্ধকারে এক জীবন্ত নরকঙ্কালকে বসে থাকতে দেখেছিলাম। কোর্ট ওয়ারেন্ট এবং জেলের টিকিটে তারই নাম ছিল ক্ষীরোদা

ওই একদিনই চোখের দেখা। বাকি দিনগুলিতে ক্ষীরোদার সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রগুলি ছিল তার চিৎকার, গর্জন, দাপাদাপি। দোতলার সেলে বসে বিভিন্ন শব্দতরঙ্গের মাধ্যম আমাদের কাছে নিয়ে আসত ক্ষীরোদার দৈনন্দিন ক্রিয়া কলাপের বিবরণ। 

জেলখানাকে সরাসরি চেনার নিত্য নতুন অভিজ্ঞতায় ভরে থাকত যে দিনরাত, সেই প্রথম পর্যায়ের কত রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেছে ক্ষীরোদার গর্জনমিশ্রিত গোঙানি আর অস্পষ্ট কাতরোক্তি শুনে। দোতলার সেলে ঠান্ডা মেঝেয় একখানা কম্বল বিছিয়ে শুয়েও যখন আমাদের শীত করছেতখন ভাবতেই হয়েছে ডিসেম্বরজানুয়ারীর সেই শীতের রাতে ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে সেলে পেচ্ছাপপায়খানার মধ্যে পড়েথাকা একটি উলঙ্গ বন্দিনীর শরীরে শীতের কামড় কেমন হতে পারে

তারপর? তারপর আর কী? একদিন মরে গিয়েছিল ক্ষীরোদাযেদিন তাকেচিকিৎসাধীনেজেলে পাঠানো হয়েছিল, যেদিন তাকেহ্যান্ডক্যাপেবেঁধে ডিগ্রিতে ফেলে রাখা হয়েছিলসেদিন তার ওপর যে অলিখিত মৃত্যুদণ্ড জারি হয়েছিল, কোনো এক রাতে তা কার্যকরী হয়েছিল মাত্রডিগ্রি ঘরে মারা গিয়েছিল এক পাগলিক্ষীরোদা।

না, কেউ আসেনি। কী করে মৃত্যু হলো ক্ষীরোদার, এ প্রশ্ন তুলে জেল কর্তৃপক্ষকে কেউ বিব্রত করেনি। কত পাগলই তো পাগল বাড়িতে বন্দী। দুচারদিন বাদে-বাদে একজন করে মারাও যাচ্ছে। তাদের মধ্যে কেউ বেওয়ারিশ! আত্মীয়-স্বজন নেই, থাকলেও তাদের সঙ্গে পাগলের সম্পর্ক ছেদ হয়েছে বহু আগেই। যাদের ওয়ারিশ আছে–  মৃত্যুর খবর পেলে তাদের কেউ-কেউ আসে, কেউ বা আসেও না। যারা আসে, সামর্থ্য থাকলে মৃতদেহের সৎকার করে। কিন্তু কেউ কোনো প্রশ্ন করেনা। কী করে তার  পাগল আত্মীয়ের অকালমৃত্যু ঘটল, এ প্রশ্ন তুলে জেল-কর্তৃপক্ষকে বিব্রত করার ঘটনা খুব কম ক্ষেত্রেই ঘটে। হয়তো যেদিন পাগল বলে তার আত্মজনকে জেলে দিয়ে গেছে কেউ, সেদিনই তাকে মৃত বলে ধরে নিয়েছে সে। তাই এই মৃত্যু আর নতুন করে তাদের মন স্পর্শ করেছে বলে টের পাওয়া যায় নি।

কিন্তু সে যে প্রতিবেশী ছিল আমাদের।  তাকে আদালত মৃত্যুদণ্ড দেয় নি। তবু তার তিল-তিল মৃত্যু দেখতে হলে চোখের সামনে। ওষুধ নয়, খাবার নয়, চিকিৎসা নয়– শুধু জন্তুর মত একজন মানুষকে বেঁধে রাখা, নোংরা আর ঠান্ডার মধ্যে মরে যাবার জন্য!

যে নিজে বন্দিনী তার পক্ষে অন্য এক বন্দিনীকে তিলে-তিলে মরতে দেখা যে কি ভয়ানক অভিজ্ঞতা, তা আমি মর্মে মর্মে অনুভব করতে বাধ্য হলাম!

তবুও তো ক্ষীরোদা সত্যিই ক্ষেপে গিয়ে খুন করেছিল নাকি একটি মানুষকে। তাকে জেলে আসতে হয়েছিল অপরাধ করার দায়ে। কিন্তু যারা নিরপরাধ? শুধুমাত্র পাগল, এই অপরাধে কোনো মানুষকে জেলবাস করানোর বিধান কোনো সভ্য-সমাজ দিতে পারে কি? কিন্তু এই জেলেই যে ছিল আসগরী! নিরপরাধ। শাহানাজ।

দুই

ক্ষীরোদা নেই। কিন্তু তার অস্তিত্ব সহজে মুছে ফেলা যায়নি ওয়ার্ড থেকে। যারা ক্ষীরোদা কে দেখেছে তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না তাকে ভুলে যাওয়া। বেশীর ভাগ ওয়ার্ডার ও বন্দিনীদের কাছে সে ছিল এক আতংক। এই আতংকের উৎস ছিল তার নামের অভিযোগনামাটি। শোনা যেত বছর তিনেকের একটি ছেলেকে আছাড় দিয়ে মেরে ফেলেছিল। কেউ বলত, ওই বাচ্চাটা খুন করে পাগল হয়ে গেছে সে। কেউ বলত, খুনটা করার আগেও সে উন্মত্ত পাগল ছিল। কেউ-কেউ আরো বলত, বাচ্চাটা নাকি ক্ষীরোদারই সন্তান।

এমন বীভৎস ও মর্মান্তিক ঘটনা শুনে মানুষ বিচলিত ও সন্ত্রস্ত বোধ করতেই পারে। কিন্তু এই বিচলিত ত্রস্ততা থেকে ডালপালায় বিস্তার লাভ করেছিল নানা গুজব। সেসব গুজবের সূত্র ধরে ক্ষীরোদা তার সমসাময়িক বন্দিনীদের কাছে হয়ে উঠেছিল রক্তচোষা ডাইনি। বহু ওয়ার্ডারই বিশ্বাস করত ক্ষীরোদা ডাইনি। সে মানুষের রক্ত খায়। এই অসম্ভব গুজবটি সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়েছিল এক কুৎসিত ঘটনার ফলে।

প্রায় প্রতিদিন ক্ষীরোদার সেলের সামনে ভিড় জমাত জেলবন্দী শিশুর দল। ক্ষীরোদাকে ক্ষ্যাপানো এই জেলখানায় অতি প্রিয় খেলা ছিল তাদের কাছে। নানারকম অঙ্গভঙ্গি করে জেলে ‘বড়ো’ হতে-হতে শেখা অশ্লীল -অশ্রাব্য গালাগালি দিয়ে তারা ক্ষীরোদাকে উত্ত্যক্ত করত!

ক্ষীরোদাও, জানি না কোন  দুঃস্মৃতির তাড়নায়, বাচ্চাদের দেখলেই ক্ষেপে যেত! আর বেশি জ্বালাতন করলে ক্ষিপ্ত হয়ে শুরু করত তর্জন-গর্জন। দাপাদাপি, হুলুস্থুলু করত বন্ধ সেলে।

পাগলদের ক্ষ্যাপানো তো এক পরিচিত খেলা; শুধু এই বন্দী জীবনে নয়– বাইরের জগতে বাচ্চাদের সাথে বয়স্ক জনরাও সপ্রশ্রয় ও কৌতুকে যোগ দেয় সে খেলায়, এ দৃশ্য নিতান্ত বিরল নয়। আর এ তো জেলখানা। এখানে সব অন্যায় কাজই পায় এক অন্য নিষ্ঠুর মাত্রা! ওয়ার্ডারদের অনেকেই বাচ্চাদের উসকিয়ে দিত! তার জবাবে ক্ষীরোদার বন্ধ ঘরে নিষ্ফল আক্রোশের আস্ফালন দেখে তারা মজা পেত।

জেলবাসী এইসব শিশুদের অন্য সময়ে গলা খুলে কথা বলার অধিকারও ছিল না। হাসি বা কান্না তো নয়ই। কারণে বা সাধারণত অকারণে নির্মমভাবে প্রহৃত হওয়াটাই ছিল তাদের অভ্যাস। সেই অসহায় শৈশবহীন শৈশবে শিশুরা হঠাৎ করে এক অনধিকার অধিকার পেত। তাদের চেয়েও অসহায় ভাবে বন্ধ এক পাগলিকে ক্ষ্যাপানোর অধিকার। এই অধিকার তারা প্রয়োগ করত নিষ্ঠুর আনন্দে। তাদের সেই খেলা নির্মমতার রূপ নিয়ে আঘাত করত ক্ষীরোদাকে। ভয়াবহভাবে ক্ষেপে উঠত সে।

একদিন এইভাবেই ক্ষীরোদাকে ক্ষ্যাপাচ্ছিল বাচ্চারা। দুপুরে খাবারের লাইন বসব-বসব করছে তখন। বাচ্চাদেরও ডাক পড়বে লাইনে বসতে। শেষবারের মতো ক্ষেপিয়ে নেওয়ার ঝোঁকে একটা বাচ্চা চলে গেল একেবারে গরাদের সামনে। ক্ষীরোদার হাতের চৌহদ্দির মধ্যে। ক্ষীরোদা তখন উন্মত্ত, ক্ষীপ্ত। লাফাচ্ছে, গালাগাল দিচ্ছে চুল ছিঁড়ছে নিজের মাথার। বাচ্চাটা গরাদের ফাঁক দিয়ে হাত ঢোকাতেই সে খপ করে টেনে ধরলো তার হাত। তারপর ভীষণ জোরে কামড় বসিয়ে দিল বাচ্চাটার একটা আঙুলে। তীব্র আর্তনাদ করে উঠলো বাচ্চাটা—অন্য বাচ্চারা সভয়ে চিৎকার শুরু করল—বন্দিনীরা দৌড়ে এলো। সবাই মিলে টানাটানি করে ক্ষীরোদার কবল থেকে ছাড়িয়ে নিল বাচ্চাটার হাত। কিন্তু ততক্ষণে আর একটা আঙ্গুলের মাংস কেটে বসে গেছে ক্ষীরোদার দাঁত। রক্ত পড়ছে চুঁইয়ে চুঁইয়ে। সে রক্তের দাগ ক্ষীরোদার ঠোঁটেও লেগেছে। সঙ্গে সঙ্গে এক ভয়ঙ্কর আতংক ছড়িয়ে পড়ল সেদিন ওয়ার্ডে।

–ক্ষীরোদা আজ রক্ত খেয়েছে।

— ক্ষীরোদা রক্ত খায়।

–ক্ষীরোদা ডাইনি।

তিন

এই ডাইনি ক্ষীরোদা, রক্তচোষা ক্ষীরোদার আরো এক গল্প আছে। সত্যি গল্প। আমার এক সহবন্দিনীর নিজের চোখে দেখা। যেমন তার চোখে দেখা টুরার মর্মান্তিক মৃত্যু। অনেক বেদনা নিয়ে সে বলত সেই কাহিনী। ‘এন সি এল’ বলে কথিত এক নেপালি মহিলার দুঃখময় জীবন আর ডিগ্রীঘরে হলে তার মৃত্যুর কথা। ক্ষীরোদার এ কাহিনীও তার মুখেই শোনা

একদিন ওয়ার্ডে রাত-ডিউটিতে ছিল অণিমা ওয়ার্ডার। ট্রাম কন্ডাক্টরের স্ত্রী, মোটাসোটা নিরীহ-দর্শন অণিমামাসী নিজের বিপুল আয়তন দেহটি সামলাতে সদাই ব্যস্ত। অন্য কোনো দিকে—বিশেষত কারো পেছনে লাগার দিকে তার মন ছিল না। তা সে রাত-ডিউটির দিন, ওয়ার্ডারদের বিশ্রামঘরটিতে নিশ্চিন্তে ঘুম লাগিয়েছিল মাসি। জেলখানায় রাত-পাহারাদারদের মধ্যে মহিলা ওয়ার্ডের প্রহরীরাই বোধহয় সুখীতম ব্যক্তি। রাতে গেট-চাবি তো জেলার সাহেবের কাছে জমা থাকে। কাজেই বাইরে থেকে নিজেও বন্দী হয়ে-পড়া ওয়ার্ডারের তোফা ঘুম দিতে কোনো বাধা নেই। ঘুমকাতুরে অণিমা মাসির ঘুমটা রাতে বেশ জমাটিই হয়েছিল। পরদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে তো চক্ষু চড়কগাছ। শোবার আগে খুলে রেখেছিল চশমা। সেটি উধাও। কি সর্বনাশ! ওয়ার্ডের একটি কাক-পক্ষীও ঘরের বাইরে নেই। যার যার ঘরে তালাবন্ধ। এর মধ্যে চশমাটা গেল কোথায়? কে নিল? খোঁজ, খোঁজ, তোলপাড় খোঁজ, পাওয়া গেল না সে চশমা।

ততক্ষণে সকাল-ডিউটির ওয়ার্ডার এসে গেছে। হরি, নারায়ণ, দুর্গা জপতে জপতে গুনতি করল মাসি। বাব্বা! গুনতি মিলেছে। পালায়নি কেউ- যে রসিকতা করে চশমা নিয়ে যাবে। তবে কোথায় সে হারানিধি? এমন সময়ে দৌড়াতে দৌড়াতে এল এক মেয়ে। খবর দিলো মাসিকে! চশমা ক্ষীরোদার কাছে আছে। সে খেলা করছে ওটা নিয়ে।

দৌড়ে ডিগ্রিঘরে গেল অণিমা মাসি। সত্যিই তো ক্ষীরোদার হাতে চশমা। বুক কেঁপে ওঠে মাসির। ভালো করে নিজেকে দেখে– নিজেরই গায়ে মাথায় হাত বোলায়।

না, কিচ্ছু তো হয়নি তার– শরীর তো সুস্থই– কেবল এই ভয়ের বুক কাঁপাটা বাদ দিয়ে। কেউ তার রক্ত চুষে খেয়েছে– এমন তো মনে হচ্ছে না। তাহলে? আবার সেলের দিকে তাকায় মাসি। না তালা তো বন্ধ– যেমন ছিল কাল সন্ধ্যেয়, তেমনিভাবেই বন্ধ আছে। তবে…?

ক্ষীরোদা, চশমাটা দে মা নরম করে ক্ষীরোদাকে বলল মাসি। একটু হেসে ক্ষীরোদা চশমাটা ফেরত দিল। ক্ষীরোদার মুখে হাসি দেখে এমন অবাক হয়ে গেলো অণিমা মাসি যে হাঁ-করে তাকিয়ে রইল তার দিকে। আর তখনই মাসিকে চমকে উঠতে হল দ্বিতীয়বার।

বহুদিন পরে নোংরা দলামোচড়ানো কাপড়খানা পরেছে ক্ষীরোদা, জটপাকানো চুলগুলি ভেজা। যেন এইমাত্র স্নান সেরে এসেছে সে কোত্থেকে। চুলের জটায় গোঁজা সাদা ফুল!

আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল ওয়ার্ডে। মুহূর্তের মধ্যে। ডিগ্রিঘর যেমন থাকার কথা তেমনি বন্ধ, কি করে বাইরে এল ক্ষীরোদা? কোনো অপার্থিব ক্ষমতা ছাড়া এটা কি সম্ভব? সারা ওয়ার্ডে সেদিনের একই কথার চর্চা:

–ক্ষীরোদা বেরিয়েছিল…

–ডাইনি…

 –রক্তচোষা…

 -কাকে খেল?

 সবাই সভয় নিজেদের দেখল। মায়েরা দেখল কোলের শিশুদের। কার কী ক্ষতি হল কে জানে। কিন্তু কারো কিছু ক্ষতি হয়েছে — এমন বোঝা গেল না অন্তত।

সকাল নটায় ওয়ার্ডে এল বড় মেট্রন। শুনল ক্ষীরোদার অসম্ভব কাহিনী। ওয়ার্ডে তার শাসন আর লুণ্ঠন বজায় রাখার জন্য কত কিছুই না করতে হয়। কত বন্দিনীকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মরতে হয়েছে তার জন্যে!  অন্ধকার মুখে সে উঠে গেল ডিগ্রিঘর দেখতে। সরেজমিনে তদন্ত করতে গিয়ে মেট্রন আবিষ্কার করল, সেলের গরাদের একটি শিকের প্রান্ত সিমেন্টের গাঁথনি থেকে আলাগা হয়ে গেছে। সেই শিকটি বেঁকিয়ে ফেলে একটি ফাঁক তৈরী করা যায়। ক্ষীরোদার মতো ক্ষীণদেহী একজনের পক্ষে সেই ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসা কষ্টসাধ্য হলেও অসম্ভব নয়।

 শুরু হলো ক্ষীরোদাকে জেরা-জিজ্ঞাসাবাদ। আজ যেন ক্ষীরো এক অন্যরূপ। রাগ করল না। চিৎকার করল না, যেন সুস্থ একজন মানুষ সে- এইভাবে বলে গেল তার অভিযান বৃত্তান্ত। কিভাবে সে একদিন ভাঙা শিকটা আবিষ্কার করল। কি করে সেটা বেঁকিয়ে সে বেরিয়ে পড়তো ওয়ার্ডে– প্রায় প্রতি রাত্তিরেই। ডিগ্রি থেকে বাইরে পা দেয়ার অধিকার তার ছিল না। স্নান করার তো নয়ই। তাই প্রায়ই সে ওয়ার্ডে ঘুরতে বেড়িয়ে পড়তো। নিশুতি রাত যখন ভোরের কাছে এসে পৌঁছতো– প্রাণভরে স্নান করতো সে। ওয়ার্ডের জলাধার তখন জনমানবশূন্য, ফাঁকা। ঠেলাঠেলি ঝগড়াঝাটি মারামারি নেই জলের জন্য। প্রাণভরে স্নান করতো ক্ষীরোদা। তারপর ডিগ্রিতে ঢুকে বসে থাকত সকাল হতে না হতেই।

 গতরাতে সে ওয়ার্ডে ঘুরেছে। স্নান করেছে। রাতে ডিভিশন ওয়ার্ডে ঢোকার সদর দরজা কখনো কখনো খোলা থাকে। এই মহিলা-ওয়ার্ডে শুধু সেখানেই ফুল ফোটে। ডিভিশনবাড়িতে গিয়ে ফুল মাথায় দিয়েছে। ফুল মাথায় দিয়ে দেবে আর শাড়ি পরবে না? ধ্যুৎ! এটা কি হয় নাকি! তাই গোছ করে শাড়িখানাও পড়েছে। শেষ পর্যন্ত মোটাসোটা অণিমা মাসির সঙ্গে একটু কৌতুক করার লোভ সামলাতে না পেরে তার পাশে রাখা চশমাটি নিয়ে ডিগ্রিতে ফেরৎ এসেছে। মুখ হাঁ-করে ঘুমিয়ে থাকা অণিমা মাসির বর্ণনা দিতে দিতে ক্ষীরোদা তো ফিক্ ফিক্ করে হেসেই সারা!

যদি ক্ষীরোদা কোনো মানবিক পরিবেশে থাকত! যদি কোনো মানসিক চিকিৎসালয়ে থাকত! যদি কোনো ভালো মনোবিজ্ঞানীর নজরাধীনে থাকত! ক্ষীরোদার মতো ক্ষিপ্ত, হিংস্র পাগলের মনে হঠাৎ কী করে এমন সুস্থ চেতনার বিকাশ ঘটল- তা নিয়ে নিশ্চয়ই তিনি ভাবতেন—হয়তো খুঁজে পেতেন তাকে সারিয়ে তোলার কোনো সূত্র। কিন্তু এসব নিয়ে জেলখানায় কেউ মাথা ঘামায় না। জেলে তো পাগলরা ডাক্তার সেবিকাদের তত্ত্বাবধানে বাস করে না, করে জমাদার ওয়ার্ডার ও অন্যান্য নানান কর্মচারীদের তত্ত্বাবধানে। তাদের কাজ বন্দীদের আটকে রাখা, জেলের লিখিত ও অলিখিত আইন বজায় রাখা। যাতে জেলের সব ব্যবস্থাই সব বন্দী মেনে নেয় শব্দহীনভাবে, যাতে কেউ পালিয়ে না যায়, কেউ গরাদ না বাঁকায়। কাউকে শরীরে বা মনে সারিয়ে তোলার দায়িত্ব জেলের কর্মচারীদের আছে– এমন হাস্যকর কথা কেউ স্বপ্নেও ভাববে না।

তাই গরাদ বাঁকানোর অপরাধে ক্ষীরোদার প্রতি আরো কঠোর হলো মেট্রন। তার নৈশবিহারে সমাপ্তি ঘটল। মিস্ত্রী এনে সেদিনই গরাদ মেরামত করাল মেট্রন। ক্ষীরোদার গায়ে হাত তুলতে কেউ রাজি হয় না– অগত্যা তাকে কড়াভাবে শাসালো। ডিগ্রির দরজা আবার চব্বিশ ঘণ্টার জন্য বন্ধ হয়ে গেল ক্ষীরোদার কাছে।

এরপর মৃত্যু পর্যন্ত ক্ষীরোদা ওই ডিগ্রিতেই বন্ধ ছিল। বাড়তি লাভ হয়েছিল তার হ্যান্ডক্যাপটা। রাতে বেরিয়ে চুলে ফুল গোঁজার শাস্তি। ওই হ্যান্ডক্যাপ দিয়ে গরাদের সঙ্গে বাঁধা থাকতো। বাধ্য হত একই জায়গায় বসে থাকতে– দিনের পর দিন। খানিকটা গুঁড়ি মেরে দাঁড়াতে পারত শুধু কখনো-কখনো। একেবারেই ক্ষেপে গিয়েছিল সে এরপর। স্নান করে চুলে ফুল গুঁজেছিল যে ক্ষীরোদা, একটি শিশুর আঙুল কামড়ে ধরেছিল সেই ক্ষীরোদাই।

ওই হ্যান্ডক্যাপ-বাঁধা অনড় অবস্থা এগিয়ে এনেছিল তার মৃত্যুকে। অন্য অনেক পাগলের মতোই একদিন মরে গিয়েছিল সে। দুটি মানুষের কাঁধের আশ্রয়ে বাহিত হয়ে তার মৃতদেহটি ডিগ্রিঘর থেকে ছাড়া পেয়ে কোথায় চলে গিয়েছিল কে জানে। আর কি-ই বা ঘটতে পারত তার ভাগ্যে? পাগল বলে চিকিৎসার জন্য যেদিন জেলে পাঠানো হয়েছিল– সেদিনই তো নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল তার ভাগ্য।

কিন্তু শুধু এন.সি.এল আসগরি বা সি.এল ক্ষীরোদাই নয়– কত পাগলকেই তো মরতে দেখলাম এই জেলখানায়।  মারা গেলে, মৃতদেহগুলিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হত। মৃত্যুর আগে তাকে যথাযথ চিকিৎসায় রাখা হয়েছিল তার বিবরণ নথিবদ্ধ করার জন্য, আর স্বাভাবিক মৃত্যু সার্টিফিকেট দেয়ার জন্য।  কে জানে কোন রোগের নাম লেখা থাকত সেসব সার্টিফিকেটে। কিন্তু হাসপাতালের মেঝেতে যখন ফেলে রাখা হত মৃতদেহগুলিকে খুব কাছ থেকে দেখেছি—সুস্থ, আধা সুস্থ, উন্মাদ, বদ্ধ উন্মাদ—যে কেউই মারা গিয়ে থাক– তার শরীরে অবশিষ্ট আছে শুধু হাড় আর চামড়া। যেন কোনো রক্তচোষা শুষে খেয়েছে তার শরীরের সব রক্ত, এমনকী মাংসও! 

 

রচনাকাল- মার্চ ১৯৮০

 

 

 

 

 

 

 

 

                                                

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *