‘মোয়ানা’-য় ইকোফেমিনিজমের বার্তা: পরিবেশ দিবসে ফিরে দেখা

‘মোয়ানা’ নামের ছবিটি

প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে এক নিরিবিলি দ্বীপ। সে দ্বীপের মাওরি প্রধানের আছে এক পুঁচকে মেয়ে। সমুদ্র তাকে হাতছানি দেয়। কিন্তু কে জানে কেন, বাবা আর মায়ের সমুদ্রে বড় ভয়। ভয়ই যখন, তখন মেয়ের নাম মোয়ানা রাখা কেন বাপু? মোয়ানা নামের মানেই যে সমুদ্দুর। সমুদ্রের কাছে যাওয়া মানা ছোট্ট মোয়ানার। সেই কোন ছোটবেলায় সমুদ্র এক জেল্লাদার সবজে পাথর এনে ফেলেছিল তার পায়ের কাছে। পাথরটা হাতে তুলেছে সবে, অমনি বাবা এসে হাজির। কোলে করে নিয়ে চলল কুঁড়ের দিকে, আর পাথর গেল হাত ফস্কে পড়ে। জলরাশি আবার ভাসিয়ে নিয়ে গেল তাকে।

‘ডিজনি মোয়ানা’-র শুরুর দিকের দৃশ্যাবলি। মা-মেয়ে গায়ে গা লাগিয়ে বসেছিলাম পর্দার টিভির সামনে ২০১৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবি দেখতে। নতুন যুগের অ্যানিমেশন, যেখানে রাজকন্যে রাজপুত্তুরের জিয়নকাঠির ছোঁয়ার অপেক্ষায় থাকে না। নিজেই নিজেকে মুক্ত করে। কোত্থেকে? এক্ষেত্রে বাপের নিষেধাজ্ঞা থেকে— সমুদ্রযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু কন্যে নিজেকে মুক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতিকেও মুক্ত করার কথা বলে যখন, তখন নড়ে-চড়ে বসি। ‘মোয়ানা’ কি ইকোফেমিনিস্ট টেক্সট? ছবি গড়াতে দেখা গেল, অল্প-স্বল্প নয়, একেবারে খাপে খাপ ‘প্রাকৃতিক নারীবাদ’-এর পাঠ দৃশ্যে দৃশ্যে। তবে তা নিজেকে আবদ্ধ রেখেছে প্রথম পর্যায়ের ইকোফেমিনিজমেই।

মোয়ানা ফুলটুসি আলটুসি নয়। তার ব্যক্তিত্বে সহজাত নেতৃত্বের গুণের দ্যুতি। বাবার পর সে হবে উপজাতির প্রধান; তাই আকৈশোর দ্বীপবাসীকে সে সাহায্য করে বেড়ায়—সে বাড়ি মেরামতিতেই হোক বা নারকেল চাষে। ঠাম্মি টালা-ও মোয়ানার মতোই সমুদ্রপাগল। ঢেউ-এর তালে তালে নাচে তার বুড়ো হাড়। টালার সয় না সমুদ্র আর মোয়ানার দূরত্ব। টালা জানে, সমুদ্র আর মোয়ানা অঙ্গাঙ্গী। মোয়ানাই সমুদ্রের দ্বারা বিশেষ কর্তব্যের জন্য নির্বাচিত। সময় হলেই সমুদ্র ঠিক ডেকে নেবে তাকে। 

ইতিহাস বলে, সমুদ্রের হাতছানি সফেদ পুরুষ নাবিকও উপেক্ষা করতে পারেনি। কিন্তু সমুদ্র কি তাদের নিয়ে গিয়ে ফেলেছিল নতুন নতুন উপনিবেশে? বোধহয় না। তারাই সমুদ্রকে বাধ্য করেছিল নতুন দেশ দর্শাতে। প্রকৃতিকে, অপর দেশ ও মানুষকে জয় করে পদানত করাতেই পৌরুষের দর্প। পশ্চিমী অভিযানের সঙ্গে উপনিবেশবাদের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। পুরুষের চোখে নারী ও প্রকৃতি দুইই বীরভোগ্যা, সেবাদাসী। এই চিন্তনসূত্র থেকেই ইকোফেমিনিজমের যাত্রা শুরু। 

তাই, সফেদ-পুরুষ-ইউরোপীয় নাবিককে সমুদ্র যেমনতরো অভিযানের হাতছানি দেয়, তার থেকে মোয়ানার অভিযান, দেখা যায়, মূলগত ভাবে আলাদা। সে পাড়ি দেয়— কিন্তু  প্রকৃতিকে অধিকার করতে নয়, প্রকৃতিকে তার অধিকার ফিরিয়ে দিতে। তার অভিযান উপনিবেশ খোঁজার উদ্দেশ্যে নয়, বরং তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে, জল-জঙ্গল-জমিন বাঁচানো উদ্দেশ্যে। 

ছবিতে দেখা যায়, প্রকৃতির খেয়ালে দ্বীপে দুর্দিন শুরু হয়। নারকেলের ফলন হয় না, মাছ ওঠে না জালে। মোয়ানা পরামর্শ দেয়, প্রবাল-প্রাচীরের অন্য প্রান্তের সমুদ্দুরে গিয়ে মাছ ধরলে হয় না? বাবা রাজি হয় না। গভীর সমুদ্রে গেলে অনর্থ হবে। অথচ সমুদ্র মোয়ানাকে শৈশব, কৈশোর ছাড়িয়ে যৌবনেও ডাকে। সে বাঁধন ছেঁড়ার গান গায়-

‘See the line where the sky meets the sea

It calls me

And no one knows how far it goes

If the wind in my sail on the sea stays behind me

One day I’ll know

How far I’ll go.’

এই মেয়ে সুদূরের ডাকে সাড়া দিতে উদগ্রীব। স্বাধীনতার প্রথম পদক্ষেপ সে নিল বলে। সে কাজে তাকে উৎসাহ দেয় ঠাম্মা টালা। সে তাকে নিয়ে যায় গুপ্ত গুহায়। জানায় প্রকৃতির প্রতিশোধস্পৃহার কারণ। জানায়, মোয়ানার পূর্বজরা অনায়াসে যেত সমুদ্রে। কিন্তু যবে থেকে তে-ফিতির সবুজ বর্ণের হৃদয়খানা চুরি গেল, তবে থেকেই সমুদ্র উত্তাল ভয়াল হয়ে উঠল। পৃথিবী গেল বদলে। তে-ফিতি হলেন স্বয়ং বসুন্ধরা। সবুজ হৃদয়ের অনুভূতি নিংড়ে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন বিশ্ব। ইকোফেমিনিজমের যাত্রাও বিশ্বপ্রকৃতিকে নারী হিসেবে কল্পনা করেই শুরু। কিন্তু প্রকৃতিকে নারী হিসেবে কল্পনা করলে ও নারীকে নারী হওয়ার কারণেই কিছু বিশেষ গুণের অধিকারী ধরলে নারী-পুরুষের যে বাইনারি তৈরি হয়, তা প্রথম ধারার ইকোফেমিজমের খামতি বা সমস্যাও বটে। আবার নারী ও প্রকৃতির মধ্যে সাদৃশ্য টানা ও তাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে নানা ভাবে দৃঢ় করার যে ইকোফেমিনিস্ট উদ্দেশ্য, সেটারও গুরুত্ব আছে।

তে-ফিতির হৃদয় হরণ করল কে? উপদেবতা মাউই। মাউই মাওরি উপকথা অনুসারে এক অর্ধদেবতা বা উপদেবতা। খানিক মানুষ, খানিক দেব। দেবতাদের থেকে শঠতার মাধ্যমে মানুষের জন্য নানা সুবিধা আদায় করে সে, এমনটাই লোকশ্রুতি। এ ছবিতে অবশ্য মাউই অহংকারী, শক্তিশালী, কিন্তু অনেকাংশে নির্বোধ এক যুবক। সে যেন স্বয়ং পৌরুষের প্রতিনিধি। সে তে-ফিতি বা ধরিত্রী মায়ের সবুজাভ হৃদয় হরণ করছিল ঠিক সেইভাবে, যেভাবে ক্ষমতার লোভে পুঁজিবাদী পিতৃতন্ত্র প্রকৃতিকে ছিন্নভিন্ন করে, ক্ষতবিক্ষত করে। প্রকৃতির সঙ্গে পৌরুষের সম্পর্কটি হাস্যোচ্ছলে ব্যক্ত করে মাউই এক কমিক গানে-

‘I killed an eel

I buried its guts

Sprouted a tree, now you got coconuts

What’s the lesson

What is the take-away

Don’t mess with Maui when he’s on a 

breakaway.’

কিন্তু তে-ফিতি-র সেই সবুজ হৃদয় নিয়ে সে পালাতে পারে না। তে-হাতে নামক দানব তাকে আক্রমণ করে। সবুজ-হৃদয়টি পড়ে যায় সমুদ্রজলে। সেই প্রবাল-সবুজ পাথরটিই শিশু মোয়ানা কুড়িয়ে পেয়েছিল একবার— যে কথা বলা আছে প্রথম অনুচ্ছেদে৷ শেষে অবশ্য জানা যায়, হৃদয় হারিয়ে তে-ফিতি-ই ভয়াল রাক্ষস তে-হাতে-তে পরিণত হয়েছিল। 

মাউই নিজেকে মোয়ানার চেয়ে শুধুমাত্র পুরুষ হওয়ার কারণেই শ্রেষ্ঠ মনে করে। মাউই মোয়ানাকে বলে যে, সে কখনই নাবিক হতে পারবে না, কারণ সে নারী। আবার মাউই মোয়ানাকে ‘টোপ’ হিসাবে ব্যবহার করে দানবকে আকৃষ্ট করতে। মোয়ানার অনুভূতির প্রতি সে অসংবেদী, ঠিক যেমন অসংবেদী সে ধরিত্রী মাতা তে-ফিতির প্রতি। মাউই সেই পিতৃতন্ত্রের প্রতিনিধি যে ভাবে, নারী বা প্রকৃতির সঙ্গে যা খুশি করা যায়। এমনকি পরিণতি ভাবার দূরদর্শিতাও যার নেই। 

মাউই হল ডেমি গড, অর্ধ-ঈশ্বর। এই অর্ধদেবতা বা উপদেবতার রূপকটি মনোগ্রাহী। তা হয়ত বোঝায় যে পুরুষ নিখুঁত নয়, যদিও সে নিজেকে ঈশ্বরতুল্য মনে করে। তার ম্যাজিক হুক, যা তাকে যে কোনো প্রাণীতে পরিণত করতে পারে, তা হয়ত প্রযুক্তিগত উন্নতির দ্যোতক। অথচ রাক্ষুসে কাঁকড়ার থেকে তা পুনরুদ্ধার করার পর মাউই সেই হুকটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, যেভাবে প্রযুক্তি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় অনেক সময়। সে স্বীয় ক্ষমতায় আশ্চর্য দ্বীপের অদ্ভুত প্রাণীদের জয় করতে পারে না। ম্যাজিক হুক উদ্ধার করতে ও জীবন নিয়ে পালাতেও তাকে সাহায্য করে মোয়ানার প্রজ্ঞা এবং বুদ্ধি। চলচ্চিত্র বার্তা রেখে যায়, পৌরুষ আর প্রযুক্তিগত উন্নতি এই দুই-কে ঘিরে অহংকার আসলে ফাঁপা ও অর্থহীন।

প্রকৃতি ও প্রাণীদের প্রতি মাউই আর মোয়ানার দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। মাউই বলে, মুরগীর যোগ্য জায়গা তার উদর। মোয়ানার শুয়োরের সামনেই পর্ক খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে তার বাধে। সে এক শিশু কচ্ছপকে পাখির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য প্রাণপাত করে। অথচ সংবেদী হলেও মোয়ানা সাহসী কম নয়। সে বুদ্ধিমতীও। যখন কাকামোরা জলদস্যুদের হাত থেকে সে সবুজ হৃদয় পুনরুদ্ধার করে বা বৃহৎ কাঁকড়া তামাতোয়ার থেকে মাউই-এর যাদু হুকটি উদ্ধার করে, তখন তার সাহস ও বুদ্ধির পরিচয় যথেষ্ট মেলে। পরিবেশ এবং নারীর মধ্যেকার এই সংবেদনার সম্পর্কের ভিত্তিতেই ইকোফেমিনিজমের সূত্রপাত, যা ভবিষ্যতে নানা প্রান্তিকতার সঙ্গে একাত্ম হবে। এবং পরিবেশবাদ এবং নারীবাদ এই দুইয়েরই জটিল সন্দর্ভগুলি নির্মাণ করবে। 

সমুদ্র এ ছবির নিঃশব্দ চরিত্র। তা যেন মোয়ানার বিবেক, তার অল্টার ইগো, আর অবচেতন, আবার তার সহায়ক শক্তিও। সমুদ্রই তাকে মাউই-এর দ্বীপে নিয়ে যায়, তাকে ডুবতে দেয় না, তবে তা তাকে সরাসরি তে-ফিতির হৃদয় ফিরিয়ে দেয় না। বরং সাগর মোয়ানার সহজাত ক্ষমতাকে জাগিয়ে তোলে। 

এই ছবির গুহাগুলিও বড় তাৎপর্যপূর্ণ।  প্রথম গুহায় টালা মোয়ানাকে চেনায় তার প্রজাতির স্বরূপ। গুহা যেন পিতৃতন্ত্রের বাইরে আত্মোপলব্ধির ও জ্ঞানার্জনের এক স্বতন্ত্র পরিসর। আবার মোয়ানা যখন মাউইয়ের দ্বীপে পৌঁছয়, তখন মাউই তাকে ছলনা করে আটকে রাখে আরেক গুহায়। সে গুহা ভেঙে বেরোনো পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ লড়াই-এর রূপক। শেষ গুহাটি হল কাঁকড়ার গুহা, যেখানে ম্যাজিক ফিশ হুক রাখা আছে। সেখানে মোয়ানা তার প্রকৃত শক্তি অনুধাবন করে। 

শেষ পর্যন্ত প্রকৃতি আর নারীর ক্ষমতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। শেষ দৃশ্যে আমরা দেখি প্রকৃতির কন্যা মোয়ানা আবার নৌ যাত্রার আয়োজন করছে। আর বাধা নেই পিতার তরফে। পিতৃপুরুষদের স্মারক পাথরগুলি দূর পাহাড়ে দেখা যাচ্ছে। নতুন কালের মেয়ে মোয়ানা নৌকা তৈরি করছে সমুদ্দুরে পাড়ি দিতে। এদিকে দ্বীপ আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে এসেছে। কারণ তে-ফিতি শান্ত হয়েছেন। প্রকৃতি প্রসন্না।

******

ইকোফেমিনিজমের একাল সেকাল

সত্তরের দশকে ফ্রান্সের নারীবাদী ফাঁসোয়া দি’ইউবোঁ প্রথম ‘পরিবেশ নারীবাদ’-এর ধারণা দেন। একদিকে তখন নারী নিজের সামাজিক-রাজনৈতিক অধিকারের জন্য গর্জে উঠছে। অন্যদিকে প্রকৃতির নাভিশ্বাস উঠছে। তাই দি’ইউবোঁ বলেন, মানবসংস্কৃতি যদি প্রকৃতিকে পদানত করার, শোষণ করার সংস্কৃতি-ই হয়, তবে তা পুরুষালি অধিকারবোধের সঙ্গে তুলনীয় কেন নয়? ইকোফেমিনিস্টরা আরও বোঝার চেষ্টা করেন, কেন নারী ও প্রকৃতি উভয়েই প্রায়শ বিশৃঙ্খল, অযৌক্তিক এবং অনিয়ন্ত্রতিত হিসাবে চিত্রিত হয়, যেখানে আধুনিকতার আখ্যান পুরুষদের যুক্তিপূর্ণ, বিজ্ঞানমনস্ক এবং বুদ্ধিমান মানুষ হিসেবে বর্ণনা করে? এই আখ্যান যেন নারী ও প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার স্বাভাবিক অধিকার পুরুষের হাতে তুলে দেয়। এই ‘পুরুষ’-এর ধারণা এক ‘প্রাধান্যকামী মানুষ’-এর ধারণার জন্ম দেয়, যেখানে বিভিন্ন শ্রেণি, জাত, বর্ণ, লিঙ্গ ইত্যাদি অবস্থান থেকে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার বহুত্ব জায়গা পায় না। ফলে প্রাকৃতিক সম্পদ হরণের পর, তার নিয়ন্ত্রণ থাকে সেই পুরুষেরই হাতে যে পিতৃতন্ত্রের প্রতিনিধি এবং যে পুঁজিবাদকেও টিকিয়ে রাখে। 

প্রথম ধারার ইকোফেমিনিজম বলে, নারী যখন নিজের অবস্থার সঙ্গে প্রকৃতির অবস্থার সাদৃশ্য দেখতে পাবে, তখন সে সমব্যথী হবে, প্রকৃতিকে রক্ষা করার চেষ্টা করবে। ইকোফেমিনিজমের এই ধারা আরও বলে যে  ক্যাটাস্ট্রফির হাত থেকে প্রকৃতি তথা মানবসমাজকে বাঁচাতে নারীর নিশ্চিত ভূমিকা থাকবে। ‘ইকোফেমিনিজম’ নামক বইটিতে লেখক বন্দনা শিব এবং মারিয়া বলেন, এমনকি আধুনিক বৈজ্ঞানিক মূল্যবোধও আসলে পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধ। এখানেও এক অমোঘ সরলীকরণের সম্ভাবনা দেখা দেয়৷ নৈর্ব্যক্তিক বৈজ্ঞানিক মূল্যবোধ বলে যা চাপানো হয়, তার মধ্যে অবশ্যই পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিহিত থাকে। কিন্তু নারী ও বিজ্ঞানকে পুরোপুরি প্রতিপক্ষ হিসেবেও দাঁড় করানো যায় না। বিজ্ঞানকে পুরোপুরি পরিহার করা যায় না। তার চাইতে যেটা বেশি জরুরি, তা হল নারীবাদী তর্ক এবং দর্শন থেকে বিজ্ঞান এবং তার সামাজিক প্রভাবকে বোঝা। তবে ইকোফেমিনিজম অবশ্যই পরিবেশ এবং জগতের প্রতি এক বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলে—যেখানে প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠ হবে না, নির্বিচারে হবে না জীবহত্যা। ক্ষমতাবানের হাতে প্রকৃতির শোষণ এবং প্রান্তিক মানুষদের নিপীড়ন ইকোফেমিনিজমের ডিসকোর্সে একে অন্যের পাশে এসে দাঁড়ায়। 

সেই সত্তরের দশকে ভারতের ‘চিপকো আন্দোলন’ বারবার উল্লিখিত হত ইকোফেমিনিস্টদের বক্তব্যে। সে আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল উত্তরাখণ্ডের বৃক্ষচ্ছেদের বিরুদ্ধে অহিংস প্রতিবাদ। ‘চিপকো’ শব্দটির অর্থ আলিঙ্গন করা। এ আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন মহিলারা, যাঁরা আক্ষরিক অর্থে ও বৃহত্তর অর্থে গাছকে জড়িয়ে ধরেছিলেন৷ তাঁদের জীবিকা যেহেতু সরাসরি প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল, তাই তাঁরা গাছ কাটার নীরব কিন্তু দৃঢ় প্রতিবাদ করেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী বাধ্য হয়েছিলেন উত্তরাখণ্ডে এক দশক ধরে গাছ কাটা নিষিদ্ধ করতে। সেদিক থেকে দেখলে, ইকোফেমিনিজম নারীবাদের এমন একটি শাখা, যা সর্বদাই শুরু হয়েছে তৃণমূল স্তর থেকে। প্রাথমিক অংশগ্রহণকারীরা হলেন প্রান্তিক আদিবাসী, দলিত, গ্রামীণ নারী, যাঁরা পরিবেশের অবক্ষয়ের দ্বারা সরাসরি প্রভাবিত হন।

আশির দশকের শেষের দিকে ইকোফেমিনিজম তাত্ত্বিকতা থেকে বেরিয়ে এক জনপ্রিয় আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। ইয়নেস্ত্রা কিং-কে সেই জনপ্রিয়তার কারণ বলেন অনেকে। ১৯৮৭ সালে কিং ‘ইকোফিমিনিজম কি?’ শীর্ষক একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন৷ আশির দশকেই ইকোফিমিনিজম-এ দুটি স্বতন্ত্র চিন্তার স্কুল তৈরি হয়। র‌্যাডিকাল ইকোফিমিনিজম এবং কালচারাল ইকোফিমিনিজম। র‍্যাডিক্যাল ইকোফিমিনিস্টরা দাবি করেন যে প্রকৃতি ও নারী— উভয়েরই নেতিবাচক বা পণ্যযোগ্য মূর্তি গড়ে তোলা চলবে না, চলবে না সস্তার শ্রম বা সম্পদের জন্য তাদের শোষণ। অন্যদিকে সাংস্কৃতিক ইকোফেমিনিস্টরা দাবি করেন যে নারীরা তাদের লিঙ্গ ভূমিকা (পালিকা ও অন্নদাত্রী) এবং জৈবিক ভূমিকার কারণে (ঋতুস্রাব, গর্ভাবস্থা এবং স্তন্যদান) প্রকৃতির সঙ্গে অনেক বেশি সম্পৃক্ত। 

প্রথম ধারার এই ইকোফেমিনিজমের সঙ্গে আমি যে খুব বেশি সহমত, তা নয়। এই ধারার ইকোফেমিনিজমের, বিশেষত কালচারাল ইকোফেমিনিজমের, মূল সমস্যা মনে হয় এই যে, তা নারীকে নারী হওয়ার কারণেই কিছু বিশেষ গুণের অধিকারী ও কিছু বিশেষ দোষ থেকে মুক্ত ধরে নিচ্ছে। এই চরম বাইনারিতে আপত্তি আছে, কারণ এই দ্বিত্বের ধারণাকে নারীবাদও প্রশ্ন করছে বহুদিন ধরে। কিছুদিন আগে মারা গেলেন সুন্দরলাল বহুগুণা— যে গান্ধীবাদী প্রকৃতিপ্রেমী মানুষটিকে চিপকো আন্দোলনের অন্যতম প্রাণপুরুষ বলা হত। তিনি বা তাঁর মতো বহু পুরুষই লিঙ্গ-সামাজিক বাইনারির ঊর্ধ্বে উঠে, প্রান্তিকতার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে, প্রকৃতির সঙ্গে ও সকল মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। ক্ষমতা এবং পরিবারকেন্দ্রিক সম্পর্কের বাইরে এই বন্ধুত্ব এবং পারস্পরিক আস্থা নারীবাদের আকাঙ্ক্ষাও বটে।  

মূলধারার প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও ডিজনির চলচ্চিত্রে পড়েছে ইকোফেমিজমের স্পষ্ট প্রভাব। শুধু কি মোয়ানা? ‘ফ্রোজেন২’-এ এলসাও প্রকৃতিকে মুক্ত করে, নিজেকে মুক্ত করার পাশাপাশি। এলসার ক্ষেত্রে প্রকৃতিকে আবদ্ধ করেছিল, পরাধীন করেছিল তারই পূর্বপুরুষ, তার ঠাকুরদা। সেই অভিশাপেই শহর ধ্বংস হতে চলেছিল। তারপর নিজের লিঙ্গ নির্ধারিত বশংবদ ভূমিকাকে ঝেড়ে ফেলে এলসা ত্রাতা হয়ে ওঠে। এলসাকে সাহায্য করে বোন অ্যানা ও তার মাতৃপ্রজাতির লোকেরা। পিতৃপ্রজাতি কিন্তু এক্ষেত্রে কলুষিত, খল৷ একইভাবে মোয়ানাকে সাহায্য করে তার ঠাম্মা টালা। প্রথমে মোয়ানার বাবা, পরে মাউই— দুজনেই পিতৃতন্ত্রের প্রতিনিধি হিসেবে বারবার তার উপর ক্ষমতা জাহির করতে চায়, কিন্তু ব্যর্থ হয়। গ্রিন মুভমেন্ট এখন নারীবাদী আন্দোলনের মতোই পৃথিবী ব্যাপী একটি সার্বিক রাজনৈতিক আন্দোলন। তাই ডিজনির উল্লিখিত ছবিগুলি মূলধারার নিয়ম মেনেই পরিবেশ এবং নারীবাদ নিয়ে সরব হচ্ছে। কিন্তু এও মনে রাখা প্রয়োজন যে বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হবার কারণে ডিজনির পক্ষে সরলীকৃত ইকোফেমিজমের বাইরে বিশেষ অবস্থান নেওয়া সম্ভব না। তাই তাদের আখ্যানে সচেতন নারীবাদী পরিবর্তন আনার চেষ্টা থাকলেও, ‘মোয়ানা’ ছবিটি পরিবেশ এবং প্রান্তিকতার সম্পর্ক গভীরে অণ্বেষণ করে না। তা ‘নারীই প্রকৃতির ত্রাতা’— এহেন বার্তা দিয়ে ফেলে। যদিও তর্ক উঠতে পারে, ছোটদের ছবি কি জটিল হবে? কেন হবে না? এক্ষেত্রে, বিশদে আলোচনায় না গেলেও, স্টুডিও ঘিবলির ছবিগুলির (মূলত হায়ায়ো মিয়াজাকি-র নির্মিত ছবি) কথা উল্লেখ করা যায়, যেখানে পরিবেশকে কেন্দ্রে রেখে ছোট মেয়েদের অভিযানের অনেক নিদর্শন মেলে, যা সমস্যার আরও গভীরে যায়।

তাহলে আজ কি ইকোফেমিজমের ধারণা প্রাসঙ্গিক? বিশ্বব্যাপী উষ্ণায়ন, জলের ঘাটতি, ওজন স্তর ক্ষয়, জীববৈচিত্র‍্য হ্রাস, মহামারী, ঝঞ্ঝার দুঃসহ কালে নারীবাদীদের মধ্যে ও সার্বিক ভাবে জনপ্রিয় হচ্ছে পরিবেশ নারীবাদ বা ইকোফেমিনিজম। কিন্তু তা নিজেকে অভিযোজিত করছে নতুন নতুন ধারণার সঙ্গে। পোস্ট হিউম্যান, পোস্ট মার্ক্সিস্ট নানা ধারণার সঙ্গে নিজেকে মেলাচ্ছে। আসছে ইন্টারসেকশনালিটির ধারণাও। পরিবেশগত ক্ষতি একটি নারীবাদী সমস্যা বটেই। পরিবেশ সংরক্ষণের লড়াইয়ে আরও বেশি করে নারীর শীর্ষে থাকা তাই দরকার। তবে ইন্টারসেকশনাল হতে গেলে ইকোফেমিনিজমকে কেবল নারী ও প্রকৃতির একে অপরের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলে চলবে না, বরং আন্তঃনারী সম্পর্কের দিকেও মনোযোগ দিতে হবে। যেমন, আদিবাসী মহিলারা, যাঁরা প্রকৃতির সান্নিধ্যে বসবাস করেন, তাঁরা পরিবেশের অবক্ষয় ও কর্পোরেট আগ্রাসনের মুখে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পরিবেশ রক্ষা করতে হলে এই সব সম্প্রদায়ের ক্ষমতা ও অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে৷ নবজাগরণের সময় থেকে যে নৃকেন্দ্রিকতা বা অ্যান্থ্রপসেন্ট্রিসিজমের ধারণা প্রচলিত, সেই ‘নৃ’ বা মানুষের মধ্যে কি আছে নারীর ভাগ? আছে কি জল জঙ্গলের মাখামাখি হয়ে থাকা আদিবাসীর অংশিদারী? আজকের ইকোফেমিজম সেই জরুরি প্রশ্নটি তোলে। ডিজনির ছবিটি হয়ত সরলীকৃত। তা রাজনৈতিক ভাবে আটকে আছে প্রথম ধারার ইকোফেমিনিজমে। পুরুষ=প্রকৃতি-ধ্বংসকারী এবং নারী=প্রকৃতির ত্রাতা এই সহজ সমীকরণ অবশ্যই ছবিটির দুর্বলতা। পরিবেশবান্ধব রোলমডেল তৈরিই যদি লক্ষ্য হয়, তবে প্রশ্ন উঠতে পারে, আমার শিশু কন্যার ছবিটি ভালো লাগলেও কোনো বাচ্চা ছেলে সেটিকে কীভাবে গ্রহণ করবে? গ্রেটা থুনবার্গের মতো সত্যিকারের মোয়ানারা আসুক, কিন্তু আসুক সব লিঙ্গপরিচিতিতেই। ২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয় বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন, পৃথিবী নাকি ২০৫০ সালেই ধ্বংস হতে পারে। অথচ জুন মাসের পাঁচ তারিখ পরিবেশ দিবস এলে, তবেই আমাদের পরিবেশ নিয়ে ভাবার ফুরসৎ হয়। এমতাবস্থায় নতুন প্রজন্মের সবুজ ভালবাসা আমাদের জোগাক শ্বাসবায়ু।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *