নাদ: আ কল ইন ওয়েটিং

কাশ্মীরি লেখিকা ও গবেষক বুশরা পাঞ্জাবীর লেখাটি প্রথম দ্য ইনভার্স জার্নাল পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ইংরেজি লেখাটি পড়তে পারবেন এখানে। 

ইংরেজি গদ্যে লেখিকা রোমানে তাঁর ভাষার কিছু প্রচলিত শব্দ ব্যবহার করে সেগুলোর তর্জমা ফুটনোটে দিয়েছেন। এই বাংলা অনুবাদে সেই শব্দগুলিকে বাংলা হরফে উচ্চারণের কাছাকাছি রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু উচ্চারণের বিভ্রান্তি এড়াতে ফুটনোটে লেখিকা প্রদত্ত সেই শব্দগুলির রোমান বানানও বাংলা তর্জমার সঙ্গে রাখা থাকল।

বছরের পর বছর ধরে সে (বহু) আগমন এবং (বহু) প্রস্থানের মধ্যে নষ্ট বুলেটের মতো ঠোক্কর খেয়ে চলেছে। সুটকেস বোঝাই করে সে যায়। সুটকেস থেকে কাপড়জামা বের করার মাধ্যমে তাঁর আগমন। কিন্তু কখনোই তাঁর সত্যিকারের আগমন ঘটে না। 

বহুদূরের কোন এক জায়গায়, সে তাঁর জীবনকে বিবিধ নিষেধের মধ্যে দিয়ে মানিয়ে চলে। এখানকার  দৈনন্দিন রীতি আর যাই হোক, স্বাভাবিক নয়। দেহ এবং বস্তু, চলমানতা এবং নিত্যকর্ম, ইশারা এবং অঙ্গভঙ্গি, চিহ্ন এবং রূপক, এইসবের সুনির্দিষ্ট মিলমেশ তার কাছে অচেনা। অচেনা ভাষা। তারা তোমার পরিবারের নামে তোমাকে চেনে না। সুনির্দিষ্টভাবে দেখতে গেলে, রাস্তার খাড়াই উতরাই, আশেপাশের জায়গা কাঠামো, অলিগলি বাজার, কোনকিছুই পরিচিত নয়। এই অচেনা ফ্রেমগুলির মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে অনুপস্থিতির মানচিত্র খোঁজে।      

এখানে শীতকালের গন্ধ রাজমা ডাল-গগজি’র মতো নয়1 সকালটা ধোঁয়া ওঠা ‘নুন চায়’2 আর ‘কান্দার চ’ট’3-এর গন্ধে ভরে যায় না। যখন তখন তাড়াহুড়ো করে শাটার বন্ধ করা এবং শূন্য খেলার মাঠ এখানকার সাধারণ দৃশ্য নয়। প্রতীয়মান বিপদের সঙ্কেতও এখানে নেই। প্যারামিলিটারি স্কোয়াড এখানে ঘুরে বেড়ায় না। সন্ধ্যের মনখারাপ করা ধূসরতা পাথরের মতো মৃত, শান্ত রাতের আকার নেয় না। এখানে আকাশ উত্তরহীন প্রার্থনার বোঝা বয়ে চলে না! ‘জুন’4-এর খেলার সাথী তারারা এখানে নেই।      

এখানে মায়েরা ক্রন্দনরত বাচ্চাদের ‘জানা এবং গাসহা’জুন’5 বলে ডেকে ‘আল্লাহু’6 গান শোনায় না। এখানে মায়েদের কারারুদ্ধ সন্তানের জন্য সন্ত্রস্ত হয়ে থাকতে হয় না। তাঁরা মৃতদেহ দেখে চিৎকার করে ‘মৌজ হা লাজিয়ে বালাই’7 বলে ওঠে না। এখানে বাচ্চারা লম্বা ছুটি উপভোগ করে না। তাদের পাথর এবং বুলেট বর্ষণের শিউরে উঠতে হয়না। দেয়াল ভেদ করে ‘আজাদি’র গর্জন ওঠে না। এখানে মানুষ গোরের টোটেম খুঁজতে খুঁজতে পাগল হয়ে যায় না। 

প্রলয়ঙ্কর অশুভ ইঙ্গিতের কোন চিহ্ন নেই। কোন চেকপয়েন্ট নেই। রাস্তায় কোন রক্ত নেই। শৃঙ্খলাবদ্ধ কোন (বি)শৃঙ্খলা নেই।  

এই অনুপস্থিতিগুলো ভীতিপ্রদ। বিহ্বল করে দেওয়া চাকার গতি, সদাব্যস্ত রাস্তা তাঁকে বিভ্রান্ত করে। এই ধরনের স্বাভাবিকতা তাঁর অশ্লীল ঠেকে। নিজেকে মানিয়ে নিতে কষ্ট হয়। যেখানে তোমার প্রতিদিনের মূলে নৈরাজ্য, সেখানে এই অচেনা স্বাভাবিকতার কী মানে দাঁড়ায়? সে এই (বিবিধ) বিচ্ছিন্নতার ভাবাবেগের কোনও কূলপায় না। এই অপরিচিতির কবলে আবদ্ধ হয়ে সে ভিনদেশে নিজেকে এক বিদেশি শরীর মনে করে।

—————————————

এই শহরের উত্তাপ অসহনীয়। বাতাসের আর্দ্রতা শরীর স্যাঁতস্যাঁতে করে দেয় , প্রফুল্লতাকে মামুলি করে তুলতে পারে। যখন অসমতল রাস্তায় রিকশা চলতে থাকে, সে এমন এক ভাষায় ফোনে কথা বলে যা রিকশাচালক বুঝতে পারেন না। কৌতূহলী চালক জানতে চান, 

ম্যাডাম, আপ কঁহা সে? আফগানিস্থান? (ম্যাডাম, আপনি কি আফগানিস্থান থেকে এসেছেন?)

সে একটি নরম নেতিবাচক উত্তর দেয়। 

ফির? (তাহলে?) চালক তাঁর উত্তরের অপেক্ষায় থাকে। 

বাঁকা হাসি দিয়ে সে জানায়, কাশ্মীর। 

ওহ, ‘ফির তো আপ আপনে হি হো’ (ওহ, তাহলে তো আপনি আমাদেরই একজন)।  

…………………………………… 

আধা মৃত। আধা জীবিত। মনে রাখার মধ্যে দিয়ে সে নিজেকে পুনরুজ্জীবিত করে তোলে। তাঁর কাছে, ভুলে না যাওয়া একটি নৈতিক আবশ্যিকতা। এবং মনে রাখা প্রতিরোধের সমান, নিজের অস্তিত্ব জিইয়ে রাখার সমান। এভাবেই তাঁর অতীত তাঁর বর্তমানে জীবিত থাকে। তাঁর ঘরের মানুষদের সঙ্গে বন্ধনসূত্রে, জীবিত এবং মৃত, বেঁচে থাকার কিছু মুহুর্ত, এবং ভাবনাগুলোর মাধ্যমে, সে তাঁর শহর এবং শহরের টুকরোগুলো নিজের সাথে বয়ে নিয়ে চলে। প্রাত্যহিক সম্পর্কগুলির মধ্যে সে বিভিন্ন প্রেসার পয়েন্টগুলি এবং বিভিন্ন ধরনের অনুষঙ্গের ওপর নজর রেখে চলে। সেই অনুষঙ্গ, যা গতানুগতিক দৃশ্য এবং দর্শনের মাধ্যমে তৈরি হয়; যত স্বাভাবিক ভয়াবহতা, যত স্বাভাবিক আবেগ। 

একটি বিকট শব্দে তাঁর বিক্ষিপ্ত মনোযোগে টান পড়ে। সে তাঁর পেশীতে উত্তেজনা অনুভব করে। এইধরনের শব্দ তাঁর কাছে নতুন না। যতদূর সে মনে করতে পারে, এই শব্দ তাঁর অনেক চেনা। কিন্তু এখানে, এর অর্থ হল আলোর রোশনাই। এই আওয়াজের বর্ষণ সারারাত ধরে চলবে। শুব্দগুলো ক্যালিডোস্কোপ-এর মতো করে স্থির ছবিকে চলমান করে তোলে। তাঁর আতংকের দৃশ্যগুলি মনে পড়ে। হঠাৎই সে অনুভব করে যেন কনসার্টিনা বাদ্যযন্ত্রের তীক্ষ্ণ চড়াই তাঁর ইন্দ্রিয় এবং স্মৃতিতে প্রবেশ করছে। সে এমন এক সময়ে ভেসে যায় যখন অজানা কোন ভয় তাঁকে জড়িয়ে ধরত। শৈশবে, যখন সে একটি ছোট মেয়ে ছিল, দিনের আলোতে চিলেকোঠার ঘরে ওঠার সাহস সে করতে পারত না। হঠাৎ কোন শব্দ হলে, দরজায় কেউ কড়া নাড়ালে সে কাঁপতে থাকত, বন্দুকের গুলির শব্দ তাঁকে হিস্টেরিক করে তুলত। চাপা গলায় কেউ বলত চোপেই কারিভ, ইয়াদ’ দেয়েও যাম্মেনাস 8। সে বুঝতে পারত না এ কোন ধরণের নাটক চলছে। তবে এটি তাঁর দুঃস্বপ্নের দৃশ্যগুলির একটি অবশ্যই ছিল। একটি আহত শিশুর মতো সে কাঁদত। বন্দুকযুদ্ধের শব্দগুলি আটকাবার জন্য দাদা তাঁর কানে তুলোর বল গুঁজে দিত। পেছনের শব্দগুলো মিলিয়ে গেলেও, ঘুমিয়ে না পড়া অব্দি, সে চাপা স্বরে ফুঁপিয়ে কেঁদে যেত। 

কোন এক জায়গায় বসবাস করা জীবন স্মৃতির উদ্রেক করে; শৈশবের স্বাদ এবং গন্ধের স্মৃতি, বন্ধুত্ব এবং হারানো প্রেম, স্বপ্ন এবং আশার স্মৃতি। কখনও কখনও আবার জীবন ডুবে থাকা জখমের দাগগুলিও ভাসিয়ে দেয় – সেইসব ক্ষত যা সারবার নয়। হঠাৎ করেই যেন তাঁকে ‘সেখান’ থেকে বিচ্যুত করে দেওয়া হয়। সে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। প্রলম্বিত প্রত্যাবর্তন এবং ক্ষয়ক্ষতির জন্য আফসোস হয়। 

—————————————-

যুগ যুগ ধরে আমরা হিসেব করে চলেছি। সংখ্যার হিসেব রাখতে আমরা খুবই পটু। সংখ্যার হিসেবে ভালো হতে গেলে অভ্যাস করতে হয়। ১৯৯০-এর দশকে আমাদের পূর্বপুরুষদের ওপর বিবিধ হিসেবনিকেশের চাবুক মারা হয়েছিল। সেই আঘাত এখনও [আজ অব্দি] চলছে। তাই যদি বলি, আমরা যে সংখ্যা হিসেব করার শৈলী আয়ত্ত করে ফেলেছি সেটা বিন্দুমাত্র বাড়িয়ে বলা হবে না। আমাদের শুধু একটা ট্রিগার দরকার। তারপর থেকে আমরাই দেখে নেব।

সারা বছর ধরে এই সংখ্যা আমাদের দাবিয়ে রাখে। আমরাও বিভিন্ন হিসেবনিকেশ নিয়ে ব্যস্ত থাকি। আমরা বিভিন্ন ঋতুদের মধ্যে তুলনা করি – জাবর9, নিষ্ঠুর যত বসন্ত এবং রক্তাক্ত সব গ্রীষ্মের ফসল গুনতে। আমাদের মাথার মধ্যে বিভিন্ন তালিকা হানা দিতে থাকে, আর বাইরে সেগুলোকেই আমরা আভরণে পরিণত করি। আমরা কী হারিয়েছি? সেটা কী, যা রয়ে গেছে? আমাদের দৈনন্দিন কথাবার্তায় সংখ্যা যতিচিহ্নের কাজ করে। সাধের প্রাণের মতোই আমরা সেগুলো আঁকড়ে থাকি। আমাদের কষ্ট, সংখ্যায় পর্যবসিত হয়েছে।   

এখানে তাঁর হিসেব গুলিয়ে যায়। উদ্বিগ্নচিত্তে সে ফোনের পর্দায় চোখ রাখে। ছোট মিসড কলগুলি তাঁকে আরও উদ্বিগ্ন এবং মরিয়া করে তোলে। এত মাইলের দূরত্বেও সে আঙুলের ডগায় হিসেব করে, কত দিন হল? আগের ফোন আসার পর কত ঘন্টা হল? সমস্ত কণ্ঠস্বর নিশ্চুপ। সে তাঁর ভীতিকে খারিজ করার চেষ্টা করে। কিন্তু যতই সে না ভাবার কথা ভাবে, ততই সন্দিহান হয়ে পড়ে। যুদ্ধকালীন সময়ে, ভালোবাসার কী পরিণতি হয়?

—————————————-

এখানে সাধারণ সময়ে নিউ নর্মালের সঙ্গে তাল মেলাতে মেলাতে, বাড়িভাড়ার টাকা জোগাড় করতে, সমস্ত বিল মেটাতে, নৈশভোজের জন্য বাজার আনতে, বাড়ির রান্নাকরা খাবারে আকাঙ্খায়, কিছু বিভ্রান্তিকর হাসিঠাট্টায়, খবরের কাগজে চোখ বুলিয়ে, জুলম-এর10 বিরুদ্ধে শাপশাপান্ত করে কেটে যায় – হিন্দুস্তানাস ত্রাত11! প্রত্যাশায় বসে থাকি, এর পরে কী হবে? অবাক হয়ে ভাবি, আর কতদিন? নিজেকে প্রশ্ন করি, ‘আমি এখানে কেন’? বাকি ঘন্টাগুলো কিছু ঘটার অথবা কিছু শেষ হবার প্রতীক্ষায় কেটে যায়। 

জানা এবং অজানার কালচক্রের পুনরাবৃত্তে সে আটকা পড়ে গেছে। সে প্রথমে সব বিশ্বাস করেছিল, এখন কিছুই বিশ্বাস করে না। একবার এদিকে, একবার ওদিকে দোল খেতে খেতে সে অবশিষ্টাংশের ছাইয়ের মতো ঝুলে থাকে। অবসান খারিজ! তাঁর হৃদয়ের সুশোভিত মূর্তিগুলো নিরলস ঘণ্টাধ্বনি চালিয়ে যায়, এই যে তুমি এখন সম্মোহনী মিথ্যেগুলো হজম করে যাচ্ছ, এ তোমার কী পরিণতি? হতভাগ্য! সে তাঁর অস্তিত্বের টুকরোগুলো গুছিয়ে নেবার জন্য উঠে পড়ে লাগে। এক ক্লান্তিকর এবং পাগল-পারা আবেগ চেপে বসে। সে আর্তনাদ করতে চায় কিন্তু কোন আওয়াজ বেরোয় না, যেন কোন অচেনা শক্তি গলা চেপে ধরেছে। জানালার ওপরে একটি পাখি বসে আছে, উড়বার জন্য প্রস্তুত – সে একবার পাখা মেলে ধরছে আবার গুটিয়ে নিচ্ছে। এই দৃশ্য দেখতে দেখতে তাঁর আত্মার শৃঙ্খলগুলি শোকার্ত ধ্বনি-বার্তা পাঠায়, মুক্তির জন্য আকুতি করে। বেরোবার কী কোন রাস্তা আছে? বাতাসে দানা ঝাপটানো পাখিটিকে যে ধরে থাকে, রহস্যময় জগতে যে হারিয়ে যায়, সে তাঁর পানে চেয়ে থাকে – সে, যে সবার উপরে নজর রাখে। তাঁর প্রতি সে একটুকরো প্রার্থনা ফিসফিস করে শুধু – তুলকালামতে’লেখ মে হুকুম-এ-আজাদি!12  

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published.