মুর্শিদাবাদের নারী শ্রমিকদের জীবন ও যন্ত্রণা

শ্রমকে মূল্য দিয়ে গুণ-ভাগ করতে ওরা জানে না। শুধু বোঝে, বেঁচে থাকা মানেই কাজ। আর কাজ মানেই পরিবারে বেঁচে থাকা। কিন্তু কাজ কই? গ্রাম জারুলিয়া। আদিবাসি অধ্যুষিত। এখানকার আদিবাসী নৃত্য শিল্পী বালিকা কিস্কু, তপতী হেমব্রম, শকুন্তলা মুর্মুদের দিন ভাল নেই। লকডাউন অন্য অভিশাপ নামিয়ে এনেছে! শুধু নুন দিয়ে ভাত। রেশন থেকে পাওয়া চাল। সেটাই ভরসা ছিল। ছেলেদের অনলাইন ক্লাসের জন্য মোবাইল ফোনের আপ্রাণ চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার গল্প বলা মায়ের চোখগুলো অন্তর বিদীর্ণ করে। মনে হয় কিসের উন্নতি! কিসের গণতন্ত্র! কার জন্য এই দেশ? আদিবাসী লোকশিল্পের দলগুলির টানা বসে থাকতে থাকতে সাত মাস পেরিয়েছে। ‘টিকমারা মারাং বুরু এনেচ সিরেঙজ গাঁওতা’ ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত। ১৮ জন মহিলা নৃত্য শিল্পীর আটজন- পূজা, অঞ্জলি, নেহা, প্রতিমারা ভাতা পায় না। কিন্তু অনুষ্ঠানে গেছে লকডাউনের আগে। লকডাউনের প্রথম দিকে তো একবেলা খেয়ে কাটিয়েছে দিন। একঘরে প্রায় আটজন করে থাকা।

‘বিষ্ণুপুর আদিবাসি লুতুতেরম গাঁওতা’র পাঁচজন নৃত্যশিল্পী শান্তি কিস্কু, রুসমি, নিশা, মামনি কিস্কুরা ভাতা ছাড়াই অনুষ্ঠান করে গেছে এতদিন। রেশনের পাওয়া চাল বেচে সংসার চালাচ্ছে! ‘শিয়ারা আদিবাসি হুডুর বিজলি গাঁওতা’র প্রতিষ্ঠা ২০০৭ সালে। আটজন মহিলা নৃত্যশিল্পী শিবানী, চুমকি, মমতা,পরী,পামি মুর্মুদেরও বিনা ভাতায় চলেছে দিন। লকডাউন আধমরা করে দিয়েছে মমতা হেমব্রমদের।

কিন্তু এদের মুখের হাসি অমলিন। নিজেদের দলের প্রোগ্রাম নিয়ে খুব উৎসাহ। অভিযোগ, টাকা একসঙ্গে পায় না। সারাবছর পায় না। অন্যদিকে মাঠের কাজ মাত্র পনেরো থেকে কুড়ি দিন। লকডাউনে সে আশাও ছেড়েছে। ধান কাটার সময় মাত্র দশ দিন কাজ পাওয়ার আশা। সে টাকাও স্বামীরা মদের জন্য চুরি করে নেয়। বছরে ৩৬৫ দিন চলে কি করে? মেরিলা, রেখা – এদের একটিই ইচ্ছা, পশুপালনের জন্য ব্যবস্থা করে দিলে সংসার বাঁচে। জীবন বাঁচে। হাঁস-মুরগি, ছাগল থাকলে অভাবের দিনে বিক্রি করে চলবে ঘর। সেদিকেই মুখিয়ে আছে এখন।

প্রতিমা, অঞ্জলি, পানসুরি, শিবানীদের নৃত্য দেখলে মনে হয় এর চেয়ে অপূর্ব সৃষ্টি আর কোথাও নেই! নৃত্যকে এরা দেবতার মত মানে। এরা সত্যিই আর্টিস্ট। কিন্তু এদের স্বীকৃতি নেই! অভাব এদের ললাটলিখন। তাই মুখের হাসি দিয়ে জীবন জয়ের মন্ত্র আয়ত্ত করেছে আদিবাসী নৃত্যশিল্পীরা। শুধু একটাই জিজ্ঞাসা, আবার কবে নতুন করে শিল্পীদল গড়া হবে? না খেয়ে ঘরে পড়ে থাকার চেয়ে তো কাজ করে হাসিমুখে অভাবকে স্বীকার করে ছেলেমেয়েকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ভালো! এই মেয়ে ও মায়েদের কাজ চাই! শুকুরমিনি, হুপনি, ফিলিচিতা মুর্মুদের কেউ আছে একটা কাজ দেওয়ার? এদের নৃত্যকে জনপ্রিয় করবে কেউ? দুর্গাপুজো,কালীপুজোর অনুষ্ঠানের দিনগুলিতে এদের ডেকে এই আদিবাসী নৃত্যশিল্পীদের শিল্পের কদর করবে কি কেউ? আজ নয়ত আর কবে?

নবগ্রাম খয়রাগাছি গ্রামে পাতানি, বপানসারি, লক্ষ্মী টুডুদের বছর জুড়ে ভালো করে খেতে না পাওয়াটাই ধর্ম। এই অভাব যে এক ধরনের অর্থনৈতিক বঞ্চনা তা ওরা জানেই না। মেয়েদের সামাজিক বঞ্চনাও যে মানবাধিকারের ইস্যু সেটা তো শোনেই নি, বোঝেও না! অতিমারির আবহে মাত্র দশ দিন মাঠে কাজ পেয়েছে পাতানি হাঁসদারা। এখন পুজোর মুখে খুব অভাব। কখনও হাত পাততে শেখেনি। সম্মানের সঙ্গে কি করে অভাবের মোকাবিলা করা যায়? প্রশ্ন করতেই পানসারি হাঁসদা বলল,”আমার হাঁস আছে। তিনশো টাকা করে একেকটির দাম। বিক্রি করলে কিছু পয়সা পাবো।” লক্ষ্মী ও পাতানিও বলে, তাদের মুরগি ও হাঁস দুই আছে। বিক্রি করলে ভালো হয়। পুজোতে ছেলে-মেয়ের জন্য কিছু কিনতে পারে! যে মহিলাদের অভাব বেশি এবং বাচ্চাদের পুজায় কেনা-কাটার বায়না বেশি তাদের কাছেই বিক্রি করতে চায় পানসারিরা তাদের হাঁস-মুরগি। তবেই যারা কিনবে তারা আবার পৌষ মাসে সোহরাই উৎসবে এগুলি বিক্রি করে বাচ্চাদের নিয়ে আনন্দ করতে পারবে। মেয়েদের অভাবে এভাবে মেয়েদের এগিয়ে আসাই এখানকার মেয়েদের স্বভাব। 

পানসারিরাই নিজেদের হাঁস-মুরগি বিক্রির জন্য নিয়ে এল ভারতী টুডুদের। মেয়েদের হাতে পয়সা নেই। কিন্তু উপায় বের করতে তাদের জুড়ি নেই।

গ্রামে সার দিয়ে মাটির বাড়ি। রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ। মাটির উনুন ওদের সকলের। অভাব নিয়ে কোনও যন্ত্রণার প্রকাশ নেই। কোনও অভিযোগ নেই। নবগ্রাম ব্লকের নারায়ণপুরের মেয়েরা অনেক কিছু পারে। মাঠে শুধু ধান পুঁতেই বসে থাকে তা নয়! সুন্দর ঝাঁটা ও পাটি বানায়। এগুলিকে বাজারজাত করার লোক কই!  বছরে দেড় থেকে দুই মাস মাঠে কাজ পায় মেয়েরা। আবার চাষের সময় মেলে না কথামতো এক ভাগ ধানও। যেটুকু ধান জোটে সারাবছর তা দিয়ে কেনা-বেচা করে চলে সংসার। আসলে ভারতী হাঁসদাদের প্রতিদিনের অবহেলা নিয়ে চিন্তা-ভাবনার লোক কম। এদের সারাবছর উপার্জনক্ষম করে তোলার পরিকল্পনা নেই কারও।

এলাকায় মাত্র ৯১৩ জন মেয়ে। বাড়ি ৪৫৬ টি। কত স্বপ্নের মত সেজে উঠতে পারত এই গ্রামের মেয়েরা! কিন্তু এদের ক্ষমতার ব্যবহারই হলো না। সামাজিক ন্যায়বিচারের শর্তপূরণের দায় ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের উদ্যোগের উপর বর্তায়। অধিকারের অসম্পূর্ণতায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভুগে চলেছে। নীলমনিদের প্রতিদিনের গ্লানি দূর করা ও ওদের  অধিকারের প্রতি সম্মান জানানো দরকার। মেয়েদের দুর্দিনে রাষ্ট্রের মুখ বরাবর ভার। তাই রাষ্ট্র মুখ ফেরালেও  স্থায়ীভাবে এদের কাজে লাগানোর কথা ভাবতে হবে। তবেই গ্লোবাল ডেভলপমেন্টের গল্পটা গালভরে করা যাবে!

হরিহরপাড়া, রুকুনপুর গ্রাম। মাইগ্রান্ট লেবার আর্জিনার বয়স সাতাশ। চেন্নাইয়ে নামী অন্তর্বাস কোম্পানীতে কাজে হাতেখড়ি। সেখানে মাসে রোজগার ছিল সাত হাজার। তারপর ঠিকানা ছিল লুধিয়ানা। এখানে ছিল টায়ারের ফ্যাক্টরিতে কাজ। সাত মাস কাজ হতেই লকডাউনের ঘোষণা। মাস মাইনে ছিল দশ হাজার। আট মাস ধরে গ্রামে। কাজ নেই। দুটি বাচ্চা। এদের পড়ানোর জন্য টাকা উপার্জন জরুরি। কিন্তু ফেরার উপায় নেই। প্লেন ভাড়ার ক্ষমতাও নেই। ঘরে বসে কী করা যায়? ভেবেই চলেছে দিনরাত। হাতের কাছে উপায় বলতে গ্রামে এক টেলার সেলাই শেখাচ্ছে। তার কাছেই কাজ শেখার কথা ভাবছে আর্জিনা।

মাইগ্রান্ট লেবার রেখার বয়স পঁচিশ। লুধিয়ানায় স্টিল ফ্যাক্টরিতে করত কাজ। দশ মাস পরেই লকডাউন ঘোষণা। মাসে পেত সাত হাজার টাকা। তামা-পেতল আলাদা করা ছিল কাজ। ঘরে ফিরে কাজ নেই। একটিই বাচ্চা। সংসার ছোটো কিন্তু স্বামী-স্ত্রী কারও কাজ নেই। তবু সংসার চালাতে হাত পাততে হচ্ছে স্বামীর কাছেই। সেখানেও উত্তর ‘নেই’। সেটা শুনেও ক্লান্তি আসছে।

সরিফা মাধ্যমিক পাশ। নাটবল্টুর কারখানায় কাজ করত লুধিয়ানায়। পেত সাত হাজার টাকা। লকডাউনে ঘরে ফেরে। এখন ফাঁকা হাত। আবার কবে কাজে ফিরবে, সে নিশ্চয়তা নেই।

চম্পা সাইকেলের রিম তৈরির কারখানায় কাজ করত। পেত সাড়ে ছয় হাজার টাকা। ঘরে ফিরে বিরাট সমস্যা। দুই মেয়ে। সংসারে ভরসা রেশনের চাল ও বাচ্চাদের স্কুলের মিড ডে মিলের চাল-ছোলা-আলু। সংসারের হাল ফেরাতে সে এখন হাঁস-মুরগি পালনের কথা ভাবছে!

পারভিনার বয়স তিরিশ। তারও নাটবল্টুর কারখানায় ছিল কাজ। লকডাউনে বাড়ি ফিরে আসা। মাসে সাত হাজার টাকা পেত। এখন ঘরে বসে থাকা। সময় কাটছে না। অন্যদিকে অভাবও দিনে দিনে বেড়েই চলেছে।

গ্রামে মেয়েদের সামনে সেল্ফ হেল্প গ্রুপের কাজ ছিল বড় বিকল্প। এখন আটমাস ধরে তালা পড়েছে সেখানেও। এখন মহিলা মাইগ্রান্ট লেবারদের সামনে দুটি বিকল্প জীবিকা। পশুপালন ও টেলারিং। কিন্তু কোনোটিতেই স্থায়ীভাবে রোজগারের আশা নেই। কাজ নতুন করে শিখে শুরু করা কঠিন। প্রশিক্ষণের জন্য সময় দরকার। রাজ্যের বাইরের কাজ আটমাস পরে ফিরে পাওয়া অসম্ভব। ফিরে যাওয়ার উপায় আপাতত বন্ধ। তাই এরা ধুঁকছে। খাবার জুটছে কোনোরকমে, কিন্তু স্বাধীনতা ও আত্মনির্ভরতার স্বাদ খুঁজে ফিরছে। মাইগ্রান্ট লেবার সরিফা-পারভিনদের সকলের একটাই কথা- “মেয়েদের হাতে কিছু পয়সা না থাকলে সম্মান থাকে না সংসারে!” সব মেয়ের বাবারা যদি বুঝত! তবে হয়ত বিয়ের জন্য পয়সা না জমিয়ে মেয়েদের স্বনির্ভর করার জন্য অর্থ সঞ্চয় করত। বেঁচে থাকার জন্য খাদ্যের মতই সম্মান জরুরি। অসম্মানের জীবনে খাবারেও পেট ভরে না। অন্যদিকে মেয়েদের অর্থনৈতিক অধিকারের বিষয়ে অনেক বেশি করে প্রশাসনিক তৎপরতা প্রয়োজন। মহিলা মাইগ্রান্ট লেবারদের জন্য একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় নীতিও জরুরি। কিন্তু ভাবছে কি কেউ? নাকি এমন অবস্থা মেনে নেওয়াটাই স্বাভাবিক এই মত প্রতিষ্ঠা হয়ে যাচ্ছে?

জঙ্গীপুর, গ্রাম ইমামনগর। মুসলিম অধ্যুষিত গ্রাম। মেয়েদের হাতের কাজ বলতে বিড়ি বাঁধা। কালন, শামিলাদের চোখ খারাপ হয়ে গেছে। চশমা নেই। পিঠে ব্যাথা নিয়ে বিড়ি বাঁধছে। মজুরি নিয়ে মাথাব্যাথা নেই। প্রাপ্য কিছু নিয়ে অধিকারের লড়াই নেই। হাঁড়িতে চাল ফুটলেই যথেষ্ট। বিড়ি বাঁধা শুরু ঘরের অভাবের জন্য। বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ি, কিন্তু বিড়ি বাঁধা থামেনি। টাকার উপর নিজের অধিকার নেই। সংসারের কাজেই শেষ হয়ে যায় টাকা। স্বামী থাকে বাইরে। টাকা সবসময় পাঠাতে পারে না। শরীরে নানা অসুখের বাসা। চিকিৎসা নেই। এক অসস্পূর্ণ জীবনের কিনারা দিয়ে অবিরাম হেঁটে চলা ওদের। যতক্ষণ শ্বাস,হাতে বিড়ির গজাল ও কুলা ধরে রাখার লড়াই।

বহরমপুর, গ্রাম বহরুল। আদিবাসী গ্রাম। সাহায্য করতে গেলে মেয়েদের বিস্মিত চোখে একটিই জিজ্ঞাসা, কোন পার্টি? রাজনীতি এভাবে কবে যে খেয়ে ফেলেছে গ্রামের মানুষদের! এখানকার মেয়েরা বেশিরভাগই জীবনে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্যের সিনেমা দেখেনি। পয়সার অভাব, টিকিট কাটতে পারেনা। আবার টিভিও নেই। সকালে আলুসেদ্ধ ভাত। আর বিকেলে এক মুঠো মুড়ি পেলেই দিন কেটে যায়। সারাবছরে একটি শাড়ি। কোনো শৌচালয় নেই। স্বাস্থ্যকেন্দ্র যাওয়ার চল নেই অসুখে। স্বামী সন্ধ্যে হলেই বেহুঁশ। এরা পরিবারে ও বাইরে শোষিত, অর্থনৈতিক ভাবে বঞ্চিত, রাজনৈতিকভাবে প্রতারিত। স্বাধীনতার চেহারা এমন হবে কেউ সম্ভবত ৪৭-এ ভেবে উঠতেও পারেনি। এ দেশেই শিল্পপতির পত্নী তিন লাখ টাকার কাপে সকালে চা খান। আবার তাঁর জন্মদিনে স্বামীর কাছ থেকে উপহার পান ৬০ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের এয়ারবাস। কিন্তু বৈশাখিদের জানা থাকে না ‘সবুজ সাথী’-র কথা। তাই ক্লাস নাইনে ওঠার আগেই পড়া ছেড়ে দেওয়ার কষ্ট বয়ে বেড়াতে হয়। মা ভাবে সাইকেলটা থাকলে বিক্রি করে তো কিছুদিন সংসার চলত! চালের বিনিময়ে ধান, আলুর বিনিময়ে শাক এভাবেই চলে অভাবের দিন। কোয়েল মুর্মুদের জীবন মানে জন্ম আর বিয়ে আর বেহিসেবি শ্রমদান। তারপর একদিন হারিয়ে যাওয়া। অধিকার আর সাম্য তাদের কাছে রূপকথার গল্প।

এভাবেই  অমর্যাদা ও অসম্মানের অনুপলব্ধির পাতা ভরে প্রান্তিক শ্রমিক নারীদের হেরে ও হারিয়ে বিদায় নেওয়ার ইতিহাস শতাব্দীর পর শতাব্দী চলছে।   

শেয়ার করুন

1 thought on “মুর্শিদাবাদের নারী শ্রমিকদের জীবন ও যন্ত্রণা”

  1. Avik Datta

    এইসব খবর কোন মিডিয়া প্রচার করে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *