জঙ্গি ভালবাসা অথবা গুলকন্দ তৈরির রেসিপি

যুদ্ধ আর হানাহানি ভালবাসাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয় না, আরও কম গুরুত্ব পায় মানুষ, যাদের ছাতিতে ওরা ঘাঁটি গেড়েছে।

আমি তখন ১৫। মানতেই হবে সে এক খুবই যন্ত্রণার বয়স। এ এক এমন বয়স যখন তুমি না বাচ্চা, না পুরোপুরি বড়। যে বয়সে শিশুর মতো স্বপ্ন আর আশা রাখার সাহস রয়েছে, আবার বড় হয়ে যাওয়া মানুষের ভয়ও তোমায় ছাড়ে না, সেই বড় হয়ে যাওয়া মানুষটা যে জানে অপচয় আর পরাজয়ের বোধও তারই মধ্যেই কোথাও ঘাপটি মেরে আছে। জেরবার হওয়ার জন্য এই তো যথেষ্ট, কিন্তু আমি আবার তার ওপর ছিলাম সাহিত্যের সন্তান, যেখানে শুধুই গল্প, ভালবাসা, আর তার শেষটা শুধুই আনন্দের।     

আমার মা ছিল ইউনিভার্সিটি-র ইংরেজির অধ্যাপিকা। যেদিন থেকে আমার বোধ হয়েছে, আমি চারপাশে শুধু রাশি রাশি বই দেখেছি। আমি বইতেই বেঁচেছি, আর সেই ১৫ বছর বয়সে, আমি আমার সারাটা দিনরাত শুধু বই পড়েই কাটিয়ে দিতে পারতাম। হয়তো হরমোন অথবা পালিয়ে থাকা। ৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে শ্রীনগরে বড় হয়ে ওঠা তো খুব সহজ ছিল না। প্রতিটা দিন সেখানে মৃত্যু নিয়ে আসত, প্রতিটা ঘন্টায় নতুন নতুন সাজে এসে উপস্থিত হত ভয়, আতঙ্ক, আর হতাশা। জীবন সেখানে এতটাই ভাঙাচোরা, ছেঁড়াখোড়া যে কোনওরকম আশা ধরে রাখাই ছিল কঠিন। যতই চেষ্টা কর না কেন, দামী সুগন্ধীর মতো মৃত্যুর গন্ধ লেপটে থাকে কাপড়ে, জামায়।   

কিন্তু আমার তখন যা বয়স, এতকিছুর মধ্যেও সম্ভাবনা আর আশা পিছু ছাড়ে না। আমি তখন যা-ই পড়ি, সেই সমস্ত কিছুই কেমন যেন সিমেন্ট আর আঠার মতো চুঁইয়ে পড়ে, গুলি আর গ্রেনেড-এর তৈরি করা ফাঁক ও বিষাদগুলোকে ভরিয়ে দেয় – জীবন ছেয়ে রাখে এক কোমল আচ্ছাদনে। 

আমার মা তাঁর কিছু ছাত্রছাত্রীকে বাড়িতে পড়াতো। না হলে লাগাতার চলা কার্ফ্যুর মধ্যে ইউনিভার্সিটির সিলেবাস শেষ করা সম্ভব হত না। সেটা ছিল আরও পাঁচটা দিনের মতোই একটা দিন। সেনা ঢুকল আমাদের মহল্লায়, নামল ক্র্যাকডাউন। ছেলেদের সকলকে চলে যেতে বলা হল। আমি মায়ের সাথে বাড়িতেই ছিলাম। এই মুহূর্তগুলোতে উৎকন্ঠা আর অশান্তির দুর্গন্ধ এতই ভারী হয়ে ওঠে যে দমবন্ধ করে মারতে পারে -সে জন্যই হয়তো বা সকলে শ্বাস বন্ধ করে ছিল। অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের আর বিশেষ কিছুই করার ছিল না। চিৎকারের শব্দ ভেসে আসছিল, যার অর্থ হয় কেউ মারা গেছে বা মারা যাচ্ছে। 

পুরুষ ও ছেলেরা বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করল। যখন তাকে দেখি, আমি তখন দরজার মুখে দাঁড়িয়ে। শুকনো ফাঁটা ঠোঁট আর কালো চোখ। প্রচলিত অর্থে সুন্দর বলা যায় না, কিন্তু ওর চেহারায় কিছু একটা ছিল যা থেকে চোখ সরানো কঠিন। লম্বা, সুগঠিত চেহারা, চওড়া কাঁধ। ওর চুল আর চোখের রঙ ছিল একই – কালো।

অনেক দিন কেটে যাওয়ার পর মাকে ওর কথা জিগগেস করলাম। আমার বুকের ধুকপুকানির মধ্যে যতটুকু শুনলাম, ও মায়ের ছাত্র। তার মানে আবার দেখতে পাবই। ক্র্যাকডাউন-এর সেই দিনের পর থেকে ওর কথা মাথা থেকে বেরোচ্ছেই না। তাড়াতাড়ি হোমওয়ার্ক শেষ করে নিতাম, যাতে সিঁড়িতে বসে ওর অপেক্ষা করতে পারি। প্রায় সপ্তাহখানেক অপেক্ষার পর শেষ পর্যন্ত একদিন তার দেখা পেলাম। বাইরের দরজাটা ঠেলে ঢুকল। কথা বলব ভেবেও শেষ অবধি সাহস করে উঠতে পারলাম না। আমার দিকে তাকাল, দেখল, মৃদু হেসে পড়ার ঘরে ঢুকে গেল।  প্রেম-ভালবাসা সম্পর্কে প্রচুর পড়ে ফেলেছি ততদিনে, অথচ এদিকে এতই বুদ্ধু ছিলাম যে প্রেমের চিহ্ন আর লক্ষণগুলো সম্পর্কে কোনও বোধই ছিল না। সেই সময়ে খুব বুদ্ধি করে আমি বুঝলাম এ আসলে ফ্লু! কিন্তু এভাবেই শুরু হয়েছিল- আমার ছোট্ট প্রেমের গল্প, আমি ভেবেছি সর্দি লেগেছে।

প্রতিদিন সিঁড়িতে ওর জন্য অপেক্ষা করতাম। কোনও কোনওদিন  ও আমাকে না দেখেই ঢুকে যেত, আবার কোনওদিন আলতো করে হাসত।

একদিন আমার মায়ের দেরি হচ্ছে, তাই ছাত্ররা সব এদিক ওদিক বসে গল্প করছিল। ও কিছু একটা পড়ছিল, চারদিকে কী হচ্ছে সে দিকে কোনও খেয়ালই নেই যেন। হঠাৎই চোখ তুলে আমাকে জিগগেস করল আমি কী পড়ছি।

কবিতা! লওয়েল। আমি হকচকিয়ে গিয়ে বললাম।

কোন কবিতা? জানতে চাইল।

আমার হৃদপিন্ডটা যেন ছিটকে বেরিয়ে যাবে।

কোন কবিতা? আবার জিগগেস করল।

কোনওরকমে বললাম, ফিরবে না

বলল, মনে হচ্ছে না আমি পড়েছি। একটু পড়ে শোনাও?

নিচের লাইন কটা পড়তে শুরু করলাম,

Some other love will sound his firewood for you

and wake your heart, perhaps, from its cool sleep;

but silent, absorbed, and on his knees,

as men adore God at the altar, as I love you –

don’t blind yourself, you’ll not be loved like that.

ইচ্ছে করেই এই লাইনগুলো পড়েছিলাম। তারপর কেউ কোনও কথা বলিনি। আমি সিঁড়িতে বসে নিঃশব্দে ওকে দেখছিলাম, আর ও চুপ করে মেঝের দিকে তাকিয়ে ছিল। সেদিনের পর থেকে এটা আমাদের রোজকার অভ্যেস হয়ে দাঁড়াল। ও পাঁচ-দশ মিনিট আগে আসত, জানতে চাইত আমি কী পড়ছি, আর আমি পড়ে শোনাতাম। ও শুনত, মৃদু হেসে পড়ার ঘরে ঢুকে যেত।  

মাসের পর মাস আমি এভাবেই কবিতা বা গদ্য পড়ে শোনাতাম, আর ও হাসত। আমার দুনিয়ায় এটা যেন এক টুকরো স্বর্গ, যা নরকের থেকে কিছু কম খারাপ ছিল না। সবটা একটা সূক্ষ্ম সুতোয়ে ঝুলছিল, কিন্তু আনন্দে ডগমগ আমি তার কোনও আভাসই পাইনি।  সেই বয়সে যখন কেউ প্রেমে পড়ে, মনে হয় তার পৃথিবীটা অজেয়। প্রেম তো এমনই। এক মিথ্যা নিরাপত্তার আশ্বাসে জড়িয়ে রাখে। মনে হয়, সেই মুহূর্তে সামনে যা কিছু উপস্থিত, তাই চিরস্থায়ী।

কিন্তু আমি থাকতাম কাশ্মীরে, যুদ্ধক্ষেত্রে। যুদ্ধ আর হানাহানি ভালবাসাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয় না, আরও কম গুরুত্ব পায় মানুষ, যাদের ছাতিতে ওরা ঘাঁটি গেড়েছে। যে আবছায়া কুয়াশায় আমি বাঁচতে শুরু করেছিলাম, তা সরে যাওয়া ছিল সময়ের অপেক্ষা, বাস্তব আছড়ে পড়তই। একদিন, সিঁড়ি দিয়ে নেমে অবাক হয়ে দেখি আমার আগেই ও এসে দাঁড়িয়ে আছে। আমি বসে অপেক্ষা করতে থাকলাম কখন আমাকে পড়ে শোনাতে বলবে। কিন্তু বলল না। পিঠের ব্যাগটা খুলে একটা প্যাকেট বের করল।  

আমার হাতে প্যাকেট-টা গুঁজে দিয়ে বলল, এটা তোমার জন্য

কোনওরকমে এবড়োখেবড়ো কাগজে মোড়ানো একটা প্যাকেট। কোনও ফিতে বা কিছু ছিলনা। সহজেই খবরের কাগজটা খুলে ফেলে দেখলাম পুরনো হয়ে যাওয়া মলিন একটা বই- তলস্তয়ের অ্যানা ক্যারানিনা ।  

লাজুক মুখে বলল, যখনই এটা পড়বে আমার কথা যাতে মনে পড়ে

আমি তো উত্তেজনায় আনন্দে কাঁপছি,  কিন্তু মনে হল আমারও ওকে কিছু একটা দেওয়া উচিত। এরকম অল্প সময়ের নোটিশে কীই বা দিতে পারি। আমার হাতের বইটার দিকে তাকালাম- শেক্সপিয়র-এর ওথেলো । বইটা বন্ধ করে ওর হাতে দিলাম।

তোমার জন্য।, আমি বললাম, যখনই এটা পড়বে আমার কথা যাতে মনে পড়ে

একটু হেসে বইটা নিল। আমরা জানতাম না, আমরা  সেদিন শুধু বই-ই দেওয়া নেওয়া করিনি। সেদিন আমরা দুজন দুজনের হাতে একে অন্যের নিয়তির বাঁধাই পাণ্ডুলিপি তুলে দিয়েছিলাম। সেদিন বা তার পরে আর কোনওদিন আমি ওকে কিছু পড়ে শোনাইনি, কারণ ও আর কোনওদিন আসেনি। সময় কেটে যেতে থাকে, কিন্তু ওর আসার কোনোও লক্ষণই নেই। আমি তখন অ্যানা কারানিনা  ছাড়া আর কিচ্ছু পড়তাম না। বারবার একই বই পড়ে যেতাম, মনে হত যতদিন আমি এই বইটা পড়ছি, ওর সাথে আবার দেখা হওয়ার আশা বেঁচে আছে। কিন্তু নিয়তি আমাদের পথ ঠিক করে রেখেছে ততদিনে- আর সেই দুই পথ কোথাও গিয়ে মেলে না।

একদিন যখন অ্যানা কারানিনা পড়ছি। শুনলাম চাপা কান্নার শব্দ। মা কাঁদছে। আমি তাড়াতাড়ি উঠে ছুটলাম কী হয়েছে দেখতে। মা রান্নাঘরে গোলাপের পাপড়ি ধুচ্ছে আর ফোঁপাচ্ছে। মা যখনই কোনও কিছু নিয়ে খুবই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে গুলকন্দ বানায়। কী হয়েছে তোমার? জিগগেস করলাম।     

কিছু না, মা বলল, এখানে একটু হাত লাগা না।

মা গোলাপের পাপড়ি জোগাড় করে সেগুলি ঠান্ডা জলের তলায় ধুয়ে রেখেছিল। তারপর সেগুলিকে দুটো পেপার ন্যাপকিনের মাঝে রেখে চেপে চেপে শুকিয়ে নিল। আমি সমান পরিমাণ চিনি মেপে রাখলাম। মা গোলাপ পাপড়িগুলোকে কুচিয়ে নিল, একদম মিহি না করে।

ঠিক, মা বলল। এক পরত পাপড়ি, তার ওপর এক পরত চিনি। যতক্ষণ না পুরোটা ভর্তি হয়ে যায় দিতে থাক।

আমরা চুপচাপ এটা করতে থাকি। মা, কাচের বয়ামে এক পরত করে কুচনো গোলাপ পাপড়ি দেয়, আর আমি তার ওপর চিনির আস্তরণ দিয়ে দিই। আমরা ততক্ষণ এটা করতে থাকি যতক্ষণ না বয়ামটা কাণায় কাণায় ভরে ওঠে।

মনে হয় হয়ে গেছে, মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

মা, কী হয়েছে? কী হয়েছে বল?

আমার এক ছাত্র মারা গেছে, মা বলল। খুব কষ্টে কান্না আটকাচ্ছিল মা, চোখের জল মায়ের চোখের পাতার ওপর জমে ছিল, ঠিক যেন গোলাপের পাপড়িতে শিশির বিন্দু। তারপর এক সময়ে ভারী হয়ে ছোট ছোট স্ফটিকের মতো ঝরে পড়ল, লক্ষ লক্ষ টুকরো হয়ে ভেঙে গেল।

আমি জিগগেস করলাম, কে?

মা বলল, তালিব।

মা আরও কিছু বলছিল, কিন্তু আমি আর কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছিলাম না।

…সিগারেট পুড়ছিল…

… ভাঙা হাড়…

আর তারপর গোটা দুনিয়া অন্ধকার।

ও নেই, কোত্থাও নেই। 

অনেকগুলো দিন আমি ঘোরের মধ্যে ছিলাম। যখনই ঘোর খানিক কাটত, বাস্তব এক বিশাল ঢেউ হয়ে আমাকে আবার ভাসিয়ে নিয়ে যেত, পা টলমল করে উঠত, আবার ডুবে যেতাম অতলে। অবিশ্বাস আর দাঁতে দাঁত চেপে মেনে নেওয়া এই দুইয়ের মধ্যে চলাচল করতাম আমি, কোনওটাই সহজ ছিল না। ওখানে আমি সেরে উঠব না, এই ভেবে মা-বাবা আমাকে দিল্লিতে পড়াশোনা করার জন্য পাঠিয়ে দেওয়া মনস্থির করল। 

বাবা আর মা দুজনই আমার সাথে দিল্লি এসেছিল। আমাকে হস্টেল-এ গুছিয়ে নিতে সাহায্য করতে। চলে যাওয়ার দিন মা আমার হাতে একটা প্যাকেট দিল। পরিপাটি করে লাল কাগজে মোড়ানো। আমি ঘরে ফিরে গেলাম, নিঃস্তব্ধে। প্যাকেট-এর মোড়ক খুললাম। সেই পুরনো মলিন অ্যানা কারানিনা। বইটা খুললাম। প্রথম পাতাটা সাদাই দেখব ভেবেছিলাম যেমনটা সব সময়ে দেখেছি। পাতাটা মলাটের সঙ্গে আঠা দিয়ে লেগে গেছিল, ছিঁড়ে ফেলার ভয় আমি আর কখনও খোলার চেষ্টা করিনি। মা কোনওভাবে পাতাটা খুলেতে পেরেছিল, পাতাটা সাদা ছিল না। লেখা ছিল, লাল কালিতে, ওর হাতের লেখায়।

​আসিয়া, আমার জঙ্গি প্রিয়,

যখন অনেক বুড়ো, ধূসর হয়ে যাবে

তখন এই বইটা নিয়ে

আস্তে আস্তে পড়ো…

অনেকেই হয়তো তোমার মধুর প্রসন্নতা ভালোবেসেছে

কিন্তু একজনই তোমার বাউন্ডুলে মন ভালোবেসে

তোমার বদলাতে থাকা মুখের ক্লেশ ভালোবেসে

তার দীপ্ত রেখা ধরে ঝুঁকে

আলতো করে বলেছে, কিভাবে প্রেমও চলে যায়…

পাহাড়ের চূড়ায় ছুটে

তারাদের ভিড়ে মুখ লুকোয়

তোমার,

তালিব (ইয়েটসের সহযোগে)

পুনশ্চগুলকন্দ-এর বয়াম ৭ থেকে ১০ দিন রোদে রেখে দিতে  হয়, তারপর সেটা খাওয়া যায়। 

লেখাটি প্রথম প্রকাশ হয় দ্য ওয়্যার পত্রিকায় । মূল লেখাটি পড়া যাবে এখানেসঙ্গের ছবিটি জানান ওয়ানান কালেক্টিভ-এর ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published.