পরিযায়ী শ্রমিক – ত্রাণের রাজনীতি পেরিয়ে (দ্বিতীয় কিস্তি)

গতবছর থেকেই আমরা দেখেছি পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর নেমে আসা আঘাতের বীভৎসতা। যে শহরগুলোকে তাঁরা নিজেদের শ্রম দিয়ে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন, রুজিরুটি হারিয়ে, কোনও সাহায্য না পেয়ে সেই শহর থেকেই বিতাড়িত হতে হয়েছে তাঁদের। সরকার কোনও ব্যবস্থা না করায়, যেটুকু যাতায়াতের ব্যবস্থা করা গেছে, তাতেই গাদাগাদি করে বাড়ি ফিরেছেন হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষ। যাঁরা যানবাহনের ব্যবস্থা করতে পারেননি, তাঁরা কয়েকশো কিলোমিটার হেঁটেছেন। মারা গেছেন পথেঘাটে, রেললাইনে। এ বছর করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা শুরু হতেই আমরা দেখেছি আবার একই ছবি। গতবছর থেকে জাতীয় স্তরে পরিযায়ী শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করেছে মাইগ্র্যান্ট ওয়ার্কার্স সলিডারিটি নেটওয়ার্ক বা পরিযায়ী শ্রমিক সংহতি মঞ্চ। বামার পক্ষ থেকে জিগীষা কথা বললেন মঞ্চের সদস্যা শ্রেয়া ঘোষের সাথে। শ্রেয়া বর্তমানে গবেষণারত, এবং শ্রমজীবী অধিকার, ছাত্রছাত্রী আন্দোলন ও নারী অধিকার আন্দোলনের কর্মী।

প্রথম কিস্তি পড়ুন এখানে

তুমি বলছিলে পরিযায়ী শ্রমিকরা জীবিকার প্রয়োজনে নতুন শহরে এসে বসতি করলেও তাঁদের কোনও সামাজিক অবস্থান তৈরি হয়না। সেই সূত্র ধরে একটা কথা একটু বলো, আমরা যে বিভিন্ন সময়ে দেখেছি যে পরিযায়ী শ্রমিকদের বিভিন্ন ধরনের হয়রানির ঘটনা, সেগুলোর ব্যাপকতা কতটা?

খুবই। একটা সামাজিক অবস্থান গড়ে না ওঠায় এই শেকড়হীন অবস্থার জন্য তাঁরা আরও বেশি করে অসুবিধায় পড়েন। বিহার, ঝাড়খণ্ড বা পশ্চিমবঙ্গ থেকে যারা অন্যান্য জায়গায় যান, তাঁদের অনেকরকম অসুবিধের মধ্যে পড়তে হয়। তাঁরা দিল্লী বা হরিয়ানায় আসছেন, না দক্ষিণ ভারতের অন্যান্য রাজ্যে যাচ্ছেন তার উপরেও এই হয়রানির পরিমাণ না হলেও ধরন কিছুটা নির্ভর করে। কারণ, বাঙালী হিন্দী তুলনায় চট করে তোলে ফলে উত্তর ভারতে তার পক্ষে কথোপকথন চালানো তুলনায় সহজ হয়। কিন্তু ভাষা বোঝা যায় তার মানে একেবারেই এই নয় যে স্থানীয় মানুষের সাথে তার সহজ সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। আবার স্থানীয় মানুষের হাতে যাবতীয় হয়রানির ঘটনাগুলোকে পুরোপুরি ইচ্ছেকৃত হেনস্থা বলেও দেখা যায় না।

আসলে, এমন একটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জাঁতাকলে আমরা আছি, যেখানে কারুরই কোনও চাকরী নেই, কোনও কর্মসংস্থান হওয়া ভয়ানক কঠিন। যেখানে কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার কেউই চাকরি দিতে অপারগ, সেখানে এরকম অস্বাভাবিক প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েই যায়। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় একজন শ্রমিক কোনও একটা ব্যবস্থাকে, বা সরকারকে তার শত্রু না ভেবে তার পাশের পরিযায়ী শ্রমিককেই তার শত্রু ভাবছেন। যে স্থানীয় সে যদি দশ টাকায় কাজ করে তাহলে পরিযায়ী শ্রমিক তার রুজিরোজগারের জন্যই বলছে সে আট টাকায় কাজ করবে। ফলে পুরো ব্যাপারটাই হয়ে যাচ্ছে ‘রেস টু দ্য বটম’ – মানে কাজের জন্য আরও তলানিতে যাওয়া। ফলে এই অস্বাভাবিক প্রতিযোগিতার মধ্যে যে সরাসরিভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী, স্বাভাবিকভাবে তার ওপরেই সবথেকে বেশি বিক্ষুব্ধ হচ্ছে মানুষ। ফলে বস্তিতে পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রচুর হেনস্থা হতে হয়।

পুলিশী হেনস্থা সব জায়গাতেই আমরা প্রচুর শুনি, যে অন্যায্যভাবে পরিযায়ী শ্রমিকদের পুলিশ বেশি করে ধরে। লকডাউনের সময়তেও যখন পরিযায়ী শ্রমিকরা শ্রমিক-ট্রেন বা বাসের আশায় বিভিন্ন সরকারী অফিসে গেছেন, তখনো তাঁদের প্রবল হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে। এছাড়া, বাড়ি ভাড়া নেওয়ার সময় বা কাজ পাইয়ে দেবার জন্য স্থানীয় ঠিকেদাররা পরিযায়ী শ্রমিকদের থেকে অনেক বেশি ঘুষ নেয়। এঁদের মধ্যে যারা জঞ্জাল পরিষ্কার করেন, ঠিকেদাররা তাঁদের থেকে অনেক বেশি টাকা দাবী করে। ফলে পরিযায়ী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র মালিকই হেনস্থা করে না, তাছাড়াও বিভিন্ন স্তরে ঠিকেদাররাও খুবই হেনস্থা করে। গুরগাঁও, ব্যাঙ্গালোর ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গাতেই দেখে গেছে বাংলাভাষী, অতএব বাংলাদেশী মুসলিম এই বলে প্রচুর হয়রানি, হেনস্থা করা হয়েছে পরিযায়ী শ্রমিকদের।

একটা প্রশ্ন যেটা একেবারেই মূলধারায় আসছে না, সেটা হলো পরিযায়ী শ্রমিকদের এই যে বাড়ি ফিরে আসা বারবার আমরা দেখলাম, বাড়ি ফিরে আসার পরের চিত্র আর আমরা দেখলাম না। সেটার আসল ছবি কী? মানে বাড়ি ফিরে যাওয়ার পর কী হলো সেটা কি তোমরা ফলো আপ করেছ?

দেখ, ফিরে যাওয়ার পর পরিযায়ী শ্রমিকরা কী অবস্থায় পড়েছেন সেটা একেবারে অন্য গল্প। যদি সরকারী হিসাবে দেখি, নারেগা (MGNREGA) বা অন্যান্য যা সরকারী গ্রামীণ প্রকল্প আছে, সেগুলো চাহিদার তুলনায় খুবই নগণ্য, তার উপরে আদৌ এগুলোর বাস্তবায়ন ঘটে না। এই দুটো বছরের দুটো লকডাউনের মধ্যে নারেগা প্রায় কোথাও লাগু হয়নি, যদিও প্রচুর পরিমাণে মানুষ তাঁদের গ্রামের বাড়িতে ফিরে গেছেন। ফলে তাঁরা গ্রামে কী কাজ করতে পারবেন, সে বিষয়ে কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার কেউই কোনওরকম দৃকপাত করে নি। যেহেতু গ্রামেও কোনও কাজকর্ম নেই, ফলে একটা লম্বা সময় ধরে কাজ হারিয়ে, কাজ না পেয়ে তাঁরা বসে থেকেছেন, তারপর আবার বিভিন্ন শহরে ফিরে এসেছেন। যারা বাড়ি ফিরেছিলেন তাঁদের ৫০ শতাংশের ওপর মানুষই আবার শহরে ফিরেছেন। হয়তো এরকম হয়েছে যে কেউ আগে সুরাটে কাজ করতেন তিনি দিল্লীতে এসেছেন, দিল্লীতে যিনি ছিলেন তিনি ব্যাঙ্গালোর গেছেন, কিন্তু বেশিরভাগই শহরে ফিরে এসেছেন।

এবং ফিরে আসার পর যেটা হয়েছে, যেখানে আগে থাকতেন সে ঘরের ভাড়া বেড়ে গেছে। একেই কাজ হারিয়ে কোনও আয় নেই এত মাস ধরে, ফলে অনেক জায়গাতে অনেক শ্রমিক ঠিকেদারদের থেকে প্রচুর পরিমাণে ধার করেছেন। ছ’মাসের ভাড়া মিটিয়ে নতুন বাড়ি ভাড়া করার খরচ দিয়েছেন আবার। ফলে না গ্রামে গিয়ে কোনও কাজের ব্যবস্থা হয়েছে, না শহরে ফিরে আগের অবস্থা ফিরে পেয়েছেন, ফলে প্রায় সবাইকেই আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হয়েছে। এবং তারপর আবার দ্বিতীয়বার লকডাউনের মধ্যে পড়েছেন এখন।

এইযে শুধুমাত্র সাহায্য মুখাপেক্ষী পরিযায়ী শ্রমিকদের ছবি আমরা দেখছি, তার বাইরের অবস্থার কথা বলছিলে তুমি, সেটা ঠিক কিরকম?

https://www.mwsn.in/resistancemap/

যেটা আগেও বলছিলাম, এমডব্ল্যুএসএন থেকে আমরা বারবার চেষ্টা করেছি পরিযায়ী শ্রমিকদের যাতে শুধু সাহায্যের মুখাপেক্ষী ত্রাণকেন্দ্রিক ভাবনা থেকেই না দেখা হয়, যাতে তাঁদের রাজনৈতিক অস্তিত্বও গুরুত্ব পায় সেই কথা তুলে ধরতে। আমরা যেমন একটা রেজিস্টেন্স ম্যাপ বা প্রতিরোধের ম্যাপ তৈরি করেছিলাম। এটায় আমরা দেখানোর চেষ্টা করছিলাম, যে শুধুমাত্র এনজিও, সরকার বা সুশীল সমাজের কাছে সাহায্য চাওয়ার বাইরেও যে পরিযায়ী শ্রমিকরা বিভিন্ন জায়গায় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন তার ছবি। তাঁরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নানান জায়গায় অবরোধ করেছেন, অবস্থান করেছেন, বিভিন্ন দাবী তুলে ধরেছেন। এবার এই ঘটনাগুলো কতটা সংগঠিত বা সংগঠিত নয় সেটা লকডাউনের মুহূর্তে দাঁড়িয়ে বাছবিচার করা খুবই কঠিন, কিন্তু সাধারণভাবে এই সবকটা ঘটনাই শ্রমিক প্রতিরোধের ঘটনা। এই ঘটনাগুলো কিন্তু প্রায়শই ঘটেছে গত বছরে। এবার, খবরের কাগজে মিডিয়াতে আদপেই পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা আসে না, সেটা একটা অন্য আলোচনা। অথচ, যখন প্রতিদিন খবরের কাগজের হেডলাইন হচ্ছে পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে, সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়েও খবরে কোথাও এই প্রতিরোধের কথা, লড়াকু শ্রমিকদের কথা তুলে ধরা হলো না। একটা এলাকায় পনেরোজন রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছেন, বাসের ব্যবস্থা করার দাবিতে, এই খবরটা কেউ জানেনা, অথচ একই অঞ্চলে কোথায় ত্রাণের লাইন আছে সে খবর সব জায়গায় দেখানো হচ্ছে।

ফলে এখন, আমাদের কর্মসূচীর মধ্যে আমরা ত্রাণের কাজ ছাড়াও সুপ্রিম কোর্টের রায় লাগু করানোর জন্য দাবী জানাচ্ছি। রায় অনুযায়ী যেকোনো পরিযায়ী শ্রমিক যেখানে আছেন, সেই জায়গার রেশন কার্ড যদি তাঁর কাছে নাও থাকে, তাহলেও সেই জায়গার রাজ্য সরকারকে তার ভরণপোষনের ব্যবস্থা করতে হবে। তাকে নিয়মিত রেশন দেওয়ার দায়িত্ব নিতে হবে, এবং লকডাউনের ফলে তার রোজগারের যে ক্ষতি হচ্ছে, তার ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা যেটা বলার চেষ্টা করছি সেটা হচ্ছে একজন পরিযায়ী শ্রমিক আসলে ফেডেরাল সাবজেক্ট, ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় তার অস্তিত্বের জায়গা আছে। যে রাজ্যে একজন পরিযায়ী শ্রমিক গেছেন, সেই রাজ্যের, যেখানে সেই শ্রমিকের বাড়ি সেই রাজ্যের, এবং কেন্দ্রীয় সরকারের – ঐ পরিযায়ী শ্রমিক এই তিনজনেরই দায়িত্বের মধ্যে পড়েন। বিশেষত দিল্লী, ব্যাঙ্গালোর, গুরগাঁও-এর মতো এই বড় বড় শহরগুলো পুরোপুরি তৈরিই হয়েছে পরিযায়ী শ্রমিকদের শ্রমকে কাজে লাগিয়ে। ফলে এই শহর কর্তৃপক্ষ এবং রাজ্য সরকারগুলি কিছুতেই পরিযায়ী শ্রমিকদের দায় অস্বীকার করতে পারে না।

সেক্ষেত্রে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হিসাবে তোমরা কীভাবে এই রাজনৈতিক প্রশ্নকে ভাবছো? 

বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্ন হিসেবে আমরা যে দাবী ওঠানোর চেষ্টা করছি তা হলো একজন পরিযায়ী শ্রমিকের নাগরিকত্বের দাবী। শুধুমাত্র শ্রমিক হিসাবে তাঁর অর্থনৈতিক অধিকারের প্রশ্নই নয়, তার সাথে সাথে একজন নাগরিক হিসেবে তাঁর যে সামাজিক, রাজনৈতিক অধিকার সেই আলোচনাটাকে আমরা সামনে আনতে চাইছি। যেমন পরিযায়ী শ্রমিক ভোট দিতে পারে না, এবং ভোটার না হওয়ার জন্য স্বভাবতই তার দাবিদাওয়ার প্রশ্নও বিশেষ পাত্তা পায়না। এবার বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তবু কিছু সংখ্যক শ্রমিক ভোট দিতে গেছিলেন, কিন্তু সেই সংখ্যা খুবই নগণ্য। কিন্তু সাধারণভাবে ভোটের সময় ছুটি বা ভাতা না পাওয়ার কারণে তাঁরা ভোট দিতে যেতে পারেন না। ফলে ‘পরিযায়ী শ্রমিক’ – এই ব্যাপারটাই প্রায় একটা রাজনীতি-বহির্ভূত অস্তিত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে রাজ্যে তাঁরা থাকেন সেখানে তাঁদের ভোটাধিকার নেই, ফলে তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান গৌণ; অন্যদিকে যে রাজ্যের তাঁরা বাসিন্দা সেখানে যেহেতু তাঁরা গিয়ে ভোট দিতে পারেন না, ফলে সেখানেও তাঁদের অবস্থান গৌণই থেকে যায়। বাড়ি থেকে অনেক বছর বাইরে থাকার ফলে স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁদের কোনও প্রভাব নেই, স্থানীয় রাজনীতির অংশ না হওয়ায় সে রাজ্য-রাজনীতিতেও তাঁরা স্থান পান না। অন্যদিকে যেখানে তিনি কাজ করতে আসেন, সেখানেও তাঁর সামাজিক বা রাজনৈতিক অস্তিত্ব বলতে কিছু নেই। এই ব্যাপারে আমরা যেমন পোস্টাল ব্যালটের দাবী জানাচ্ছি। এই মুহূর্তে পোস্টাল ব্যালট দেওয়া হয় শুধুমাত্র আর্মিকে, এবং এনআরআই-দের। এবার এনআরআই-দের যদি দেওয়া যেতে পারে, তাহলে যে কোনও সরকারী পরিকাঠামোগত বা পরিকল্পনাগত অসুবিধা নেই সেটা স্পষ্ট, ব্যাপারটা শুধুই সদিচ্ছার প্রশ্ন। ফলে পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্যও এই ব্যবস্থা কেন করা হবে না, সেই প্রশ্ন তুলছি আমরা।

যেধরনের শ্রম আইন সম্প্রতি পাশ হলো, তাতে বোঝাই যাচ্ছে যে অর্থনৈতিক অধিকার বলে শ্রমিক শ্রেণীর কাছে কিছুই নেই, বিশেষত পরিযায়ী এবং অসংগঠিত শ্রমিকদের কাছে আরোই নেই। ১৯৭৯ সালের শ্রম আইনে পরিযায়ী শ্রমিকদের যেটুকু সংস্থান ছিল, তা কতটা বাস্তবের মাটিতে লাগু হতো সেটা আলাদা প্রশ্ন, কিন্তু তবুও খাতায়-কলমে আইন বলবৎ ছিল। এখন পরিযায়ী শ্রমিকের জন্য সেটুকুও আর অবশিষ্ট নেই। নতুন শ্রম আইন বলছে মালিককে পরিযায়ী শ্রমিকদের আসা-যাওয়ার খরচা দিতে হবে – কিন্তু কীভাবে এই আইনের বাস্তবে রূপায়ণ হবে তার কোনও রূপরেখা নেই। যদি মালিক এই খরচা না দেয়, তাহলে কি মালিকের কোনও জরিমানা হবে? মালিক খরচা না দিলে কি রাজ্য বা কেন্দ্র সরকার দায়িত্ব নেবে? মালিকের বিরুদ্ধে কোথায় অভিযোগ দায়ের করা যাবে – কিছুই বলা নেই নয়া শ্রম আইনে। তাছাড়াও, ‘মালিক’ এই ব্যাপারটাই পরিযায়ী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ধোঁয়াশার। একজন শ্রমিক কারখানার এমন এক বিভাগে কাজ করেন, যেখানে নিজের প্রত্যক্ষ ‘মালিক’ বলতে তিনি একজন ঠিকেদারকে চেনেন। সেই ঠিকেদারও এদিকে হয়তো পরিযায়ী শ্রমিকের থেকে আর্থিক বা সামাজিক স্বচ্ছলতার দিক দিয়ে সামান্যই উপরের স্তরের লোক, তাঁর পক্ষে সম্ভবই না সমস্ত শ্রমিকের আসা যাওয়ার খরচা দেওয়া। এদিকে এই ঠিকেদার তাঁর কারখানার মাল বেচছেন নাইকির মতো বহুজাতিক কোম্পানিকে, অথচ নাইকিও আসলে তাঁর সরাসরি এমপ্লয়ার বা মালিক নয়। ফলে ‘এমপ্লয়ারকে খরচা দিতে হবে’ এই কথার কোনও বাস্তব ভিত্তি নেই।

ফলে, আমাদের দেশের শ্রমজীবী শ্রেণীর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে অংশ, সে আসলে রাজনৈতিক প্রশ্নে সম্পূর্ণ গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। আমরা এটাই চেষ্টা করছি, যাতে পরিযায়ী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে তাঁদের সামাজিক, আর্থিক, আইনী সমস্যাগুলোকে রাজনৈতিকভাবে তুলে ধরা যায়। এর সাথে আমরা এটাও বারবার মনে করানোর চেষ্টা করছি যে এই মুহূর্তে পুরো দেশটাই চলছে সম্পূর্ণভাবে পরিযায়ী শ্রমিকদের শ্রমের উপর ভিত্তি করে। ত্রাণের রাজনীতির বাইরেও পরিযায়ী শ্রমিকদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের যে প্রশ্ন, তাকে আমরা সামনের সারিতে আনতে চাইছি।

এমডব্ল্যুএসএন-এর তরফে প্রকাশিত করোনা লকডাউন এবং পরিযায়ী শ্রমিক সম্বন্ধিত একটি রিপোর্ট পড়া যাবে এখানে – https://cis-india.org/raw/files/atmanirbhar-bharat-meets-digital-india.pdf?fbclid=IwAR3BokLqmON-4qpe_iLFfzs-5ORzp2EQJziaBKqbUJ8gY06-ENAckFcoYYw

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published.